নায়ক রাজ

razzak

‘নীল আকাশের নীচে আমি

রাস্তা চলেছি একা।’       অথবা

‘পিচঢালা এই পথটাকে ভালবেসেছি

তার সাথে এই মনটাকে বেঁধে রেখেছি।’

razzak1

এই গানগুলো গেয়ে গেয়ে একজন রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াতেন। সেই দুরন্ত যুবকের কথা কী কারো মনে পড়ে? রূপালি পর্দায় তার অবাধ বিচরন ছিল এক সময়। কখনও রোমান্টিক নায়ক, কখনও দুখী মায়ের আদরের দুলাল, কখনও প্রতিবাদী কন্ঠ, কখনও ভাবীর আদরের দেবর। একই মানুষের কত শত রূপ ছিল পর্দায়। যখন যে চরিত্র অবলীলায় ফুটিয়ে তুলেছেন। এখনও বুঝতে পারছেন না? বলছি বাংলাদেশের এক সময়ের সাড়া জাগানো, যার একচেটিয়া দখল ছিল বাংলা সিনেমা জগতে একটা সময়ে, সেই নায়ক রাজ রাজ্জাকের কথা।

কদিন আগে আমি লিখেছিলাম বাংলাদেশের অপর এক জনপ্রিয় নায়ক অকাল প্রয়াত সালমান শাহকে নিয়ে। নায়ক রাজ রাজ্জাক বোধহয় ছিলেন সালমানের আগে প্রথম কোন জনপ্রিয় নায়ক যার জনপ্রিয়তা তখনকার সময়ে সাড়া জাগিয়ে ছিল ঘরে ঘরে। তার অভিনয় প্রতিভা, স্টাইল সব কিছুই ছিল নজরকাড়া। কী ছিল কথা বলার ভঙ্গিমা আর কী ছিল চুলের স্টাইল অথবা পোশাক আশাকের ধরন! এক সময় তার চুলের স্টাইল নকল করতেন অনেক যুবক। আর নারীরা হয়তবা তার প্রেমে হাবুডুবু খেতেন। আমার নিজেরই এখন তার সেই সব ছবি দেখে প্রেমে পড়ে যেতে মন চায়। 😛 আজ লিখব আমার অন্যতম প্রিয় আর সেরা এই অভিনেতাকে নিয়ে।

razzak2

রাজ্জাকের আসল নাম আব্দুর রাজ্জাক, জন্ম হয়েছিল ১৯৪২ সালের ২৩শে জানুয়ারি কলকাতায়। বাংলা চলচ্চিত্র জগতে তার বিচরন ছিল ১৯৬০ সাল থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত। জন্মের পর থেকেই কলকাতায় বেড়ে ওঠা রাজ্জাকের কখনই অভিনয়ের প্রতি কোন আগ্রহ বা ইচ্ছেই ছিলনা। বরং তাঁর ইচ্ছে ছিল একসময় ভালো কোন খেলোয়াড় হবেন। খেলাধুলার প্রতি আগ্রহ থেকেই তাঁর এমনটি ইচ্ছে। একবার তাঁর স্কুল থেকে স্বরস্বতী পূজা উদযাপনের জন্য একটি নাটক প্রদর্শনের ব্যবস্থা নেয়া হয়। রাজ্জাকের স্পোর্টস শিক্ষক রাজ্জাককে সেখানে অংশ নিতে বললেন। রাজ্জাক অনেকটা অনিচ্ছায় সেখানে একটি পার্ট করলেন এবং আশ্চর্যজনকভাবে তার সেই প্রথম অভিনয় জীবনে আগমনের সেই অভিজ্ঞতায় তিনি খুব আনন্দিত হলেন। অভিনয়ের প্রথম স্বাদ তাকে পেয়ে বসল। এরপরও স্কুলের আরো কিছু নাটকে তিনি অংশ নিলেন একে একে। কিন্তু অবাক করা বিষয়, এভাবে অভিনয় করতে করতে একটা সময় এলো যখন রাজ্জাক অভিনয়কে গুরুত্বের সাথে নেয়ার কথা চিন্তা করতে লাগলেন।

razzak3

কিন্তু যেমন ভাবা তেমনটা কী আর এত সহজে হয়? কোন বড় অভিনেতার জীবনেই হয়ত অনেক কষ্ট করে ছারা সাফল্য আসেনি। কিংবা সাফল্য পেতে হলে অনেক দূর যেতে হয় এটাই হয়ত ঠিক কথা। আর সেক্ষেত্রে রাজ্জাককেও কষ্ট করতে হয়েছে। কেননা তাঁর অভিনয়ের পথে বড় বাঁধা ছিল তাঁর পরিবার। রাজ্জাকের বাবা আর তার অপর দুই ভাই একে অপরের পথ ধরে ছিলেন ব্যবসায়ী। আর স্বাভাবিকভাবেই পরিবারে সবার ইচ্ছে রাজ্জাকও বাকি সবার পথ অনুসরণ করেন। তিনি শুরুও করেছিলেন তেমনটি কিন্তু অভিনয়ের প্রতি তার আগ্রহ আর ভালবাসা দেখে তার মেঝ ভাই তাকে সব দিক দিয়ে সহায়তা করেছিলেন। আর ভাইয়ের সাহায্যে রাজ্জাক তার স্বপ্নের পেছনে ছুটতে সফল হোন।

রাজ্জাক এসএসসি পরীক্ষা পাশ করার পর থেকেই অন্যান্য বড় কিছু অভিনেতাদের সাথে নাটকে কাজ করা শুরু করেন। নিজের প্রতিভার গুনে রাজ্জাক ধীরে ধীরে আরো অনেক নাটকে কাজ করার সুযোগ পেতে থাকেন। একসময় রাজ্জাক কলকাতার নামকরা নাট্যাভিনেতা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।

razzak shabana

কলকাতার সেই সময়ে যেখানে রাজ্জাক তার অভিনয় জীবনের সূচনা করেছিলেন সেখানেই তার জীবনের আরেক অধ্যায় শুরু করেন স্ত্রী লক্ষীর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে। কলকাতার সেই অভিনয় পাড়ায় চলতে গিয়ে রাজ্জাক সংস্পর্শে আসেন নেক খ্যাতিমান অভিনেতাদের এদের মধ্যে ছিলেন উত্তম কুমার, তপন সিনহা আর পরিচালক পিযূষ সাহা। পিযূষ সাহার অবদান ছিল রাজ্জাকের জীবনে অনেক বড় এক ভূমিকা। এই পরিচালক এক সময় রাজ্জাককে বলেছিলেন নিজের ক্যারিয়ার গড়তে ঢাকায় পাড়ি জমাতে।

সময় ছিল ১৯৬৪ সাল, রাজ্জাক কলকাতা থেকে বাংলাদেশে তখনকার পূর্ব পাকিস্তানে পাড়ি জমান স্ত্রী আর ৬ মাসের পুত্র সন্তান বাপ্পারাজকে সাথে করে। চোখে তখন তার অনেক স্বপ্ন। স্বপ্ন অভিনয়ে নিজের প্রতিভার সর্বোচ্চ দেয়ার, স্বপ্ন চলচ্চিত্রে অভিনয় করার। প্রথম দিকে রাজ্জাক চেয়েছিলেন কলকাতার চলচ্চিত্রে ছোটখাট চরিত্রের মাধ্যমেই চলচ্চিত্রে নিজের স্থান করে নেয়া। কিন্তু পিযূষ সাহা তাকে বারন করলেন আর বললেন ভালো চরিত্রের সন্ধান করতে আর ঢাকা হবে তার জন্য সবচেয়ে ভালো যায়গা নিজের প্রতিভার বহিঃপ্রকাশ করার। ঢাকায় নিজের সবকিছু গুছিয়ে নিয়ে রাজ্জাক কাজ শুরু করেন বিভিন্ন থিয়েটারে। সে সময় তিনি কিছু সহকারী পরিচালকের কাজও করেছেন। তারপর দুই বছর টেলিভিশনের অভিনেতা হিসেবে কাজ করেছেন। পাকিস্তান টেলিভিশনে একটি ধারাবাহিক ‘ঘরোয়া’ তে রাজ্জাক অভিনয় করেন। তারপর তিনি কিছু ছোটখাট চরিত্রে অভিনয় করেছেন বেশ কিছু চলচ্চিত্রে।

razzak kobori

একটা সময় আসল যখন শুধুমাত্র রাজ্জাকের জন্যই চরিত্র সৃষ্টি হতে লাগল। তার তখন এ স্প্মর্কে কোন ধারনাই ছিলনা যে জীবন কেমন হয়ে যেতে পারে। অবশেষে এলো ১৯৬৬ সাল, সেই সাল যখন রাজ্জাকের জীবনের মোড় ঘুরে যায়। বিখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক জহির রায়হান রাজ্জাককে আমন্ত্রঞ্জানালেন তার তৈরী ছবি ‘বেহুলা’ তে অভিনয়ের জন্য। সেটি ছিল তাঁর প্রথম ছবি প্রধান অভিনেতা হিসেবে। তারপর দ্বিতীয় ছবি ছিল আনোয়ারা আর তৃতীয় ছবি আগুন নিয়ে খেলা যখন বের হলো ততদিনে রাজ্জাক সুপারস্টার খেতাবে ভূষিত।

রাজ্জাক প্রথম জুটি বেঁধে অভিনয় করেন সুচন্দার সাথে। তারপর একে একে কবরী, ববিতা আর শাবানার সাথে জুটি বেধে ভালো জুটির খ্যাতি অর্জন করেন। এছাড়াও আরো অনেক অভিনেত্রীদের সাথে রয়েছে তার অনেক চলচ্চিত্র।

রাজ্জাক অভিনয় করেছেন প্রায় ৩০০টির মত বাংলা আর উর্দু চলচ্চিত্রে। কাজ করেছেন অনেক নামী অভিনেতাদের সাথে। আনোয়ার হোসেন, বুলবুল আহমেদ, সোহেল রানা, ইলিয়াস কাঞ্চন প্রভূত শিল্পীদের সাথে তার অভিনিত চলচ্চিত্র রয়েছে।

তখনকার দিনে এত হার্ট্থ্রোব আর সুপারস্টার নায়ক হওয়া সত্বেও রাজ্জাককে নিয়ে শোনা যায়নি কোন স্ক্যান্ডাল। অভিনয়ের প্রতি আসক্তি আর পরিবারের প্রতি ভালবাসা তার ছিল প্রগাঢ়। নিজের কাজ আর পরিবার দুটোর মধ্যেই ছিল ভাল বোঝাপড়া। তাছাড়া স্ত্রীর সার্বক্ষণিক সহযোগিতা রাজ্জাককে সব ধরনের গুজব থেকে দূরে রাখতে পেরেছে। ইন্টারনেটের এক সাক্ষাৎপ্কারে এমনি বলেছেন নায়ক রাজ্জাক।

razzak with sons

নায়ক হিসেবে রাজ্জাক সর্বশেষ অভিনয় করেন ১৯৯৪ সালে অন্ধ বিশ্বাস ছবিতে। তারপর দীর্ঘ ৫ বছরের বিরতি। এরপর আবারো রূপালী পর্দায় ফিরে আসেন বাবা কেন চাকর ছবির মাধ্যমে। রাজ্জাক এরপর থেকে বেশ বেছে বেছেই চলচ্চিত্র করে গেছেন। তার মতে তিনি এখন আর তেমন কোন চরিত্রে অভিনয় করবেন না যা তাকে মানাবে না।

ইন্টারনেটের আরেক তথ্য থেকে আমি জানতে পারলাম শক্তিমান এই অভিনেতা এখনও বাংলাদেশি চলচ্চিত্রে কাজের পাশাপাশি কলকাতার চলচ্চিত্রেও কাজ করছেন। আমি অবশ্য এর সত্যতা কতটুকু তা জানিনা। তাই এ সম্পর্কে আর বেশি কিছু বলতে চাচ্ছিনা।

নায়ক রাজ্জাকের দুই পুত্র বাপ্পারাজ আর সম্রাট এখন ঢাকার চলচ্চিত্রে নায়ক হিসেবে অভিনয় করছেন। রাজ্জাক নিজের ছেলেদের তারই পথ অনুসরণ করে অভিনয়ে পদার্পন করাতে খুব গর্ববোধ করেন।

নায়ক রাজ রাজ্জাক তাঁর অভিনয় জীবনে অর্জন করেছেন সেরা অভিনেতা হিসেবে ন্যাশনাল এ্যাওয়ার্ড পাঁচবার। আর এ বছরই অর্জন করে নেন লাইফটাইম এ্যাচিভমেন্ট এ্যাওয়ার্ড।

razzak4

রাজ্জাকের অভিনিত ছবিগুলোর মধ্যে উল্ল্যেখযোগ্য হচ্ছে – অবাক পৃথিবী, আবির্ভাব, অলংকার, অবকাশ, অবুঝ মন, আলোর মিছিল, অণির্বান, অনুরাগ, আনোয়ারা, আপনজন, অসাধারন, আসামী, আশার আলো, অশিক্ষিত, বাদী থেকে বেগম, বাশরী, বেহুলা, বেঈমান, বন্ধু, বড় ভালো লোক ছিল, চন্দ্রনাথ, চোখের জলে, ছন্দ হারিয়ে গেল, ছুটির ঘন্টা, দ্বীপ নেভে নাই, দর্পচূর্ণ, দুই ভাই, দুই পয়সার আলতা, এতটুকু আশা, ঘরণী, গুন্দা, যে আগুনে পুড়ি, জীবন সঙীত, জীবন থেকে নেয়া, ঝড়ের পাখি, কাবিন, কাঁচ কাটা হীরে, কাজল লতা, কালো গোলাপ, কে তুমি, কী যে করি, মানুষের মন, মাটির ঘর, মায়ার বাঁধন, মধু মিলন, মহানগর, মনের মত বউ, মতিমহল, ময়নামতি, নাত বউ, নাচের পুতুল, নাগিন, নতুন পৃথিবী, নাজমা, নীল আকাশের নীচে, অধিকার, অমর প্রেম, অনেক প্রেম অনেক জ্বালা, ওরা এগারো জন, অশ্রু দিয়ে লেখা, অতিথি, অভাগী, পিচ ঢালা পথ, পরিচয়, প্রতিশোধ, পুত্রবধূ, রজনীগন্ধা, রংবাজ, সেতু, সমাধী, সমাপ্তি, স্বরলিপি, সংসার, সোহাগ, স্বপ্ন দিয়ে ঘেরা, সুখে থাকো, স্লোগান, সোনালী আকাশ, স্মৃতিটুকু থাক, টাকা আনা পাই, তালাক, তেরো নাম্বার ফেকু ওস্তাগার লেইন।

#san_bio_bb

(Visited 456 time, 1 visit today)

এই পোস্টটিতে ১০ টি মন্তব্য করা হয়েছে

  1. নির্ঝর রুথ says:

    আমি অবশ্য টলিউডের একটা মুভিতে রাজ্জাককে দেখেছিলাম। নাম মনে পড়ছে না 🙁

  2. সোলিটারিও says:

    তুমি ভালই লেখো… তবে লেখার সুর ঠিক ছিল, তাল কাটা ছিল, লয় বেশ টলমল করেছে… তবে আশাহত হওয়ার কিছু নাই… চেষ্টা করে যাও… একদিন ভাল করবে… 😀 😀 😀

  3. ট্রিপল এস ট্রিপল এস says:

    লেখায় অনেক অনেক ভাল লাগা রেখে গেলাম। ১ম বারের মত দেশীয় তারকার ব্যক্তিবৃত্তান্ত লিখেছেন দেখে অনেক ভাল লাগলো।

মন্তব্য করুনঃ

You must be Logged in to post comment.

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন