ব্লেড রানার: দর্শন আর বিজ্ঞানের মিলন যেখানে
Share on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on TwitterPin on Pinterest0

লস অ্যাঞ্জেলেস, ২০১৯। পৃথিবী ছেড়ে মানুষের জীবন ছড়িয়ে গেছে অন্য গ্রহেও। শুধু কথায় নয়, আদতেও আকাশছোঁয়া দালানে বাস করা মানুষের এই জীবনে সাহায্যকারী হিসেবে তৈরি করা হয় মানুষের মতো করেই তৈরি করা বায়ো-ইঞ্জিনিয়ার্ড অ্যান্ড্রোয়েড, যাদেরকে বলা হয় রেপ্লিকেন্ট। টাইরেল কর্পোরেশনের তৈরি এই রেপ্লিকেন্টের পৃথিবীর বাইরের বিদ্রোহের কারণে নিষিদ্ধ করা হয় পৃথিবীর মাটিতে। আর তাই পুলিশের বিশেষ স্কোয়াড ব্লেড রানারদের দায়িত্ব দেওয়া হয় রেপ্লিকেন্টদের ‘রিটায়ার্ড’ করতে, অর্থাৎ, মেরে ফেলতে।

 

এই থিমের উপর ভিত্তি করে লেখা বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি লেখক ফিলিপ কে ডিক এর ১৯৬৮ সালের উপন্যাস ‘Do Androids Dream of Electric Sheep?’। লেখকের কল্পকাহিনিগুলোর মাঝে সবচেয়ে আকর্ষণীয় যে অংশটা থাকে, সেটা হচ্ছে বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি হলেও সেখানে বর্তমান (তার সময়ের বর্তমান) এবং কল্পনার ভবিষ্যতের দারুণ এক মিশ্রণ কাজ করে। তাই উপন্যাসের অ্যাডাপশন ‘ব্লেড রানার’ চলচ্চিত্রের অন্যতম আকর্ষণ এক কল্পনার জগতের মাঝেও চিরচেনা কিছু জিনিস দেখতে পাওয়া।

 

১৯৮২ সালে এই চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন বিখ্যাত পরিচালক রিডলি স্কট। নিও-নয়্যার সায়েন্স ফিকশন ঘরানার এই ছবি যদিও বইয়ের খুবই লুজ অ্যাডাপশন। বই এর দার্শনিক এবং বৈজ্ঞানিক আলোচনার বাইরে পুলিশি তদন্ত আর অ্যাকশনই বেশি দেখানো হয়েছে, কিন্তু যদি সেকেন্ডারি প্লটগুলো ব্যবহার করা হতো সঠিকভাবে, তাহলে আরো বেশি মাত্রাছাড়া হতে পারতো।

 

সিনেমার কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করেন হ্যারিসন ফোর্ড, বাউন্টি হান্টার ব্লেড রানার রিক ডেকার্ড চরিত্রে। আগেই বলেছি, সিনেমার আকর্ষণের অন্যতম অংশ কল্পনা এবং বাস্তবের মিশ্রণ। আকাশে ওড়া গাড়ি, সত্যিকার অর্থে আকাশছোঁয়া বিল্ডিং, মানুষের মতোই চলাফেরা করা অ্যান্ড্রোয়েড; এতোকিছুর মাঝেও সাধারন গোয়েন্দাকাহিনির মতো হ্যারিসন ফোর্ডের তদন্ত করে চলা। হ্যারিসন ফোর্ডের অন্যতম সেরা কাজ শতাব্দীর অন্যতম সেরা এই ছবিতে।

 

তবে শতাব্দীর অন্যতম সেরা এই চলচ্চিত্র একদম শুরু থেকেই ছিলো না। বক্স অফিস সাফল্য তো তেমন ছিলই না, সমালোচকদের প্রশংসাও একবারে পায়নি। ধাপে ধাপে এই চলচ্চিত্র মানুষের এবং সমালোচকদের মন কেড়েছে, স্থান করে নিয়েছে কাল্ট-ক্লাসিক এক বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি চলচ্চিত্র হিসাবে।

 

সিনেমার কাহিনি খুব বেশিই সাধারণ, কিন্তু এই সাধারণ ঘটনার পাশাপাশি যে অসাধারণ গল্প চলছিলো, সেটা আর সামনে আনেন নি রিডলি স্কট। শুধুমাত্র রেপ্লিকেন্ট-ব্লেড রানার এর মধ্যকার ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়াকেই পুঁজি করেছেন। বই এর মতো বিস্তৃতভাবে আলোচনা করেননি দার্শনিক, ধর্মীয় আর বৈজ্ঞানিক অংশগুলোকে।

 

Routger Houer as Roy Batty

 

সিনেমার অ্যান্টাগনিস্ট হিসেবে রেপ্লিকেন্ট রয় বেটির চরিত্রে ছিলেন ডাচ অভিনেতা রৌজগের হাওয়ার। অ্যান্ড্রোয়েড এর চরিত্র হলেও, এই রয় বেটি চরিত্রের মাধ্যমে বিভিন্ন দার্শনিক চিন্তাভাবনা তুলে ধরা হয়। অ্যান্ড্রোয়েড কি মানুষের তৈরি বলেই কি শুধু তাদের মানুষের মতো জীবন নেই? তাহলে কেনো তাদের মানুষের আদলেই তৈরি করলো আরেকজন মানুষ? এমন অনেক প্রশ্ন রয় বেটির মানুষের কাছে। মেরি শেলির ‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন‘ এর দানব অথবা গড এবং লুসিফারের গল্পের মতো করে দেখানো হয় রেপ্লিকেন্ট রয় বেটি আর তার উদ্ভাবক এলডন টাইরেলকে। টাইরেলের আকাশছোঁয়া দালান আর মাটিতে চলা সাধারণ মানুষের মাঝে তুলনা করে দেখানো হয়েছে স্বর্গ-মর্ত্যের তফাত। যেখানে মাটিতে চলা সাধারণ মানুষ এই দুনিয়ায় এখন চাইলেই জীবিত-আসল কোনো প্রাণী কেনার সামর্থ্য রাখে না, যারা পারে না তারা ব্যবহার করে অ্যান্ড্রোয়েড প্রাণী; যেখানে নিজস্ব জীবিত প্রাণী তার মালিকের বিশেষ মর্যাদা বোঝায়। বই এর নাম ‘Do Androids Dream of Electric Sheep?’ তাই শুধু মেটাফরিক্যালি অ্যান্ড্রোয়েডরা স্বপ্ন দেখে কিনা তাই বোঝায় না, বোঝায় তারাও আসলে এই ডিস্টোপিয়ান দুনিয়ায় মর্যদা নিয়ে বেঁচে থাকারা আশা করে কিনা।

 

এরকমভাবে আরো অনেক দার্শনিক তত্ত্ব বই এ আলোচিত হলেও সিনেমায় হয়নি। তারপরও এই সিনেমার আবেদন গল্পের চেয়ে বেশি এর মেকিং এ। নিও-নয়্যার জন্রা এবং চিয়ারোস্কুরো (অন্ধকারাচ্ছন) সিনেমাটোগ্রাফির সাথে আছে এর বিশাল সেট আর নন-ডিজিটাল ভিজ্যুয়াল এফেক্ট, যেটাকে অন্যতম সেরা এফেক্ট হিসেবে গণ্য করা হয়। আর তাই আর্ট ডিরেকশন এবং ভিজ্যুয়াল এফেক্ট; দুই বিভাগেই অস্কার নমিনেশন লাভ করে ‘ব্লেড রানার’।

 

 

‘ব্লেড রানার’ সিনেমার কালচারাল ইমপ্যাক্ট অনেক বিস্তৃত। মিডিয়া ফ্রাঞ্চাইজ ‘গোস্ট ইন দ্য শেল’ এর ধরণ-গল্প; দুটোই ‘ব্লেড রানার’ এর থেকে অনুপ্রাণিত। এর বাইরে আরো অনেক ফিল্ম-টিভি সিরিজ, ভিডিও গেমস, কমিক, সংগীতে এই সিনেমার বিভিন্ন উপাদান নেওয়া হয়েছে। অ্যালেক্স গারল্যান্ডের ২০১৫ সালের সাই-ফাই সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার ছবি ‘এক্স ম্যাকিনা’ এর অনুপ্রেরণাও অফিসার ডেকার্ড আর তার টুরিং টেস্ট এর আদলের ‘ভয়েট-কাম্পফ’ টেস্ট এর অংশ থেকে। সিনেমার মনোলগ ‘টিয়ার্স ইন রেইন’ আলাদাভাবেই দারুণ জনপ্রিয়।

 

১৯৮২ সালের পরে এই সিনেমার থিয়েট্রিকাল ভার্সন সহ মোট সাতটি ভার্সন আছে। তবে ১৯৯২ সালের ‘ডিরেক্টরস কাট’ আদতে রিডলি স্কটের ভার্সন নয়। তিনি নিজেই এই ভার্সন পছন্দ করেন নি। পরবর্তীতে ২০০৭ সালে তাঁর ফাইনাল কাট রিলিজ করা হয়। যেখানে প্রথমবারের মতো রিক ডেকার্ড এর ইউনিকর্ন ড্রিম সিন যোগ করা হয়, যেটা মূলত প্রয়োজনীয় একটা অংশ ছিলো সিনেমার শেষ দৃশ্যের খাতিরে।

 

‘ব্লেড রানার’ একবার শুধু দেখলে আসলে কার কতোটা ভালো লাগবে বলা মুশকিল। তবে বইটা পড়া থাকলে অথবা সিনেমা দেখার পরে ঘাটাঘাটি করলে যে বেশ আগ্রহ জাগানিয়া জিনিসপত্র পাবেন, তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। ১৯৮২ সালে তৈরি এই সিনেমা তাই এতো বছর জুড়ে তৈরি করে নিয়েছে সিনেমা ইতিহাসে এক অনন্য স্থান এবং আবেদন। সেই আবেদনের জন্যেই ৩৫ বছর বাদে এবছর মুক্তি পেয়েছে সিক্যুয়েল ‘ব্লেড রানার ২০৪৯’, যেখানে আলোচিত হবে আরো অনেক আকর্ষণীয় তত্ত্ব-কাহিনি। কানাডিয়ান পরিচালক ডেনিস ভিলন্যুয়েভের পরিচালনা আর অভিনয়ে রায়ান গসলিং, জ্যারেড লেটোর সাথে হ্যারিসন ফোর্ডের ফিরে আসা এই সিক্যুয়েল ইতোমধ্যে মূল ছবির ফ্যান-ফলোয়ার এবং সমালোচকদের জোড় প্রশংসা পাচ্ছে। ‘ব্লেড রানার’ যেখানে শেষ হয়েছে তার ত্রিশ বছর পরের গল্প থেকে শুরু হবে এর গল্প, উন্মোচিত হবে আরো অনেক তথ্য এই নন-ইউটোপিয়ান দুনিয়ার।

 

ধর্ম, দর্শন, বিজ্ঞান; এই তিনের মিশ্রণে যে গল্প ছিলো বই এ, তার সম্পূর্ণ স্বাদ হয়তো ‘ব্লেড রানার’ এ পাওয়া যাবে না। তবে রিডলি স্কট তার চমৎকার পরিচালনায় যে সিনেমা তৈরি করেছেন তার স্বাদও কম নেয়। সূক্ষ্মভাবে যে ধারণাগুলো সিনেমার মাঝে আলোচিত হয়েছে, সেটুকুও বদলে দিতে পারে আপনার চিন্তাধারা।

 

Blade Runner
Year: 1982
Genre: Neo-noir, Science Fiction
Based On: ‘Do Androids Dream of Electric Sheep’ by Philip K. Dick
Diretor: Ridley Scott
Cast: Harrison Ford, Rutger Hauer, Sean Young, Edward James Olmos
Rated: R

IMDb Rating: 8.2/10
My Rating: 8.5/10
Rotten Tomatoes: 90%

 

Error: No API key provided.

এই পোস্টটিতে ১টি মন্তব্য করা হয়েছে

মন্তব্য করুনঃ

You must be Logged in to post comment.

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন