আমার প্রথম ৩টি শর্ট ফিল্ম ও সেগুলোর পেছনের গল্প

এখন পর্যন্ত  বেশী কাজ করা হয়নি। মোটে ৩টি শর্ট ফিল্ম ও একটি নাটক পরিচালনা করেছি। একটি শর্ট ফিল্মের সিনেমাটোগ্রাফী করেছি আর নিজের ৪টি কাজ বাদে আরো ৩টী শর্ট ফিল্ম এ স্ক্রিপ্টরাইটার হিসেবে কাজ করেছি।

আজকে ৩টি শর্ট ফিল্ম এর লিঙ্ক সহ পেছনের গল্প করবো। আপনাদের সুবিধার জন্য ফেসবুকের লিঙ্ক সরবরাহ করলাম। যদিও প্রথম দুইটি ইয়ুটিউবে সার্চ দিলেও পেয়ে যাবেন।

 

LOOPHOLE (2011)

 

তখন ছিলো, ভীষন অন্ধকার, আকাশ ছিলো কালো

দেখা হলো সঙ্গে যে তার ভাটির জলজল 

 

ইউকে থেকে বাংলাদেশে ফেরত গিয়েছি সবে, সঙ্কল্প করেছি আর ফিরে আসবোনা (ইউকে তে)… পুরোনো বন্ধুদের সাথে চা আর সিগারেট চলছে আর চলছে আড্ডাবাজী। আড্ডার বিষয়? না থাক, অনেকেই ১৮- এখানে 😛 তো, শর্ট ফিল্ম বানাবো সেই ভুত তো আগে থেকেই আছে, যেটার প্রয়োজন সেটা হলো অভিজ্ঞ লোকের সাহায্য। কিন্তু বিধিবাম, দুজন ফ্রেন্ড বাদে আর কাউকেই পাচ্ছিনা কাজ করার মতো। এর মাঝে একজন (অর্নব) হলো নাটকে অভিনয় করে একজনের ছোট ভাই (ওর অভিজ্ঞতা রয়েছে) আর আরেকজন (বাবু) আমার মতোই নাদান। অর্নবের মাধ্যমে পরিচয় হলো কনকের সাথে; কনক সিনেমাটোগ্রাফার এবং বেশ কিছু নাটকে কাজ করেছে অলরেডি; সেসময় ও ‘সাতকাহন’ সিরিয়ালে কাজ করছিলো।

যাইহোক, আমরা আলচনা করতে লাগলাম কিভাবে কি করা যায়, কিন্তু কাজ এগুতে লাগলোনা। শুধু চা আর সিগারেট আর কথাই খরচ হতে লাগলো। একদিন রাতে আমরা ঠিক করলাম কাজ শুরু করে দিতে হবে। আমি বললাম আমার হাতে যেসব প্লট আছে সেগুলো দিয়ে কম টাকায় শর্ট ফিল্ম বানানো যাবেনা এবং বানাইলেও ভালো হবেনা। আমাকে বলা হলো নতুন প্লট নিয়ে ভাবতে। বাসায় ফিরে আমি লেগে গেলাম নতুন প্লট নিয়ে ভাবতে এবং সে রাতেই লুপহোলের আইডিয়াটা পেলাম। সবার সাথে আলোচনা করলাম, সবাই পছন্দ করলো। এখন মুল সমস্যা শুরু।

শুরুতেই বাজেট। বাজেট নির্ধারন করা হলো ২০ হাজার টাকা। ক্যামেরা ও লাইট ভাড়া করতে হবে, সবার খাওয়াদাওয়া এবং যাতায়াত ভাড়াতেই মুলত খরচ হবে। ও হ্যাঁ, এডিটিং যেহেতু পারিনা, তাই এডিটরকে কিছু টাকা দিতে হবে। আমার বর ভাই থেকে নিলাম ২ হাজার, মেঝো ভাই থেকে ২ হাজার, ইমেডিয়েট বড় বোন থেকে ১ হাজার, অর্নব দিলো ২ হাজার, বাবু দিলো ২ হাজারের মতো, আর বাকীটা ম্যানেজ করলাম আমি।  লোকেশন? অনেক এদিক সেদিক করে অর্নব এর ভাই এর বাসা আর তাদের এলাকার গলি ঠিক করা হলো। একি সাথে ঢাকা ইউনিভার্সিটির কথাও মাথায় রাখা হলো। কাস্টিং? ঝামেলাটা শুরু হলো এই জায়গায়। মুল চরিত্রের জায়গায় অর্নবকেই কাস্ট করতে হলো যেহেতু অভিনয়ের জন্য কাউকে পাচ্ছিলাম না। এতে আমার অ্যাসিস্টেন্ট হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি অর্নবকে অভিনয়ের পিছনেও সময় দিতে হয়েছিলো যেটা ওর উপর একটা চাপ হয়ে দাড়িয়েছিলো। আমার এক বন্ধুকে রাজী করিয়ে ওর বোনকে কাস্ট করলাম। মেয়েটা চটপটে এবং সুশ্রী থাকায় আমাকে দ্বিতীয়বার ভাবতে হয়নি। কিন্তু সাইকিয়াট্রিস্ট চরিত্রের জন্য কাউকে খুজে পাওয়া যাচ্ছিলোনা।

আমাদের সাথে এক ফ্রেন্ড এর আঙ্কেল ও আড্ডা দিতেন। চাকুরিজীবী ও ব্যাচেলর এই আঙ্কেল অনেক অমায়িক এবং আমরাও উনাকে পছন্দ করতাম। এদিকে শুটিং এর ডেট এগিয়ে আসছে অথচ আমরা সাইকিট্রিস্ট খুজে পাচ্ছিনা, ওদিকে বাবু আঙ্কেলকে কাস্ট করে বসলো। আঙ্কেল তো এক পায়ে রাজী, এদিকে আমি আর কোন উপায় দেখছিনা। আঙ্কেল এর উৎসাহ দেখে মনে হলো একেবারে খারাপ হয়তো করবেনা। আমরা শুটিং শুরু করলাম।

প্রোডাকশনে নেমে বুঝলাম কাজটা যতটা সহজ ভেবেছিলাম ততটাই কঠিন। একজন ম্যানেজার কে কত ঝামেলা পোহাতে হয় আর কত কিছু ম্যানেজ করতে হয় সেটা বুঝলাম সেদিন। হাজারো ঝামেলার মাঝে কাজ শেষ হলেও আমাদের মুল সমস্যা ছিলো দুটো। একঃ আঙ্কেল অভিনয় করতেই পারছিলেন না, দুইঃ আংকেলের পিছনে সময় দেয়ায় আমাদের শুটিং দুইদিনের জায়গায় ৩দিন চলে যাচ্ছিলো। আঙ্কেলের সমস্যার সমাধান বের করলো কনন (সিনেমাটগ্রাফার), সে আংকেলের মাথাই কেটে দিলো। এতে আঙ্কেলের ফেইস দেখা না গেলেও বডি ল্যাঙ্গুয়েজ দেখে বুঝা যাচ্ছিলো যে আঙ্কেল কথা বলছে (পরে তার ডায়ালগ ডাব করে দেয়া হয়েছিলো)… আর দুটো সিকোয়েন্স কেটে ফেলে দিয়ে শুটিং ২ দিনেই সমাপ্ত করার কাজটা করতে হয়েছিলো আমাকেই 🙁

শুটিং শেষেই আগে থেকে প্ল্যান করে রাখা ট্যুর দিয়েছিলাম কক্সবাজারের উদ্দেশ্য। ঢাকায় ফিরে এসে এক রাতে এডিটরের সাথে থেকে এডিট করেছিলাম।

ফেসবুক থেকে দেখার লিঙ্কঃ https://www.facebook.com/photo.php?v=10151131036977982&set=vb.672862981&type=2&theater

 

 

THE LOST DREAM (2011)

 

বন্ধু তোর লাইগা রে বন্ধু তোর লাইগা রে, আমার তনু জরজর
মনে লয় ছাড়িয়ারে যাইতাম, থুইয়া বাড়ি ঘর, বন্ধু তোর লাইগা রে…

 

দ্যা লস্ট ড্রীম কে আমি সবসময় উল্লেখ করে থাকি এক্সপেরিমেন্টাল কাজ হিসেবে। কারন আমি এই শর্ট ফিল্ম এ প্রথম ক্যামেরা চালাই, এবং প্রথম এডিটিং প্র্যাক্টিস করি। দ্যা লস্ট ড্রীমের পেছনের ঘটনাটা মজার। এটার স্ক্রিপ্ট ছিলো ২মিনিটের একটা ঘটনা। অনেক আগে লিখে ফেলে রাখছিলাম। তো, লুপহোল এর পর ভাবলাম আমার যেহেতু একটা ডিএসএলআর আছে, এটা দিয়ে একটু প্র্যাক্টিস করি। এতে প্র্যাক্টিসটাও হবে আবার শর্ট ফিল্ম বানাতে খরচটাও কমবে। ফ্রেন্ড দের সাথে কথা বলে ঠিক হলো যে অ্যাকশন ধাঁচের কিছু বানাবো। দুই ফ্র

েন্ড এবং তাদের একজনের গার্লফ্রেন্ড আর একজনের অফিসের কলিগ নিয়ে কাজ করা হবে বলে ঠিক হলো। পড়ে যুক্ত হলো আরেক ফ্রেন্ড। দুই মিনিটের স্ক্রিপ্টকে একটু ঘুরিয়ে বড় করলাম, আর ঠিক করলাম আমার বাসায় অর্ধেক শুট হবে, আরেক ফ্রেন্ডের মেসে বাকীটা শুট হবে।আমার বাসায় শুট করে রাতের বেলায় আব্বা আম্মার কাছে খাইলাম ঝাড়ি। বাসায় শুটিং হবেনা। এখন আমার বাসায় যেটুকু শুট করছি তার অর্ধেক আবার অন্য সিকোয়েন্সের, অন্য বাসায় বাকীটা করলে লোকেশন মিলবেনা। এদিকে প্রতি সপ্তাহের একদিন শুটিং করতে পারবো। হুর, দিলাম অর্ধেক ক্লিপ্স ফালায়া। বাকিটা রেখে দিলাম ( ফ্ল্যাশব্যাকের সীকোয়েন্সগুলো) …

এদিকে স্ক্রিপ্ট চেঞ্জ হতে লাগলো। পরের শুটিং ডের আগে ঠিক হলো অ্যাক্ট্রেস বেইমানি করবে। আউটডোর একটা সিকোয়েন্স বাদ দিলাম বাবুর অফিসের কলিগের বাজে পারফর্ম্যান্স দেখে। ৩য় শুটিং এর দিন আরেক ফ্রেন্ড কে কল দিয়ে বললাম অমুকের বাসায় আইসা পর। আসার পর বললাম তোরে একটু ক্যামেরার সামনে দাড়াতে হবে। আর আমি ঠিক করলাম নিজেই হবো কীলার যেহেতু আর কাউকে পাইতেছিনা।

এইভাবে ঝামেলার পর ঝামেলা, আর স্ক্রিপ্ট চেঞ্জ, আর লোকেশন চেঞ্জ আর অ্যাক্টর পাওয়ার ঝামেলা নিয়ে এই জিনিস সমাপ্ত করলাম।

এডিট করার সময় গল্প আরেকটু চেঞ্জ হলো 😛 এর মাঝে ডাবিং এ একজনের ভয়েস দিলো আরেকজন। আর জীবনে প্রথম ডাবিং এ ডায়ালগ সিঙ্ক করতে আমার কালো ঘাম ছুটে গেলো। এডিটিং শেষ; এবার রেন্ডারিং।

রেন্ডারিং দিয়ে দেখি বলতেছে 13 hours remaining … কস্কি মমিন! রাতে দিয়া গেলাম ঘুমায়া, সকালে উঠে দেখি ল্যাপটপ্স শো শো করতেছে আর আরো নাকী ৪ ঘণ্টা লাগবে। (এইভাবে মোট ৩বার রেন্ডার দিতে হইছে) … অবশেষে শেষ হইলো এই এক্সপেরিমেন্টাল শর্ট ফিল্ম… বন্ধুদের সাহায্য ছাড়া সম্ভব হতোনা।

 

ফেসবুক লিঙ্কঃ https://www.facebook.com/photo.php?v=10151130007192982&set=vb.672862981&type=2&theater

 

 

UNDER THE CLOUDS OF LOVE (2012)

 

ঘুড়ি তুমি কার আকাশে ওড়ো

তার আকাশ কি আমার চেয়ে বড়ো 

 

তো, আমার বেশ নাম ডাক চারিদিকে (আই মিন বন্ধু বান্ধবের কথা বলছি 😛 ) … ফেসবুকে শর্ট ফিল্মগুলো শেয়ার দেয়ায় অনেকেই বেশ প্রশংসা করছে, একি সাথে সমালোচনাও করছে। ভালই লাগছে আবার খারাপ লাগছে এই ভেবে যে যেসব শর্ট ফিল্ম দেখে ইন্সপায়ার্ড হয়েছি তার ধারে কাছেও যাচ্ছেনা। বুঝলাম একটা টিম ছাড়া সম্ভব না। সব কাজ একাই করা যায় কিন্তু করা উচিত না।

একদিন চায়ের দোকানে বাবু প্রস্তাব করলো ভালোবাসা নিয়ে কিছু করতে। মানে রোমান্টিক কোন শর্ট ফিল্ম আর কি। আমার আবার ড্রামা/রোমান্স নিয়ে একটু অ্যালার্জী আছে। পুরুষ মানুষ সবসময় মারামারি করে অভ্যস্ত, দুই একটা খুন বা পিস্তল টিস্তুল না থাকলে লাইফ জমে নাকি! লাইফে সেরকম না হলে অন্তত ক্যামেরায় তো দেখাতে হবে, নাকী! প্যানপ্যানানি রোমান্স নিজেই দেখিনা, বানাই কিভাবে! কিন্তু বাবুর ঘ্যানঘ্যানানিতে বিরক্ত হয়ে বললাম – ওকে, ভালোবাসা ভালোবাস আহবে কিন্তু একটু ডিফ্রেন্ট ভাবে। আমার আইডিয়াটা বললাম ওকে। ও রাজী হলো। আমি স্ক্রিপ্ট লিখায় মনোনিবেশ করলাম।

এই প্রোজেক্টের বাজেট নেয়া হয়েছিলো বেশ কিছু বন্ধু বান্ধবের কাছ থেকে; ১০০/২০০ টাকা করে 😛 তবে সার্বিকভাবে সাহায্য করেছিলো রানা। ওর বাড়ি ধামরাইতে গিয়ে চমৎকার লোকেশনে শুট না করলে শর্ট ফিল্ম টা দেখে ভালো লাগতো না। এছাড়া, ওর চাচাতো বোন কেও আমরা বোনাস হিসেবে পেয়ে গিয়েছিলাম অভিনয় করার জন্য, নাহলে সেখানে কে আমাদের শর্ত ফিল্মে অভিনয় করতো? যেখানে ডিএসএলআর ক্যামেরা দেখে তারা মনে করে আমরা রাস্তা মাপার করিপের কাজে গিয়েছি :p আমি বলছিনা তারা অশিক্ষিত, ব্যাপার হচ্ছে তারা সবাই বড় বড় ক্যামেরা দেখে অভ্যস্ত।

যাইহোক, শুক্রবারে শুক্রবারে (এবং শনিবারেও)  কাজ করায় মোট ৩ সপ্তাহ শূট কাজ করতে হয়েছে প্রোডাকশনের। মোট ৪ দিন শুট করেছি যার ৩ দিন ধামরাই এবং একদিন ঢাকায়। বেশ কিছু সিকোয়েন্স লোকেশন জনিত সমস্যা থাকায় বাদ দিতে হয়েছিলো যার মাঝে একটা ছিলো দোলনায় দোল খাওয়ার একটা শট। এছাড়া রানার গোষ্ঠিতে রানার চাচাতো বোন অভিনয় করা নিয়ে ঝামেলা লেগে গিয়েছিলো যার ঝড় কিছুটা আমাদের উপর দিয়ে গিয়েছিলো।

কাজ শেষ করে ক্লিপ্স হার্ড্ডিস্কে রেখেছি কি রাখিনি, আরেকটা কাজ শুরু করে দিয়েছিলাম। ভবঘুরে নামের ঐ নাটনের গল্প আরেকদিন। কিন্তু এই ঝামেলায় আমি ইউকে এসে দেখি আমার হার্ড্ডিস্কে আন্ডার দ্যা ক্লাউডস অফ লাভের মোট ৩ দিনের ক্লিপ্স আছে, চতুর্থদিনের নাই। কপালে বাড়ি মারা ছাড়া কিছুই করার ছিলোনা। বন্ধু বান্ধব ফোনে বা ফেসবুকে কিছু না বললেও তাদের গালাগালি আমি ঠিক সারে ৬ হাজার মাইল দূর থেকে টের পাচ্ছিলাম  😛

এই হারানো ক্লিপ্স পেলাম আমার এক মেমোরী কার্ডে। এর জন্য বন্ধু স্নিগ্ধা ধন্যবার পাওয়ার যোগ্য। কারন ওকে কিছু সিনেমা দিবো ভেবে পুরোনো একটা মেমোরি কার্ড যেটা আমি এখন আর ইউজ করিনা, সেটা বের করে দেখি ওটার ভেতর ৪র্থ দিনের ক্লিপ্সগুলো। 😀 তখিনি এডিটিং এর কাজ শুরু করে দিলাম। শুটিং এর প্রায় এক বছর পর মুক্তি পেলো আন্ডার দ্যা ক্লাউডস অফ লাভ।

 

ফেসবুক লিঙ্কঃ https://www.facebook.com/photo.php?v=10151122346907982&set=vb.672862981&type=2&theater

 

এরকমভাবে প্রতিটা কাজের পেছনে গল্প থাকে; ঝামেলার, আনন্দের, কষ্টের, টেনশনের। ডিরেক্টর হওয়ার ম্যালা ঝামেলা 🙁

 

 

*ঘটনাগুলো সংক্ষেপিত 

* লেখা অনেক বড় হওয়ায় কোন ইমেজ দেয়া হলোনা

 

মাহদী হাসান [শামীম]

ফ্রীল্যান্স ফিল্মমেকার

লন্ডন

(Visited 102 time, 1 visit today)

এই পোস্টটিতে ১টি মন্তব্য করা হয়েছে

মন্তব্য করুনঃ

You must be Logged in to post comment.

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন