বাস্টার কিটন- একজন হারিয়ে যাওয়া লিজেন্ড এবং তার কিছু সেরা নির্মাণ

চাদে প্রথম কে পা রেখেছেন ? এই প্রশ্ন যদি শিক্ষিত কোনো ব্যক্তিকে করা হয় তাহলে তিনি আলোর বেগে বলে দিবেন “নীল আর্মস্ট্রং” । এরপর যদি তাকে বলতে বলা হয় দ্বিতীয় ব্যক্তি কে যিনি আর্মস্ট্রং-এর পরে চাদে পদার্পণ করেছেন তাহলে তার কপাল হয়তো কিঞ্চিত ভাজ পড়ে যাবে উত্তর দেওয়ার আগে । ঠিক তেমনি আমাদের যদি এখন জিজ্ঞেস করা হয় “নির্বাক সিনেমা” কার হাতের ছোয়ায় এতো দূর এসেছে ? আমরাও সেই ব্যক্তির মতন আলোর বেগে বলে দিবো “চ্যাপলিনের” নাম ।

“চ্যাপলিনের পরে কার অবদান ছিলো এই নির্বাক সিনেমায়”
আজ সেই ব্যক্তির ব্যাপারে কিছু কথা বলবো যিনি নিজের কিছু ভুল বা বোকামীর জন্য চ্যাপলিনের কাতারে দাড়াতে পারেন নি । চার্লস চ্যাপলিন, ক্লিন্ট ইস্টউড, মারলন ব্রান্ডো, পল নিউম্যান, ডেনিয়েল ডে লুইস, আল পাচিনোর’দের মতন লিজেন্ডারী অভিনেতা/পরিচালকদের ভীড়ে হয়তো “বাস্টার কিটন” নামটি অপরিচিত লাগতে পারে ।

 

Buster-Keaton-silent-movies-13812971-1800-1430

 

“বাস্টার কিটন”- খুব ইচ্ছা ছিলো বড় হয়ে ইঞ্জিনিয়ার হবেন, নিজের নাম লেখাবেন তৎকালীন বড় বড় ইঞ্জিনিয়ারদের নামের পাশে কিন্তু বাবা-মা দুজন-ই ছিলেন অভিনয়ের সাথে জড়িত, অগত্যা তাকেও সেই দিকে যেতে হয়ে । মোটামুটি চার বছর বয়স থেকে অভিনয় করা শুধু করলেও খুব একটা টানতো না থিয়েটারের মঞ্চ । কিন্তু বাবা-মার ইচ্ছা ছিলো ছেলেকে অভিনেতা-ই বানাবেন । স্কুলের উঠান পার হওয়ার পর অভিনয় ব্যাপারটা আকর্ষনীয় হয়ে উঠলো তার কাছে , নিয়মিত থিয়েটার করা শুরু করে দিলেন । এক সময় সিনেমার পোকা মাথায় ঢুকে বসে আর থিয়েটারে মন বসাতে পারলেন না । বাবার হাত ধরে-ই সিনেমায় হাজির হলেন, বাবার খুব কাছের বন্ধু পরিচালক  Roscoe ‘Fatty’ Arbuckle তাকে তার সিনেমায় অভিনয়ের সু্যোগ করে দিলেন, এরপর শুধু সামনে এগিয়ে যাওয়া, পরিচালক Roscoe ‘Fatty’ Arbuckle-এর সাথে মিলে শুরু করেদেন সিনেমা নির্মান, অভিনয়ের পাশাপাশি লেখা-লেখিও চালিয়ে যান, দিতে থাকেন একের পর এক চমক । কিটন মূলত দুটি কারণে খুব বিখ্যাত ছিলেন প্রথমত তিনি যখন সিনেমা নির্মান শুরু করেন তখন সিনেমা আতুর ঘরে , সেই সময় তিনি যেসব স্টান্ট করে দেখাতান তা তৎকালীন সময়ের বাঘা বাঘা স্টান্টম্যানরা করার সাহস পেতো না, তিনি শুধু নিজের স্টান্ট নিজে করতেন তা না, নিজের স্টান্ট ছাড়াও কো-আর্স্টিস্টদের স্টান্টও তিনি করে দিতেন , পাহাড় থেকে লাফ দেয়া, উচু পাহাড় থেকে কোনো রকম ব্যাক-আপ ছাড়া গড়িয়ে পড়া, মোটর বাইকের একদম সামনে বসে বাইক চালানো, এগুলো ছিলো কিটনের বা’হাতের খেল । তার স্টান্ট করা নিয়ে খুব মজার একটি ঘটনা আছে, কিটনের বয়স যখন ছয় মাস তখন কিটন তার মায়ের হাত থেকে বেশ উচু থেকে পড়ে যান । পড়ার পর কিটন মোটেও কাদেননি তখন-ই তার বাবা হাসির ছলে বলে দেন “আমার ছেলে অনেক বড় স্টান্টম্যান হবে”, তখকার সময় যারা স্টান্ট করতো তাদের বেশ কদর ছিলো ।  স্বয়ং জ্যাকি চ্যান পর্যন্ত কিটনের স্টান্ট থেকে ইন্সপায়ার্ড হয়েছেন, এক সাক্ষাৎকারে জ্যাকি বলেছেন তার এমন ভয়াবহ স্টান্ট করার অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন “বাস্টার কিটন” । ভয়াবহ সব স্টান্ট করতে গিয়ে বেশ কয়েকবার গুরুতর আহত হয়েছেন তার অন্যতম বিখ্যাত সিনেমা Sherlock Jr. (1924)-এর একটি দৃশ্যের স্টান্ট এতো-ই ভয়াবহ ছিলো যে সেই স্টান্ট করতে গিয়ে তার ঘাড়ে মারাত্মক রকমের আঘাত পান যা তাকে প্রায় আট বছরের মতন ভুগিয়েছে । এরপর আরেকটি ব্যাপার যা এতোটা বিখ্যাত করে তুলেছে তা হলো তার এক্সপ্রেশন । তার অভিনিত ১৫০এর অধিক সিনেমা রয়েছে , এই দেড়শ সিনেমার মাত্র একটি সিনেমা তিনি “হাসির এক্সপ্রেশন” দিয়েছেন, বেশির ভাগ সিনেমায় তার ভঙ্গি থাকতো এক রকম, এর জন্য তাকে বলা হতো “দ্যা গ্রেট স্টোন ফেস” । সিকুয়েন্স যতো-ই গুরু-গম্ভীর হোক আর যতো-ই হাসির হোক তার মুখের ভঙ্গির কোনো পরিবর্তন হতো না, এক-ই রকম ভঙ্গি দিকে মনে হয় না আর কোনো অভিনেতা এতো সিনেমা করেছেন । বলতে গেলে এটি-ই ছিলো তার সিগনেচার স্টাইল ।

 

9831344_ori

 

 

অনেকে-ই মনে করেন কিটন চ্যাপলিনকে ফলো করেন, এই তথ্যের কোনো ভিত্তি নেই । কারণ চ্যাপলিনের সিনেমার মুল ভিত্তি ছিলো চ্যাপলিন নিজে, দর্শক শুধু চ্যাপলিনের উপস্থিতিতেই হেসে উঠতো । যদিও তার সিনেমার স্টোরিও অনেক ভালো মানের ছিলো । অন্যদিকে কিটনের সিনেমা হতো একদম স্বল্প দৈর্ঘের , কিন্তু এই স্বল্প দৈর্ঘের সিনেমায় তিনি অনেক কিছু দেখিয়ে দিতেন, হিউমার আর অভিনয়ের কিছু কিছু ক্ষেত্রে তিনি চ্যাপলিনকেও ছাড়িয়ে গেছেন । বিশেষ করে হিউমারের ক্ষেত্রে । কিছু হিউমার আজ থেকে ৫০-১০০বছর পর এতোটা দৃষ্টি নন্দন হয়ে থাকবে যতোটা কাল ছিলো । পোশাক-আশাকের দিক থেকে তিনি চ্যাপলিন থেকে আলাদা ছিলেন, যেখানে চ্যাপলিন অস্ত্র ছিলো ছেড়া প্যান্ট,জীর্ণ-শীর্ণ কোট আর হ্যাট সেখানে কিটন ছিলেন পুরোদস্তুর চ্যাপলিনের বিপরীত ।

শুধু অভিনয় আর স্টান্ট না সিনেমা নির্মানের ক্ষেত্রেও দেখিয়েছেন ব্যাপক মুন্সিয়ানা । ১৯২৬ সালে দ্য জেনারেল সিনেমায় গোটা ট্রেন উল্টে দিয়েছিলেন কাহিনীর প্রয়োজনে, যা ছিলো সেই সময়ের সব’চে ব্যায়-বহুল দৃশ্য । এতো কিছুর পর কিটন এখন সর্ব-প্রকার আলোচনা বাহিরে, আগে-ই বলেছি কিছু ভুল সিদ্ধান্ত বা বোকামী ছিলো এর পেছনের কারণ । সফলতার এক পর্যায়ে এসে তিনি সিদ্ধান্ত নেন হলিউডের অন্যতম বৃহৎ স্টুডিও MGM(Metro-Goldwyn-Mayer) এর সাথে যৌথ ভাবে কাজ করবেন । যখন তিনি এই সিদ্ধান্ত নেন তখন-ই চ্যাপলিন তাকে নিষেধ করে , কারণ চ্যাপলিন আগে-ই বুঝতে পেরেছিলেন Metro-Goldwyn-Mayer তাদের সার্থে কিটনকে তার মত করে কাজ করতে দিবে না, এবং হয়ে ছিলোও তাই, Metro-Goldwyn-Mayer কিটনকে স্বাধীন ভাবে কাজ করতে দেয়নি । প্রথম দিকে কিছুটা সাফল্যের দেখা পেলেও পরবর্তীতে তা মোটেও সুখকর হয়ে উঠনি, কিটনের প্রথম শর্ত-ই(নিজের স্টান্ট নিজে করার) তারা মানতে রাজি না কোনো ভাবে । এই একটি সিদ্ধান্ত তার ক্যারিয়ার নষ্ট করে দেয় । এরপর যে বোকামী করলেন তা ছিলো কল্পনাতীত, তিনি তার স্টুডিও(Buster Keaton Productions) আর সকল সিনেমা Metro-Goldwyn-Mayer-এর কাছে বিক্রি করে দেন । এই ভুল ডিসিশনের জন্য আজ তিনি চ্যাপলিনের পর্যায়ে পৌছাতে পারেন নি ।

 

buster-keaton-sherlock-jr

 

বাস্টার কিটনের সকল সিনেমা-ই ছিলো ভয়াবহ হাস্য-রস আর হিউমারে পূর্ণ । আমার দেখা কিটনের সেরা সিনেমাগুলো হলো- The General (1926)- Seven Chances (1925)- Sherlock Jr. (1924)-The Cameraman (1928)- Steamboat Bill, Jr. (1928)- এছাড়াও Our Hospitality (1923) আর The Navigator (1924) ছিলো কিটনের অন্যতম সেরা সিনেমা । The Navigator (1924) কিটনের সব’চে ব্যবসা সফল সিনেমা ।

 

আমার দেখা কিটনের সেরা তিনটি সিনেমা নিয়ে হালকায়ে আলোচনা ।

 

Seven Chances(1925)– সাতাশ তম জন্মদিনের ঠিক সাত ঘটিকায় বিবাহে আবদ্ধ হলে পাবেন সাত মিলিয়ন ডলার ।

আমার দেখা কিটনের সেরা সিনেমার তৃতীয় স্থানে আছে এই সেভেন চান্স সিনেমাটি । মাত্র ৫৬মিনিটের সিনেমায় কতো কিছু দেখানো যায় তা এই সিনেমা দেখলে অনুমান করা যায় ।

 

Sherlock Jr.(1924)- সেরা সিনেমার সারির দ্বিতীয় স্থান দখল করেছে এই সিনেমাটি । কিটন অভিনিত সেরা সিনেমা এটি । কমেডি সিনেমা কিন্তু কিছু দৃশ্যে্র স্টান্ট আপনার স্নায়ুর উপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করবে । এই সিনেমার একটি দৃশ্যে স্টান্ট করতে গিয়ে আহত হন, যা তাকে আট বছর ভোগায় । পুরো সিনেমার সেরা দৃশ্য ছিলো “পুল” খেলার সিকুয়েন্সটি, চার মাস এক্সপার্টের কাছে প্রেক্টিস করেন পুলের বিভিন্ন ট্রিক্স শট শিখতে । ঐ দৃশ্যে কোনো প্রকার ইফেক্ট ব্যবহার করা হয়নি, যা দেখার পর কিছুতে-ই মানতে মন চাইবে না । এখন যেমন আমরা নোলানের ইনসেপশন দেখা অবাক হই তখনকার সময় এই সিনেমায় ব্যবহৃত কিছু ইফেক্টস দেখা মানুষ ততোটুকু অবাক হতো । বিশেষ করে থিয়েটারের সিন দেখে আমি নিজে-ই অনেকক্ষণ ভেবেছি করা হয়েছে এই দৃশ্যটি ।

 

 

The General(1926)- কিটনের সব’চে বিতর্কিত সিনেমাটি । মুক্তির পরপর-ই মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয় এই সিনেমা নিয়ে । এটি কিটন এবং আমার দুজনের-ই খুব প্রিয় সিনেমা । প্রেমিকা আর ট্রেন এই দুজনকে বাচানোর গল্প-ই দ্য জেনারেল । এতো সিম্পল একটি স্টোরিকে কতো উপরে নিয়ে যাওয়া যায় তা শুধু নির্বাক যুগের চ্যাপলিন আর কিটনরা-ই জানতেন । কিটনের সব সিনেমা একটি ব্যাপার লক্ষনীয়, আর তা হলো কোনো প্রকার অহেতুক দৃশ্যে নির্মানে স্থান পেতো না । এমনিতেও কিটন তার সব গল্পের উপর গভীরভাবে কাজ করতেন, তিনি চাইতেন যতো কম সময়ে দর্শককে পুরো সিনেমা ভালো করে বোঝানো যায় । এরজন্য-ই তার সিনেমা দৈর্ঘ্য খুব একটা বেশি হতো না ।

 

অবশ্য-ই সর্বকালের সেরা অভিনেতাদের একজন “বাস্টার কিটন” । যারা বাস্টার কিটনের সিনেমা দেখেন নি তারা অনেক ভালো কিছু মিস করে আছেন । কিটনের সিনেমাগুলো একা দেখে যতোটা মজা পাবেন তার থেকে কয়েকগুণ বেশি বিনোদন পাবেন পরিবার অথবা সঙ্গী-সাথী নিয়ে দেখলে

সিনেমার ডাউনলোড লিঙ্ক চাওয়ার আগে একটু কষ্ট করে ইউটিউবে ঢু মারলে-ই উনার সব সিনেমার ডাউনলোড লিঙ্ক পেয়ে যাবেন ।

(Visited 182 time, 1 visit today)

এই পোস্টটিতে ৫ টি মন্তব্য করা হয়েছে

  1. বুস্টার কিটন-এর সম্পর্কে নতুন কিছু জানানোর জন্য ধন্যবাদ।
    বাংলায় নামটি একটু পরিবর্তন করবেন আশাকরি। 🙂

    ‘বুস্টার কিটন’ সম্পর্কে দুটি জনপ্রিয় বাক্য প্রচলিত আছে – “The Great Stone Face” এবং “The Michelangelo of Silent Comedy”…:)

  2. sidney sheldon er the otherside of me – te besh detailed information ache ei stunt actor ke niye.

মন্তব্য করুনঃ

You must be Logged in to post comment.

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন