তারকভস্কির মুভি Stalker(1979)-সাই-ফাই এর আড়ালে ব্যক্তিগত জীবনদর্শণ
Share on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on TwitterPin on Pinterest0

“When a man thinks of his past, he becomes kinder…”

প্রথমেই অল্প কথায় মুভির কাহিনীটা বলে নেই, এরপর আলোচনা।

জোন নামক এক রহস্যময় জায়গায় যারা মানুষকে নিয়ে যায় তারা হচ্ছে স্টকার। এই জোন জায়গাটা কিভাবে তৈরী হল, কেন তৈরী হল, এটা নিয়ে অনেক রহস্য। বলা হয় এখানে গেলে মানুষের সুপ্ত ইচ্ছা পূরণ হয়। কিন্তু জায়গাটা সরকারীভাবে নিষিদ্ধ এক জায়গা। মুভিতে এরকম একজন স্টকার এক প্রফেসর আর এক লেখককে নিয়ে যায় জোনে। তাদের যাত্রাপথে কি হয়, সেখানে গিয়ে তারা কি দেখে, ফেরত আসতে পারবে কিনা এইসব নিয়েই মুভি। কি হচ্ছে, কি হবে এইরকম একটা টেনশান মুভিতে শেষ পর্যন্ত ধরে রেখেছিলেন তারকভস্কি।

4.2.3

এইবার আলোচনায় আসি। এই মুভির গল্পের পিছনেই গল্প বেশি আসলে। মুভির বিভিন্ন পরিস্থিতিতে আসলে সেই সময়ের রাশিয়ার সামাজিক অবস্থা এবং মানুষের মানসিক অবস্থার বিশ্লেষণই যেন দেখাতে চেয়েছেন তারকোভস্কি। মুভিটা আসলে তৎকালীন রাশিয়ার পরিস্থিতি বিবেচনা করলে কিছুটা বুঝা যায়। কেমন ছিল রাশিয়া তখন? রাশিয়া তখন পুরো মাত্রায় বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির দিকে ঝুকে ছিল, সব কিছুর পিছনে যুক্তি এবং কারণ অনুসন্ধানী বৈজ্ঞানিক মানসিকতা সমপন্ন সমাজ তৈরী করার চেষ্টা চলছিল পুরোদমে, বিশ্বাসীদের কোন স্থান ছিল না সে সমাজে। এমনকি রাষ্ট্রীয় মদদেই বিশ্বাসীদের উপর যুক্তিবাদী বিজ্ঞানমনষ্ক মানুষদের দ্বারা চলত মানসিক নির্যাতন, তাদেরকে এমনকি সামাজিকভাবেও হেয় করা হত। মুভির শেষ দিকে স্টকার এর স্ত্রী যখন তার মায়ের বর্ণনা দেয়, তখনও দেখা যায় এরকম কিছুই ঘটেছিল তার সাথেও।

তারকভস্কি সেই সমাজের নিপীড়িত বিশ্বাসীদের প্রতি সহানূভূতিশীল ছিলেন। মুভির তিনটি চরিত্র সনাজের তিন স্তরের প্রতিনিধি, একজন প্রফেসর বা বিজ্ঞানী, একজন আর্টিস্ট বা রাইটার, আরেকজন বিশ্বাসী সাধারণ মানুষ। তাদের কথোপকথন গুলো খুবই ইন্টারেস্টিং।

Stalker-1979

এর মধ্যে আর্টিস্টকে মনে হয়েছে তারকভস্কি নিজেই, যিনি কনফিউজড অনেক কিছু নিয়েই। মানবীয় আবেগগুলোর স্বরূপ সন্ধানের জন্য যিনি প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে যাচ্ছেন, কিন্তু এই আবেগের পিছনে কোন কারণ খুজে না পেয়ে দিশেহারা। বিজ্ঞান তার কাছে খুব বোরিং, অতি মাত্রায় বস্তুবাদীতা। সুযোগ পেলেই তিনি বিজ্ঞানীকে মক করেন, মানবীয় এবস্ট্রাক্ট ব্যাপারগুলোকে বুঝার জন্যও যে বিজ্ঞানীকে বস্তুর জগতে এনে চিন্তা করতে হয় এটা নিয়েও তিনি কৌতুক করেন। সম্ভবত মানবীয় অস্তিত্বের কোন কারণ খুজে পান না তিনি, কিন্তু তিনি নিজে কিছুই না এটাও মেনে নিতে পারেন না। এই জন্যই নিজের অস্তিত্বের জানান দিতেই মানুষ লেখালেখি করে বলে তার মনে হয়। তিনি হতাশ, নিহিলিস্টিক,  মাঝে মাঝে মনে হয় এগ্নোনিস্টিক, কিন্তু তারপরও মানবীয় আবগেগুলো তাকে চমৎকৃত করে।

My dear our world is hopelessly boring

বিজ্ঞানী পুরোমাত্রায় বৈজ্ঞানিক ধ্যানধারণায় অভ্যস্ত, তারপরও অন্য অনেক বিজ্ঞানীর মতই অনেক কিছুর কারণ না জানায় তিনিও হতাশ। তিনি খুব ভালো করেই জানেন, অনেক কিছুই তার অজানা, তবে তারপরও তিনি যৌক্তিক পথেই আগাতে চান। তিনি ‘জোনে’ আসেন ‘জোনের’ কিংবা বিশ্বাসের অসারতা প্রমাণ করতে।

স্টকার মানে সাধারণ মানুষ যিনি, তার জন্য আসলে মায়া হয় সবচেয়ে বেশি। তিনি এই দুজনের মত তেমন বিশেষ কেউ না, তাদের মত জ্ঞানের চর্চা তিনি করেন না, তার বিশ্বাসটাই তার সম্বল। তার এই বিশ্বাসটাই এবং তার মতই যারা আশাহত তাদেরকে এই বিশ্বাসের সন্ধান দিতে পেরে তিনি মানসিক প্রশান্তি পান। অবিশ্বাসী হওয়ার মত শক্ত মানসিকতা তার নেই। তবে তিন চরিত্রের মধ্যে একমাত্র তিনিই মানুষের অস্তিত্বের কারণ খুজে পান। এমনকি বাকি দুজনের নিহিলিস্টিক দর্শণকেই তিনি এক পর্যায়ে প্রশ্নবিদ্ধ করেন এই বলে, সবকিছুর পিছনেই তারা কারণ খুজে পান, মানব অস্তিত্বেরও নিশ্চয়ই কারণ আছে। তবে তার কারণটা হচ্ছে আসলে তার বিশ্বাস। এই বিশ্বাস সত্যি কিংবা মিথ্যা সেই নিয়ে তারকভস্কি কিছু বলেন নি, বিশ্বাস জিনিসটা কেমন সেটাই তিনি দেখাতে চেয়েছেন। এমনকি শেষ দৃশ্যেও যেন তিনি বিশ্বাসের সেই স্বরূপটাই দেখাতে চেয়েছেন- সেই দৃশ্যে মনে হয় স্টকার এর মেয়ের ইশারায় গ্লাস পড়ে যাচ্ছে টেবিল থেকে, কিন্তু এটা তখন তাদের বাড়ির পাশ দিয়ে যে ট্রেন যাচ্ছিল সেটার কম্পনেও হতে পারে, নিশ্চিতভাবে জানার উপায় নেই।

tarkovsky stalker 10

আবার যত উন্নত যুক্তিবাদী কিংবা নিঃস্ব মানুষই হোক না কেন, মানবীয় ভালো এবং খারাপ ইচ্ছাগুলো যে সবার মধ্যেই সমানভাবে থাকতে পারে, এটাও হয়ত বলতে চেয়েছেন তারকভস্কি । শেষের দৃশ্যটা সেইদিকেও ইঙ্গিত করতে পারে। বলা হয় স্টকাররা ‘জোন’ এ কোনরকম ইচ্ছা পোষণ করতে পারবেন না, কিন্তু গল্পের স্টকার হয়ত অবচেতনে জোনের কাছে তার মেয়ের ব্যাপারে কিছু চেয়েছিলেন। এর আগে যে Stalker বিজ্ঞানী জোনে এসেছিলেন, তিনিও আবার অবচেতনে চেয়েছিলেন অর্থবিত্ত।

তিনটা চরিত্রই আবার অন্য চরিত্রকে যেন ঠিকমত বুঝতে পারে না। বিজ্ঞানী মনে করেন শুধু তিনিই মানব উন্নয়নে কাজ করেন, আর্টিস্ট মনে করেন একমাত্র আর্টই হচ্ছে মানব সভ্যতায় নিঃস্বার্থ অবদান, স্টকার আবার ঠিক বুঝতেই পারেনা বিশ্বাস ছাড়া বাকি দুজন কি নিয়ে বেচে আছে। আবার বিজ্ঞানী এবং লেখক যেন ফ্রিড্রিখ নিচা (Friedrich Nietzsche) এর পোস্ট-গড সোসাইটির প্রতিনিধি যারা চরম নিহিলিস্টিক। যাই হোক, এই তিন ধরনের মানুষকেই যে পাশাপাশি সমান সুযোগ দিয়ে সমাজে থাকতে দিতে হবে এটাই তারকভস্কির ফিলোসফি।

tumblr_my00dflAus1rl4bh9o1_500

পরিশেষে, বিজ্ঞানমনষ্কতা অবশ্যই খারাপ কিছু না, সভ্যতার অগ্রযাত্রাকে দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যেতে বিজ্ঞানীরা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন, জ্ঞান সাধণাকেই তারা জীবনের ব্রত বলে মনে করেছেন এবং উদারহস্তে তাদের অর্জিত জ্ঞান বিলিয়ে গেছেন। সত্যি বলতে জ্ঞান সাধনার জন্য যৌক্তিক এবং জিজ্ঞাসু হওয়া ছাড়া উপায়ও নেই। কিন্তু অতি বিজ্ঞানমনষ্ক হতে গিয়ে আমরা যেন মানবিকতা এবং সহনশীলতা হারিয়ে না ফেলি, এটাই সম্ভবত বলতে চেয়েছেন তারকভস্কি।

Stalker (1979)
Stalker poster Rating: 8.1/10 (74,140 votes)
Director: Andrei Tarkovsky
Writer: Arkadiy Strugatskiy (novel), Boris Strugatskiy (novel), Arkadiy Strugatskiy (screenplay), Boris Strugatskiy (screenplay)
Stars: Alisa Freyndlikh, Aleksandr Kaydanovskiy, Anatoliy Solonitsyn, Nikolay Grinko
Runtime: 163 min
Rated: NOT RATED
Genre: Drama, Sci-Fi
Released: 17 Apr 1980
Plot: A guide leads two men through an area known as the Zone to find a room that grants wishes.

মন্তব্য করুনঃ

You must be Logged in to post comment.

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন