আশ্চর্য প্রদীপ (২০১৩): আলাদীনের দৈত্য পেলে কতোটুকু বদলাবে জীবন? (স্পয়লার থাকতে পারে)

সেই মধ্যবিত্ত মানসিকতা, সেই টাকার জন্য হাহাকার, এটা নেই-সেটা নেই বলে আফসোস আর উপরে উঠার বাসনা। কম তো দেখলেন না এই বিষয়ে। ফের দেখার জন্য বসে যেতে পারেন এই মুভি। কেন? ঐ কারণটাই বলতে চাইবো এখানে।

মুভির মুক্তিকালঃ ১৫ নভেম্বর, ২০১৩ (কলকাতা)

পরিচালকঃ অনীক দত্ত

কাহিনীঃ শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

অভিনয়ঃ শ্বাশত চট্টোপাধ্যায়, শ্রীলেখা মিত্র, রজতাভ দত্ত, মুমতাজ সরকার সহ অনেকে।

গীতিকারঃ অনীক দত্ত

সুরকারঃ রাজা নারায়ণ দেব

ধরণঃ কমেডি, ড্রামা, স্যাটায়ার, ফ্যান্টাসি

বলুন তো, আপনার জীবনে যা নেই সেটা পাওয়ার কথা কতবার ভেবেছেন? হিসেব নেই, তাই তো? স্বাভাবিক। বিশ্বায়নের যুগে আমাদের চাহিদা হয়েছে সাত আসমানের উপরে কিছু থাকলে, সেটার সমান। “অমুকের ওটা আছে, আমার কেন নেই?” কিংবা “সে এটা কিনেছে। হায়! আমি পারছি না।“ হয়তো আমরা চাই না এমন করে ভাবতে কিন্তু অজান্তেই চলে আসে তুলনা। বেড়ে চলে চাহিদা।

চোখের সামনে মিডিয়ার সংখ্যা বাড়ছে বৈ কমছে না। ফলে সারাক্ষণ নিত্যনতুন পণ্য আর ব্র্যান্ডের বাহার দেখে মাথা ঠিক রাখা মুশকিল! তবে সমস্যা সব মধ্যবিত্তের। এরা না ঘর কা, না ঘাট কা। সমাজের মধ্যম আয়ের লোকদের এসব কেনার ইচ্ছা থাকলে হয়তো সামর্থ্য নেই, সামর্থ্য থাকলে হয়ত কেনার পর বোঝা যায় উটকো ঝামেলাটার আদৌ কোন চাহিদাই নেই। কেবলমাত্র স্ট্যাটাস রক্ষার্থে কিনতে হয়েছে।

এমনই এক মধ্যবিত্ত কর্মচারী হলেন শ্বাশত। “নেই নেই” রোগে আক্রান্ত বৌ শ্রীলেখা আর পিচ্চি এক ছেলে নিয়ে তার সংসার। বৌয়ের বড় বোনের বিয়ে হয়েছে ধনাঢ্য একজনের সাথে আর তা নিয়ে নিয়ম করে শ্রীলেখার খোঁটা শুনতে হয় শ্বাশতকে। খোঁটায়-অপমানে জর্জরিত শ্বাশত মদেই খুঁজে পায় স্বস্তি, তাও লুকিয়ে। এমন সময় একদিন শ্বাশতর হাতে আসে আশ্চর্য প্রদীপ।

হয়ে গেলুম কি দুনিয়ার বাদশা?

হয়ে গেলুম কি দুনিয়ার বাদশা?

কিন্তু আলাদীনের মত এক মুহূর্তেই বদলে যায় না শ্বাশতর জীবন। পরিচালক এখানে বেশ সময় নিয়ে, বয়ান দিয়ে দর্শকের টনক নড়িয়েছেন। টানটান কাহিনী, চমৎকার উপস্থাপনা আর শ্বাশত-রজতাভ-শ্রীলেখা-মুমতাজের দুর্দান্ত অভিনয় আপনাকে উপহার দেবে অসাধারণ দুই ঘণ্টা।

আলাদা করে বলতে হয় ডায়ালগের কথা। উরি বাপ! কথা তো নয় যেন রসিকতার গোলা। পুরো ছবি জুড়ে হিউমারের ছোঁয়া একটুও বাড়তি লাগে নি, মনে হয় নি স্থূল কিংবা সুড়সুড়িদায়ক। শ্বাশতর মুখে “বাজারের যা অবস্থা! পটল ৩০ টাকা কেজি। খাবো নাকি তুলব?” শুনে কি নিজের অবস্থাই কল্পনায় আসে না? :mrgreen:  কিংবা “জাপানিদের নামগুলো অনেক লজিক্যাল। তাকিয়োনা মুতেআসি, নিশিরাতে হিসিপাওয়া…”! মজা না পেলে হিউমারের দোষ  🙄

প্রতিটা গানই হিপহপ ধরণের বলে একটু একঘেয়েমি আসতে পারে। তবে অনুরোধ থাকবে গানগুলো কেটে না দেওয়ার। অসাধারণ সব লিরিক দিয়ে সাজানো হয়েছে প্রতিটা গান। খোঁচা কাকে বলে, কত প্রকার ও কী কী – সব শিখে যাবেন গান শুনে। সুরও শ্রবণযোগ্য।

পরিশেষেঃ

যতদিন বাজার অর্থনীতির চক্কর থাকবে, ততদিন পার্থিব চাহিদাগুলো বাড়তেই থাকবে। মানুষ যেন ঢুকে পড়েছে ভোক্তা সমাজের এক গোলক ধাঁধায়। এখানে যেন ভোগেই সুখ! কিন্তু প্রদীপের দৈত্য আপনার বস্তুগত চাহিদা মেটাতে পারলেও, আপনাকে টাকা-বাড়ী-গাড়ী-স্ট্যাটাস-ক্ষমতার অধিকারী করতে পারলেও দিন শেষে আপনার আসল যে চাহিদা… ভালোবাসা, স্নেহ, মায়া-মমতা কিংবা সম্পর্কের বন্ধন এনে দিতে পারবে না। আর এগুলো ছাড়া বাকীগুলোর আদৌ কি কোন মূল্য আছে দুনিয়ায়?

শেষ চমকের ব্যাপারে অনেকে আগেই অনুমান করতে পেরেছিলেন। আমিও। কিন্তু তাতে মুভির আবেদন এতটুকু নষ্ট হয় নি। শ্বাশতর কাহিনী একটু অদ্ভুতভাবে শেষ হয়েছে। হয়ত পরের অংশটুকু পরিচালক দর্শকের হাতে ছেড়ে দিতে চেয়েছেন!

যা হোক, ভোগবাদী সমাজ ব্যবস্থা নিয়ে দারুণ একখান স্যাটায়ার উপহার দেওয়ার জন্য “ভূতের ভবিষ্যত”য়ের পরিচালক অনীক দত্তকে সাধুবাদ  😀

ডাইরেক্ট ডাউনলোড লিঙ্কঃ http://davvas.com/ozfwr6pj5vpy  (সৌজন্যেঃ ফাইয়াদ ইফতিখার রাফী)

(Visited 221 time, 1 visit today)

এই পোস্টটিতে ৯ টি মন্তব্য করা হয়েছে

  1. আইম্যান আইম্যান says:

    জাপানিদের নাম অনেক লজিক্যাল, মিনিংফুল ।
    # টাকাহাসি তাকিয়োনামুতেআসি :ngakak

  2. নির্ঝর রুথ says:

    নিশিরাতেহিসিপাওয়া :afro:

  3. পথের পাঁচালি পথের পাঁচালি says:

    অনেকদিন পর তোমার লেখা পড়ে ভাল লাগল। এটা আমি দেখব তাড়াতাড়িই

  4. ট্রিপল এস ট্রিপল এস says:

    সব লেখাই ভাল লাগে, তবে গত কয়েকটার চেয়ে এই লেখাটা একটু বেশিই ভাল লাগলো পড়ে।  মুভিটা ভাল লেগেছে। অনীক দত্তের মুভি তো!!

  5. মুভিটা দাহরুণ লেগেছে । ভুতের ভবিষ্যতের চেয়েও বেশী ভালো লেগেছে এমন মনে হয় ! কড়া সারকাজম এবং সেটা রিলেটও করতে পেরেছি মধ্যবিত্ত সংসারে নিত্য বেড়ে ওঠার অভিজ্ঞতার সাথে । দেখেছি পাড়া প্রতিবেশীদের আচরণ ! 

     

    মুভিটার শেষে কী বুঝাতে চাইলো বলে মনে করলেন ?  

    • নির্ঝর রুথ says:

      আমার তো মনে হল, পরিচালক বুঝাতে চেয়েছেন – সবই আগের মতো হয়ে গেছে আবার। প্রদীপ এসেছিলো, দুইদিনের একখান নীতি বিবর্জিত ঝকমকে দুনিয়া দেখালো এবং শেষে মানব সন্তান তার সাধারণ জীবনেই ফিরে এলো। সাথে নিয়ে এলো অনুতাপ আর লোভের কারণে ধ্বংস হওয়া জীবন। 

      নাকী?

মন্তব্য করুনঃ

You must be Logged in to post comment.

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন