লেমন ট্রি (২০০৮) : রাজনীতি – ধর্ম বিদ্বেষ – দখলদারিত্ব যেখানে একাকার..
Share on Facebook3Share on Google+0Tweet about this on TwitterPin on Pinterest0

হিল্লোল দার এই লেখাটি অনুমতি নিয়ে শেয়ার করলাম। উনি একজন সিনিয়র ব্লগার এবং চলচ্চিত্র সংগঠক। আমরা যারা মুভি লিয়ে লেখার জগতে নতুন , এই লেখাটি থেকে আমরা অনেক কিছু জানতে পারব। একটি মুভি কে রিভিউ করতে গেলে প্রচলিত দৃষ্টিকোণ গুলো ছাড়াও আরো কি কি বিষয় বিবেচনায় আনা যেতে পারে তাও কিছুটা হলেও উপলব্ধি করতে পারব..

লেমন ট্রি (২০০৮) : রাজনীতি – ধর্ম বিদ্বেষ – দখলদারিত্ব যেখানে একাকার..

—-হিল্লোল দত্ত

 

একদল অসহায় দেশত্যাগীদের নিয়ে এক তোতলা পথদ্রষ্টা বেরিয়ে আসে স্বৈরাচারের রাজ্যসীমা থেকে। ভূমি ঊষর, পথ অচেনা, ভবিতব্য অন্ধকার। পৌরাণিক কাহিনি বলে, দুহাত তুলে শূন্যে প্রার্থনা জানানোর পর নামে খাদ্যের বন্যা। আকাশ থেকে বৃষ্টি হয় সুখাদ্যের যা মধুর এবং যা সঞ্চয়-অসম্ভব।

সেই উদ্বাস্তুরাই আজ ইতিহাসের নিয়ত চক্রে চংক্রমণ করতে করতে সেখানেই বানিয়েছে মরু ভেদ করে বসত। আজও সেখানে আকাশ থেকে বন্যা নামে, শুধু তা খাদ্যের নয়, বিধ্বংসী বোমার।

পৃথিবীতে এরকম উদাহরণ বেশ কমই যে ধর্মের জন্যে, শুধু ধর্মপরিচয়ের জন্যে একটা জনগোষ্ঠী সইতে পারে এতোটা নিগৃহণ, এতোটা অপমান, এতো নিষ্করুণ নির্যাতন। বিপরীতক্রমে, সেই দুর্বলতর ও নির্যাতিত কওমই যখন গড়ে তোলে তাদের ভূমিস্বত্ব, এমনকি অন্যদের ভূমি থেকে উৎখাত করে, তখন তারাও নিপীড়কের ভূমিকায় ভালোই নাম যশ অর্জন করে। রক্ত ঝরায়, ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ তাদের শত্রু হলেও সেটাই তারা আঁকড়ে ধরে পরম আদরে, নিজেদের ওপরে হওয়া নির্যাতনের দাগগুলো মুছতে দেয় না, আবার চারপাশে বৈরী বাতাস নিয়েও লড়াই করতে ডরায় না। মাটিতে জমে থাকে নিহতদের শেষ ভারি নিঃশ্বাস, অস্ত্রাঘাতের রক্তমাংস, বাতাসে বুনো প্রতিহিংসা আর প্রতিশোধের উভয়পক্ষীয় মানবিক চেতনারাশি এবং শেষমেষ এভাবে পুষ্টি পেতে থাকে শুধু হিংসা আর হানাহানির স্বর্গরাজ্য।

এরান রিকলিস-এর লেমন ট্রি (২০০৮) এসবের কথা কিছুই বলে না। যদিও এই ছবিতে আছে লড়াই, আছে আক্ষরিক অর্থে দুপক্ষ-একটি দুর্বল ফিলিস্তিনি নিঃসহায় নারী, এবং তাঁর প্রতিবেশী ইজরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী, আছে অগণিত ইঙ্গিতময়তা, আছে কিছু বোমানিক্ষেপের শাব্দিক বিবরণ, আর আছে গলিয়াথের বিরুদ্ধে ডেভিডের অসম সংগ্রাম, তফাৎ এইমাত্র যে ডেভিড ইহুদি নয়।

ছবি শুরু হয় তীব্র উজ্জ্বলতর স্বর্ণাভ সকালে লেবুবাগানের ভেতরকার সমাহিত, মৌন হৃদয়গ্রাহী ক্যামেরাভ্রমণের সাথে একখানা গানের মেলবন্ধনের মাধ্যমে। সুবর্ণরেখাময়, পরিপুষ্ট ফলভারে নত শাখাগুলোর সাথে সবুজ পাতার আবছায়া যে-মায়াময়তা সৃষ্টি করে, হয়তো তা-ই অন্বিষ্ট ছিলো পরিচালকের। গানটি বিখ্যাত বলেই জানলাম পরে। ‘লেমন ট্রি’ নামে পরিচিত এই লোকগীতির মূল গায়ক উইল হোল্ট, সময়কাল গত শতকের ষাটের দশক। গানটা জনপ্রিয় করেন পিটার পল এন্ড মেরি। এটা আরও গেয়েছেন দ্য কিংস্টন ট্রায়ো, দ্য সিকার্স, বব মার্লে এবং দ্য ওয়েইলার্স, স্যান্ডি শ’, ট্রিনি লোপেজ, রজার হুইটেকার প্রমুখ। এবং সেই সিকোয়েন্সেই দেখানো হয় ছবির মূল চরিত্র সালমা জিদান নামের পশ্চিমতীরনিবাসী এক বিধবা ও একাকী রমণী, যিনি সেই লেবুবাগানের অধিকারী, তৈরি করছেন লেবুর সুমধুর শরবত এবং তাঁর ঘুমের ভেতর সেই লেবুবাগানের ছায়ায় তাঁর শৈশব-কৈশোর ঘুরে আসে। লেবুর পানীয় তৈরির এই দৃশ্য একাধিকবার ঘুরে ঘুরে আসবে পরে, ঠিক লেইত-মোতিফ বলা না-গেলেও ইঙ্গিতবাহী বটে।

কাহিনিসূত্র সরল, একরৈখিকই বলা যায় প্রথম দৃষ্টিতে, অথচ বহুস্তরী, বিভিন্নমাত্রিক।

পশ্চিমতীরবর্তী এক শহরের সীমান্তবর্তী এলাকা। ফিলিস্তিনি আর বনি ইসরায়েলের আদমেরা বসবাস করে পাশাপাশিই, লক্ষ্মণরেখার এপারে ওপারে। বিধবা সালমা জিদানের সন্তানেরা কেউ থাকে না এখানে। জীবিকা নিশ্চিত করতে ছেলে গেছে আমেরিকায়, সঙ্গী তার শুধু বাবার আমল থেকে এই লেবুবাগানের রক্ষণাবেক্ষণকারী এক প্রৌঢ় তারিক কপটি (আবু হুসাম), যে তার সাথে ভাগাভাগি করে নেয় লেবুকুঞ্জের সাথে তার গহিনতর ভালোবাসা। সেটা তার উপার্জনের মূল ক্ষেত্রও বটে, উভয়ার্থেই। গত অর্ধশতক ধরে এই টিকে-থাকা এই ফলদায়ী বাগান তার ‘দুই বিঘে জমি’-র উত্তরাধিকারও বৈকি।

আচমকা সেই লেবুকুঞ্জের পাশেই বসতি গাড়েন ইসরায়েলের প্রবল ক্ষমতার প্রতিভূ প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল নাভন (ডরোন টাভোরি)। চরিত্র ও নাম দুটিই একাধিক মাত্রাময়। ইসরায়েল নাভন মানে ‘ইসরায়েল বিজ্ঞ’, কেউ হয়তো এর ভেতর কিছুটা তির্যকতা আবিষ্কার করতে পারেন। আর চরিত্রটি ছবিতে ইসরায়েলের ক্ষমতার প্রতীকই নিঃসন্দেহে। প্রতিবেশী ফিলিস্তিনি রমণীটির লেবুবাগান মন্ত্রীমহোদয়ের নিরাপত্তার জন্যে হুমকি বলে মনে করে কালোচশমাপরা, নিরাবেগ নিরাপত্তাপ্রহরীরা। দ্রুত স্থাপিত হয় এর সীমানা ঘিরে কাঁটাতারের বেড়া, দাঁড় করানো হয় প্রহরামিনার। পুরো বাগানটাই কেটে-ফেলার আদেশ জোগাড় করে তারা, স্রেফ ‘নিরাপত্তার খাতিরে’। সালমার কাছে এই মর্মে একটা পত্রও হস্তান্তরিত হয়। সালমার কাছে হিব্রু ভাষাটি হিব্রুই বটে, সে না পারে তা পড়তে বা শুনে বুঝতে। হতাশ, বিভ্রান্ত, বিচলিত সালমা ছুটে যায় স্থানীয় বয়স্কদের কাছে, যারা তার সমাজের মাথাও বটে। সেই অফিসিয়াল, ঠান্ডা সুরের চিঠিটা জানায় তার লেবুবাগান সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কা বাড়াতে পারে বলে সেটা কেটে ফেলা হবে। ক্ষতিপূরণের আশ্বাসও থাকে তাতে, তবে এটা মনে করিয়ে দিয়ে যে বর্তমান আইনে ক্ষতিপূরণ প্রদান বাধ্যতামূলক নয়। জ্ঞানবৃদ্ধ সেসব বাস্তববাদীরা ঘাড় নেড়ে তাকে মেনে নেয়ারই পরামর্শ দেয়। ইসরায়েলের সাথে রীতিমত অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে লড়াইতেই যেখানে হার মানছে তাদের যোদ্ধারা, সেখানে সামান্য কিছু লেবুগাছ নিয়ে টানাহেঁচড়া? হাস্যকর বললেও কমই বলা হয়।

সত্যি বটে সালমার কাছে সেসব স্রেফ গাছ নয়, সেই স্থান শুধু কুঞ্জবন নয়, সেই ফলরাজি কেবল উপার্জনের উপকরণ নয়, কিন্তু তাতে কার কী আসে? লেবুফুলের ঘ্রাণে তার কৈশোর-যৌবন মেদুর হয়ে উঠেছে কিনা, লেবু বা এর রসময় পানীয় তার জীবিকার বা আতিথেয়তার পথ সুগম করেছে কিনা, তার জীবনের একটা অংশই হয়ে উঠেছে কিনা তারা তাদের মূক-নীরব অস্তিত্ব নিয়ে, তাতে কর্ণ বা দৃষ্টিপাত করে কেই বা? দেয়াল থেকে তার স্বামীর ভ্রূকুটিময় ছবি চোখে পড়ে, বোঝাই যায় তার দাম্পত্যজীবন নিতান্ত রোম্যান্সমধুর ছিলো না। তিন সাগরের পারে দোকানে কর্মরত ছেলে বোঝেই না মায়ের অর্থহীন আকুলতা কিছু লেবুগাছের জন্যে যার ওপর সদয় দৃষ্টি পড়েছে ইসরায়েলের ওপরমহলের। মেয়েরও হয়েছে বিয়ে, থাকে সে স্বামীর সাথে আলাদা। কাজেই অবলম্বন, আশ্রয়, জীবিকার সূত্র বা যাকিছু আর, সব কিছুরই মূল প্রোথিত ওই বাগানেই।

কিন্তু, সেই গৃহবাসী, সাদামাটা ফিলিস্তিনি নারী হার মানবেই না যেন। কী যে বিরক্তিকর তার এই ব্যর্থ প্রচেষ্টা! ছোটে সে এক আইনজীবী জিয়াদ দাউদের (আলি সুলিমান) কাছে, এই ‘অন্যায় উৎখাতের আদেশ’-এর বিপক্ষে দাঁড়াবেই সে। তার সীমিত সামর্থ্য দিয়ে সে চিলচিৎকার করে যেন বলবেই, এটা ঠিক নয়। যেখানে নিয়ত বোমা আর পদাতিক বাহিনীর দাঁতেনখে হামলায় মানুষের প্রাণই চলে যায় অগণিত, সেখানে এই নির্বোধ রমণী কী রক্ষা করার চেষ্টা করে যায়?

কিছু লেবুগাছ।

কার বিরুদ্ধে লড়াই করে?

ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর নিরাপত্তার।

তার এই উদ্যম নজর কাড়ে প্রতিরক্ষামন্ত্রীর স্ত্রী মিরা নাভনের (রোনা লিপাজ-মাইকেল), যে অনুভব করে তার মাতৃতন্ত্রীতে সমান্তরাল অনুরণনের, কারণ তার একমাত্র কন্যাসন্তানটিও দত্তক। প্রথম দেখাতেই সে মুগ্ধ মন্তব্য করে লেবুবাগানটা নিয়ে, “দারুণ না ওটা?” চোখ পড়ে এমনকি ইসরায়েলি গণমাধ্যমের, যারা সরাসরি প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয় প্রতিরক্ষামন্ত্রীর মুখের ওপর, ব্যাকগ্রাউন্ডে খবরের বাক্যাংশ শোনা যায়, নিরাপত্তাঝুঁকিতে উৎখাত করা হয়েছে হাজারো জলপাই গাছ…। মনে ঝলকে ওঠে আশির দশকে রোদচশমাপরিহিত আমার দেশেরই এক মিলিটারি মেসাইয়ার কথা যিনি বর্ষপ্রাচীন বৃক্ষ কর্তন করেছিলেন ঠিক একই অজুহাতে, নিরাপত্তা। প্রতিরক্ষামন্ত্রী কৌশলে এড়িয়ে যান এই প্রশ্ন সেই নিরাপত্তার মরিচাধরা ঢালের আড়ালে। যদিও ‘অফ দ্য রেকর্ড’ মেনে নেন কাজটা ঠিক হচ্ছে না। কিন্তু, নিরাপত্তা…? নিরাপত্তার কথা বেশি করে মনে পড়িয়ে দিতেই যেন প্রতিরক্ষামন্ত্রীর সেই বাড়িতে হাউজ ওয়ার্মিং পার্টির রাতে হিজবুল্লাহ গেরিলাদের বোমা, গুলির শব্দ শোনা যায়। অতিথিরা মাথা নিচু করে ছোটে জীবন বাঁচাতে। কাজেই, গণমাধ্যমও কিছুটা নীরব এবার। এবং চাপ বাড়ে হতভাগ্য, শুকিয়ে আসতে-থাকা গাছগুলোর ওপর। জল-দেওয়া হচ্ছে না সেগুলোয়। এই নিরাপত্তাচাপটা ঝুলিয়ে পৃথিবীতে অনেক অধিকারই হরণ করা হয়, হয়েছে, হচ্ছে, এমনকি গণতন্ত্রের, মানবাধিকারের কীর্তনিয়া মহামস্তান দেশেও। কাজেই সবাই চুপচাপ, চিরতরে নয় অবশ্য।

সালমা ছোটে তার আইনজীবীর সাথে, ফিলিস্তিনি সরকারের আমলাতান্ত্রিক শীতলতর ফাইলের জটে তার আশ্বাস ধুলোয় চাপা পড়ে, ইসরাইলি আদালতের সেনানিয়ন্ত্রিত উত্তপ্ত কক্ষে তার ক্ষতিপূরণের প্রস্তাব সে হেলায় উপেক্ষা করে। সে শুধু চায় তার লেবুগাছগুলো বাঁচাতে, অন্ধ মাতৃত্বপরায়ণতা তাকে একরোখা, একগুঁয়ে আর দৃঢ়ত্বকমণ্ডিত করে তুলেছে।

তার এই নীরব লড়াইয়ে অজান্তেই একাত্ম হয়ে পড়ে শ্রীমতি প্রতিরক্ষামন্ত্রী মিরা নাভন। এমনকি এক পর্যায়ে সে কাঁটাতারের বেড়া পেরিয়ে চলে আসে সালমার সাথে মুখোমুখি দেখা করবে বলে, যথাসময়ে বাধক আসে নিরাপত্তারক্ষীর রূপে। সালমা কিছুটা অনুভবের ছোঁয়া পায় শুধু। এদিকে আইনজীবীর কাছ থেকেও সে পায় অনুরাগের স্পর্শ। তার হয়তো মনে পড়ে, সেও মানুষ মাত্র। এবার বাধা আসে তার সমাজের আরেক মাথার কাছ থেকে যে এমনকি তার মৃত স্বামীর ও পরিবারের ‘সম্মান’ রক্ষার্থে মৃত্যুর হুমকি দিতেও পিছপা হয় না।

পৌরুষের ছড়াছড়ি তার বিপরীতে।

কিন্তু সে হার মানে না। মানবে না। ইসরায়েলের সুপ্রিম কোর্টে সে মামলা নিয়ে যায় ক্ষতিপূরণের হাতছানি পাশ কাটিয়েই। পারবে কি সে? আইনজীবীর সাথে কি তার সম্পর্ক রূপ নেবে কোন বাস্তবতায় সমাজের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে?

শেষটা সাদামাটা, বাস্তবসম্মত অথচ সালমার দৃঢ়তায় ঋজু।

আশ্চর্যজনকভাবে, কাহিনির প্রেক্ষাপট পুরোপুরি অবাস্তব নয়। এক প্রাক্তন ইসরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী শাওল মোফাজ একইভাবে সীমান্তবর্তী পৈত্রিক বাড়িতে বসবাসের জন্যে আশেপাশের ফিলিস্তিনিদের জলপাই গাছগুলো সেই একই নিরাপত্তাক্ষুণ্ন হওয়ার অজুহাতে কেটে-ফেলার আদেশ যোগাড় করেন। ফিলিস্তিনি পরিবারগুলো ব্যাপারটা টেনে নিয়ে যায় ইসরায়েলের সুপ্রিম কোর্ট অবধি। রিকলিস সেই ঘটনাকেই আরো কিছুটা সংহত ও নাটকীয় স্তরে রূপান্তরিত করেছেন মাত্র।

রাজনৈতিক ছবি?

হ্যাঁ এবং না।

পরিচালক রিকলিস এটা রাজনৈতিক ছবি বলতে চান নি। তাঁর ভাষায় এটা আদ্যোপান্ত মানুষের ছবি, মানবিকতার ছবি, সম্পর্কের ছবি। তবে কবি আবুল হাসানের ভাষায় যদি বলি, “দালান উঠছে সেও রাজনীতি, দালান ভাঙছে সেও রাজনীতি..”, তাহলে এটা অতিঅবশ্যই রাজনৈতিক ছবি বটে। রিকলিসও তাই এই সর্বব্যাপী রাজনীতির ভেতরকার সব সম্পর্ক স্পষ্ট করেই এটাকে আলাদা করে রাজনৈতিক ছবি নাম দিতে চান নি।

নারীবাদী ছবি?

হ্যাঁ এবং না।

বস্তুত, প্রতীকায়ন এই ছবির আত্মা ও মাংস। প্রতিরক্ষামন্ত্রী নাভন ও যে-জায়নবাদী আদর্শ সে ধারণ করে, সবই দৃঢ়, একমুখিন, তুলনামূলকভাবে অসংবেদনশীল, বিচ্ছিন্নতাপরায়ণ ও কট্টর দৃষ্টিভঙ্গিময়। পক্ষান্তরে সালমার বৃক্ষরক্ষার ব্যাকুল বিবক্ষা, ভালোবাসা পাওয়ার ও দেওয়ার আন্তরিক আকাঙ্ক্ষা, পরাজিত হয়েও নত না-হওয়ার সংনম্যতা, সবই যেন নারিত্বের ধ্রুপদী উদাহরণ, যা উজ্জীবিত করে প্রতিরক্ষামন্ত্রীর পত্নীকেও, এতোটাই যে সে শেষমেষ গণমাধ্যমে সাক্ষাতই দিয়ে বসে যা তার স্বামীর রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের জন্যে হুমকিই হয়ে দাঁড়ায়। এক পর্যায়ে সে সীমানার ওপার থেকে চিৎকার করে সালমার কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করে, নিষ্ফল জেনেও। তার মন্ত্রীস্বামীর মৃদু বহুগামিতার আভাস ও পারস্পরিক বনিবনার বিরুদ্ধে তার যৎসামান্য প্রতিবাদও রণিত হয় ছবির শেষ দিকে। এত কিছুর পরও পরিচালক নিজে এটা সুতীব্রভাবে নারীবাদী ছবি বলতে চান নি। কিন্তু দেখি সালমার নির্যাতন দ্বিগুণিত, ফিলিস্তিনি হয়ে এবং নারী হয়ে। এদিকে মিরা যদিও ক্ষমতাধর ইসরায়েলের পক্ষপুটে, কিন্তু সেও বন্দী নিরাপত্তার কারাগারে আর অন্তত একভাবে নিপীড়িত। আবারও বলি, রিকলিস এটা কট্টর নারীবাদী ছবি হিসেবে দেখাতে না-চাইলেও ছবির পুরুষ চরিত্রগুলোর চরিত্রছাপে স্বার্থপরতা, লোভ, অসংবেদনশীলতা, সুবিধেবাদ, গোঁড়ামি চোখ এড়ায় নি কারোরই।

এমনকি প্রতীকায়িত এখানে লেবুগাছগুলোও। তারা মাটির সন্তান, সেখানে দৃঢ়মূলপ্রোথিত তাদের অস্তিত্ব, নিরাপত্তার জন্যে হুমকি বলে আখ্যায়িত, যত্নের অভাবে পরিশুষ্ক আর তাদের ফলগুলো শেষে মাটিতেই গড়াগড়ি খায়। মিল পাওয়া যায়?

আশ্চর্য হলো যে-ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ তাদের রাষ্ট্রগঠনের মূলভিত্তি, সেই ধর্মের দেশনাই তারা অগ্রাহ্য করে। ডিউটেরনমির ২০:১৯-এ বলা হচ্ছে, “এমনকি দীর্ঘদিন যুদ্ধার্থে কোন নগর অবরোধ করিলেও উহার বৃক্ষরাজি কর্তন করিবে না”, উপমিত হয়েছে মানুষ বৃক্ষের সাথে। “কারণ, মনুষ্য ক্ষেত্রের বৃক্ষ বটে।” বৃথাই উপদেশব্যয়। যদিও ছবির একটি গানে বাক্যটা উঠে আসে, বোঝাই যায় রিকলিস অনীহ ইসরায়েলি চেতনায় কিছু মানবিক সুর যোগ করার পক্ষপাতী।

প্রসঙ্গত, রিকলিস ইসরায়েলিই জন্মসূত্রে। তিনি মন্ট্রিয়ল ও নিউ ইয়র্কে কাটিয়েছেন জন্মের পর বেশ কিছু বছর পিতার কর্মসূত্রে। ছ’বছর বয়েসে ফিরেছেন ইসরায়েলে। ১৯৭৫-এ প্রথম ইসরায়েলি হিসেবে ইংল্যান্ডের ন্যাশনাল ফিল্ম এন্ড টেলিভিশন স্কুলে যোগ দিয়েছেন। তাঁর আগের ছবি ‘দ্য সিরিয়ান ব্রাইড’-এও ছিলেন এছবির মুখ্য চরিত্র হিসাম, সেটা ইসরায়েলেও বেশ প্রশংসা কুড়ায় কিন্তু এটা ততোটা নয়। এই ছবিটি বার্লিন ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে পায় প্যানোরোমা অডিয়েন্স এওয়ার্ড, ইসরায়েল ফিল্ম একাডেমির তরফে হিয়াম আব্বাস পান সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার। এক ইহুদি সমালোচক তো রীতিমত এর দিকে আঙুল তুলেছেন এটা “নির্লজ্জরকমের প্রো-ফিলিস্তিনি” বলে।

ছবির গঠন আশ্চর্যরকমভাবে সংহত ও সূক্ষ্ম ব্যঞ্জনাবাহী, অভিনয় যথার্থ ও অনুচ্চ, ক্যামেরার চলন গতিময় ও কিছু ক্ষেত্র ছাড়া আবেগবর্জিত। অভিনয়ে হিয়াম আব্বাস অতুলনীয়, ডারন টাভোরি দৃষ্টিসুখকর রকমের মাপসই, আইনজীবীর ভূমিকায় আলি সুলিমান খাপ খেয়েছেন সাবলীলভাবেই। অন্যেরাও নিজের জায়গায় সুন্দরতর সঙ্গত করেছেন। এমন সব জায়গায় তিনি শুটিং করেছেন যেখানটায় অন্য সব পরিচালকেরা যাওয়ার কথা ভাববেনই না, উদাহরণস্বরূপ: জেরুজালেমের সুপ্রিম কোর্ট।

মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ততম সংঘাতময় পরিস্থিতির কোন স্থির সমাধানের দিকে নির্দেশ করে না ছবিটা। শুধু রাজনৈতিকতার সংঘর্ষের অসহায় শিকারের দিকে মানবিক দৃষ্টি ফেরানোর সূক্ষ্ম প্রচেষ্টা করে। পরিচালককে যখন প্রশ্ন করা হয়, ছবিটা কি দুনিয়া পাল্টে দেবে? তিনি সহাস্যে আশাবাদী সুরে জানান, “নির্ঘাৎ, টের পাচ্ছেন না? তবে ছবির গানটা যেমন বলে, লেবুগাছ বড় সুন্দর আর ফুলগুলো মধুর, কিন্তু বাজে গাছের লেবু খাওয়া অসম্ভবপর…আমিও ভাবি লোকের দৃষ্টিভঙ্গিটা একটু অন্য দিকে যাচ্ছে, হয়তো কিছু বদ্ধমূল ধারণা ভাঙছে আর কিছু খোরাক জুটছে চিন্তার, এই ভেবেই আমার সন্তুষ্ট থাকা উচিত।”

ছবির শেষ দৃশ্যে যা দেখা যায়, প্রতিরক্ষামন্ত্রীর বাহ্যত ও দৃশ্যত জয়ের পরও নিঃসঙ্গতা আমাদের মনে করিয়ে দিতে পারে,
“হায়রে মানুষ, বাতুলতা তব আকাশ চুমি,
প্রাচীর যত না গড়েছো, সেতু তো গড়ো নি তুমি।”

ছবিটা দেখানোর জন্যে ধন্যবাদ প্রাপ্য চট্টগ্রাম চলচ্চিত্র কেন্দ্রের এবং Gias Ahmed-এরও।

মন্তব্য করুনঃ

You must be Logged in to post comment.

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন