“ঢাকা অ্যাটাক” একটি মানসম্মত বাণিজ্যিক বাংলা চলচ্চিত্র!

সিনেমাটি নিয়ে অনলাইন-অফলাইন দুই জায়গায়তেই প্রচুর আলোচনা হয়েছে। চারিদিকে এত মাতামাতি দেখে ভেবেছিলাম যত গর্জে তত বর্ষে না কিন্তু ভাবনা ভুল প্রমাণিত হয়ে সিনেমাটি বেশ ভাল লেগে গেলো। বাংলা চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে বারবার এমন ভুল প্রমাণিত হতেও আপত্তি নেই আমার। ভয়ঙ্কর সুন্দরের হতাশার পর দর্শকদের জন্য ঢাকা অ্যাটাক বড় ধরনের স্বস্তি বলা চলে। আমার অর্থ ও সময়ের সুবিচার হয়েছে।

সিনেমাটির সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হচ্ছে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত দর্শকদের মধ্যে একটা টানটান উত্তেজনা তৈরি করে রাখা। সিনেমার প্রথম দৃশ্য দিয়েই কৌতূহল সৃষ্টি করে শেষ পর্যন্ত সেটা টেনে নিয়ে যাওয়াটা পরিচালকের মুন্সিয়ানা বলা যায়। সিনেমার প্রাথমিক গল্প সম্পর্কে ইতিমধ্যে অনেকেই হয়তো জানেন। সন্ত্রাসীদের বোমা বিস্ফোরণ নিয়ে একদল ফোর্সের উদ্যমী ও সাহসী তদন্ত এবং অভিযান নিয়েই মূলত সিনেমার গল্প।

 

লোকেশন, বোমা নিষ্ক্রিয়ন, পুলিশ প্রশাসনের একাডেমীক বিষয়গুলো বেশ মানানসয় ও কনভিন্সিং ছিল। আর অ্যাকশন-থ্রিলার সিনেমা বলে ইমোশন কম ছিল এমন নয়। সিনেমায় রোমান্স ও আবেগের উপস্থিতিও ছিল।
সিনেমার টেকনিক্যাল বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিত লিখতে পারছিনা কেননা আমি এই বিষয়ে পারদর্শী নয়। তবে টেকনিক্যাল সেক্টর গুলোতে যে বেশ দক্ষ ও প্রফেশনাল মানুষজন নিয়োগ দেয়া হয়েছে সেটা সিনেমার দেখার সময়েই টের পাওয়া যাবে। সাসপেন্সের দৃশ্য গুলোতে ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক পার্ফেক্ট ছিল। পাশাপাশি গান হিসেবে অরিজিৎ এর গাওয়া “টুপ টাপ” শ্রুতিমধুর ও আদিতের গাওয়া “পথ যে ডাকে” গানটি সিনেমাতে সঠিকভাবেই ব্যবহার করা হয়েছে।

 

আরেকটি বিষয় হচ্ছে বাংলা সিনেমায় পুলিশের এত চমকপ্রদ প্রদর্শন সম্ভবত এই প্রথম দেখানো হয়েছে। পুলিশের নানাবিদ চৌকস ও ডিজিটাল কাজকর্মও সুন্দরভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। সিনেমাতে পুলিশ প্রশাসনের সরাসরি সম্পৃক্ততাও ছিল।

 

অভিনয় শিল্পীদের নিয়ে আলোচনা করতে গেলে প্রথমেই বলতে হয় সিনেমার ভিলেন চরিত্রে অভিনয় করা তাসকিন রহমানকে নিয়ে। একটি অ্যাকশন থ্রিলার সিনেমাকে এক্সসাইটেড করার পেছনে নেতিবাচক চরিত্র তথা খলনায়কের অনেক অবদান থাকে। সে হিসেবে তাসকিনের চাহনী, ডায়লগ এবং অভিব্যক্তি দুর্দান্ত। সাইকো ভিলেন চরিত্রে এর চেয়ে ব্যাটার অপশন আর কেউ আছে বলে আপাতত মনে হচ্ছেনা। জাস্ট ব্রিলিয়েন্ট!

তাসকিন রহমান

একজন সহকারী পুলিশ কমিশনার এবং বোমা নিষ্ক্রিয় বিশেষজ্ঞ হিসেবে আরিফিন শুভ নিঃসন্দেহে সেরা ছিল। সম্পূর্ণ সিনেমাতে তার আচার আচরণ বেশ প্রফেশনাল পুলিশ অফিসারের মতোই মনে হয়েছে। চতুর ও দক্ষ পুলিশ অফিসার চরিত্রে শুভকে বেশ মানিয়েছে। বাংলা চলচ্চিত্রে বর্তমানে তার এমন অবস্থান সত্যি সে ডিজার্ব করে।
বিশেষ ম্যানশনযোগ্য এ বি এম সুমন। সোয়াট অফিসারের রোলে অসাধারণ অভিনয় করেছেন তিনি, বিশেষ করে সিনেমার শেষের দিকে তার এক্সপ্রেশন মুগ্ধকর ছিল। এ বি এম সুমনকে কাজে লাগাতে পারলে একজন বড় স্টার হওয়ার যোগ্যতা রাখে সে। সিনেমার সুমনের স্ত্রীর চরিত্রে “নওশাবা” পর্দায় অল্পক্ষণ থাকলেও ভাল অভিনয় করেছেন। আর শতাব্দী ওয়াদুদ ও শিপন বেশ ভাল ছিল। মাহিয়া মাহিকে নিয়ে বিশেষ কিছু বলার নেই।

 

সিনেমায় সিনিয়র অভিনেতাদের মধ্যে সৈয়দ হাসান ইমাম, আলমগীর এবং আফজাল হোসেনের ক্যামিও তথা অতিথি চরিত্র ছিল। অল্প সময়ে পর্দায় উপস্থিত থাকলেও পুলিশের বড় অফিসার হিসেবে তাদের বেশ মানিয়েছে বলা যায়। ক্যামিও হলেও ওজনদার চরিত্র ছিল।

অবশেষে সিনেমার পরিচালক দীপঙ্কর দীপন ও রচয়িতা সানী সানোয়ারকে অভিনন্দন জানানো প্রয়োজন। হলে সিনেমা দেখার একটি বড় সুবিধা হচ্ছে তাত্ক্ষণিক দর্শক রিএকশন পাওয়া যায়। সিনেমা চলাকালীন সময়ে ও শেষ হবার পরে দর্শক রিএকশন দেখে মনে হচ্ছে সিনেমাটি বড়সড় হিট হতে যাচ্ছে। দীপঙ্কর দীপন ভারতের গুণী পরিচালক অনুরাগ কাশ্যপের সহকারী হিসেবে কাজ করেছিলেন। সুতরাং প্রতিভাবান মানুষ বলা চলে, সিনেমাতেও সেই পরিচয় দিয়েছেন।

 

সিনেমার নেতিবাচক দিকগুলো নিয়ে বিশেষ করে লিখারও কিছু নেই। আর কমার্শিয়াল ফিল্মের মানদণ্ডেই বিচার করেছি বলা চলে। সুতরাং গল্পের গভীরতা বা অন্যান্য জনরা মানদণ্ডে মাপাও অনুচিত। তবে বম্ব ব্লাস্টিং এর দৃশ্য গুলো আরো রিয়েলিস্টিক করা যেত। দেশীয় চলচ্চিত্র হিসেবে বাজেটের কথা ভেবে ছাড় দেয়া যায়।

 

মোটকথা এই ছিল ঢাকা অ্যাটাক নিয়ে আমার ব্যাক্তিগত অভিমত। “ঢাকা অ্যাটাক”-একটি মানসম্মত বাণিজ্যিক বাংলা চলচ্চিত্র, আপনাদের ভালো লাগবে আশা করি। সম্ভব হলে সিনেমাহলে গিয়ে দেখে ফেলুন। ধন্যবাদ।

(Visited 1,422 time, 1 visit today)

এই পোস্টটিতে ৪ টি মন্তব্য করা হয়েছে

  1. Is Noman says:

    আশা করি কাল/ পরশু দেখতে যাব…….

  2. আজ দেখবো, অবশ্যই হলে গিয়ে

মন্তব্য করুনঃ

You must be Logged in to post comment.

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন