“শার্লক” টিভি সিরিজ এবং আমার অনুভূতি!
Share on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on TwitterPin on Pinterest0
শার্লক আর ওয়াটসন: রাব নে বানা দি জোড়ি!

শার্লক হোমস আর ডাঃ জন ওয়াটসন: রাব নে বানা দি জোড়ি!

শার্লক সিরিজের কথা প্রথম শুনেছিলাম এক বছর আগে। তখন দেখার আগ্রহ বোধ করি নি। কারণ, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই যেসব বই আমি পড়েছি, সেগুলো থেকে ধার করা গল্প নিয়ে তৈরি মুভি, টেলিফিল্ম, নাটক কিংবা টিভি সিরিয়াল আমার মনের মত হয় না। কিন্তু এই সিরিজ নিয়ে মুভি লাভারজ পেইজে কয়েকটা স্ট্যাটাস আর কমেন্ট দেখে আগ্রহ জেগে উঠলো। এমন সময় ছোট ভাই শার্লক সিরিজের প্রথম সিজনের তিনটা এপিসোডও নামালো। কিন্তু নামানোর পর প্রায় দেড় মাস কেটে গেল। শার্লক দেখা হল না। আমি ডুবে গেলাম দ্য বিগ ব্যাং থিওরিতে আর ভুলে গেলাম শার্লকের কথা। টানা কয়েক সপ্তাহ শুধু বিগ ব্যাং নামালাম আর দেখলাম (আমার সিরিয়ালের প্রতি কোনোদিনই আগ্রহ ছিল না। তাই বিগ ব্যাং থিওরির নামই শুনি নি তিন মাস আগে :(!!) ছয় নম্বর সিজনের তেরো নম্বর এপিসোড (সর্বশেষ এপিসোড) দেখার পর মেজাজ খিঁচরে রইল পরবর্তী এপিসোডের আশায় বসে থাকতে থাকতে।

এমন সময় মনে পড়ল শার্লকের কথা। ছোট ভাই অনেকবার বলেছে দেখতে। কিন্তু বড় ব্যাঙে মজে গিয়ে শার্লক-ফারলক কোন পাত্তাই পায় নি আমার কাছে।

ঘোর কলি কাল আর কি!!!

আবারো পঠিত বই থেকে বানানো সিরিজ দেখে আশাভঙ্গ হওয়ার আশা নিয়ে বসে পড়লাম শার্লকের প্রথম সিজনের প্রথম এপিসোড দেখতে। কিছুক্ষণ দেখে আমি থতমত! এ তো দেখি একবিংশ শতাব্দীর অত্যাধুনিক ব্যাপার-স্যাপার। তার মানে এখানে শার্লকের আধুনিকায়ন করা হয়েছে?

বেশ বেশ! আমার আগ্রহ চরমে উঠলো। আধুনিক শার্লক হোমস আধুনিক উপায়ে কিভাবে রহস্য উদঘাটন করে সেটা দেখার জন্য পর পর দুই দিনে দুই সিজনের ছয় এপিসোড খতম করে দিলাম। খতম শেষে তব্দা মেরে রইলাম আরও দুই দিন 😯  ।

“ইহা আমি কি দেখিলাম?” কিংবা “একি অপরূপ রূপে গো তোমায় হেরিনু শার্লক-ওয়াটসন!”

ক্লাস এইটে থাকতে পড়েছিলাম শার্লক সমগ্র। পড়ার সময় শার্লকের চেহারা কল্পনা করেছিলাম অপুষ্টিতে ভোগা-চিকনা পটাশ-ম্যাকগ্রার মত লম্বু আর আব্রাহাম লিঙ্কনের মত চাপা ভাঙ্গা এক মধ্যবয়স্ক ব্যাটাকে। কিন্তু সিরিজের শার্লককে দেখার পর থেকে আমার কল্পনায় কৈশোরের সেই ব্যাটা আসছেই না। আসছে শুধু কোঁকড়া চুল, সুন্দর চেহারা, কম বয়স আর ভাল স্বাস্থ্যের Benedict Cumberbatch!

একালের শার্লক!

একালের শার্লক!

 

তবে আশ্চর্যের ব্যাপার এই যে, আমার কল্পনার ওয়াটসনের সাথে সিরিজের ওয়াটসনের (Martin Freeman) ভীষণ মিল। হা হা হা!

শার্লক দেখতে গিয়ে একটা ব্যাপারে ভালই সমস্যা হয়েছে আমার। তা হল, শার্লক হোমসের কথা বলার গতি। সাবটাইটেল দিয়েও অনেক ক্ষেত্রে কুলানো যায় নি। Pause দিয়ে দিয়ে সাবটাইটেল দেখতে হয়েছে  :P!

প্রতিটা কাহিনীর জটিলতা, রহস্যময়তা আর মারপ্যাঁচ এত সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে যে তা ঢ্যাঁড়স ভর্তার মত মসৃণভাবে মনের ভিতর ঢুকে যায়। দেখতে গিয়ে একবারও মনে হয় না, “এই যাহ! মাথার উপর দিয়ে চলে গেল।“ এক সেকেন্ডও বাড়তি নেই কোথাও। ঠিক যতটুকু খেলে সবার পেট ভরবে আবার তৃপ্তির ঢেঁকুরও উঠবে, ততটুকুই প্লেটে বাড়া হয়েছে। দেখতে বসে আমি নিঃশ্বাস নেওয়ারও সময় পাই নি। প্রতিটি দৃশ্যই ছিল মূল্যবান আর চমকপ্রদ। চোখের পলক ফেলতেও দুইবার ভাবতে হয়েছে…পাছে কোন দৃশ্য মিস হয়ে যায়!  8)

স্যার আরথার কনান ডয়েলের গল্প অনুসারে সিরিজের এপিসোডগুলো হুবহু বানানো না হলেও প্রতিটা এপিসোডই উনার গল্পের ছায়া অবলম্বনে তৈরি করা হয়েছে। এপিসোডগুলোর IMDB rating-ও সেরকম। যেমনঃ

S1 E1: তৈরি করা হয়েছে A Study in Scarlet অবলম্বনে (8.8 )

S1 E2: তৈরি হয়েছে তিনটি গল্প অনুসারে- The Valley of Fear, The Adventure of The Dancing Men এবং The Sign of Four (7.8 )

S1 E3: তৈরি হয়েছে মোট দশটি গল্প থেকে ধারণা নিয়ে (8.6)

S2 E1: তৈরি হয়েছে A Scandal in Bohemia অবলম্বনে (9.2)

S2 E2: তৈরি হয়েছে The Hound of The Baskervilles অবলম্বনে (8.2)

S2 E3: তৈরি হয়েছে The Final Problem অবলম্বনে (9.3)

লেখক হিসেবে Steven Moffat আর Steve Thompson-এর সাথে আছেন Mark Gatiss, যিনি আবার প্রতি এপিসোডে মাইক্রফট হোমস হিসেবে অভিনয়ও করেছেন! সবচেয়ে বেশিবার পরিচালনা করেছেন Paul McGuigan।  এরপর আছেন Toby Haynes এবং Euros Lyn

সিরিজটির সার্বিক IMDB rating 9.2।

 

হুবহু গল্প অনুযায়ী বানানো না হলেও আধুনিক যুগ অনুযায়ী যা দেখানো হয়েছে, তাতে আমার কোন অসন্তুষ্টি নেই। বরং দেখার পর বারবার মনে হয়েছে, চিত্রনাট্যকার আর পরিচালকের ঘিলু কি শুধুই Grey Matter দিয়ে ভর্তি?

ছয়টার মধ্যে আমার সবচেয়ে প্রিয় এপিসোড হল A Scandal in Belgravia।  জটিল… জটিল!

শার্লককে ফাঁদে ফেলা আইরিন নাকি নিজেই শার্লকের ফাঁদে পড়ে যাওয়া বক?

শার্লককে ফাঁদে ফেলা আইরিন নাকি নিজেই শার্লকের ফাঁদে পড়ে যাওয়া বক?

আইরিন এডলারের কি চরিত্র রে বাবা (যদিও বুদ্ধিমত্তা ছাড়া ডয়েলের আইরিনের সাথে ইনার কোন মিল নেই)! মূলত এই চরিত্রের জন্যই এপিসোডটা চরম লেগেছে। হোমসের সাথে টেক্কা দেওয়ায় পারদর্শী দুর্ধর্ষ মহিলা, যে কিনা হোমসকে ঘোল খাইয়ে ছেড়েছে, তার সাথে হোমসের হালকা রোমান্টিকতার আভাস এপিসোডকে করে তুলেছে অপ্রতিরোধ্য (আর কোন বিশেষণ মাথায় আসছে না )। তবে শেষ পর্যন্ত বেচারিকে হোমস এমনভাবে চেঁছে ফেলবে, কল্পনাও করি নি! আসলেই হোমসের কথামত, “Love is a dangerous disadvantage!”

এরপরেই আছে The Hounds of The Baskerville। বরাবরের মতই দুর্দান্ত কাহিনী। মূল গল্পকে এখানে যেভাবে আধুনিকায়ন করা হয়েছে, আমি হতবাক!

তৃতীয় নাম্বারে আছে The Reichenbach Fall।  এটা দেখতে গিয়ে টেনশনে বমি আসার মত অবস্থা! পরীক্ষার হলে প্রশ্ন পাওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে যা হয় আর কি। শার্লক মারা যাওয়ার পর কান্নাও পেয়েছিল। আহা রে আমার কাম্বারব্যাচ!

শার্লক আর ওয়াটসনের মধ্যকার রসিকতাগুলো খুব বিনোদন দিয়েছে। শার্লকের কথার স্টাইলও হাস্যকর! কাউকে পরোয়া না করে, কারো অনুভূতির ধার-কাছ দিয়ে না গিয়ে সমানে পট পট করা। ওয়াটসন শিখিয়ে না দিলে তো ব্যাটা জানেও না কখন ধন্যবাদ দিতে হয়! শার্লকের ছেলেমানুষি অভিমান কিংবা ওয়াটসনের রাগ ভাঙ্গানোর জন্য শার্লকের প্রচেষ্টা (যা মোটেও শার্লোকিয়ান নয়!) দেখে রামগরুড়ের ছানাও হাসবে 🙄 ।

সিরিজে ভিলেনের আবির্ভাব ঘটেছে চরমভাবে। প্রথম দেখাতে বুঝতেই পারি নি ইনিই হতে যাচ্ছেন শার্লক হোমসকে ধ্বংসকারী অস্ত্র! তবে জেমস মরিয়ারটী চরিত্রে Andrew Scott কে আমার তেমন ভাল লাগে নি। উনার অভিনয় নিয়ে আমার বলার কিছু নেই। সেই উদাসীন ভাব-ভঙ্গি, টেনে টেনে কথা বলা বা কলজে কাঁপানো হুংকার-সবই মারাত্মক। তবে এই চরিত্রে শার্লকের মতই শক্ত-পোক্ত কাউকে নিলে আমার বেশি ভাল লাগত।

ওহ, আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল সিরিজটির আবহ সঙ্গীত। অসাধারণ! “দি এডভেঞ্চার অফ সিনবাদ”-এর পর এই সিরিজেই মনে রাখার মত কোন মিউজিক পেলাম। দৃশ্য অনুযায়ী মিউজিকগুলো এতই খাপে খাপ, আব্দুল্লার বাপ যে আপনি মুগ্ধ হয়ে আপনার মনোযোগ দৃশ্যের দিকে না দিয়ে সঙ্গীতের দিকেও দিয়ে রাখতে পারেন (আমার মত)।

বলতে দ্বিধা নেই, শার্লক সিরিজ দেখে নিজেকে ধন্য মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে জীবনে একটা কিছু দেখলাম বটে!

সিরিজের প্রথম সিজন দেখিয়েছিল ২০১০-এ। দ্বিতীয় সিজন দেখাল ২০১২ তে। আর তৃতীয় সিজনের কাজ কিনা মাত্র শুরু হবে ২০১৩-র মার্চে?? দেখাতে দেখাতে তো ২০১৪!

প্রতি সিজনের ধাক্কা সামলানোর জন্য দর্শকদের দুই বছর সময় দেয় নাকি বিবিসি?

কেন যে ওরা বুঝে না, অপেক্ষায় থাকা বড় কষ্টের!

“মাথা নষ্ট” বিশেষণটা অনেক শুনেছি, অনেক পড়েছিও। কিন্তু ব্যবহার করা হয় নি তেমনভাবে। এই সিরিজের ক্ষেত্রে যদি ব্যবহার না করি তাহলে আমার অনুভূতি  অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। তাই শেষ করছি এই বলে,

মাথা নষ্ট সিরিজ, ম্যান!

না দেখলে পস্তাইবেন।

মন্তব্য করুনঃ

You must be Logged in to post comment.

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন