ক্রান্তি (২০০৬) ‘অন্ধকারে এক চিলতে রোদ্দুর’

Kranti_2006_poster(2)

আমি জানি না কলকাতার বর্তমান বানিজ্যিক ছবিগুলো আপনাদের কাছে কেমন লাগে; হয়তো উত্তরটা ‘আগের চেয়ে ভাল’ হওয়াই স্বাভাবিক। আমি জানি,আগের চেয়ে টলিউড এখন অনেক বেশি গ্ল্যামারাস। সোজা কথায় আগের চেয়ে বাজেট বেড়েছে, ছবির বা গানের দৃশ্যায়ণ বিদেশে হওয়াটা এখন একটা ট্রেণ্ড আর সত্যি বলতে গল্পের মধ্যে তামিল-তেলেগু ভাব আর মিউজিকের দিক থেকে বলিউড ভাবটা দর্শকরা বোধহয় বেশ ভালভাবেই নিচ্ছেন। সে যাই হোক এই আমার কাছে মনে হয় আগের (ধরুন ৭-৮ বছর আগের) ছবিগুলোতে পরিচালকদের একটা নিজস্বতা ছিল ; আপনি হয়তো ছবির কিছুটা অংশ দেখে পরিচালক বা ক্যামেরার ওপাশের কলাকুশলীদের নাম বলতে পারতেন (যদিও দক্ষিণী রিমেক তখনও যথারীতি বর্তমান) ; আর এখনকার কমার্শিয়াল ছবিগুলোতে পরিচালকের নিজস্বতা তো দূরে থাক নায়কের এক্সপ্রেশনেও সেটা পাওয়া কঠিন। তো এতসব কথা মাথায় এল যে ছবির নাম করে- সেটা হল – ক্রান্তি ; প্রথমবারের মতো ছবি পরিচালনায় আসলেন রিঙ্গো। সাধারণ কমার্শিয়াল ছবির তুলনায় চিত্রায়ণ, ডায়লগ বা অভিনয় এর দিক থেকে অনেকটা আলাদা বলা চলে একে।

ক্রান্তি অনেক দিক থেকে আলাদা হলেও এর গল্প শুনলে মনে হবে এই স্টোরির ছবি হাজারটা হয়েছে। হ্যাঁ, মনে হবারই কথা – বিশেষ করে কোন ছবিতে যদি দেখায় কোন কলেজ পড়ুয়া ছেলে বখাটে বা ওই জাতীয় ভিলেন টাইপের গুণ্ডাদের সঙ্গে মারপিট করছে, তাহলে আপনি সেই ছবিকে মার্কামারা বাংলা ছবির ক্যাটাগরিতে ফেলতে বাধ্য। কিন্তু সেই কাজটাকে অনেকটা আদর্শিক ভাবেই ফুটিয়ে তুলেছেন পরিচালক রিঙ্গো, তাই ‘মারপিট ‘ শব্দের স্থলে ‘রুখে দাঁড়ানো’ শব্দটাই ব্যবহার করব।

প্রথমে ছবির কলাকুশলী নিয়ে কিছু বলে রাখা ভাল; যেহেতু কমার্শিয়াল ছবি, রিঙ্গো তাই নায়ক হিসেবে রাখলেন জিতকে- যিনি বরাবরই ব্যবসাসফল (সেই সাথী থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক মুক্তিপ্রাপ্ত বচ্চন পর্যন্ত) আর এইটা তার ক্যারিয়ারের এমন একটা ছবি যেটার কাস্টিং নিয়ে শুরুতে বলতে হয় ‘Jeet as Jeet’ অর্থাৎ নামটা ছবিতে একই রাখা হয়েছে এবং ছবির নামের সঙ্গেও যথেষ্ঠ সঙ্গতিপূর্ণ আর নায়িকা হিসেবে স্বস্তিকা ব্যানার্জী, এছাড়া মহাভিলেন আশীষ বিদ্যার্থী (বিষ্ণু), রয়েছেন লকেট ব্যানার্জী (দেবশ্রী), বিশ্বনাথ বোস (ইকবাল), ঋষি কৌশিক (দেবা) ও অন্যান্য। এটি অনেকেরই প্রথম ছবি বলা যায় – প্রথম মুভি ডিরেকশনে রিঙ্গো, মিউজিক কম্পোজে প্রথমবারের মতো সোম,ঋষি,সামিধ এর পুরো টিম, অভিনয়ে প্রথমবারের মতো ঋষি কৌশিক। আর এত নিউ কামাররা ছিল বলেই বোধহয় ছবিটা একটা নতুন মাত্রা পেয়েছে।

ছবির শুরতে দেখা যায়, এক বাবার চোখের সামনে তার ছোট্ট শিশুটি পথ দুর্ঘটনায় মারাত্মকভাবে আহত হয়। আসলে লোকটি ছিল এক কারখানা কর্মকর্তা যেখানে অনেকদিন ধরেই মালিকপক্ষের বিরুদ্ধে তার নেতৃত্বেই আন্দোলন চলছিল কিন্তু নিজ ছেলের চিকিৎসার খরচ যোগাতে তিনি মালিকপক্ষের কাছে টাকা চাইতে বাধ্য হন। পরিনামে ঘুষখোর নামে মিথ্যা বদনাম জোটে আর সেই ছেলেও লোকমুখে এসব শুনেই বড় হয়। ফলে বাবা ছেলের মধ্যে একটা দূরত্ব তৈরি হয়।

তো, সেই ব্যক্তি পুরো পরিবার নিয়ে অন্য শহরে চলে আসে আর সেখানেই শুরু হয় সামাজিক লড়াই। বিষ্ণু নামের এক শীর্ষ সন্ত্রাসীর অধ্যুষিত এলাকাটিতে থাকতে গিয়ে পদে পদে বিরম্বনায় পরে পরিবারটি; অন্যদিকে কলেজে জিত ওই দলের বখাটেদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গিয়ে সঙ্গে ঝামেলায় জড়িয়ে পরে এবং ক্রমেই বুঝতে পারে অন্ধকার জগতের মানুষের আস্তানায় ঠিল ছুড়েছে সে। তার সাহসী কাজগুলো দেখে কলেজ শিক্ষার্থীদেরও অনুপ্রেরণা জোগায়;

hqdefault(2)

স্থানীয় কলেজ নির্বাচনে দেবাকে (বিষ্ণুর ছোট ভাই) হারিয়ে জয়ী হয় সে। কিন্তু এরপর থেকে চিরতরে বদলে যায় তার জীবন- প্রতিবাদের পরিনামে বিষ্ণুর গ্যাং আঘাত হানে ওই পরিবারের উপর; জিত হারায় তার সবচেয়ে কাছের বন্ধু ইকবালকে, নিজের চোখের সামনে অসাহায়ের মতো লাঞ্চিত হতে দেখে তার বোনকে এবং শেষে হারায় তার বাবাকে।

সবকটা কাছের মানুষ হারানোর তীব্র বেদনা তার বুকের প্রতিশোধ স্পৃহাটাকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়; এক অসম্ভব পথ বেছে নেয় সে- একাই রুখে দাঁড়ায় তাদের বিরুদ্ধে; তারপর সে কি প্রিয়জনদের নির্মম মৃত্যুর প্রতিবাদের আড়ালে সমাজের ক্রান্তিকালে এক নতুন দিনের সূচনা করতে পারবে- সেটি জানতে হলে দেখতে হবে ছবিটি।

এই সাধারণ স্টোরিকে রিঙ্গো যেভাবে পর্দায় তুলে ধরলেন, তা নি:সন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। যিনি নিজেই বলেছেন জন উ (Jhon Woo) তাঁর ছবি পরিচালনায় অনেক দিক থেকেই অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে। অভিনয় বা কোরিওগ্রাফিং বা একশন সিনের হিডেন মিনিংগুলো দেখার সময় আপনি ভেবে অবাক হবেন যে বাংলা ছবি দেখছেন। অপরাধকে যে ভিন্ন আঙ্গিকে দেখানো হয়েছে সেটা যেকোনো বাংলা ছবির দর্শককেই বিস্মিত করে। সবকয়টি জিনিসই মুভি রিলেটেড; সীমিত সংলাপ তার সঙ্গে অসাধারণ ডিরেকশন – মানতেই হবে এই ধারায় নতুন কিছু করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন পরিচালক । বিশেষ করে নায়ককে স্টাইলিশ নয় বরং এতটা সাধারণ হিসেবে দেখানোর রিস্ক এখনকার গ্লামারাস টলিউড নিতে সাহস করবে না।

আর অভিনয়ের কথা বললে নায়ক জিত বা ইকবাল চরিত্রে বিশ্বনাথ থেকে শুরু করে ভিলেন কৌশিক বা আশীষ বিদ্যার্থীর প্রশংসা করা ছাড়া উপায় নেই; ডায়লগ ডেলিভারি এতটাই নিখুঁত যে তাদের সিনেমা চরিত্রের বাইরের কেউ মনে হয় না। ঋষি, সমিধ দারুণ মিউজিক করছেন, ‘আমি বাংলায় গান গাই’ গানটিকে নতুনভাবে আরো স্পষ্ট করে বললে নতুন ক্ষেত্রে দারুণভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে; সঙ্গে ছবির শেষে ‘ক্রান্তি’ টাইটেল track আর সব শেষে একটা দিক না বললেই নয়, আর সেটা হল এই ছবির নতুন ধরনের ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক ; কতগুলো বিশেষ মুহূর্তের ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক ছবি দেখার পরও অনেক দিন মনে থাকার মতোই। এই হিসেবে এর সাথে সমসাময়িক বানিজ্যিক ছবিরগুলোর সত্যি কোনো তুলনা চলে না এবং এখনও বাংলা অ্যাকশন মুভির কথা বললে হয়ত ‘ক্রান্তি’ কেই এগিয়ে রাখব।

তাই সময় হলে দেখে নিতে পারেন ‘ক্রান্তি’ ছবিটি ; গতানুগতিক বাংলা ছবির ফ্রেম ভেঙ্গে রিঙ্গোর এই অসামান্য ছবিটি প্রমাণ করে – বাজেট কম হতে পারে, কিন্তু উচ্চাশা নয়। সাধারণ একটা গল্পকে যেভাবে উপস্থাপন করেছেন তা এক কথায় অনবদ্য। ছবির একদম শেষ মুহুর্তে এসে দেখা যায় সেই সাধারণ যুবক
নি:সঙ্গ সৈকতে নতুন এক দিনের আশায় আলোকিত সূর্যের দিকে মুখ করে অজানার উদ্দেশ্য তাকিয়ে; যার মধ্য দিয়ে সমাজের নতুন দিগন্তের সূচনার স্বপ্নকে রূপায়িত করলেন পরিচালক যেখানে ‘জিত’ কোন নাম নয়, হাজারো তরুণের সামাজিক অবিচারের প্রতি লুকায়িত প্রতিশোধস্পৃহা আর প্রদীপ্ত বাণী যেখানে উচ্চারিত হয়েছে এই একই তরুণের কন্ঠে :
” অন্ধকারে এক চিলতে রোদ্দুর যে অসহায়, যে দুর্বল, তার অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার সাহস…..একসাথে, এক হয়ে এগিয়ে চলার মানে ‘জিত’।”

IMG_20150209_211855

(Visited 910 time, 1 visit today)

এই পোস্টটিতে ৭ টি মন্তব্য করা হয়েছে

  1. পাঁজর পাঁজর says:

    মুভি দেখার আগেই?

  2. ভারতীয় রগরগে বাংলা ছবি… বৃত্ত.. মাল টা ভালই।

  3. ekta time e kolkatar best movie…kolkatay tokhon emon movie asha kora jaay na….just awesome

  4. seriously ekta bhalo post dicen….ami ai movie ti first dakhi kolkatar….eto bhalo lage je bashay prokash korar mto na….amr dharona tahole bhul chilo na,,,apnr post dekhe bujhlammm…osadharon

  5. পাঁজর পাঁজর says:

    আসলে ডিরেকশন বা অভিনয় এই দুইটা দিকই বিবেচনা করলে এটি যেকোন সাধারণ বাংলা ছবি থেকে অনেক আলাদা; যেটা আমার সবচেয়ে ভাল লেগেছিল।

মন্তব্য করুনঃ

You must be Logged in to post comment.

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন