ভালোবাসা এবং ত্যাগের মিশ্রন “ইন্টারস্টেলার”

Interstellar

শেষ মনে হয় কুব্রিকের 2001: A Space Odyssey দেখার পর এতোটা মুগ্ধ হয়ে ছিলাম যতোটা মুগ্ধ ইন্টারস্টেলার দেখে হয়েছি । এক কথায় এই সিনেমার প্রশংসা করা আমার পক্ষে সম্ভব না ।

ভালোবাসা এবং সেক্রিফাইস এই দুইয়ে মিলে নির্মিত হয়েছে “ইন্টারস্টেলার” । সাই-ফাই হওয়া সত্ত্বেও সন্তানের প্রতি বাবার এবং বাবার প্রতি সন্তানের যে ভালোবাসা তা নিখুত ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন “নোলান ভ্রাতৃদ্বয় ” । সাই-ফাই জেনারের সাথে ড্রামার মিশ্রণ, এই ব্যাপারটি সিনেমার “অসাধারণ” লেভেলকে আরো অসাধারণ করে তুলেছে ।

বছরের পর বছর হাজারো সাইন্স ফিকশন সিনেমা নির্মিত হচ্ছে সামনে আরো অনেক সাইন্স ফিকশন সিনেমা নির্মিত হবে কিন্তু এসব হাজারো সিনেমার ভিড়ে কটি সিনেমা-ই বা হাজারের মধ্যে অন্যতম হয়ে আছে । ইন্টারস্টেলার ঐ হাজারের ভীড়ে নির্মিত “অন্যতম” একটি সিনেমা । যা শুধু চোখের বিনোদন নয় মনেরও বিনোদন ।

Screenshot_1

নোলানের প্রিয় পরিচালক স্ট্যানলী কুব্রিক । সেই প্রিয় পরিচালকের সেরা নির্মাণের রেশ ধরে-ই নোলান এই সিনেমাটি নির্মান করেছেন । ওয়ার্ম হোল-ব্ল্যাকহোল-ডাইমেনশন আর স্পেস ট্রাভেলিং -নিউটনের থার্ড ল এর মতো কৌতুহল পূর্ণ সাবজেক্ট ছিলো এই সিনেমার মূলতন্ত্র । বিখ্যাত পদার্থ বিজ্ঞানী কিপ থ্রনকে সাথে নিয়ে কৌতুহল পূর্ণ বিষয়গুলো যৌক্তিক ব্যবহার করেছেন নোলান ভ্রাতৃদ্বয় । চেষ্টা করেছেন কোনো প্রকার গোজামিল যেনো সিনেমায় ঠায় না পায় । এর জন্য-ই কিছু কিছু বিষয়ের সঠিক প্রয়োগের জন্য সপ্তাহ ভর গবেষনা করেছেন ।

২০০৬ সালে দিকে জোনাথান নোলানের সাথে মিলে স্পিলবার্গ এই সিনেমার স্ক্রিপ্টে হাত দেন, পরবর্তীতে অজানা কোনো কারণবশত স্পিলবার্গ এই সিনেমার কাজ করবেন না বলে জোনাথান নোলানকে জানান, এরপর দুই ভাই মিলে-ই শুরু করে দেন সিনেমার কাজ । স্পিলবার্গ এই সিনেমার কাজ করলে কেমন হতো জানি না কিন্তু এইটা আপাতত বলতে পারি নোলান যেভাবে ইন্টারস্টেলার নির্মান করেছেন তা যে কোনো সিনেমা নির্মাতাকে তাক লাগিয়ে দিবে । ১৯৬৮ সালের 2001: A Space Odyssey যেমন এতো বছর পরও মাস্টারপিস হয়ে আছে নোলানের এই সিনেমাটিও আজ না হোক পরবর্তী ২০ বছর পর আ স্পেস ওডেসির মতো মাস্টারক্লাস সিনেমা হয়ে থাকবে । পাঠ্য বিষয়ে অন্তর্ভুক্ত হলেও অবাক হবো না ।

ইন্টারস্টেলারের প্রায় প্রতিটা দিক-ই মনোমুগদ্ধকর, যে দুটি দিক একটু বেশি “মনকে মুগ্ধ করেছে” তার একটি হলো “চিত্রায়ণ” ।
প্রথম ৪০/৪৫মিনিটের ক্যামেরা ওয়ার্ক দেখে চক্ষুশীতল হয়ে গেছে, কিছু সিকুয়েন্সের ফ্রেমিং দেখে মন চাইছিলো স্ক্রিন ছিদ্র করে সিনের মধ্যে ঢুকে যাই । সাই-ফাই সিনেমায় এমন চিত্রায়ণ খুব একটা দেখা যায় না । যদিও ৫০মিনিটের পর থেকে(শুধু স্পেসের সিকুয়েন্সগুলোর) চিত্রায়ণ স্বাভাবিক লেগেছে কারণ এই ধাচের চিত্রায়ন আগেও বিভিন্ন সিনেমায় দেখা হয়েছে ।

Screenshot_2

অন্যটি আরেকটি দিক যা হৃদয় ছুয়ে গেছে তা হলো হ্যান্স জিমারের সুরের খেলা । হ্যান্স জিমার কি জিনিস তা আগে-ই জানতাম এবার তিনি নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টায় ছিলেন । সাধারণত সিনেমার স্ক্রিপ্ট সঙ্গিত পরিচালকে দেওয়া হয়ে থাকে, যাতে তিনি বুঝতে পারেন, কোন দৃশ্যে কেমন আবহ সঙ্গিত প্রয়োগ করতে হবে কিন্তু এই সিনেমার কোনো প্রকারে স্ক্রিপ্ট নোলান তাকে দেন নি । এই সিনেমার মাধ্যমে পঞ্চম বার নোলানের সাথে হ্যান্স জিমারের এবং হ্যান্স জিমারের সাথে নোলানের কাজ করার সৌভাগ্য হয় । হয়তো এই পাচ বারের কম্বিনেশনের কারণে-ই স্ক্রিপ্ট ছাড়া-ই ব্যাক-গ্রাউন্ড স্কোরের কাজ করে ফেলেছেন ।

 

সিনেমার স্টোরি একদম সরলরৈখিক তা বলবো না, নোলানের সিনেমায় সরলরৈখিক কিছু পাওয়ার আশা করা মানায় নাহ, তারপরও পূর্বে সিনেমাগুলো থেকে এই সিনেমার কাহিনী সহজ মনে হয়েছে (কাহিনী মারপ্যাচের জন্য অনেকের কাছে কিছুটা দূর্বোধ্য মনে হতে পারে) । সিনেমার মূলমন্ত্র গুলো আয়ত্ত করতে পারলে কোনো কিছু-ই দূর্বোধ্য মনে হবে না । এর জন্য আপনাকে সাইন্সে স্টুডেন্ট হওয়ার প্রয়োজন নেই । নোলান ইংলিশ লিটারেচারের ছাত্র হয়ে যদি এহেন সিনেমা নির্মান করতে সক্ষম হন তাহলে বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী না হয়েও এই সিনেমা বুঝতে পারাটা অস্বাভাবিক কিছু না । জাস্ট একটু পড়াশোনার প্রয়োজনীতা আছে আর কি ।

স্পয়লার এলার্ট ঃ
(যাদের কাছে এন্ডিং ক্লিয়ার না তারা নিম্নের লেখা পড়তে পারেন)

মূলত সিনেমাত কাহিনী আবর্তিত হয় দুইটি প্ল্যানকে কেন্দ্র করে প্ল্যান “A” এবং প্ল্যান “B”

প্ল্যান “A” ঃ ধূলিময় এই পৃথিবী যেখানে খাদ্যের তীব্র সংকট এই সংকট থেকে পরিত্রাণ পেতে নাসার বিজ্ঞানীগণ সিদ্ধান্ত নেন একটা স্পেস স্টেশন (কৃত্রিম গ্রহ) তৈরি করে যাতে করে পৃথিবীর সব মানুষকে নিয়ে স্পেস লিফ্ট করা যাবে। কিন্তু এটা ফ্লাই করার জন্য দরকার সিন্গুলারিটির ইকুয়েশন যা ব্রান্ড হাফ কমপ্লিট করে। কিন্তু উনি কুপার কে কথা দেয় ওরা যতক্ষন প্লান বি সফল করবে তার আগেই উনি সল্ভ করে ফেলবেন।

প্ল্যান “B” ঃ প্ল্যান “বি” বেশ কমপ্লেক্স । এই প্ল্যানে বলা হয়েছে পৃথিবী থেকে ৫০০০ হাজার নিষিক্ত ডিম্বানু কালেক্ট করে টিউবের মাধ্যমে তাদের জন্ম দিবে অর্থ্যাৎ “টিউব বেবি” । এদের মাধ্যমে আলাদা একটা স্পেস ক্রিয়েট করবে , এরপর ধীরে ধীরে জনসংখ্যা বৃদ্ধি করবে । যদিও এই প্ল্যান খুব-ই মারাত্মক কারণ এই প্ল্যানের মাধ্যেমে পৃথিবীর সবাইকে বাচানো পসিবল নাহ ।

এইখানে প্ল্যান “A” বলতে কোনো প্ল্যান ছিলো না, প্ল্যান “A” বলতে কোনো প্ল্যান ছিলো না এইটাও এক প্রকারের প্ল্যান, কুপারকে পাইলট হওয়ার জন্য রাজি করাতে এই প্ল্যান করা হয় । কারন প্রফেসর দশ বছর আগেই বুঝাতে পারেন যে স্টেশন স্পেসে লিফ্ট করা পসিবল যতক্ষন না ব্লাকহলের ইকুয়েশন সলভ হবে। ম্যান(ম্যাট ডেমন) কুপার কে বলে আর্থ এর মানুষ দের বাচানো যাবে না বলেই ব্রান্ড অন্য কোনো গ্রহতে নতুন মানুশের বসতি করতে চাইছিলেন।

এরপর যখন কুপার এইটা জানতে পারলো যে প্ল্যান “A” বলতে কোনো প্ল্যান ছিলো না । তখন কুপার সিদ্ধান্ত নিলো সে “ব্ল্যাকহোল(গারগ্যানচুয়া)র মধ্যে যাবে , এরপর দেখা যায় কুপার ব্ল্যাকহোলের মধ্যে প্রবেশ করে । এই ব্ল্যাকহোল জগতটি “ফাইভ ডাইমেনশনাল” , এর মাধ্যমে অতীতের সাথে ভবিষ্যতের এবং ভবিষ্যতের সাথে অতীতের সম্পর্ক সৃষ্টির করে কুপার তার মেয়ের কাছে কুয়ান্টাম ডাটা সেন্ড করে যার মাধ্যমে মার্ফ প্রফেসরের সমীকরণের সাথে কুয়ান্টাম ডাটা মিলিয়ে আলাদা একটি স্পেস তৈরী করে ফেলে । এই “ফাইভ ডাইমেনশনালে” মুভিতে যাদের “they” বলা হয়েছে তারা-ই ত্রিমাত্রিক স্থান বানিয়েছে, যাতে করে কুপার সময়ের মধ্যে দিয়েও বস্তুর আরেকটা মাত্রা দেখতে পারে(ব্যাপারটি দাঁড়ায়, কুপার স্থান ও সময়ের উপর নিয়ন্ত্রন করতে পারে), এভাবে সে মার্ফকে কুয়ান্টাম ডাটা সেন্ড করে ।

আশা করি কিছুটা হলেও বুঝতে পেরেছেন, এবার যদি সিনেমাটি আরো একবার দেখেন তাহলে পুরোপুরি ক্লিয়ার হয়ে যাবেন ।

অনেকে-ই হয়তো গারগ্যানচুয়া(ব্ল্যাকহোল) থেকে অচিরে-ই কুপারের বের হয়ে আসাটাকে “প্লট হোলের” দৃষ্টিতে দেখেছেন, হিসেব করলে এটি আসলে-ই একটি বিরাট প্লট হোল কিন্তু আমি এটাকে প্লট হোল হিসেবে মেনে নিতে পারছি না, কারণ সিনেমা মানে কল্পনার বাস্তব রূপ, কথায় আছে “সিনেমার গরু গাছে চড়ে” এখানেও নোলান তার গরুকে গাছে চড়িয়েছেন, নোলান জাস্ট ইমাজিন করেছেন যদি ব্ল্যাকহোল থেকে বের হওয়া তাহলে কি হবে । যদিও এটা পসিবল না, তবুও তিনি জাস্ট নিজের ইমাজিনেশনকে বাস্তবে রূপ দিয়েছেন । তার এই বাস্তব রূপ দেওয়াটা অনেকে মেনে নিতে পারেন নি তাই তাদের কাছে ব্যাপারটি কটু লেগেছে, এর ফলে নোলান এবং কিপ থ্রন ব্যাপক সমালোচনার মধ্যেও পড়েছেন ।

অভার অল ইন্টারস্টেলার দেখার পর ইন্টারস্টেলারিত হয়ে আছি, এটিকে নোলানের সেরা সিনেমা বলবো না এখনও আমার কাছে নোলানের সেরা নির্মাণ ইনসেপশন আর মেমেন্টো, কিন্তু হ্যা, ইন্টারস্টেলার আমার দেখা সেরা সাইন্স ফিকশন সিনেমা ।

(Visited 227 time, 1 visit today)

এই পোস্টটিতে ৬ টি মন্তব্য করা হয়েছে

  1. পেঙ্গুইন পেঙ্গুইন says:

    উম্ম একটা ব্যাপারে একটু দ্বিমত পোষণ করলাম ভাই…আমার যতদুর মনে পড়ে গারগান্টুয়া ও টেসার‍্যাক্ট মানে যে ফিফথ ডাইমেনশনের মাধ্যমে কুপার মার্ফের ঘড়িতে কোয়ান্টাম ডাটা এনকোড করে সেইটা ফিউচার হিউম্যান সিভিলাইজেসনের তৈরি…কনট্যাক্টে ব্যাপারটা এভাবেই লেখা বলেইমনে পড়সে 🙂

  2. ব্যাপারটা আরো একটু ক্লিয়ার করে বলবেন কি ? আমি ঠিক বুঝতে পারিনি আপনি কোন বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করছেন…

    • পেঙ্গুইন পেঙ্গুইন says:

      ওইযে নোলান সাহেব গল্পের গরু গাছে তুলেছেন এই কথাটার সাথেই দ্বিমত পোষণ করলাম ভাই 🙂

  3. ভাই ডাউনলোড লিংক দিবেন প্লিজ? এন্ড্রয়েড এর জন্যে

মন্তব্য করুনঃ

You must be Logged in to post comment.

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন