তারেক মাসুদের ”আদম সুরত” এবং আমার কিছু স্মৃতি

বাংলাদেশের বিখ্যাত চিত্রশিল্পী এস.এম সুলতানের জীবনী অবলম্বনে তৈরি ”আদম সুরত” তথ্যচিত্রটির ব্যাপারে অনেকের জানার আগ্রহ আছে। আদম সুরত তৈরির পর তারেক মাসুদ ওঠা নিয়ে বাণিজ্যিক বা তেমন কোন বিশেষ প্রদর্শনীর আয়োজন করেন নি। দীর্ঘ দিন ওই তথ্যচিত্রটির রিল গুলো ক্যানে ভর্তি ছিল। অবশেষে কয়েক বছর আগে ক্যাথরিন ওই তথ্যচিত্রটিকে আলোর মুখ দেখানোর চিন্তা ভাবনা থেকে ওঠা ৩৫ মি.মি রিল থেকে ডিজিটালি ট্রান্সফার করে ডি.ভি.ডি/ ব্লু-রে/ ডিজিটাল কপি ফরম্যাটে রূপান্তরের প্রয়াস নেন। ক্যাথরিন নিউ ইয়র্করের নাম করা একটি ফিল্ম ল্যাবরেটরীতে এটা ডিজিটালি ট্রান্সফার করেন। চট্টগ্রামে “রানওয়ে” মুক্তির পর তারেক মাসুদ বলেছিলেন তাঁর ”আদম সুরত” তথ্য চিত্রটিকেও দর্শকদের সম্মূখে আনবেন। কথা রেখেছিলেন তারেক মাসুদ। এরই ধারাবাহিকতায় থিয়েটার ইন্সটিটিউট চট্টগ্রামে ”আদম সুরত” তথ্যচিত্রটির প্রদর্শনী হয়। প্রদর্শনী শেষে উন্মূক্ত আলোচনায় দর্শকদের প্রশ্নের উত্তরে অনেক কিছু জানিয়েছিলেন তিনি। মজা করে বলেছিলনে ” সিনেমা বানিয়ে বড়লোক হতে চেয়েছিলাম। কিন্তু পারিনি। ” তথ্যচিত্রটি দেখে বিভিন্ন টি.ভি চ্যানেল থেকে ওনাকে চড়া দামে স্বত্ব বিক্রির প্রস্তাবও দেয়া হচ্ছিল। তিনি ওসব প্রস্তাব ও বিবেচনায় রেখেছিলেন। ওই তথ্যচিত্রটি নির্মাণের পেছনের অনেক কথা বলতে গিয়ে স্মৃতিকাতর হন তিনি। এস.এম সুলতানের ওই পল্লীতে শূটিং এর সময়কার নানান ঘটনা বলেন তিনি।

অনেকে বলে ”আজ আমি ইতিহাসের সাক্ষী” হলাম। একটুও বাড়িয়ে না বলে আমিও বলতে পারি ” আমিও বাংলা চলচ্চিত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সাক্ষী হয়েছিলাম অজান্তে”।
ডিজিটাল ফরমেটে ট্রান্সফারের কারণে তথ্যচিত্রটি দেখে মনেই হয়নি এটি অনেক পুরাতন একটি ছবি। ঝকঝকে প্রিন্ট, সাউন্ড, কালার।

ছবির শুরুতেই লং শটে বর্ষায় নিমজ্জিত একটি বিলের পাশে গ্রাম দেখানো হয়। ধীরে ধীরে ক্যমেরা গ্রামে প্রবেশ করে। ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকের সাথে সাবলীল বর্ণনা। একজন শিল্পী তার কাজের প্রতি কতটা আত্মনিষ্ট হতে পারে তার প্রমাণ এস.এম. সুলতান। ছবিতে তাকে দেখানো হয়েছে একটি প্রায় পরিতক্ত বাড়ীতে তিনি থাকেন। বাড়ির একপাশে একটি কক্ষে তার স্টুডিও। একজন মহিলা তার রান্না বান্নার কাজ করে দেন। তারেক মাসুদকে পর্দায় সরাসরি দেখা না গেলেও সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে পুরো সিনেমা জুড়ে ছিলেন। এস.এম সুলতান তাঁর আর্টিস্ট হয়ে উঠার কাহিনী গল্পের ছলে বর্ণনা করে চলেন। আলোচনায় উঠে আসে কলকাতা আর্ট কলেজ, জয়নুল, ওই সময়কার চিত্রকলার সার্বিক অবস্থা। এস. এম সুলতান কে আগে কখনো ভিডিও চিত্রে দেখিনি। যে সময় তথ্যচিত্রটি নির্মিত হয় তখন এস.এম সুলতান অনেকটা বার্ধক্যে উপনীত। এর পরো তার বাচনভঙ্গী, কথা বলার ধরণেই তাঁর শিল্পী মনের পরিচয় সুষ্পষ্ট। আমাদের চিত্রকলার ইতিহাস, সম্ভাবনা, শিল্পীদের মূল্যায়নের বিষয়ে তাঁর মতামত সব কিছুতেই চিত্রকলার প্রতি তাঁর ভালোবাসা ফুটে উঠছিলো।
আর্টের বিষয়ে যতটুকু ধারনা আমার ছিল; তথ্যচিত্রটি দেখার পর এই বিষয়ে ভাবনার পরিধি আরো বেড়ে গিয়েছে। ছবি আঁকার উপকরণ নিয়ে তিনি যা বললেন তা এক কথায় মুগ্ধ করার মত এবং আশা জাগানিয়া।
আমাদের শিল্পীরা ছবি আঁকার জন্য বিদেশী উপকরণের উপর নির্ভরশীল। যার কারণে উপকরণের দাম বাড়লে আর্টের ছাত্রদের উপরও তার প্রভাব পড়ে। তিনি বলেন ”বিদেশী উপকরণ নির্ভরতা কমিয়ে স্বদেশী উপকরণ ব্যাব হারের মাধ্যমেও ভালো ছবি আঁকা সম্ভব।” এ বিষয়ে তারেক মাসুদের সম্পূরক প্রশ্নের জাবাবে তিনি হাতে কলমে দেশীয় নানান ফল, লতা, গুল্ম, গাছের গুড়ি, মাটি প্রভৃতি দিয়ে রং তৈরি করে দেখান। পাট দিয়েও যে ছবির ক্যানভাস তৈরি করা যায় তাও তিনি দেখান । কয়েকটি ছবি দেখিয়ে তিনি বলেন যে এগুলো সবই পাটের ক্যানভাসে এবং দেশীয় উপকরণে তৈরি রং দিয়ে আঁকা।
তিনি ওই বাড়ীতে পাঠশালাও বানিয়েছেন । যেখানে গ্রামের শিশুরা পড়াশুনার পাশাপাশি ছবি আঁকা শিখে।
শিল্পী এস. এম সুলতানের আরো অনেক অজানা দিক তথ্যচিত্রটিতে উঠে এসেছে। তারেক মাসুদের মৃত্যুর পর ক্যাথরিন শোক সামলে ”রানওয়ে” ডি.ভি.ডি তে মুক্তি দিয়েছেন। কাগজের ফুল প্রজেক্টটিও বাতিল করেন নি। হয়ত আমরা আদম সুরতের প্রদর্শনী এবং ডি.ভি.ডি আশা করতে পারি।

(Visited 175 time, 1 visit today)

মন্তব্য করুনঃ

You must be Logged in to post comment.

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন