এক রাতের অভিযান {আমার ২ খানা মুভি দেখা}

*** গতকল্য রাত্তিরে হঠাৎ করিয়া কি এক ভাব উদয় হইল। আমাদিগের সম্পর্কে শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যথার্থই বলিয়া গিয়াছিলেন যে, এই বয়সের ছেলেপুলেদের মনের ভাব বোঝা অতিশয় কষ্টের কর্ম। এই দেখুন না, তাই না হইলে আমার মনের গভীরতম স্থানে, যেইখানে ভাঁড়ামি দেখিবার কোনরূপ যায়গা নাই সেইখান হইতে কেনই বা গোপন ধ্বনি শুনিতে যাইব যে, “বৎস, অনেক হইয়াছে তোমার ইতস্তত গমন, এইবার তোমার নিজের মাতৃভূমির আশেপাশের দেশসমুহে কিরূপ কাণ্ড ঘটিয়া যাইতেছে তাহার দিকে দৃষ্টিপাত কর”। যদিও আগেই অনেকবার দেখিয়া আশা ভঙ্গ হইয়া ব্যথিত বদনে সময় ক্ষেপণ বহু করিয়াছি, তবুও বিধির আদেশ আমার ছোট্ট মন হইতে বাহির হইয়াছে মনে করিয়া, নিজেকে বিরাট কিছু মনে করিয়া দুই পায়ে লাফাইতে লাফাইতে বসিয়া পরিলাম আমার কাছে থাকা ছোট্ট এক বাক্সের সম্মুখে। এই বাক্স নানাবিধ মহলে নানাবিধ কর্ম সম্পাদনে ব্যবহৃত হইয়া থাকিলেও আমার কাছে বর্তমানে ইহা চলচ্চিত্র প্রদর্শনের নতুন একটি সহজ উপায় বৈ কিছু নয়। আমার শ্রদ্ধেয় পিতা-মাতা গন আমার এইরূপ তাহাদের টাকার প্রতি উদাসীনতা এবং তাহাদের নিকট মিথ্যা বলা দেখিলে নিশ্চিত ভাবিবে “হায় ইহা আমি কি করিয়াছি” অথবা “উলু বনে সারা জীবন মুক্তাই ছড়িয়ে গেলুম।”

 

*** যাহাই হোক, এইবার কৃত কর্মের কথায় আসি,(যদিও তাহা কোন রূপ কর্ম {কুকর্ম নাকি সুকর্ম}তাহা নির্ধারণের দায়িত্ব আপনাদের হস্তেই সমাপিত করিলাম)। সেই বাক্সখানি খুলিয়া লইয়া হতবাক হইয়া তাকাইয়া ছিলাম। আর মনে মনে নিজেকে অভিসম্পাত দিতে লাগিলাম। “হতচ্ছাড়া, কু-কর্ম করবি তো কর সেই কু-কর্ম খানিও ভাল ভাবে করিতে পারিস না?”। ইহা বলিবার কারন হইল যেই কর্ম সম্পাদনের উদ্দেশে আমার স্থান গ্রহণ করা, তাহা করিবার জন্য আমার সম্মুখে হাজার না হইলেও শত সুযোগ আসিয়া দাঁড়াইয়াছে। এত চলচ্চিত্র আমার সামনে আসিয়া দণ্ডায়মান হইল যে আমার লজ্জায় মাথা কাটিয়া পড়ার উপক্রম হইল। মনে মনে জপিতে লাগিলাম, এতদিন আমি করিয়াছি কি? অশ্ব তো আমার নাই, তাহার জন্য ঘাস কাটিবার কোন কারণ খুঁজিয়া পাইলাম না। কি আর করিব, বসিয়া থাকিলাম মূর্খের মত। কি দেখিব, কি দেখিব, করিতে করিতে আমার বেলা চলিয়া যাইতে লাগিল। তখন মনে বাজিতে লাগিল, “কে আমায় আশা দেবে? কে আমায় ভরসা দিবে?” হঠাৎ আবার যেন স্বয়ং ঈশ্বর দৈববাণী করিলেন। তিনি আজকে পণ করিয়াছেন, আমায় দিয়ে চলচ্চিত্র দেখিয়েই ছাড়িবেন। তিনি আমাকে বলিলেন “তোমার পাশের দেশের দু একটা নয় কেন? বহুদিন তোমাকে তাহাদের শরণাপন্ন হইতে দেখিতেছি না”। আমি ঊর্ধ্ববাহু হইয়া নাচিয়া উঠিয়া বলিলাম।, “ইউরেকা ইউরেকা”।

 

*** ঠিক করিয়া ফেলিলাম একই দেশের দুই ভাষার চলচ্চিত্র দেখিব। আর ঠিক করিলাম একটা হইবে বাংলা অপরটা হিন্দি। কয়েকদিন যাবত আমাদের দেশের এক খাদ্যের নামে এক চলচ্চিত্রের নাম শুনিয়া আসিতেছিলাম। নাম তাহার “বরফি”। চিন্তা করিলাম ইহা দেখিয়া ফেলিব। সাথে ঠিক করিলাম, “আওয়ারা” নামক এক চলচ্চিত্র আসিয়াছে যাহার প্রেম কাহিনী এখন আকাশে বাতাসে ধ্বনিতেছে। ইহাই দেখিব বলিয়া মনস্থির করিলাম। এই বার আমার দেখিবার পালা শুরু হইল।

*** শেষ করিয়া উঠিলাম দুইখানা চলচ্চিত্রই। মনের কোন অংশে কি ভাব চলিতেছে তাহা বর্ণনা করা আমার পক্ষে সম্ভবপর হইয়া উঠিবে না। তাহার পরেও এই ২ খানা চলচ্চিত্র লইয়া ২ খানা কথা বলিবার বড় খায়েশ হইতেছে। মন বাবাজীর উপরে আগেও যেহেতু বল প্রদর্শন করি নাই। তাই আগের পন্থা অনুসরণ করিবার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিলাম। আমার সেই ২ খানা করে কথা নিম্নে আপনাদের জ্ঞাতার্থে আলোকপাত করিয়া দিলাম। কাহারো মতের সহিত অমিল খুঁজিয়া পাইলে আমার কোন দোষ নাই, আর কাহারো সাথে মিল পাইলে বাহবা দিতে কোনোরূপ কার্পণ্য করিবেন না।

 

 

বারফিঃ

ইহাকে লইয়া মিশ্র প্রতিক্রিয়া শুনিতেছিলাম। ইহাতে নাকি দৃশ্য চুরি করিয়া লইয়া এক মহা প্রদর্শনীর আয়োজন করা হইয়াছে। ইহা দেখিতে বসিয়া আমি তো হতবাক। যাহারা ইহার সাথে অন্য চলচ্চিত্রের মিল সমূহ ফটোর মাধ্যমে উপস্থাপন করিবার ব্রত লইয়াছিলেন তাহাদিগের কি ফটোতে স্থান সংকুলান হয়নি নাকি তাহারা ইচ্ছা করিয়া মমতা করিয়া অন্য ছায়া অবলম্বনে নির্মিত দৃশ্যগুলিকে এড়াইয়া গিয়াছেন তাহা ঠাওর করিয়া উঠিতে পারিলাম না। কারণ, আমি অত্যন্ত নগণ্য মুভির দর্শক। হাতে গুনে যে কয়েকটা ছবি দেখিয়াছি তাহার মধ্যেই অনেক দৃশ্য মিলিয়া মিশিয়া একাকার হইয়া গেল। অন্যান্য ছবি বোদ্ধাদের কেমন করিয়া তাহা সযতনে চক্ষু এড়াইয়া গেল? হিরু সাহেব তাহার অনেক কীর্তি কলাপ দেখাইয়া আমাদিগের মন জয় করিয়া লইলেন পুরো ছবিতে। যাহারা তাহার এইরূপ মজার কীর্তি দেখিয়া হাসিয়া লুটোপুটি খাইয়াছেন তাহাদের বলিতেছি, আসলেই তিনি ইহাতে ভাল অভিনয় পারদর্শিতা প্রদর্শন করিয়াছেন, তবে তাহার প্রায় সকল অভিনয় এবং অঙ্গভঙ্গি ছিল তথাকথিত “ছায়া অবলম্বনে”। যাহাদের মনে এখনও সন্দেহ নামক পোকার ভিটা বাড়ী রহিয়াছে তাহাদিগকে আমি Sir Charlie Chaplin নামক এক জনৈক ব্যক্তির ছবি সমগ্র হইতে তাহার অভিনয় দেখিয়া লইতে বলিব। এর পরেও আমি পরিচালক এবং নায়ককে সাধুবাদ জানাই কেননা তাহারা এত বড় একজনের অনুকরণের ধৃষ্টতা দেখাইয়াছেন, এবং অনেক অংশে (!!!) সফলকামও হইয়াছেন। আমার প্রধান হিরুইনের চরিত্র ভাল লাগে নাই। কিন্তু অন্য প্রদেশ হইতে আগত হিরুইনের অভিনয় বেশ লেগেছে। কাহিনীতে বেশ কিছু ফাঁকও রহিয়াছে। পরিচালক একদিকে নজর দিতে গিয়া অন্য কিছু চরিত্রকে বেমালুম ভুলিয়া গিয়াছেন যাহা ঠিক হয় নাই। তাহারা অপমানিত বোধ করিতে পারে। আজিকে আমি এই ছবি লইয়া বিশ্লেষণ করিব না। তাহা হইলে আপনারা আমকে গালাগাল দিয়া উঠিয়া যাইতে পারেন। তবে সব কথার শেষ কথা নকল করাও এক প্রকার কলা। এইখানে যেই কলার যথাযথ ব্যবহার হইয়াছে বলিয়া আমার ধারনা। এই কারনেই ছবি ভাল লাগে নাই বলিলে মিথ্যা বলা হইবে। আমার কাছে ছবিখানা উপভোগ্য বলিয়া মনে হইয়াছে। আপনারা যাহারা এখনও এর দর্শন পাননি তাহারা অতি সত্বর দর্শন দিয়া আসুন।

আওয়ারাঃ

নাম দেখিয়াই চমকিত হইয়াছিলাম। বাংলা শব্দ ভাণ্ডার অনেক বিরাট বলিয়াই জ্ঞাত ছিলাম। সেই বাংলা ছবির নাম দেখিয়া অবাক হইলাম। আমাদের দেশীয় ছবি না বলিয়া এই নিয়া চিন্তা করিলাম না। শুরু করিয়া দিলাম আমার অভিযান। শুরু হইতেই আমার ভ্রু যুগল কুঞ্চিত হইয়া উঠিল। হিরু প্রথম দৃশ্য হইতেই যে পরিমাণে ভাঁড়ামি করিতেছে, পুরো ছবি ইহা সহ্য করিতে হইবে ভাবিয়া আমার কণ্ঠ শুকাইয়া কাষ্ঠের ন্যায় হইয়া উঠিল। বহু কষ্টে বিরক্তি মহাশয়ের টুটি চাপিয়া ধরিয়া দেখিয়া যাইতে লাগিলাম। নায়িকার প্রেমে পড়িয়া যাইবার দৃশ্যতে আক্ষরিক অর্থেই হাসিয়া লুটোপুটি খাইতে লাগিলাম। আমার মা বলেন, “একখানি কৌতুক তখনই পরিপূর্ণতা পাইবে যখন তোমার অবস্থা চিন্তা করিয়া শ্রোতা সকল হাসিয়া উঠিবে কিন্তু তুমি থাকিবে তোমার স্থানে অবিচল”। আহা,!! আহা,!! কি যথার্থ উক্তি…!! আজিকে এতদিন পরে আসিয়া তাহা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করিতে লাগিলাম। ছবিতে তাহাদের রাশভারী মুখভঙ্গিতেই আমার হাসি পাইতেছিল, অন্য কোথাও নয়। মনের মধ্যে একটা জিনিস খোঁচা মারিয়া যাইতেছিল সেই প্রস্তর যুগ হইতেই। ছবিটা কোথায় জানি দেখিয়াছি। হঠাৎ করিয়া মনে পড়িয়া গেল, ইহা এক দক্ষিনী ছবির নকল। নকল বলিলে কম বলা হইবে। সকল কিছু শুধু “ধর তক্তা মার পেরেক” টাইপের নকল। আমি হা হইয়া দেখিতে লাগিলাম পরিচালক কি নিপুণভাবে নকল করিয়াছেন… একটা দৃশ্য এমনকি সংলাপ পর্যন্ত নতুন পাইলাম না। পরিচালক মহাশয় বোধ হয় আগে নির্মিত ছবিখানা সামনে ছাড়িয়া দিয়া বলিয়াছেন, ইহার মত কর, সংলাপ আওড়াইয়া যাও। আর সকলে তাহাই করিয়াছে। আসলে তাহাদের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে যাহারা অবগত আছেন তাহাদের বলিয়া দিতে হইবে না যে তাহাদের ছবির বর্তমান অবস্থা। তাহাদের ছবির সাথে জড়িত ব্যক্তিবর্গ নিজে ভাত বাড়িয়া খাইবার চেয়ে ইদানীং অন্যদের বাড়া ভাত খাইতেই অধিক রুচি বোধ করিয়া থাকেন। বিরক্তির এত চরম পর্যায়ে পৌঁছাইয়া গিয়াছি যে এই মুভি লইয়া আর কথা বলিতে ইচ্ছা করিতেছে না। ওহহো, আরেকটা জিনিস ভাল লাগিয়াছে, তাহা হইল ইহার গান। আগে শুনিয়াছিলাম একেবারে খারাপ বোধ হয় নাই। মন্দের ভাল বলিয়া একটা কথা রহিয়াছে। আমি তাই লইয়া শান্তিতে থাকিতে চাইলাম। যদিও ৪ খানা গানের মধ্যে আমার করন কুহরে ২ খানাকে নকল বলিয়া মনে হইতে লাগিল। কেহ যদি গানের কথার ভক্ত হইয়া থাকেন তবে এই গান না শোনাই শ্রেয়। আর কেহ যদি আমাকে এত কিছু বলিবার পরেও প্রশ্ন করে এই ছবিখানি দেখিব কিনা? আমি সোজা বাংলায় বলিয়া দিতেছি, “না”।

*** মনের উপরে জোর খাটাইয়া আজিকে দুইখান চলচ্চিত্র দেখিলাম। বিধির নির্মম পরিহাস, দুইখান চলচ্চিত্রই নকল। হায়রে, আমার পোড়া কপালে ইহাই ছিল? আফসোস করিতে করিতে আমার হিসাব-কারী যন্ত্রখানা বন্ধ করিলাম।

(Visited 50 time, 1 visit today)

মন্তব্য করুনঃ

You must be Logged in to post comment.

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন