Blade Runner 2049: The Sci-fi Art
Share on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on TwitterPin on Pinterest0

লস অ্যাঞ্জেলেস, ২০৪৯। ত্রিশ বছরের মাঝে পৃথিবীর ক্ষতি হয়েছে আরো অনেক। অফ-ওয়ার্ল্ড কলোনিতে মানুষের পদার্পন আগের চেয়ে বেশি। তবে এখন আরো উন্নতমানের রেপ্লিকেন্ট ব্যবহার করছে মানুষ। বায়ো-ইঞ্জিনিয়ার্ড নতুন মডেলের রেপ্লিক্যান্ট অফিসার কে, লস অ্যাঞ্জেলেস পুলিশ ডিপার্টমেন্টের একজন ব্লেড রানার, যারা কাজ শুধু উপর থেকে আসা আদেশ পালন করা। মূলত তার কাজ পুরনো মডেলের রেপ্লিক্যান্ট রিটায়ার্ড করা। এমনই এক রেপ্লিক্যান্টকে রিটায়ার্ড করতে গিয়ে আবিষ্কার করে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য, যা বদলে দিতে পারে এই দুনিয়ার অনেককিছু।

 

১৯৮২ সালে কিংবদন্তী পরিচালক রিডলি স্কটের পরিচালনার ‘ব্লেড রানার’ এর সিক্যুয়েল ‘ব্লেড রানার ২০৪৯’ আবারো দর্শকদের ফিরিয়ে নিয়ে গেলো বায়ো-ইঞ্জিনিয়ার্ড সিনথেটিক হিউম্যান রেপ্লিকেন্টদের নিয়ে আলোচিত ডিস্টোপিয়ান দুনিয়ায়। কিন্তু ‘ব্লেড রানার ২০৪৯’ শুধুমাত্র ১৯৮২ সালের মূল ছবির গল্প শেষ করার জন্যে সিক্যুয়েল নয়। এই সিনেমার নিজস্ব একটা নতুন গল্প আছে, একদমই শুধু মূল ছবির থেকে টেনে নিয়ে সিক্যুয়েল হিসেবে একটি ধারাবাহিকতা বজায় রাখার জন্যে নয়, বরঞ্চ আগের গল্পের প্রভাব এবং ত্রিশ বছর পরের নতুন গল্পের মিশ্রণে একদমই নিজস্ব সিনেমা ‘ব্লেড রানার ২০৪৯’

 

১৯৮২ সালের মূল সিনেমার অনুপ্রেরণা ফিলিপ কে ডিক এর ‘Do Androids Dream of Electric Sheep?’ বইয়ের তুলনায় সিনেমাতে এর দার্শনিক চিন্তাভাবনার কমই ফুটে উঠেছিলো। তবে এবার প্রায় তিন ঘন্টার সিনেমায় দার্শনিক বিষয়াদি ব্যবহার করা হয়েছে আগেরচেয়ে বেশি, আলোচনাও হয়েছে অনেক, কিন্তু বেশ সূক্ষ্মভাবেই। পরিচালক ডেনিস ভিলেন্যোভ আর চিত্রনাট্যকার হ্যাম্পটন ফ্যাঞ্চার দুইজনেই দারুণ গবেষণা করেছেন এই সিনেমার পিছনে। বিভিন্ন ধরণের গল্প, অন্যান্য বিখ্যাত সায়েন্স ফিকশন বই ও সিনেমার থেকে অনুপ্রেরণা এবং আগেরবারের মতোই কিছু পরিচিত দার্শনিক তত্ত্বের ব্যবহার।

 

রেপ্লিকেন্টরা বায়ো-ইঞ্জিনিয়ার্ড সিনথেটিক মানুষ। অনেকটাই ইতিহাসের প্রথম সায়েন্স ফিকশন উপন্যাস মেরি শেলির বিখ্যাত ‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন’ গল্পের মতোই। ফ্রাঙ্কেনস্টাইন এর দানব আর মানুষের মাঝে পার্থক্য করার সময় ফ্রাঙ্কেনস্টাইন এর মনে এসেছিলো, তার তৈরি জীবটা মানুষ নয়, কারণ তার ‘soul’ নেই। ‘Soul’ বলতে আক্ষরিক অর্থে শুধু আত্মা বা সৃষ্টিকর্তার সৃষ্ট জীব বলে নয়, বরং মানুষের মানুষ হয়ে ওঠার কারণগুলোও বোঝায়। অর্থাৎ সেই দার্শনিক প্রশ্ন, ‘What does it mean to be a human?’ রেপ্লিকেন্টদের এমনভাবে তৈরি করা হয় যে তাদের মাঝে কোনো অনুভূতি (empathy) দেয়া হয় না। কিন্তু তারপরও কী কোনোভাবে আসল মানুষের মতো ভালোবাসা, চিন্তা করা, বিভিন্ন অনুভূতি ধারণ করা কী সম্ভব রেপ্লিকেন্টদেরও? এরকম মানুষের বিভিন্ন দার্শনিক তত্ত্বের অবতারণা করা হয়েছে রেপ্লিকেন্টদের চিন্তার মাধ্যমে। তাদের মধ্য দিয়ে তুলে ধরা হয়েছে আমাদেরই কথা।

 

১৯৯৯ সাল থেকেই ‘ব্লেড রানার’ এর সিক্যুয়েল করার চিন্তা করছিলেন রিডলি স্কট। কিন্তু সময়ের কারণে, আবার অন্য প্রোজেক্টের কারণে বিভিন্ন সময়ে শুরু করতে গিয়েও করা হয়নি। অবশেষে ২০১৫ সালে রিডলি স্কট শুধুমাত্র প্রযোজকের আসনে বসে পরিচালনার ভার তুলে দেন সময়ের আলোচিত পরিচালক কানাডিয়ান ডেনিস ভিলেন্যোভ এর হাতে। আর চিত্রনাট্যের দায়িত্বে আসেন মূল ছবির লেখক হ্যাম্পটন ফ্যাঞ্চার। এরপরে আর বেশি সময় লাগেনি কাজ এগোতে। হ্যারিসন ফোর্ড তার চরিত্র অফিসার ডেকার্ড হিসেবে ফিরে আসতে আগেই রাজি ছিলেন। এবারের মূল চরিত্র অফিসার কে চরিত্রে একবারেই নিয়ে নেওয়া হয় রায়ান গসলিং কে। সাথে অন্যান্য চরিত্রে আসেন রবিন রাইট, ডেভ বাতিস্তা, কিউবান অভিনেত্রী অ্যানা ডি আর্মাস, ডাচ অভিনেত্রী সিলভিয়া হয়েক্স। ফটোগ্রাফি ডিরেক্টর হিসেবে আসেন বিখ্যাত সিনেমাটোগ্রাফার রজার ডিকিনস।

 

 

সিনেমার গল্প যতোটা দার্শনিক আর বৈজ্ঞানিক তত্ত্বে ভরপুর, সিনেমার তৈরিও ঠিক ততোটাই সুন্দর। রজার ডিকিনসের ক্যামেরার কাজ অতিমাত্রায় অসাধারণ। যথেষ্ট পরিমাণে শৈল্পিক ও নান্দনিক সিনেমাটোগ্রাফি সারাক্ষণ আলাদাভাবে টেনে রেখেছিলো পর্দার দিকে। সিনেমার শুরুর অ্যারিয়েল শট থেকে শুরু করে শেষ ফ্রেম পর্যন্ত চোখে আলাদা প্রশান্তি দিয়েছেন মিস্টার ডিকিনস। সেট ডিজাইন এবং সিনেমার গ্রাফিক্সের কাজও অসাধারণ। জায়ান্ট হলোগ্রাফ কিংবা সাধারণ মানবাকৃতির হলোগ্রাফই হোক না কেন, গ্রাফিক্সের কাজ নিখুঁত। কালার গ্রেডিং দুর্দান্ত। চোখের একপ্রকার আরামই বলা চলে এই সিনেমার ভিজ্যুয়াল। একই সাথে প্রতিটা দৃশ্যের সাথে ছিলো ভয়াবহ শব্দের কারুকাজ। এই সিনেমার টেকনিক্যাল সেরাগুলোর দিকে প্রথমে সিনেমাটোগ্রাফি থাকলে এর পরেই থাকবে সাউন্ড এফেক্টস। ক্লাইমেক্স থেকে অ্যাকশন কিংবা ছোটখাট ডিটেইলস এর ক্ষেত্রেও শব্দের কাজ অসাধারন। দুঃখের সাথেই বলতে হচ্ছে, আপনার বাসায় যদি হোম থিয়েটার না থাকে, এর কিছুই আপনি বুঝতে পারবেন না বাসায় দেখে। হলে এই সিনেমা না দেখলে যে কি ভুল করতাম সেটা লাউড স্পিকারের প্রতিটা জোড় শব্দের দৃশ্যেই বুঝতে পেরেছি। সাউন্ড এডিটিং এবং সাউন্ড মিক্সিং এ অস্কার নমিনেশন পাবে ‘ব্লেড রানার ২০৪৯’। এবং রজার ডিকিনসের হাতে সিনেমাটোগ্রাফির অস্কার আশা করাই যায়।

 

 

ডেনিস ভিলেন্যোভ আবারও নিজেকে প্রমাণ করলে সময়ের অন্যতম সেরা পরিচালক হিসেবে। আগেই বলেছি, সিক্যুয়েল হলেও এই সিনেমার নিজস্ব আলাদাভাবে একটা গল্প রয়েছে। মূল ছবির এতো বছর পরে তৈরি হলেও আগের গল্পের থেকে গল্প নেওয়া আর নিজের গল্পে শুরু থেকে শেষ এর সিনেমা এটি। এভাবেই একে উপস্থাপন করেছেন ভিলেন্যোভ। ডিস্টোপিয়ান দুনিয়ার মাঝেও হারিয়ে যাওয়া পৃথিবীর প্রতি মানুষের আকর্ষণ দেখানোর জন্যেই এর মাঝেই পুরোনো হলোগ্রাফে দেখিয়েছেন এলভিস প্রিসলিকে, জুকবক্সে শুনিয়েছেন ফ্রাংক সিনাত্রাকে। দুই আলাদা সময়ের কাহিনির মাঝে একটা সুতো বেঁধে দিয়েছেন গল্পের বর্ণনার জন্যে। ভিজ্যুয়ালি তিনি কোনো গল্পের বই এর ন্যারেটর এর মতোই বর্ণনা করেছেন কাহিনিকে। যে জিনিস তিনি বানিয়েছেন, এটি একটা উদাহরণ হয়ে থাকবে চলচ্চিত্র ইতিহাসে ভবিষ্যতের জন্যে, যেমনটা এর আগে অনেক পরিচালক তাদের ম্যাগনাম ওপাস তৈরি করে গিয়েছেন। ‘ব্লেড রানার ২০৪৯’ ডেনিস ভিলেন্যোভ এর ম্যাগনাম ওপাস। এবং তার ক্যারিয়ার এখনো সামনে অনেক লম্বা।

 

ডেনিস ভিলেন্যোভ, রিডলি স্কট, হ্যারিসন ফোর্ড এবং রায়ান গসলিং

 

সিনেমার মিউজিকের দায়িত্বে ছিলেন কিংবদন্তি মিউজিশিয়ান হ্যান্স জিমার আর তাঁর ‘ডানকার্ক’ সহযোগি বেন ওয়ালফিস্ক। এ বছর মনে হচ্ছে না এনাদের হাতছাড়া হচ্ছে অস্কারের সেরা অরিজিনাল স্কোর এর পুরষ্কার। প্রথমে ‘ডানকার্ক’ তো আছে, আর এখন ‘ব্লেড রানার ২০৪৯’। মিউজিক এক কথায় অসাধারণ। আলাদা একটা স্বাদ যোগ করেছে সিনেমায়। এই সিনেমার টেকনিক্যাল দিকগুলোর কাজ অনেক বেশি সুন্দর। কিন্তু তার আড়ালে ঢাকা পরেনি অভিনয়ের ক্যারিশমা।

 

Ryan Goshling as Officer K

 

রায়ান গসলিং অনবদ্য তার চরিত্রে। অফিসার কে ভয়ংকর এবং আবেগাক্রান্ত দুইটি দিকই একই সাথে ফুটিয়ে তুলেছেন গসলিং। ভিলেন্যোভ এর প্রথম পছন্দ ছিলো রায়ান এবং স্ক্রিপ্ট পড়ে নির্দিধায় রাজি হয়ে যান এই চরিত্রে। রায়ানের অন্যতম সেরা অভিনয় দেখলাম এই সিনেমায়। আর সেই অফিসার ডেকার্ড চরিত্রে হ্যারিসন ফোর্ড পর্দায় বেশ কম সময় থাকলে সেইটুক সময়েই তার ভেলকি দেখিয়ে দিয়েছেন। হ্যারিসন ফোর্ড এতোদিন পরেও সেই ডেকার্ডকেই ফিরিয়ে নিয়ে এসেছিলেন পর্দায়।

 

Harrison Ford as Rick Deckard

 

একজনের কথা একটু আলাদা করে বলতে হয়, তিনি হচ্ছেন জ্যারেড লেটো। অস্কারজয়ী এই অভিনেতার স্বার্থক ব্যবহার করেছেন ভিলেন্যোভ। আগের সিনেমার টাইরেল কর্পোরেশন এর রাজত্ব শেষে এবার রাজত্ব করছে ওয়ালেস কর্পোরেশন, যার প্রধান নিয়ান্ডার ওয়ালেস এর চরিত্রে অভিনয় করেন জ্যারেড লেটো। এবং তার অভিনয় ভয়ংকর। না, কোনো উচ্চমাত্রার অ্যাকশন কিংবা ফেসিয়াল এক্সপ্রেশন নেই তার, কিন্তু তারপরও তার অভিনয় ছিলো মাত্রাছাড়া ভয়ংকর। খুবই ধীরস্থিরভাবে প্রতিটা ডায়লগের মাঝে দিয়ে তার চরিত্রের ভয়াবহতা দেখিয়েছেন, কারণ চরিত্র ছিলো এক অন্ধের। হ্যাঁ, টাইরেল কর্পোরেশনের যেখানে শেষ, সেখানেই শুরু নিয়ান্ডার ওয়ালেসের। এমনটাই দেখানো হয়েছে। যারা মূল ছবি দেখেছেন, তাদের এই সম্পর্ক বুঝতে আশাকরি সমস্যা হবে না।

 

Jared Leto as Niander Wallace

 

বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনির মাঝে দর্শনের মিশ্রণের সাথে তৈরি এই গল্পের সিনেমার বিভিন্ন অংশ থেকে অন্য অংশের মিলকরণ করে একটা বিশাল গল্পের ‘নেটওয়ার্ক’ তৈরি করেছেন ফ্যাঞ্চার এবং ভিলেন্যোভ। টুপি খোলা সম্মান তাদেরকে। ভিজ্যুয়াল প্রেজেন্টেশন থেকে অভিনয় কিংবা টেকনিক্যাল সাপোর্ট আর একটা গল্প; সব মিলিয়ে একটা সার্থক সিক্যুয়েল এবং মাস্টারপিস সিনেমা ‘ব্লেড রানার ২০৪৯’

 

Blade Runner 2049

Year: 2017
Genre: Neo-noir, Science Fiction, Dramma, Action
Based on: Characters from ‘Do Androids Dream of Electric Sheep?’ by Philip K. Dick
Director: Denis Villeneuve
Cast: Ryan Gosling, Harrison Ford, Robin Wright, Ana de Armas, Jared Leto, Sylvia Hoeks, Dave Bautista

 

IMDb Rating: 8.5/10
My Rating: 9/10
Rotten Tomatoes: 88% Certified Fresh

 

 

 

Error: No API key provided.

মন্তব্য করুনঃ

You must be Logged in to post comment.

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন