নারীকেন্দ্রিক এগারোটি অসাধারণ হিন্দি চলচ্চিত্র

সারা বিশ্বের চলচ্চিত্র জগতেই প্রধান চরিত্রে পুরুষ শিল্পীর অভিনয় একটি নৈমিত্তিক ঘটনা। পুরুষতান্ত্রিক সমাজের মন, চোখ পুরুষকেই নায়ক হিসেবে পেতে চায়, দেখতে চায়। পুরুষের বলশালী দেহ, বুদ্ধি, প্রেমিক হৃদয় আর মারপিটের উপস্থাপনা দেখে দর্শক বিমোহিত হয়, শিস বাজায়।

কিন্তু এই প্রথা থেকে বেরিয়ে এসে যুগে যুগে নারীপ্রধান চলচ্চিত্রও নির্মিত হয়েছে। সেই নির্বাক যুগে নির্মিত “দা প্যাশন অফ জোয়ান আর্ক” থেকে শুরু করে আজকের “গন গার্ল” – সবই মুখ্য নারী চরিত্রকে ফোকাসে রেখে বানানো। তবে এখানে আমি হলিউড বা ইউরোপের নারীকেন্দ্রিক মুভি নিয়ে লিখছি না। লিখছি আমার দেখা বলিউডের এগারোটি মুভি নিয়ে, যেখানে কেন্দ্রীয় চরিত্রে ছিলেন নারী শিল্পীরা। এসব মুভি হয়েছিলো বাণিজ্যিকভাবে সফল আর সমালোচকদের কাছে সাদরে গৃহীত।

পোস্ট শুরুর আগে কিছু কথাঃ

দর্শক চাহিদার কথা মাথায় রেখেই চলচ্চিত্র জগত পরিচালিত হয়। যেহেতু এখনো বেশীরভাগ দর্শক দেখতে চায় নায়কের মারামারি আর নায়িকার রঙঢঙ, তাই এখনো বেশীরভাগ ক্ষেত্রে নায়িকাদের রঙ মেখে সঙ সেজেই পারিশ্রমিক নিতে হচ্ছে। কিন্তু দর্শকের রুচি পালটাচ্ছে। লুতুপুতু রোম্যান্টিক মুভি এবং হার্ডকোর একশন মুভির জমানা ছেড়ে আমরা (বলিউড, ঢালিউড) প্রবেশ করেছি রাজনৈতিক মারপ্যাঁচ, সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার ইত্যাদি জনরায়। এভাবে একসময় নায়িকা প্রধান মুভিও ধুমসে তৈরি হবে বলে আশা রাখি। দর্শকের মানসিকতার পরিবর্তন এখন যুগেরই দাবী!

বলিউডে নারী-প্রধান মুভি কম হলেও পুরুষ-প্রধান মুভির তুলনায় এগুলোর কাহিনী খুবই জোরালো হয়। এখানে টাইম পাস ধরণের আজিরা একশন, গান, ভাঁড়ামো, গাঁজাখুরি গল্প থাকে না। যদি দশটা নারীপ্রধান মুভি বানানো হয়, তাহলে সাতটিই ভালো হবে – এমন।

তাহলে চলুন আমার তালিকাটি দেখি!

.

* কাহানী (২০১২)

জনরাঃ ড্রামা, রহস্য, থ্রিলার

kahani_hme

বিদ্যা বালান অভিনীত এই মুভিটি দেখে থতমত খায় নি, এমন দর্শক খুঁজে পাওয়া ভার। মুভিটির জন্য তিনি ফিল্মফেয়ার, আইফা, স্ক্রিন অ্যাওয়ার্ড, স্টার গিল্ড অ্যাওয়ার্ডসহ মোট সাতটি পুরষ্কার অর্জন করেন।

নিখোঁজ হাজবেন্ডের সন্ধান পাওয়ার জন্য লন্ডন থেকে কলকাতায় আসা এক আপসেট বউয়ের চরিত্রে অভিনয় করেছেন বিদ্যা। ক্ষণে ক্ষণে ভোল পালটানো দুর্দান্ত কাহিনী, পরিচালনা, বিদ্যার দুর্দান্ত অভিনয় আর পার্শ্ব চরিত্রে শাশ্বত চ্যাটার্জি এবং পরম্ব্রত চ্যাটার্জির সাপোর্টের কারণে মুভিটি চলেছে এক্সপ্রেস ট্রেনের গতিতে। কিন্তু শেষ করে মনে হবে, বিদ্যা যেন একাই টেনে নিয়েছেন মুভিটাকে। ওঁর পাশে অন্যরা যেন ম্রিয়মাণ!

.

* দা ডার্টী পিকচার (২০১১)

জনরাঃ বায়োগ্রাফি, ড্রামা

0The-Dirty-Picture

“যেকোনো ফিল্ম মাত্র তিনটা কারণে চলে। বিনোদন, বিনোদন আর বিনোদন। আর আমিই হলাম সেই বিনোদন!”

হ্যাঁ পাঠকরা, বিদ্যা বালানের আরেকটি মাস্টারপিস। এই মুভি দেখে বিদ্যার ভক্ত বনে যান নি, এমন দর্শক পাওয়া মুশকিল। বিদ্যার কঠোর নিন্দুকটিও এই মুভি দেখে বিদ্যার প্রেমে পড়বেন, নিশ্চিত। এই মুভিতে অসামান্য অভিনয়ের জন্য ২০১১ সালের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরষ্কারও জিতে নিয়েছিলেন বিদ্যা।

দক্ষিণ ভারতীয় চিত্রনায়িকা সিল্ক স্মিতার জীবন কাহিনী নিয়ে নির্মিত এই চলচ্চিত্রটি নারীকেন্দ্রিক হবে, এটাই স্বাভাবিক। তবে পার্শ্ব চরিত্রে ইমরান হাশমি এবং কিংবদন্তী নাসিরুদ্দিন শাহ্‌র উপস্থিতি মুভির জৌলুশ বাড়িয়েছে।

.

* মারদানী (২০১৪)

জনরাঃ একশন, ড্রামা, থ্রিলার

Mardaani-2

তো, কি দেখতে পাচ্ছেন? মেয়েরাও একশন ফিল্মের প্রধান চরিত্র হতে পারে। আর সম্পূর্ণ বাস্তব একটা কাহিনীর মধ্য দিয়ে রাণী মুখার্জি সেটা ফুটিয়ে তুলেছেন। বাস্তব বলছি কারণ মুভিতে রাণী একজন পুলিস অফিসার। আর পুলিস হিসেবে তিনি ব্যায়াম করে একটা শক্তিশালী দেহের অধিকারী হবেন কিংবা মারামারি জানবেন কিংবা উপস্থিত বুদ্ধি খাটিয়ে অপরাধ সংঘটনের স্থান থেকে বেরিয়ে আসতে পারবেন, এটাই স্বাভাবিক। একশন মুভির নামে এখানে “বস্তির মেয়ে অথচ কুংফু ক্যারাটেতে দক্ষ” টাইপ অবাস্তব জিনিস দেখানো হয় নি।

এন্টাগোনিস্ট চরিত্রে নতুন মুখ তাহির রাজও ছিলেন দারুণ। তবে দিনশেষে ফাটিয়ে দিয়েছেন রাণী একাই। চরিত্র অনুযায়ী সাদামাটা চেহারা, জামাকাপড় দিয়ে রাণী যেন পাশের বাড়ীরই বাসিন্দা! অনেকদিন পর নতুন করে রাণীর প্রেমে পড়লাম।

.

* নো ওয়ান কিল্ড জেসিকা (২০১১)

জনরাঃ ক্রাইম, থ্রিলার, ড্রামা

no-one-killed-jessica-review

হ্যাঁ পাঠক, দুজন নারী চরিত্র দিয়ে আস্ত একখানা ক্রাইম থ্রিলারও হয়ে যায়। যারা মুভিটি দেখেছেন, তারা এক বাক্যে স্বীকার করবেন যে, এটা বলিউডের পুরুষকেন্দ্রিক কোনো ক্রাইম থ্রিলারের চেয়ে কম নয়! মজার ব্যাপার হল, এখানে অভিনয় করেছেন উপরের মুভিগুলোর নায়িকারা – বিদ্যা বালান আর রাণী মুখার্জি।

১৯৯৯ সালে সংঘটিত একটি সত্য কাহিনী অবলম্বনে নির্মিত হয়েছে মুভিটি। নয়াদিল্লীর উঠতি মডেল জেসিকা লালের হত্যা কাহিনীর উপর ভিত্তি করে। দুই ঘণ্টার মুভিটি মাঝের দিকে একটু ধীর গতির। তবে মুভির মধ্যে একবার ঢুকে গেলে ধীর গতি কোন সমস্যা করবে না।

আমার কাছে এখানে রাণীর চেয়ে বিদ্যার পারফর্মেন্স বেশী ভালো লেগেছে। দর্শকরা মেকআপহীন, গ্ল্যামারহীন বিদ্যাকে দেখে চমকে যেতে পারেন।

.

* ফ্যাশন (২০০৮)

জনরাঃ ড্রামা, রোমান্স

fashion

এই মুভি নিয়ে নতুন করে কিছু বলার নেই। অসাধারণ একটা মুভি। কেন্দ্রীয় চরিত্রে প্রিয়াঙ্কা চোপড়া স্রেফ তুলোধুনো করে ছেড়েছেন! একই পাল্লার অভিনয় করেছেন কঙ্গনা রানাউত। দুজনেই জাতীয় চলচ্চিত্র পুরষ্কার জিতেছেন এই মুভির জন্য। তবে আমার কাছে কঙ্গনার অভিনয় প্রিয়াঙ্কার চাইতে অনেক অনেকগুণ বেশী ভালো লেগেছে। মেয়েটা সত্যিই একটা জিনিয়াস!

এছাড়া পার্শ্ব চরিত্রে মুগ্ধা গডসে আর কিরণ জুনেজাও অনেক ভালো খেল দেখিয়েছেন।

.

* কুইন (২০১৪)

জনরাঃ এডভেঞ্চার, কমেডি, ড্রামা

queen_ver5_xlg

কঙ্গনা রানাউতের এই মুভিটি বোধহয় ওর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে আলোচিত মুভি। প্রথম সিনেমা গ্যাংস্টারেই নিজের জাত চিনিয়েছিলেন তিনি। এরপর অবশ্য নেশাখোর আর বিষণ্ণ চরিত্রে বারবার অভিনয় করে টাইপড হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু কুইন দিয়ে সেই বদনামের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকলেন কঙ্গনা।

দুর্দান্ত অভিনয় আর পরিচালনার গুণে “মোটামুটি কাহিনী” কীভাবে অসাধারণ হয়ে উঠে, কুইন মুভিটি তার প্রমাণ। এই মুভিতে অভিনয়ের জন্য দ্বিতীয়বার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরষ্কার জেতেন কঙ্গনা। আর কেনই বা জিতবেন না? পার্শ্ব চরিত্রে লিসা হেইডেনের দারুণ অভিনয়ের পরও পুরো মুভিটি কেবল একজনেরই ছিল। তিনি কঙ্গনা।

.

* ইংলিশ ভিংলিশ (২০১২)

জনরাঃ ড্রামা, কমেডি

English-Vinglish-Movie-Posters04

চলে এলাম হিন্দি সিনেমার প্রথম মহিলা সুপারস্টার শ্রীদেবীর দ্বিতীয়বার বলিউড অভিষেকের গল্প নিয়ে।

আশি আর নব্বই দশকের তুমুল জনপ্রিয় এই তারকা তাঁর শেষ পূর্ণদৈর্ঘ্য ছায়াছবিটি করেন ১৯৯৭ সালে (জুদাই)। এরপর দীর্ঘ বিরতি দিয়ে ফিরে আসেন ২০১২ সালে, নিজের বর্তমান বয়সের উপযোগী একটি চরিত্রে, ইংলিশ ভিংলিশ মুভিতে। সেই সাথে একটা ইতিহাসও রচনা করেন শ্রীদেবী। সেটা হল – এটাই হিন্দি চলচ্চিত্রের ইতিহাসে একমাত্র ঘটনা যেখানে একজন অভিনেত্রী বিরতি নেওয়ার পর ফিরে এসে চরম সাফল্য পেয়েছেন। তাই এখানে কেবল একটা কথাই খাটে – এলেন, দেখলেন, জয় করলেন।

আর মুভির বিষয়ে বলতে হলেও একটা লাইন দিয়েই বলবো – এটা ওয়ান উইম্যান শো!

.

* ওয়াটার (২০০৫)

জনরাঃ ড্রামা, রোমান্স

water

ত্রিশের দশকে ভারতীয় উপমহাদেশে নারীর সামাজিক অবস্থান, বাল্যবিবাহ এবং তার অভিশাপ নিয়ে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন পরিচালক দীপা মেহতার ক্লাসিক মুভি ওয়াটার। এটা তাঁর “Elements Trilogy” মুভি সিরিজের তৃতীয় এবং শেষ কিস্তি।

লিসা রে বলিউডে তেমন সাড়া ফেলেন নি। কিন্তু ইনাকে আমার খুব ভালো লাগে। ওয়াটার মুভিতে কল্যাণী চরিত্রে লিসার অনবদ্য অভিনয় এবং মেকআপহীন বিধবার বেশ দেখে আমি হতবাক! মানুষ এতো চমৎকার হয় কীভাবে? সাথে পার্শ্ব চরিত্রদের কথা না বললেই নয়। বিধবাশ্রমের পরিচালক চরিত্রে মনোরমা, পিচ্চি বিধবা “চুইয়া” চরিত্রে সরলা, হিজড়া চরিত্রে রঘুবীর যাদব, শকুন্তলা চরিত্রে সীমা বিশ্বাসের অভিনয় আপনাকে মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখবে। ছোট একটা চরিত্রে জন আব্রাহামের অভিনয়ও মন কেড়ে নিয়েছে। লোকটাকে আমি গ্ল্যামার সর্বস্ব বলেই জানি। কিন্তু এই মুভিতে গ্ল্যামারবিহীন জনকে যেন নতুনভাবে আবিষ্কার করলাম।

.

* লজ্জা (২০০১)

জনরাঃ ড্রামা, ক্রাইম

lajja

হিন্দি সিনেমার ইতিহাসে আরেকটা ক্লাসিক মুভি এই লজ্জা। এটি নির্মিত হয়েছে ভারতীয় সমাজের বিভিন্ন স্তরে বাস করা নারীদের দুর্দশা নিয়ে। মুভিতে দেখানো হয়েছে কীভাবে অত্যন্ত ধনী নারী থেকে শুরু করে মধ্যবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত কিংবা দরিদ্র নারী – সকলেই বিভিন্ন সামাজিক প্রথা আর পুরুষের নোংরা মানসিকতার বলি হয়।

কাহিনী, পরিচালনা আর গানের পাশাপাশি এই মুভির একটা বড় শক্তি হল কাস্টিং। সেই সময়ের জনপ্রিয় তারকা মাধুরী দীক্ষিত, রেখা, মনীষা কইরালা, মাহিমা চৌধুরী, অজয় দেভগন, অনিল কাপুর, জ্যাকি শ্রফ, জনি লিভার কে নেই এখানে?

.

* চাঁদনী বার (২০০১)

জনরাঃ ড্রামা, ক্রাইম

cadni bar

২০০১ সালে লজ্জার পাশাপাশি আরেকটা নারীকেন্দ্রিক মুভি বের হয়েছিলো – চাঁদনী বার। অকস্মাৎ এক ঘটনায় গ্রামের মেয়ে টাবুর বাবা মা মারা যান। এরপর ভাগ্যান্বেষণে শহরে আসতে হয় তাকে। একে তো গরীব ঘরের মেয়ে, তার উপর সুন্দরী। সহজেই অনুমান করা যায় টাবুর পরিস্থিতি। শেষমেশ চাঁদনী নামক এক বারে জায়গা হয় তার। সেখানেও ক্রমাগত চালিয়ে যেতে হয় নিজের সম্মান বাঁচানোর যুদ্ধ।

এমনই একটা সংগ্রামী চরিত্রে অনবদ্য অভিনয় করে টাবু জিতে নিয়েছিলেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরষ্কার।

.

* শক্তি (২০০২)

জনরাঃ একশন, ড্রামা

shakti

মুভিটি নির্মিত হয়েছে ইরানী লেখক বেটি মাহমুদির আত্মজৈবনিক উপন্যাস “নট উইদাউট মাই ডটার” অবলম্বনে। কারিশমা কাপুরের চমৎকার অভিনয় মুভি জুড়ে আমাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিলো। কিংবদন্তীতুল্য অভিনেতা নানা পাটেকারের সাথে তাল মিলিয়ে কারিশমা যে অভিনয় দেখিয়েছেন, সেটা প্রশংসিত হয়েছে সব মহলেই।

নিজের সন্তানকে ফিরে পাওয়ার জন্য এক মায়ের সংগ্রামের কাহিনী নিয়ে তৈরি হয়েছে শক্তিঃ দা পাওয়ার।

(Visited 380 time, 1 visit today)

এই পোস্টটিতে ৮ টি মন্তব্য করা হয়েছে

  1. Please Add “Matrubhoomi – A Nation Without Women” & “Bol”

  2. আমাদের দেশে পেরেম পিরিতি ছাড়া কোন মুভি আশা করাও পাপ

  3. Ramiz Raza says:

    Fire should be there … Starring Nandita Das and Sabhana Azmi this film is actually a Fire .. well, I dint watch Lajja, Shakti and Mardaani but yes, Fashion and No One Killed Jassica are absolutely ”my type” films …

    • নির্ঝর রুথ says:

      হ্যাঁ, আমিও জানি ফায়ার যোগ করা উচিৎ! কিন্তু এই মুভিটি আমার দেখা হয়ে উঠে নি। তাই যোগ করতে পারি নি।
      মাত্রুভূমি, ফায়ার, চামেলী দেখে সেগুলো নিয়ে পরের কিস্তি লেখার আশা রাখি।

      ধন্যবাদ!

মন্তব্য করুনঃ

You must be Logged in to post comment.

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন