তানভির গাজীর শর্টফিল্ম ‘খাওয়া – A Dine’ এবং আমাদের সমাজের শ্রেণী সংঘর্ষ

‘খাওয়া – A Dine’ শর্টফিল্মটি দেখলাম কদিন আগে। স্টোরি এবং ডিরেকশন তানভির গাজীর, যিনি মাত্র চার মিনিটের লেংথে সমাজে বিদ্যমান নিম্ন, মধ্য এবং উচ্চবিত্ত, তিন শ্রেণির মধ্যকার সংঘর্ষের চিত্র তুলে ধরেছেন।

 

**স্পয়লার এলার্ট**

 

ফিল্মে দেখা যায় প্রথম থেকে টেবিলের একদিকে বসে আহার করছেন একজন উচ্চবিত্ত, তার সাথে অনেক পদের খাবার। অতপর সেই টেবিলে খেতে আসে একজন মধ্যবিত্ত এবং তার পরপরই এক নিম্নবিত্ত। টেবিলে আসার পরই মধ্যবিত্ত ব্যক্তিটি তাকান টেবিলের অপর পাশে খেতে বসা উচ্চবিত্তের  খাবারের পদের দিকে এবং তারটা দেখাদেখি অর্ডার করেন নিজের খাবারের। উচ্চবিত্তের সামনে বসে নিজের সহজাত কথা বলবার স্টাইলও পাল্টে ফেলেন তিনি। পাশে বসা নিম্নবিত্ত ব্যক্তিও একবারের মতন নজর দেন উচ্চবিত্তটির খাবারের দিকে, কিন্ত পরমুহূর্তে কোন ভ্রুক্ষেপ না করে নিজের খাবারের অর্ডার তিনি দেন। মধ্য এবং নিম্নবিত্ত ব্যক্তির খাবার আসে একত্রে, খাবার আসবার পর দেখেন আমাদের মধ্যবিত্তটি, তার এবং নিম্নবিত্ত ব্যক্তির খাবারের একটি পদ মিলে যায়। ওয়েটারকে দিয়ে মধ্যবিত্ত পাল্টে নেন সেই মিলে যাওয়া পদটি।

 

কাহিনীর এই পর্যায়ে পানির জন্যে উল্টোদিকে ঘুরেন মধ্যবিত্ত, এবং পুনরায় সামনের দিকে ফিরলে দেখতে পান তাঁর প্লেটের মাংসের টুকরোটি সেখানে আর নাই! অর্থাৎ কেউ একজন সরিয়ে নিয়েছে। পাশে বসা নিম্নবিত্তকে অভিযুক্ত করে সে প্লেটের মাংস চুরির দায়ে। দায় অস্বীকার করলে মধ্যবিত্ত তাঁর ভাই বেরাদারদের নিয়ে আসে নিম্নবিত্তকে সাইজ করবার জন্য। এসময় কর্তাসুলভ গলায় উচ্চবিত্ত তাদের আদেশ দেন ঝামেলা যা করবার, তা যেন বাহিরে গিয়ে করে তারা। আদেশ অনুযায়ী নিম্নবিত্তকে টেনে বাইরে নিয়ে যায় মধ্যবিত্তের ভাই বেরাদারেরা। টেবিলে এবার একা এবং পরস্পর মুখোমুখি হয় উচ্চ এবং মধ্যবিত্ত ব্যক্তি দুজন। ভয়ংকর দৃষ্টিতে মধ্যবিত্ত তাকিয়ে থাকে অপর পাশে বসা উচ্চবিত্তের দিকে। সেই দৃষ্টিতে আছে ঘেন্না, বিদ্বেষ এবং উচ্চবিত্তকে কিছু করতে পারার অক্ষমতা। মাংসের টুকরোটা যে উচ্চবিত্ত ব্যক্তিটিই চুরি করছে, তা আগেই বুঝেছিল আমাদের মধ্যবিত্ত। উচ্চবিত্ত ব্যক্তি তার সেই দৃষ্টির উত্তর দেয় অবজ্ঞার হাসি দিয়ে, এবং নিজের খাওয়া সে চালিয়ে যেতে থাকে।

 

এই শর্টফিল্ম সমাজে বিদ্যমান তিন শ্রেণীর সংঘর্ষের চিত্রকে পুরোপুরি তুলে ধরে। ফিল্মের তিনজন চরিত্র আমাদের সমাজের তিনটি শ্রেণিরই প্রতিনিধিত্ব করে।

 

ফিল্মে উচ্চবিত্ত চরিত্রটির মধ্যবিত্তের ভাই বেরাদারদের বাইরে গিয়ে ঝামেলা করবার আদেশ এবং মাংসের টুকরো চুরির মধ্য দিয়ে আমরা দেখতে পাই সমাজে বিত্তবান বা এলিট শ্রেণীর যেকোনোভাবে কর্ত্রিত্ব ধরে রাখবার সহজাত স্বভাব, অন্যের জিনিষ প্রয়োজন পড়লে দ্বিধাহীন ভাবে হাত করে নেয়ার প্রবনতা।

 

সমাজের আর দশজন মধ্যবিত্তের মতই ফিল্মের মধ্যবিত্ত চরিত্রও উচ্চবিত্তকে অনুসরন করবার প্রবণতা থেকে টেবিলে তাঁর দেখাদেখি খাবারের অর্ডার দেয়, নিজের কথা বলবার ভঙ্গী পাল্টে ফেলে। আবার নিম্নবিত্তের মত হতে না চাইবার প্রবনতা ফুটে ওঠে নিম্নবিত্ত চরিত্রের সঙ্গে তাঁর মিলে যাওয়া খাবারের পদ পাল্টানোর মধ্য দিয়ে। কিন্ত সম্পদের সীমাবদ্ধতার কারনে উচ্চবিত্তের জীবন পুরোপুরিভাবে সে যাপন করতে পারে না এবং উচ্চবিত্তের শোষনের জবাব দেবার ক্ষমতাও তাঁর নেই। এই অক্ষমতা থেকে তাঁর মনে গড়ে ওঠে উচ্চবিত্তের প্রতি বিদ্বেষ। অক্ষমতার ঝাল সে মেটায় নিম্নবিত্তের ওপর, যেটা আমরা এই ফিল্মে দেখি মাংস চোর কে তা জানবার পরও মধ্যবিত্ত দ্বারা নিম্নবিত্ত ব্যক্তিটির অভিযুক্ত হওয়া এবং বাইরে মধ্যবিত্তটির ভাই বেরাদারদের হাতে মাইর খাওয়ার মধ্য দিয়ে। এবং এথেকে ফুটে ওঠে শ্রেণী সংঘর্ষের এই ময়দানে দিনশেষে নিম্নবিত্ত প্রায় সবসময়ই নিরপরাধী হয়েও মধ্য এবং উচ্চবিত্তে, এবং তাদের কাজের দ্বারা শোষিত হয়ে যাওয়া।

 

মাত্র চার মিনিটে ছোট এবং সাধারণ পরিসরের ভেতরে পুরো শ্রেণী সংঘর্ষ তুলে ধরতে পারা ডিরেক্টরেরই দক্ষতা। চরিত্রদের অভিনয়ও ভালো ছিল, বিশেষ করে মধ্যবিত্ত চরিত্রটির। একদম শেষে তাঁর বিদ্বেষ এবং ক্রোধভরা চোখে উচ্চবিত্তের দিকে তাকানো ছিল ফিল্মের সর্বশ্রেষ্ঠ দৃশ্য। কাকতালীয়ভাবে সেসময় তাঁর সামনে দিয়ে একটি মাছি উড়তে উড়তে চুলে বসার দৃশ্য, সেই দৃষ্টিকে করে তুলেছে আরো নিখুঁত।

 

 

 

(Visited 117 time, 1 visit today)

মন্তব্য করুনঃ

You must be Logged in to post comment.

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন