The Devil’s Double: স্পয়লারমুক্ত নয়, (টুকটাক) স্পয়লারযুক্ত একটি রিভিউ।

অনেক অনেকদিন পর একটা মুভি দেখলাম যেটা সম্পর্কে আমার বিন্দুমাত্র ধারণা ছিল না। কোন রিভিউ পড়ে নয়, কারো কাছ থেকে কোন সাজেশন পেয়ে নয় – ভাগ্যের কারসাজিতে আচমকাই দেখা শুরু করেছিলাম The Devil’s Double। আর অতি আশ্চর্য! মুভিটি আমার প্রিয় মুভির তালিকায় ঢুকে পড়ল।

পূর্ব ইতিহাসঃ
শুক্রবার সকাল। ছোট ভাই ডেক্সটপ দখল করে রেখেছে কিন্তু আমার হাতে প্রচুর অবসর। কি করি? কি করি? দেখতে বসলাম টিভি। এই বোকাবাক্সটা আমার মোটেও পছন্দের জিনিস নয়। একেবারে না পারতে দেখি। কিন্তু ভাগ্য এমনই খারাপ যে বুঝে বুঝে ওইদিনই ডিশের লাইনে গণ্ডগোল। মেজাজের পারদ আকাশ ছুঁই ছুঁই করার আগেই দেখি টিভিতে একটা পেনড্রাইভ লাগানো। নিশ্চয়ই দুই ভাইয়ের কারো কাজ! কৌতূহলবশত ওপেন করলাম। বেশ কয়েকটা দেখা মুভির মাঝখানে The Devil’s Double নামটা অদেখা লাগলো। শুরু করলাম দেখা। তখনো কি ছাই জানতাম, কি অপেক্ষা করছে আমার জন্য?

এটি একটি বায়োগ্রাফিকাল মুভি। আগে জানলে হয়ত দেখতেই বসতাম না। কারণ, এই জেনরটা কেন যেন আমার সাথে যায় না। কিন্তু ওই যে বললাম, ভাগ্যের লিখন না যায় খণ্ডন! ভাগ্যদেবী হয়ত বলছিলেন, “দেখবি না মানে? দেখবিও, নায়কের প্রেমেও পড়বি!”

দেখতে বসলাম সিনেমাঃ

ইরাকের স্বৈরশাসক সাদ্দাম হোসেইনকে আমরা সবাই চিনি। না চিনলেও অন্তত নামটা জানি। কিন্তু সবাই হয়ত জানি না, তাঁর দুটো ছেলে ছিল। বড় জন উদে, ছোট জন কুশে। মুভিটি বড় ছেলে উদের জীবনীরই সফল চিত্রায়ন।

উদে ছিল সাদ্দাম হোসেনের প্রিয় ছেলে। কিন্তু প্রচণ্ড উগ্র স্বভাবের এই ছেলেটি একসময় বাবার মনঃকষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কিভাবে?

উদে ছিল ভয়ঙ্কর রকমের সেক্স অ্যাডিক্ট-প্যারানয়েড-রাগী-প্রতিশোধপরায়ণ-অগোছালো আর অপরিণামদর্শী এক যুবক। তার আবেগ ছিল খুব চড়া সুরে বাঁধা। সে পরিচিত ছিল তার অত্যাচারের কারণে। কেউ তাকে হতাশ করলে কিংবা তার সাথে বেইমানি করলে উদে তাকে যেভাবে শাস্তি দিত, তা দেখে যেকোন সুস্থ মানুষের অসুস্থ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে (কথাটি Saw, Hostel টাইপের মুভি দেখে অভ্যস্তদের জন্য প্রযোজ্য নহে)। এই অত্যাচার থেকে বাদ যায় না উদের প্রেমিকা, রক্ষিতা, স্কুলগার্ল কিংবা খারাপ পারফরমেন্স করা ইরাকি খেলোয়াড়।

উদেঃ চরমভাবাপন্ন এক চরিত্র

উদেঃ চরমভাবাপন্ন এক চরিত্র

এই উদে তার নিরাপত্তার জন্য একজন ডাবল বা “ফিদেই” খুঁজছে। খুঁজতে খুঁজতে সে পেয়ে যায় তার স্কুল জীবনের  ক্লাসমেট লতিফ ইয়াহিয়াকে যে বর্তমানে একজন ইরাকি যোদ্ধা। কিন্তু লতিফ প্রথমে এই কাজ করতে রাজি হয় না কারণ ব্যক্তিগতভাবে সে সাদ্দাম হোসেইন বা উদে – কাউকেই পছন্দ করে না। তবে নিজের পরিবারকে উদের শ্যেন দৃষ্টি থেকে বাঁচানোর জন্য লতিফকে রাজি হতেই হয়।

লতিফ আর উদে

লতিফ আর উদে

নিজেকে পুরোপুরি উদের মত দেখানোর জন্য লতিফকে বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। তবে সবকিছুর শেষে যখন দুই উদে বক্সিং করার পর শাওয়ার নিচ্ছিলো, তখন সত্যিকারের উদের করা রসিকতাটা ছিল সত্যিই সিরাম!

উদের জীবন যাপন সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার জন্য লতিফকে প্রথমেই নিয়ে যাওয়া হয় ডিস্কো বারে। 😛 । সেখানে লতিফের পরিচয় দেওয়া হয় উদের ভাই এবং সাদ্দামের তৃতীয় ছেলে হিসেবে। উদের উদ্দাম জীবনের সাথে লতিফ খাপ খাওয়াতে পারে না। কিন্তু এই শান্ত-শিষ্ট আর বজ্র-কঠিন যুবকটির উপর নজর পড়ে উদের বর্তমান প্রেমিকা সারাবের (নজর পড়ার আরেকটা লুলীয় কারণও আছে)। এই ব্যাপার উদে জানতে পারলে কি হবে সেটা ভেবে লতিফ এড়িয়ে চলতে চায় সারাবকে। কিন্তু সারাব উদের অবর্তমানে লুকিয়ে-চুরিয়ে দেখা করতে শুরু করে লতিফের সাথে।

উদের ফেদাই লতিফ

উদের ফেদাই লতিফ

উদের শারীরিক চাহিদা মেটানোর জন্য হাজার হাজার প্রস্টিটিউট থাকলেও টিনেজার স্কুলগার্লদের উপরও তার নজর পড়ত। রাস্তা থেকে ওদের উঠিয়ে এনে উদে লালসা মেটাত আর শেষে মেরে ফেলে দিত আস্তাকুঁড়ে। পুরোপুরি অসুস্থ একটা চরিত্র। বলা যায়, স্বৈরশাসনের সুযোগ-সুবিধার একশভাগ উসুল করে নিয়েছিল এই উদে। খুব খারাপ লেগেছিল বিয়ের দিন ওই মেয়েটির কাহিনী দেখে। মানুষ কি সত্যিই এত খারাপ হতে পারে?

উদের এইসব কীর্তিকলাপ লতিফকে অধৈর্য আর রাগান্বিত করে তুলল। কিন্তু কিই বা করার আছে? ও নিজেও যে উদের খেলার পুতুল!

একসময় দাবার ছক উল্টে যায়। লতিফ উদেকে অমান্য করা শুরু করে। উদের রাগ-ক্রোধ কিছুই আর লতিফকে ভয় দেখাতে পারে না।

মুভি টার্ন নেয় অন্যদিকে।

এর সাথে সাদ্দাম হোসেইনের উপস্থিতি, উদের ডাবল হিসেবে কাজ করতে গিয়ে লতিফের বিভিন্ন পরিস্থিতির শিকার হওয়া কিংবা সাদ্দাম-উদে সম্পর্কের অবনতি বা লতিফের বেইমানি ও তার শাস্তি – এইসব বিষয় নিয়ে কিছু না বলাই ভালো। টুকটাকের বদলে তাতে বিরাট স্পয়লার হয়ে যেতে পারে।

মুভির একটা চরম দৃশ্য!

মুভির একটা চরম দৃশ্য!

আমার অনুভূতিঃ

মুভির প্রাণ ছিল উদের অভিনয় আর ডায়ালগ। একেকটা ডায়ালগ যেন একেকটা বাজুকা! আর হ্যাঁ, উদের হাসি। আর অবিশ্যি অবিশ্যি লতিফের চরিত্রটি (লতিফের চেহারা কেন যে আমার কাছে চে গুয়েভারার মত লেগেছে, কে জানে!)। মুভি শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত আমি বুঝতেই পারি নি, উদেই লতিফ – লতিফই উদে। 😛 । আমি এইটাও বুঝি নি যে, লতিফ/উদে কোন এশিয়ান অভিনেতা নয়। পরিচালক আমাকে ভালোই ঠক খাইয়েছেন। 🙁

উদে-লতিফের চাহনি কিংবা বিভিন্ন বিষয়ে দুজনের অভিব্যক্তি অথবা বাকি সবকিছু – মুভির প্রতিটা সেকেন্ড আমি তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করেছি। তবে শেষ হওয়ার পর মেজাজটা খিঁচরে গিয়েছিল। কারণ সমাপ্তিটা আমার ভালো লাগে নি। কেমন যেন হঠাত করে শেষ হয়ে গেল টাইপ।

ব্রিটিশ অভিনেতা ডোমিনিক কুপারকে আমি চিনতাম না। কিন্তু মুভিতে ইনার সুপার্ব অভিনয় দেখে আমি একই দিনে দুইবার এই মুভি দেখে উঠেছি। ভবিষ্যতে আরও দেখব। কিছুটা শার্লক সিরিজের মত। বারবার দেখা যায়। প্রখ্যাত মুভি ক্রিটিক রজার এবার্টও এই মুভিকে ফোরস্টারের ভিতর থ্রিস্টার রেটিং দিয়ে বলেছেন, “All due praise to Dominic Cooper. It should have been more.”

এই মুভি দেখে আমি স্বাদ পেয়েছি থ্রিলার-বায়োগ্রাফিক্যাল-স্যাডিস্টিক এবং রোমান্টিক মুভির। এর ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক ছিল অসাধারণ। বিশেষ করে, লতিফের সাথে সারাবের ঘনিষ্ঠ দৃশ্যে ব্যবহৃত The Veils ব্যান্ডের Jesus for the jugular ট্র্যাকটি তো এই বিশ্বের কিছু নয়!

মুভিটি প্রাপ্তবয়স্কদের (১৮+) জন্য আর এর আইএমডিবি রেটিং হল 7.1। জর্ডান এবং মাল্টায় শুটিং হওয়া এই মুভির পরিচালক হলেন Lee Tamahori এবং এর মুক্তিকাল ২০১১।

বিতর্কঃ

মুভিটি নির্মাণ করা হয়েছে লতিফ ইয়াহিয়ার “The Devil’s Double” শীর্ষক অটোবায়োগ্রাফি হতে। মুভিটি নিয়ে বেশ কিছু বিতর্কও আছে। যেমনঃ লতিফ আদৌ উদের ডাবল ছিল কিনা কিংবা সে সাদ্দামের এত কাছে কখনো যেতে পেরেছিল কিনা সে বিষয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কিন্তু আমার কাছে মুভিটি ভালো লেগেছে।

প্যাঁচালের সমাপ্তি।

(Visited 132 time, 1 visit today)

মন্তব্য করুনঃ

You must be Logged in to post comment.

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন