Review: Joker (2019) মুভি শুধু মুভি নয় !!!

Review: Joker (2019)

(spoiler alert)

Image result for Joker (2019)

অনেক দিন ভাল কোন মুভি রেভিউ পড়ি না, ভাল কোন মুভির সাজেশন ও পাই না। আলতু ফালতু মুভি তৈরি হচ্ছে পৃথিবীজুড়ে যা তৈরি করেছে ফালতু মুভি ফ্যানবেজ আর মেকি মুভি ক্রিটিকস। আমার মত সেকেলে মুভি ফ্যানরা যারা সত্যজিৎ, কুব্রিক, স্করসিসের মুভির ভক্ত তারা সিনেমার পৃথিবী ছেড়ে আশ্রয় নিয়েছে সিরিজের দুনিয়াতে। তবুও মন পড়ে থাকে সিনেমার পৃথিবীতে।

এমনিতেই সুইডেনে থাকার কারনে টরেন্ট থেকে হলিউড মুভি নামানে ভয় লাগে, তাই ভরসা সিনেমা হল। শুনলাম বাড়ির সামনের হলে একটা সিনেমা লেগেছে, পত্র পত্রিকায় লেখা লেখিও হচ্ছে ওটা নিয়ে। ক্লাসম্যাট রা যাচ্ছে শুনে আমিও জয়েন্ করে ফেললাম। কি আছে জীবনে!

সুইডেনের সিনেমা হলের অবস্তাও বাংলাদেশের মত। অর্ধেকের বেশী সিট ফাকা থাকে। সব দোষ টিভি আর ওয়েবসিরিজ এর। কিন্তু অ্যাই মুভি এর ক্ষেত্রে বেতিক্রম দেখলাম। প্রায় সিটই পাওয়া যাচ্ছে না। হাতে পায়ে ধরে পেলাম তাও সামনের সিট! মানে ঘাড় শেষ। মুভি ২ ঘণ্টা ১ মিনিট এর। মুভি এর নাম জোকার!

মুভি শুরু হোল খুবই সাধারণ ভাবে, কিছু রঙ মেখে বসে থাকা পাবলিক দের খেজুরে আলাপ চলছে। নায়ক একটু পর পর মাইর খায় পলাপাইন দের হাতে আর হাসে। কিরে ভাই, অ্যাই মুভির জন্য এত মারামারি! আসে পাশে তাকালাম, সবাই ফেকাসে দৃষ্টিতে বড় পর্দায় তাকিয়ে পপকর্ণ খাচ্ছে, কিছু একটা হবে এই আশায়। পড়ে নায়ককে দেখে বললাম “আরে অ্যাই হালারে তো আমি চিনি, ওই গ্লাডিয়েটর মুভির ভিলেন ডা না?” পাশে বসা আমার স্প্যানিশ ভাষী বন্ধুটি কিছু বুজলনা আমার কথা। পড়ে আমিও বসে রইলাম এই ভেবে যে “আহারে লোকটা এত সকালে বুড়া হইয়া গেসে”। মুভি চলতে থাকলো।

মুভি চলতে চলতে আমার বসে থাকা সিটটি চলে গেল গোথাম সিটি নামক এক নোংরা, ধনী গরীব বৈশম্মে ভরা শহরে, যেখানে আরথার ফ্লেক নামে এক মধ্য বয়সী মানুষ তার মাকে নিয়ে থাকে। একটা আধপাগল মা ছাড়াও আরথারের আছে অসীম নিষঙ্গটা, অনেক না পাওয়া, আর সমাজের অবহেলা। আরথার নিজের আর মায়ের জন্য কাজ করে খায়, ভারের কাজ (জোকার)। বিভিন্ন দোকান বা হাস্পাতাল আরথারকে ডাকে, আরথার কখনো রেস্টুরেন্টে খদ্দেরদের দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করে, কখনো হপাতালে অসুখে আক্রান্ত বাচ্চাদের কসরত দেখিয়ে হাসি ফুটানোর চেষ্টা করে। কিন্তু মানুষ আর এসব খায় না। তবুও আরথার টিকে থাকার লড়াই করে যায়। আরথারের রোগা শরীর নিয়ে চেষ্টা করা দেখলে মনে হয়, জীবিত মানুষ আসলে কখনো “জীবন যুদ্ধে” হারে না। কারন “জীবন যুদ্ধে হারা” নামে কোন অপশন জীবিত মানুষের থাকে না, পেট বাচানোর জন্নে মানুষকে অবিরাম যুদ্ধ করে যেতে হয়। পেট বাঁচাবার যুদ্ধে থাকা মানুষরা অনেক স্বপ্ন দেখে, কারন তাঁদের যাপিত জীবন দুরসপ্নের মত। স্বপ্নের মত জীবন কাটায় শহরের মাত্র কতিপয় এলিট মানুষ। আরথার স্বপ্ন দেখে ও একজন বড় কমেডিয়ান হবে, ঠিক মুরের মত (রবার্ট ডি নির)যার প্রোগ্রাম আরথারের মা প্রতিদিন দেখে, একদিন আরথার কেও ওর মা টিভিতে দেখবে। কি দারুন হবে ব্যাপারটা!

 

Image result for Joker (2019)

স্বপ্ন দেখলেই স্বপ্ন ভাঙ্গার রিস্কটা থেকে যায়। আরথার যেহেতু গুড ফর নাথিং, তাই বস তক্কেতক্কে ছিল। একটা জুতসই অভিযোগ পেয়েই বের করে দিল ওকে। জীবনের সব হিসাবে ফেল করে ক্লান্ত আরথার ফাকা ট্রেনএ বসে পড়ে, কাজের সুবাদে মুখ ভর্তি ভাঁড়ের রঙচং আর কস্টিউম। পাশেই বসে আছে শহরের এলিট শ্রেণির বকে যাওয়া ৩ তরুণ যাদের কাজ সব নামী দামী ব্রান্ডের জামা কাপড় পড়া, সাধারন মানুষদের ছোটলোক বলে গালি দেওয়া আর অসহায় মেয়েদের হয়রানি করা। ৩ তরুণ ইচ্ছা মত একটা অসহায় মেয়েকে উত্তক্ত করছিল, আরথার ভাঁড়রের গেটআপ নিয়ে অসহায় দৃষ্টিতে দেখছিল। মেয়েটা অসহায়ভাবে একবার তাকাল কিন্তু একটা ভাঁড়ের উপর মেয়েটির ভরসা হচ্ছিল না। ট্রেনটা ( সাবওয়ে) চলে গেল মাটির নিচে, মাঝে মাঝেই সব অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে। হুট করে প্রকাণ্ড হাসি শব্দে কেপে গেল গোটা বগী! আরথার হাসচ্ছে, অট্ট হাসি! আরথার এর একটা মানুসিক রোগ আছে, যেকোনো অস্বস্তিকর মুহূর্তে আরথারের হাসি আসে, এটা খুব কমন রোগ (মুন্না ভাই এমবিবিএস এর প্রিসসিপাল এর মত)। কিন্তু বড়লোকের বকে যাওয়া ছেলেদের ওর হাসি পছন্দ হোল না। ওরা এগিয়ে এলো “ শালারে আজ মেরে বাপের নাম ভুলাব” মুড নিয়ে। আরথারের হাসি থামে না, বকাটেরা ওকে বেধম পিটানো শুরু করল, একদম নিচে ফেলে পা দিয়ে ফুটবল খেলা। মেয়েটা সব দেখে পালালো। আরথার মার খাচ্ছে আর হাসতেছে, বেছারার রোগ এটা, কন্ট্রোল করতে পারছে না। আরথার এর আগেও বহুবার মাইর খাইছে, তাই ওর এক সহকর্মী ওকে একটা পিস্তল দিয়েছিল কাছে রাখার জন্য। আরথার পিস্তলটার ট্রিগার টিপে দিল, একটা ছেলে পড়ে গেল, এরপর আর একটা। তিন নম্বর ছেলেটা ট্রেন থেকে নেমে দৌড় দিয়ে পালানো, কিন্তু আরথার ধরে ফেলল, অনেক গুলো গুলি করলো ওকে। পুরো হল চুপ। যেন আরথার এরপর আমাদের দিকে দৌড়ে আসবে, কিন্তু না। আরথার দৌড় দিয়ে চলে গেল এক নোংরা পাবলিক টয়েলেটে। পুরো টয়েলেটের দরজা বন্ধ করে বেসিনের সামনে দাড়িয়ে পরল, শুরু হোল আরথারের মৃত্যু নৃত্য। মানুষ মারার পর আরথার যেন উজ্জাপন করলো নিজেকে, তার প্রতিভাকে, অসাধারণ ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক এর তালে চলল এক অসাধারণ পারফর্মমেন্স, মাথাটা আমার একটু ভারী হয়ে গেল। মাথায় ঘাম নিয়ে এসি এর নিচে আসলে যেমন লাগে, পুরো হলের মানুষদের তেমন একটা ফেলিংস দিয়ে গেল ওর নৃত্যটা। আরথার মানে সেই ভাঁড় দরজা খুলে বের হয়ে এল বাইরে, আরথারকে এখন অন্য রকম লাগছে, ব্যাটম্যান ডার্ক নাইটের ভয়ংকর জোকারের মতন। আমরা জানি এটা ব্যাটম্যান সিরিজের ‘জোকার’ এর ক্যারেক্টার ডেভেলপমেন্ট স্টোরি! মানে আরথার কিভাবে ভয়ংকর ভিলেন ক্যারেক্টা্র জোকার হয়ে উঠল।

এর পর এর কাহানি খুবই মজার। ওই তিন ছেলেকে এক জোকার মারছে বলে শহরে টকশ হয়। বড়লোক মানুষ শোক প্রকাশ করে আর পাবলিক বলে ভাল করছে, আরও কয়েকটারে মারা উচিত। সবাই জোকার এর মুখস পড়ে রাস্তায় নেমে পড়ে। অজানা এক জোকার (আমরা দর্শকরা জানি জোকার হোল আরথার) হয়ে যায় নিপীড়িত, অবহেলিত, গরীবদের নায়ক, মানে পুরো বাহুবলি। এরপর আরথার এক এর পর এক মানুষ খুন করে, একজন আর্টিস্ট এর মত মানুষ খুন করে-করে সিরিয়াল কিলারে পরিণত হয়। আমিসহ দর্শক কনফিউশড হয়ে যায়। জোকার কি একজন কিলার না আর্টিস্ট! মুরে (রবার্ট ডি নির) আরথারকে ওর প্রোগ্রামে ইনভাইট করে, (জানে না ওই সেই মোস্ট ওয়ান্টেড খুনি), ……………………………………

কাহিনির শেষে চলে আসি, আরথার যে জোকার তা সে নিজেই বলে দেয়, এরেস্ট করা হয় তাকে। গাড়ীতে থানায় যাচ্ছে আরথার, সারা শহরে আগুন জ্বলছে, গাড়ির জানালা য়ে সব দেখে সে। হুট করে এক আম্বুলেঞ্ছ চাপা দেয় পুলিশের গাড়িকে। সামনে বসা পুলিশ মারা যায়, আরথার আধমরা। চাপা দিয়েছে নব্য জোকাররা, আরথারকে (গুরু) বাঁচানোর জন্য। ওর বডি ভাঙা গাড়ির উপর রাখা হয়। জনতা অপেক্ষা করছে, গুরু উঠে দাঁড়াবে………… অপেক্ষা শেষ হয়, জোকার (আরথার) উঠে দাড়ায়, হাজার হাজার জোকার হুঙ্কার দিয়ে উল্লাস করে! আরথার অবাক হয়, সে একজন রকস্টার এর সম্মান পাচ্ছে আজ, অথচ কমেডিয়ান হিসাবে অ্যাই সম্মানটা চেয়েছিল ও। এক্সিরেন্ট করা আরথার নিজের মুখে রক্ত দেখে, হাত দিয়ে রক্ত নিয়ে মুখে টেনে হাসির রক্তের সাইন হয়ে যায় “দি জোকার”!

 

Related image

মুভির পরিচালক টোড ফিলিপস, যে Hangover মুভি সেরিজের পরিচালক। এই পরিচালক এমন মুভি বানাল কিভাবে, ও বানাবে ওয়াশরুমে গিয়ে ফ্ল্যাশ কাজ করে না টাইপ মুভি। হিসাব মেলে না, মিলল নেট ঘেঁটে, যা ধারণা তাই, মুভি এর Executive Producer ছিলেন Martin Scorsese যিনি তৈরি করে ছিলেন পৃথিবীর ২য় বেস্ট সাইকো মুভি ট্যাক্সি ড্রাইভার। এই মুভি এর স্কেচও তারই করা। যদিও শেষ পর্যন্ত ছিলেন্ না এই মুভির সাথে বেক্তিগত বেস্ততার কারনে। মুভিটাতে কুব্রিকের ক্লকওয়ার্ক অরেঞ্জ এর কিছু প্রভাব আছে।

এই মুভি যেহেতু হত্যা, রাহাজানি কে কিছুটা হোয়েলও প্রমট করেছে তাই সারা পৃথিবী জুড়ে এই মুভি নিয়ে বিতরকের দেখা দিয়েছে। আমেরিকা তে “gun violence” বেড়ে যেতে পারে আশঙ্কায় অনেক সিনেমা হলে পুলিশ মতায়েন করা হয়েছে। শুধু এই কারনে অস্কার কমিটিও সামনের পুরস্কার দেওয়ার ক্ষেত্রে অনেক কার্পণ্য করবে নিরসন্দেহে। ( মূলত ‘বেস্ট পিকচার’ দেওয়ার ক্ষেত্রে)

আমরা জানি, ইতিমধ্যেই অনেক ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল এ “জোকার” মুভিটি প্রসংসিত ও পুরস্কৃত হয়েছে। সামনের বছর সেরা অভিনেতার অস্কারটি জোয়াকিন ফিনিক্স ঘরে না গেলে খুব অবিচার করে হবে। বেচারা অনেক বছর ধরে অসাধারণ সব ক্যারেক্টার প্লে করছে (Her এর কথা মনে আছে?)। সেটা ব্যাকগ্রাউন্ড স্কর ক্যাটাগরি তেও স্কার প্রাপ্য মুভিটির। “জোকার” এই বছরের সেরা মুভি। বর্তমানে IMDB rating 9.1 (৩ টা মুভি এর থেকে বেশী রেটিং পাওয়া)। আমার মতে (আরও অনেকের মতে) পৃথিবীর সেরা সাইকো মুভি এই জোকার। পরিচালক টোড ফিলিপসকে জিজ্ঞেস করা হয়ে ছিল, জোকার ক্যারেক্টারটি এত ভয়ংকর কেন? উত্তরে উনি বলেছেন –“এই সাধারন বেক্তিকে ওই শহরের মানুষরাই অবহেলা, অনাদরে ভয়ংকর বানিয়েছে , তারা জোকারের মত একজন ভিলেন কেই ডিজারভ করে”। ডিসি – মারভেল এর কছকচানি তে যাব না। তবে ওয়ারনার ব্রাদার্স ও ডিসি তাঁদের comfort zone থেকে বেরিয়ে এসে মুভিটা বানিয়েছে বলে তারা একটা বাহবা পেতেই পারে (পাচ্ছে ও)।

কে সেরা জোকার?

হিথ লেজার, কারন জোয়াকিন ফিনিক্স (অ্যাই মুভির জোকার) মূলত “আরথার ফ্লেক” এর রোল প্লে করেছে, কিভাবে একজন নিরসঙ্গ কমেডিয়ান ভয়ংকর ভিলেন ‘জোকার’ হয়ে উঠে। মুভিটা রেগুলার সুপার হিরো – সুপারভিলেন মুভি নয়। এই দুই জোকার কে মিলানো মানে মেসি (ফুটবলার) আর উসাইন বোলট (দৌড়বিদ) তুলনা করা। হিথ লেজার একজন সুপার ভিলেনকে অসাধারণ ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। জোয়াকিন ফিনিক্স একজন মানুষিক বিকার গ্রস্ত বেক্তির রোল প্লে করেছেন যে শেষমেশ একজন অপরাধী (জোকারের) হয়ে উঠেন। জোকার মুভিটি মূলত “আরথারের” জোকার হয়ে উঠবার কাহিনী, “জোকারের নয়”।

কিছু কিছু মুভি ভাল আর খারাপ – এই দুইয়ের মধ্যে সিমাবদ্ধ থাকে না, কিছু মুভি দর্শকদের মোহে আচ্ছন করে রাখে, ভাল না খারাপ হুট করে বুঝা যায় না, মন অনেক সময় নেয় বুঝতে, জোকার এমন সে রকম মুভি। এই ধরনের মুভি কে Own করতে হয়, ভাল-খারাপ অনেক ছোট একটা বিষয়। সামনের দিন গুলোতে হলিউডের সেরা মুভির যেকোনো তালিকায় “জোকার” কে প্রথম দিকেই খুজে পাওয়া যাবে।

Image may contain: 2 people, people sitting, living room, table and indoor

Error: No API key provided.

(Visited 183 time, 1 visit today)

মন্তব্য করুনঃ

You must be Logged in to post comment.

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন