মুভি রিভিউঃ A Time for Drunken Horses (2000)

সিনেমার গতানুগতিকতা থেকে আধুনিক ইরানী সিনেমা নানা দিক থেকে স্বকীয়। এই স্বকীয়তার পেছনে রয়েছে কাহিনী নির্বাচনে বৈচিত্র‌ময়তা, জীবন ঘণিষ্ঠতা, মানবিকতা আর বাস্তব জীবনের আপাত সাধারণ ঘটনা গুলোর হৃদয়স্পর্শী উপস্থাপন।

প্রয়োজনই মানুষকে উদ্ভাবনে উদ্বুদ্ধ করে। ইরানী সিনেমা কঠোর সেন্সরের বাধা পেরিয়ে দর্শকের মুখ দেখে। সেন্সর নীতিমালার কারণে যৌনতা, খোলামেলা পোষাক, এমনকি প্রপ্তবয়স্ক থিমের কাহিনী নির্বাচন নিষিদ্ধ সহ নানা সীমাবদ্ধতায় ইরানী পরিচালকরা ইচ্ছে থাকা সত্বেও তাদের মুক্ত দৃষ্টিভঙ্গি সিনেমার বর্ণময় ভূবনে প্রতিফলন ঘটাতে পারেন না। তাই এসকল সীমাবদ্ধতায় বিকল্প হিসেবে তাঁদের বেছে নিতে হয়েছে আমাদের চোখে দেখা পরিচিত জীবনটার এড়িয়ে যাওয়া অতি সাধারণ বিষয় গুলোর গভীরতার প্রতিচ্ছবিকে।

২০০০ সাল থেকে মুক্তি পাওয়া প্রায় সব ইরানী সিনেমায় আমরা এই ধারাটি দেখতে পাই। বাহমান ঘোবাদী ও এই ধারারই পরিচালক । তাঁর পরিচালিত উল্লেখযোগ্য সিনেমা সমূহ টর্টেলস্ ক্যান ফ্লাই (২০০৪), মেরুন্‌ড ইন ইরাক (২০০২) এবং নো ওয়ান নোজ অ্যাবাউট পারসিয়ান ক্যাটস্‌ (২০০৯)। একজন কুর্দি হিসেবে তাঁর প্রায় সব ছবিতেই প্রাধান্য পেয়েছে কুর্দিদের জীবন।


এই সিনেমার কাহিনীও তাঁর ব্যতিক্রম নয়। কুর্দি জণগোষ্ঠীর ভৌগোলিক সীমানা ইরান, ইরাক, তুরস্ক এবং সিরিয়া জুড়ে বিস্তৃত জাগ্রস পর্বতমালা অঞ্চল। পারষ্পরিক বিভিন্ন সাংস্কৃতিক এবং সামাজিক আদান-প্রদানে বিভিন্ন দেশের সীমান্ত তাদের জন্য কখনো বাধা হয়ে ওঠে না। ইরানের কুর্দিস্তানের ইরাক সীমান্তবর্তী ছোট গ্রামের এক অনাথ পরিবারের কয়েকটি শিশুর বেঁচে থাকার সংগ্রামই এই সিনেমার মূল উপজীব্য বিষয়। চোরাচালান, মাদক পাচার, অবৈধ পণ্যের পরিবহনে পৃথিবীর সকল দেশের সীমান্ত অঞ্চলে নারী ও শিশুদের অবাধ ব্যবহার সাধারণ ব্যাপার। দেশ, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক অবস্থাভেদে এই ব্যবহার বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন রকম। তবে মূল উদ্দেশ্য সব ক্ষেত্রে একই। সদ্য অনাথ আইয়ুব, রোজিন, কুলসুম, ছোট্ট দু’ভাই এবং একজন প্রতিবন্ধী ভাই মাহ্‌দী সহ ৬ জনের সংসার। খাবার এবং প্রতিবন্ধী ভাই মাহ্‌তির ওষুধ, ইনজেকশন, চিকিৎসা খরচ জোগাতে আইয়ুব এবং কুলসুম স্থানীয় সীমান্ত শহরে গ্লাস, কাপ, বাসন সহ বিভিন্ন ক্রোকারিজ সামগ্রী মোড়কীকরণের কাজ নেয়। ব্যাপক দারিদ্রের কারণে ওই অঞ্চলে মাত্রারিক্ত শিশুশ্রম বিদ্যমান। মাহ্‌দীকে নিয়মিত ইনজেকশন দেয়ার জন্য ডাক্তারের বাড়ীতে নিয়ে যায় আইয়ুব। ডাক্তার এক মাসের মধ্যে মাহ্‌দীকে শহরের হাসপাতালে অপারেশন করাতে বলে। আর অপারেশনের পর সে খুব বেশিদিন বাঁচবে না । তাই যত শীঘ্রই সম্ভব অপারেশন করাতে পরামর্শ দেয়। একদিন ক্রোকারিজ মোড়ানোর সময় এক ব্যক্তি এসে ৬ জন ছেলে চায় সীমান্তে মালামাল বহনের জন্য। আইয়ুব ৬ জনের দলে যোগ দেয়।

অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রম রোধ এবং ইরাক – ইরান উভয় দেশেই কুর্দি বিদ্রোহীদের দমনের জন্য ওই অঞলের প্রায় সব কৃষি জমি, পার্বত্য চোরা পথ সবখানে মাইন পোঁতা। তাই অধিকাংশ মানুষের পেশাই হল ইরাক- ইরান সীমান্তে মানব পাচার এবং অবৈধ পণ্য পরিবহন । অবৈধ পণ্য পাচার এবং পরিবহনে ব্যবহৃত শিশু গুলোকে প্রতিশ্রুত পারিশ্রমিকও দেয়া হয় না প্রায়ই। অনেক সময় বিপক্ষ দেশের সীমান্তরক্ষী, প্রতিযোগী প্রতিপক্ষের আতর্কিত হামলার শিকার হতে হয় তাদের। মাহ্‌দির অপারেশনের সময় এগিয়ে আসে কিন্তু পর্যাপ্ত টাকা যোগাড় হয়ে ওঠে না। এরই মাঝে চাচার পরামর্শে অবস্থার গুরুত্ব উপলব্ধি করে বড় বোন রোজিন বিয়ের প্রস্তাবে রাজী হয় এই শর্তে যে বিয়ের পর তার স্বামী তার ভাই মাহ্‌দীকে ইরাকে তার শ্বশুরালয়ে নিয়ে যাবে এবং ইরাকের কোন হাসপাতালে অপারেশন করাবে। শর্ত মেনে বিয়ে হয় কিন্তু আইয়ুব তা মেনে নিতে পারেনা কারণ বিয়ের পরিকল্পনা হয়েছে তাকে না জানিয়েই। ভাই হিসেবে তার সম্মানে লেগেছে। চাচার সংলাপে তা আরো স্পষ্ট বোঝা যায় ” তুমি এখনো বালক। এগুলো বড়দের বিষয়। ” …..কাহিনী এগিয়ে যায়…।

কয়েকটি দৃশ্য মনে রাখার মত। গ্রামের স্কুল ঘরে একটি বাচ্চা ছেলের বই থেকে এরোপ্লেন আবিষ্কারের কাহিনী পড়ে শোনানো, রোজিনের বিয়ের দৃশ্য। পুরো সিনেমায় শীতকাল দেখানো হয়েছে । শীতের রুক্ষ প্রকৃতি যেন চরিত্র গুলোর বেঁচে থেকে থাকার সংগ্রামেরই প্রতীক। তুষারাবৃত গ্রাম এবং পার্বত্য পথে তুষার মাড়িয়ে সারি সারি মাল বোঝাই ঘোড়ার চলন, জ্বালানী কাঠ সংগ্রহের জন্য জমাট বরফে শক্ত হয়ে যাওয়া কাঠে কুঠারের আঘাত, ব্যস্ত সীমান্ত শহর, চায়ের দোকানে সমোভরের ধোঁয়া ..সবই যেন মানুষগুলোর জীবনকে ভালবাসার, আঁকড়ে থাকার প্রয়াস।
সিনেমাটিতে দু’টি গান ব্যবহার করা হয়েছে। গান দুটিই শ্রুতিমধুর। অবহ সঙ্গীতও ভাল হয়েছে।

(Visited 114 time, 1 visit today)

এই পোস্টটিতে ৩ টি মন্তব্য করা হয়েছে

  1. পথের পাঁচালি পথের পাঁচালি says:

    আপ্নি এতো সুন্দর করে লিখতেন কিন্তু আপনাকে এখন আর ব্লগে দেখা যাচ্ছেনা।

  2. মাইকেল ফ্রান্সিস করলিয়নে says:

    কতদিন পড়ে আপনার পোস্ট দেখলাম… কই ছিলেন ভাই… লেখা বরাবরের মতই চখাম 😛 … মুভিটাও সেই মাপের 🙂 … আরও লেখা চাই… তবে তার আগে আপনাকে চাই নিয়মিত… 🙂 থাকবেন তোঁ??

  3. অনিক চৌধুরী says:

    বেশ মার্জিত সুন্দর করে রিভিউ লেখা। মুভিটা একটু কঠিন হবে কিনা জানিনা তবে ট্রাই করবো। যেভাবে ওয়াচলিস্ট বাড়ছে!

মন্তব্য করুনঃ

You must be Logged in to post comment.

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন