জিগা ভার্তব এবং তাঁর The Man with a Movie Camera (1929): সিনেমাটিক ল্যাঙ্গুয়েজ এবং সিনেমাটিক গ্রামারের জনক।

আমরা বেশিরভাগই মুভি স্কুলের ছাত্র নই। এ কারণে সিনেমার সংজ্ঞা আমাদের একেক জনের কাছে একেক রকম। এই বহুমাত্রিকতার কারণেই সিনেমার নান্দনিক নানান দিক সম্পর্কে নানা জনের নানান মত পাই। এর পরও যারা সিনেমা নিয়ে ব্যক্তিগত ভাবে পড়াশুনা করেন এবং ফিল্ম রিডিং করেন তারা সিনেমার ব্যাকরণগত এবং শৈল্পিক গুণ সম্পর্কে কিছুটা হলেও অবগত থাকেন। আমরা আজ সিনেমার যে রূপটি দেখছি অর্থাৎ আধুনিক সিনেমায় সিনেমার যে ব্যাকরণ অনুসরণ করা হচ্ছে তা প্রতিষ্ঠা করে গেছেন সিনেমার নির্বাক যুগের শেষ এবং সবাক যুগের শুরুর দিকে সিনেমাকে জীবন হিসেবে ভাবা কয়েকজন প্রাণ পুরুষ। এদের মধ্যে অন্যতম হলেন সার্গেই আইজেনস্টেন (১৮৯৮-১৯৪৮) এবং জিগা ভার্তব (১৮৯৬-১৯৫৪)। সিনেমা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার এক পর্যায়ে অজান্তে এসব ব্যাকরণ তৈরি হয়ে যায় । পরবর্তীতে নির্মাতারা তাঁদের দেখানো পথেই এগুতে থাকেন।
ভাষা আগে; ব্যাকরণ পরে। ঠিক তেমনি সিনেমা আগে; এর পর সিনেমার ব্যাকরণ তৈরি হয়।
আজ আমরা সিনেমায় স্পেশাল ইফেক্ট, স্লো মোশন, ওভার থ্যাম্বলিং সহ প্রযুক্তির অগ্রগতিতে এমন সব কারিগরি কারিশমা দেখি যার কারণে কল্পনার জগতটাকে পুরোটাই পর্দায় উপস্থান সম্ভব। ভাবতে অবাক লাগে এসব কিছুই আমাদের দেখিয়ে দিয়েছেন ১৯২৯ সালে একজন পরিচালক জিগা ভার্তব তাঁর ” Man With A Movie Camera (1929) ” সিনেমাটিতে। ওই সিনেমাটি থেকেই মূলত অধুনিক সিনেমার এডিটিং, স্পেশাল ইফেক্ট, ক্যামেরার বিভিন্ন অ্যাঙ্গেলের শট , কোন শট কেন কোথায় প্রযোজ্য, কোথায় স্লো মোশন দিতে হবে, কোথায় স্পিড দিতে হবে, মন্তাজের ধারণা ইত্যকার বিষয়ের সূত্রাপাত। এর পর থেকেই তাঁর দেখানো পথে সিনেমা চলতে শুরু করে এবং আজো চলছে। এ কারণে তাকে সিনেমার ভাষা এবং ব্যাকরণের জনক বলা হলেও খুব বেশি বাড়িয়ে বলা হবে না।

শুরুর দিকে সিনেমা ব্যাপারটা এতটা ডাল পালা বিস্তৃত ছিল না। হাতে বহন যোগ্য মুভি ক্যামেরা আবিষ্কারের পরই সিনেমা যেন অদৃশ্য কোন খাঁচা থেকে মুক্তি পেল। বিশ দশকের শুরুতে হাতে বহনযোগ্য এসব ক্যামেরা সংবাদ সংগ্রহের জন্য ব্যবহৃত হত। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে সাংবাদিকরা ব্যাপক হারে এ মুভি ক্যামেরা ব্যবহার করতে থাকে। যুদ্ধের চলমান চিত্র ধারণ সহজ ব্যাপার নয়। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এসব চিত্র ধারণ করতে হত। ঝুঁকি কমিয়ে কিভাবে গুরুত্ব পূর্ণ ঘটনা গুলো ধারণ করা যায় এ চিন্তা থেকেই উদ্ভাবন হয় ক্যামেরা সেটিংস এর নানান ধারণা। কিভাবে নির্বাচিত জায়গায় সশরীরে উপস্থিত না থেকেও ক্যামেরা বসিয়ে নিরাপদে দৃশ্য ধারণ সম্ভব, কোন অ্যাঙ্গেল থেকে ভাল ভিউ আসবে, এসব কিছুই যুদ্ধে দায়িত্বপালনরত সাংবাদিকরা অজান্তেই তৈরি করে নেন।


এখন সিনেমায় চলন্ত ট্রেনের দৃশ্য দেখাতে যে ধরণের শট নেয়া হয় তা তিনিই প্রথম দেখিয়েছেন। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় অধিকাংশ সিনেমায় চলন্ত ট্রেনের দৃশ্যে দেখানো হয় রেল লাইনের উপর দিয়ে তীব্র বেগে ট্রেন যাচ্ছে আর দর্শকরা ট্রেনের বগির অন্ধকার তলা পর্যন্ত দেখছে এবং তলার দু’পাশের ফাঁক দিয়ে তীব্র বেগে ছুটে আসা ট্রেনের চাকা এবং পেছনে ছুটে যাওয়া দৃশ্য দেখছে। কেউ কি ভেবেছেন কিভাবে এটি সম্ভব? আপনি যদি এটি ধারণ করতে চান তাহলে আপনাকে রেল লাইনে শুয়ে ক্যামেরাটা উপর দিকে ধরে ট্রেন আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। ট্রেন আসলে ট্রেন আপনাকে এবং ক্যামেরাকে একসাথে স্বর্গে পাঠিয়ে দিবে। কিন্তু বিকল্প কি? এই সহজ বিকল্পটি ১৯২৯ সালে জিগা ভর্তব আমাদের শিখিয়েছেন ট্রেন লাইনের মাঝখানে গর্ত করে ক্যামেরা চালু করে গর্তে বসিয়ে রাখলে ট্রেন আসলে ক্যামেরা নিজ থেকেই শট নিতে থাকবে এবং ট্রেন চলে যাওয়ার পর ক্যামেরাও অক্ষত থেকে যাবে। এখন অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে এটাতো খুবই সহজ একটি পদ্ধতি। যে কেউ বুদ্ধি খাটালেই এধরণের আইডিয়া মাথায় আসবে..। কিন্তু আপনি যদি ১৯২৫-১৯২৯ সালের দিকের কথা চিন্তা করেন তাহলে দেখবেন ..ওই সময় ট্রেনের বগির তলা থেকে দৃশ্য নেয়ার চিন্তা এবং প্রয়োজনীয়তা কোনটাই ছিল না। জিগা ভার্তবই প্রথম ভেবেছেন ট্রেনের তলা থেকে শট নিলে সেটি কেমন আবেদন সৃষ্টি করবে সিনেমার পর্দায়। এভাবনা থেকেই তিনি এধরণের প্রয়াস নেন।

জিগা ভার্তভ প্রথম বিশ্বযুদ্ধে দায়িত্ব পালনকারী এধরণের একজন সাংবাদিক। যুদ্ধ শেষে তিনি মুভি ক্যামেরা নিয়ে তাঁর এই নতুন লব্ধ ধারণা সিনেমায় প্রয়োগ ঘটাতে নানান পরীক্ষা নিরীক্ষা চালান। এধরণেরই একটি প্রয়াস তাঁর Man With A Movie camera (1929) সিনেমাটি। বিশ দশকের রাশিয়ার নগর জীবন থেকে স্নিগ্ধ পল্লী, রাস্তার ভবঘুরে থেকে উচ্চবিত্ত সমাজ, সংস্কৃতি, ক্রীড়া, সাগরে জনকেলি, মেশিনের যান্ত্রিক গতির সাথে কর্মমূখর শ্রমিক এক কথায় পুরু রাশিয়াকে দেখিয়েছেন প্রচণ্ড বেগে ঘূর্ণায়মান টর্নেডোর মত ক্যামেরার যান্ত্রিক চোখ দিয়ে।
এখনকার আধুনিক সিনেমায় পরাবাস্তবতার অনেক ব্যাপার দেখানো হয়। যার অন্যতম উদাহরণ Inception (2010), Source Code (2011), The Tree of Life (2011). এগুলো সব পরাবাস্তবতার সাম্প্রতিক সিনেমাটিক রূপ। এধরণের পরাবাস্তবতার সূচনাও তিনি করেছেন তাঁর Man With A Movie Camera ( 1929) এ।
সিনেমায় স্পেশাল ইফেক্টের প্রথম সফল প্রয়োগ Metropolis (1927) এ। এর ২ বছর পরই মুক্তি পায় Man With A Movie Camera ( 1929) । বড় বড় স্টুডিও গুলো সেটের মাধ্যমে অপেরা এবং থিয়েটারের দৃশ্যসজ্জার ধারণাকে আধুনিকায়ন করে ক্যামেরার মাধ্যমে স্পেশাল ইফেক্ট দেখানোর চেষ্টা করত। যার ভাল উদাহরণ Hugo (2011) । এই সিনেমায় দেখানো হয়েছে কিভাবে সেটের ব্যবহারের মাধ্যমে বিশের দশকে কল্পকাহিনী ভিত্তিক সিনেমা গুলো তৈরি হত। কিন্তু সেটের ব্যবহার না করে শুধুই ক্যামেরার ক্যারিশমায় এবং এডিটিং এর মাধ্যমেই এটা সম্ভব তা জিগা ভার্তব ১৯২৯ সালেই দেখিয়েছেন।


বিশের দশকে জিগা ভার্তব ছিলেন ওই সময়কার প্রমাণ্যচিত্র নির্মাতাদের অগ্রদূত। তিনিই সর্ব প্রথম চলচ্চিত্র নির্মাতাদের ভিন্নধর্মী চলচ্চিত্র আন্দোলন kinoks, এর প্রতিষ্ঠাতা (kino-eyes) । এই কিনো আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য ছিল সমমনস্ক নির্মাতাদের নিয়ে নন ডকুমেন্টারী – নন ফিচার ধারার চলচ্চিত্র নির্মাণের ধারণা সর্বত্র ছড়িয়ে দেয়া। Man With A Movie Camera (1929) মুক্তি পাওয়ার পরই তার এই বৈপ্লবিক ধারণাটি অনেকটা রাতারাতি নির্মাতাদের সিনেমা সম্পর্কে প্রচলিত ধারনাকে পরিবর্তন করে নতুন করে চিন্তা করতে বাধ্য করে।
বলতে গেলে তিনিই সর্ব প্রথম সিনেমাকে স্টুডিওর বাইরে নিয়ে আসেন। তাঁর এই সিনেমার মাধমেই তিনি দেখিয়েছেন ক্যামেরার সঠিক প্রয়োগে দৃশ্যগুলোও চরিত্রের মতন কথা বলবে। সিনেমায় বাস্তব দৃশ্য প্রয়োগের ধারাও তিনি চালু করেন। একারণে তাঁর Man With A Movie Camera (1929) সিনেমাটিতে একটিও সাজানো দৃশ্য নেই। সব গুলোই বাস্তব জীবন থেকে ক্যামেরায় তুলে এনে জোড়া লাগিয়েছেন। যদিও এ ব্যাপারটি নিয়ে অনেকের মধ্যে মত পার্থক্য আছে। এর পরও যারা সিনেমাটি দেখেছেন তারা পরিচালকের এই স্বীকারোক্তির সাথে একাত্ম হবেন।


তাঁর Man With A Movie Camera (1929) মুক্তির পরই নবীন শিল্প মাধ্যম হিসেবে সিনেমার বেশ কিছু ভাষা, ব্যাকরণ এবং রীতি নির্দিষ্ট হয়ে যায়। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল স্টুডিওর বাইরে চলচ্চিত্রায়নের প্রসার, সেট থেকে বেরিয়ে আসার প্রচেষ্টা, ক্যামেরায় সঠিক পদ্ধতিতে শট নির্বাচন, মন্তাজ, দৃশ্যানুযায়ী ফ্রেমের গতি নিয়ন্ত্রণ, সিনেমা সম্পাদনা, ক্যামেরার চোখের সাথে মানুষের চোখের ধারণ ক্ষমতার পার্থক্য, স্টিল ফটোগ্রাফীর সাথে চলমান ছবির পার্থক্য সহ আরো অনেক কিছু।
পৃথিবীর সেরা দশটি চলচ্চিত্রের মধ্যে একটি হল Man With A Movie Camera (1929)। এটি কোন ফিচার ফিল্ম নয়। তাই প্রচলিত অর্থে সিনেমাটিক এনটারটেইনমেন্ট এখানে তেমন নেই। সবার পক্ষে এই সিনেমা হজম করাও কষ্টসাধ্য। নির্বাচিত মেম্বার এবং কয়েকজন আমন্ত্রিত অতিথির উপস্থিতিতে আমাদের কেন্দ্রের একটি কোর্সের অংশ হিসেবে সিনেমাটি বড় পর্দায় দেখানো হয়েছিল গতকাল। প্রথম ২০ মিনিটের মাথায় অনেকের নিদ্রালু ভাব। পরের ১৫ মিনিটের মধ্যে ৩ জন চেয়ার খালি করে চলে গেলেন। চলচ্চিত্রের টেক্সট ফিল্ম হিসেবে Battleship Potemkin (1925) এর পরপরই এর স্থান। জিগা ভার্তব ১৯২৯ সালে বলেছিলেন এমন সময় আসবে ক্যামেরার মধ্যেও মানবিক গুণ আসবে। মানুষের হয়ে কথা বলবে ক্যামেরা। তিনি কি ক্যামেরা শব্দটিকে সিনেমা অর্থে বলেছিলেন..হয়ত তাই হবে..একারণেই এখন তঁর ভবিষ্যতবাণীর সত্যরূপ আমরা দেখতে পাচ্ছি।

(Visited 105 time, 1 visit today)

মন্তব্য করুনঃ

You must be Logged in to post comment.

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন