মার্ভেল সিনেম্যাটিক ইউনিভার্সের মার্ভেলাস স্বপ্নযাত্রা

১৯৯৬ সাল। বিশ্বখ্যাত মার্ভেল কমিকসের অফিসে তখন নেমে এসেছে অন্ধকার। ক্যাপ্টেন অ্যামেরিকা, ফ্যান্টাস্টিক ফোর, এক্স-মেন, স্পাইডারম্যান, আয়রন-ম্যান, থর, হাল্ক- আমাদের কিশোরবেলার সাথীদের হয়তো বিদায় নিতে হবে। কারণ মার্ভেল তখন দেউলিয়া। শেষমেশ সবাইকে বিদায় দিতে না হলেও তাদের হাতছাড়া হয়ে যায় সেরা সেরা অস্ত্রগুলো। স্পাইডারম্যান নিয়ে নেয় সনি আর ফ্যান্টাস্টিক ফোর এবং এক্স-মেন চলে যায় টোয়েন্টিয়েথ সেঞ্চুরি ফক্সের কাছে।

 

সাল ২০০০। সনি বাজিমাত করে ফেলেছে স্পাইডারম্যান দিয়ে। ফক্সও বাজিমাত করেছে এক্স-মেন দিয়ে। মার্ভেলকে হয়তো নামেমাত্র রেখেছে সাথে, কিন্তু তাতে কি আর মন ভরে? ২০০৩ সালের ডেয়ারডেভিল হোঁচট খেলেও মার্ভেল কমিকসের দামই আলাদা। সেখানে তাদের এমন দুরবস্থা দেখে কিছুটা দুঃখই হয় বইকি।

 

এবার একটানে চলে আসি ২০১৫ সালে। মার্ভেল সিনেম্যাটিক ইউনিভার্স এখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় স্টুডিওগুলোর একটা। শুধুমাত্র নিজেদের ছবি বানিয়েই প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলার আয় করেছে তারা মাত্র ৭ বছরে। ২০০৮ সালে ছাই থেকে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে কীভাবে তারা সাথে সাথেই আধিপত্য স্থাপন করলো অতিমানবের সেলুলয়েড জগতে? কীভাবে তারা উদ্ধার করলো হারানো সাম্রাজ্য?

 

আমার কাছে মার্ভেলের এই সাফল্যের রহস্য যা মনে হয়েছে, সেটা নিয়েই একটু ফ্যানগার্লিং করা যাক। আবারও মনে করিয়ে দিই এটা মার্ভেল সিনেম্যাটিক ইউনিভার্স, যেখানের প্রতিটা ক্যারেক্টার তাদের নিজেদের হাতে আছে এবং প্রতিটা ছবিই তাদের একান্ত নিজেদের। ফক্স মার্ভেল, তথা এক্স-মেন বা ফ্যান্টাস্টিক ফোর না (যেটা কিছুদিনের মধ্যেই হয়তো বাড়ি ফিরে আসবে)।

 

 

১। এখানে সবার জন্যই কিছু না কিছু আছে। পিওর কমিক বুক সুপারহিরো মুভির সংজ্ঞাই তো তারা, সাথে অন্য জনরাও তারা এক্সপ্লোর করছে। উইন্টার সোলজার দিয়ে পলিটিকাল থ্রিলার, থর ১ দিয়ে শেক্সপিয়ারিয়ান ড্রামা (হ্যামলেটের গন্ধ পেয়েছেন কি? ডিরেক্টর কেনেথ ব্র্যানা অবশ্য শেক্সপিয়ার মুভি করেই নাম করেছেন), দ্য ফার্স্ট অ্যাভেঞ্জার দিয়ে পিরিয়ড এস্পিওনাজ প্রেস্টিজ থ্রিলার, গার্ডিয়ানস দিয়ে স্পেস অপেরা।

 

২। টপ নচ কাস্টিং। রবার্ট ডাউনি জুনিয়র, মার্ক রাফেলো, স্যাম এল জ্যাকসন, নাটালি পোর্টম্যান, গুইনেথ প্যালট্রো, স্কারলেট জোহানসন, জেরেমি রেনার, ডন চিডল, এডওয়ার্ড নর্টন, মাইকেল ডাগলাস, রবার্ট রেডফোর্ডের মত হেভিওয়েট অভিনেতারাও যেমন আছেন, তেমনি আছেন তিন ক্রিস- হেমসওয়ার্থ-এভান্স-প্র্যাট, টম হিডলস্টন কিংবা ভবিষ্যতের টম হল্যান্ডের (ভালো করিস, ভাই। অনেক আশা নিয়ে বসে আছি) মত আপ-অ্যান্ড-কামিং অভিনেতারাও, যারা স্বল্পখ্যাত ছিলেন এর আগে, কিন্তু পারফেক্ট কাস্টিংয়ের জোরে চমৎকার অভিনয় করে বাজিমাত করেছেন (এ পর্যন্ত যাদের দেখা গেছে)।

 

তারপরে আছেন ক্লাসিক অভিনেতারা- টম হিডলস্টন ছাড়াও আছেন অ্যান্থনি হপকিন্স, হিউগো উইভিং, টিম রথ, ইদ্রিস এলবা, বেন কিংসলি এবং ভবিষ্যতে দেখা যাওয়া বেনেডিক্ট কাম্বারব্যাচ ও মার্টিন ফ্রিম্যান। যে টিল্ডা সুইন্টন নারনিয়ার আগে-পরে ব্লকবাস্টারের ছায়াও মাড়ায়নি, তাকেও দেখা যাবে ডক্টর স্ট্রেঞ্জে।

 

সাপোর্টিং ক্যারেক্টারগুলোতে আছে কার্যকর কাস্ট। তাদের কেউ হয়ত আগে খুব একটা পরিচিত ছিলো না, কেউ হয়তো ছিলো (যেমন, স্টেলান স্কার্সগার্ড)। সবগুলোতে ক্রুশাল সব কাস্টিং ফাটিয়ে দিয়েছে মার্ভেল। যেমন পেগি কার্টার চরিত্রে হ্যালি অ্যাটওয়েল, ইয়াং হাওয়ার্ড স্টার্ক চরিত্রে ডমিনিক কুপার, বাকি বার্নসের চরিত্রে সেবাস্টিয়ান স্ট্যান, জাস্টিন হ্যামার চরিত্রে স্যাম রকওয়েল, স্কারলেট উইচের চরিত্রে এলিজাবেথ ওলসেন, ভিশন চরিত্রে পল বেটানি, তারপর অ্যান্ডি সারকিস, চুইটেল এজিওফোর, ড্যানিয়েল ব্রিল, ইভাঞ্জেলিন লিলি, জেরেমি রেনার, অ্যারন টেলর-জনসন, জোয়ি সালডানা, ডেভ বতিস্তা, লিভ টাইলার, আরও হাজারটা উদাহরণ দেয়া যাবে।

 

মার্ভেল সবার ওপরেই বিশ্বাস রেখেছিলো আর সেটা প্রত্যেকের অভিনয়েই ফুটে উঠেছে সেটা। একটাও মিসকাস্ট হয়নি তাদের (হাল্ক চরিত্রে এড নর্টন ওকে ছিলো, তবে মার্ক রাফেলো knocked it out of the park)। কিছুটা উইক যেগুলো মুভি বা ক্যারেক্টার, সেগুলোতেও কেউ মিসকাস্ট হয়েছে বলা যায় না)।

 

শেষোক্ত ক্যাটাগরিতে আমার সবচেয়ে পছন্দের দুজনের কথা বলতেই হচ্ছে- ডমিনিক কুপার আর স্যাম রকওয়েল। এই দুজন+রবার্ট ডাউনি জুনিয়র+মার্টিন ফ্রিম্যানের জরুরি ভিত্তিতে একসাথে একটা R রেটেড (for language) কমেডি মুভি করা দরকার। ডিরেক্টর থাকুক জন ফ্যাভ্রু বা এডগার রাইট বা ম্যাথিউ ভন বা গাই রিচি।

 

৩। দর্শকের সাথে সুসম্পর্ক, যেটা তাদেরকে সবার চেয়ে আলাদা করে তুলেছে। তারা তাদের ভক্তদের ভক্ত। ভক্তদের চাহিদার দিকে তারা লক্ষ্য রাখে এবং একই সাথে মুভিগুলোতে নিজেদের স্বকীয়তাটুকুও বজায় রাখে। তাদের সব ছবি স্পষ্ট বোঝা যায় দর্শকের জন্যই। ক্রাউড-প্লিজার হওয়ার মাঝে দোষের কিছু নেই। একই সাথে ক্রিটিকদের মনও কিন্তু তারা জয় করছে।

 

৪। সুপারহিরো তেমন কোনো সিরিয়াস জিনিস না (কোন বোদ্ধার লেখায় যেন পড়েছিলাম সুপারহিরোর মত সিরিয়াস একটা জিনিসে হিউমার এনে মার্ভেল নাকি ওজন হালকা করে দিচ্ছে। আমার প্রশ্ন হলো, সুপারহিরো জিনিসটা সিরিয়াস হলো কবে?)। মার্ভেল সেটা ভালো করেই জানে এবং সে অনুযায়ী পরিমিত পরিমাণ ড্রামা, অ্যাকশন, হিউমার- সবই থাকে তাদের ছবিতে। ভিলেন পিটানো বা দুনিয়া বাঁচানো বা নিজের সাথেই যুদ্ধ মানে এই না যে, সবসময় পার্মানেন্ট একটা ডিপ্রেশনের দুনিয়ায় ডুবে থাকতে হবে বা চারপাশের দুনিয়াটা দেখলে মনে হবে কখনও কোনো আলো ছিলো না সেখানে কিংবা কেউ কখনও সুখী হতে পারবে না। মার্ভেল কিছুটা সিরিয়াস টোনেও কম যায় না, উইন্টার সোলজার দ্রষ্টব্য, এবং সেখানেও মার্ভেলের লাইট টোনের টাচ ছিলো।

 

৫। হুইপ-স্মার্ট ডায়লগ। একা টনির কথাগুলো দিয়েই একটা এনসাইক্লোপিডিয়া অভ অওসামনেস বানিয়ে ফেলা যাবে। বাকিগুলোও হচ্ছে গোল্ড।

 

৬। মার্ভেল কি তাই বলে শুধুই এন্টারটেইনমেন্ট? ক্যাপ্টেন অ্যামেরিকা চরিত্রটা কমপ্লেক্স। টনি স্টার্ক বারবার রিডেম্পশনের পথে চলছে অতসব অস্ত্রের কুফল দেখে। থর ভুগছে শেক্সপিয়ারিয়ান ব্রাদার ইস্যুতে। এগুলোও কি রিচ ক্যারেক্টার না? রিচ মানে কি শুধুই রাগারাগি আর কান্নাকাটি?

 

৭। মার্ভেল অনেকগুলো সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়েছে। হটশট ডিরেক্টর তেমন না নিয়ে কার্যকর মানুষকে নিয়েছে। শুরু করেছে জন ফ্যাভ্রুর মত লাইট কমেডি ডিরেক্টরকে দিয়ে, এরপর থরের জন্য নিয়েছে শেক্সপিয়ার মুভির ডিরেক্টর কেনেথ ব্র্যানাকে, অ্যাভেঞ্জার্সের জন্য নিয়েছে নার্ডদের গার্ডিয়ান এঞ্জেল জস হুইডনকে…

 

৮। মার্ভেলের হাতে বাকি ছিলো বি-লিস্ট কয়েকটা সুপারহিরো ক্যারেক্টার। সেগুলোর প্রত্যেকটা দিয়ে তারা ভালো মুভি বানিয়েছে। প্রত্যেকটা দিয়ে। শুধু একটা চরিত্র দিয়ে একটামাত্র ভালো ফ্র্যাঞ্চাইজই তাদের একমাত্র ভালো কাজ না।

 

৯। অ্যাভেঞ্জার্স হচ্ছে মার্ভেলের হার্ট আর গার্ডিয়ানস হচ্ছে তাদের স্পিরিট। বাকি ছবিগুলো এগুলোরই অংশ। আয়রন ম্যান, হাল্ক, থর, ক্যাপ্টেন অ্যামেরিকা, অ্যান্ট-ম্যান আর মোটামুটি রক্তাক্ত অবস্থায় হলেও ঘরে ফিরে আসা ঘরের ছেলে স্পাইডার-ম্যান মিলে আলাদা ফ্র্যাঞ্চাইজ করেও মার্ভেলকে গঠন করেছে আর গার্ডিয়ানসের আমুদে আর নিখাদ বিনোদনের মুড হচ্ছে মার্ভেলের সত্যিকারের ‘why so serious’ স্পিরিট।

 

‘Why so serious?’ প্রশ্নটা এখন মার্ভেলের মুখেই শোভা পায়।

 

(Visited 211 time, 1 visit today)

এই পোস্টটিতে ৯ টি মন্তব্য করা হয়েছে

  1. যদিও আমি ডিসি ফ্যানবয় এবং উপরোক্ত বেশ কিছু বিষয়েই দ্বিমত আছে ( :p ) ……… তবুও অন্য যেকোনো অবুঝ মারভেল ফ্যানের চেয়ে অত্যন্ত সুন্দরভাবে যুক্তি উপস্থাপন করা হয়েছে সে জন্যে লেখিকাকে সাধুবাদ 😀 :p :v

  2. Rashed Amin says:

    মার্ভেল যেমন ডিসি থেকে চুরি করসে তেমনি তাদের আবাল ফ্যানগুলাও জঘন্যতম চোর। ‘Why so serious?’ প্রশ্নটা এখন মার্ভেলের মুখেই শোভা পায়?! শ্লার চুরি করতে করতে এমন অবস্থা হয় গেছে যে, শেষ পর্যন্ত সংলাপ গুলাও চুরি করতে হচ্ছে।

    • এই ডায়লগটা কোন মার্ভেল মুভিতে আছে একটু বলবেন কি, যে আপনি চুরি শব্দটা ব্যবহার করছেন? আমি এটা ব্যবহার করেছি মার্ভেলের স্পিরিট বোঝাতে, ডিসিকে আঘাত করতে বা মার্ভেল মুভিতে এই ডায়লগ ইউজ করুক বোঝাতে না। দয়া করে একটা জিনিস পড়ে ভদ্র ভাষায় রুচিসম্মত ও যৌক্তিকভাবে কথা বলবেন। অবুঝ ডিসি ফ্যানবয়দের মত অযৌক্তিকভাবে মাথা গরম করবেন না শুধু শুধু। আর আপনাদের ডিসি ফ্যানবয়দের যন্ত্রণায় কি মার্ভেল ফ্যানরা বোবা হয়ে যাবে নাকি? সবখানে ঠিকমত কিছু না পড়েই অন্ধের মত রে রে করে তেড়ে আসতেই হবে আপনাদের?

    • Rashed Amin says:

      আবালের মত কথা বলেন কেনো?! আমি বলছি যে, আপনি বলেছেন Why so serious?’ প্রশ্নটা এখন মার্ভেলের মুখেই শোভা পায়?! কি বলেন নি??? তো এটা কেনো মার্ভেলের মুখে শোভা পাবে?! এসব বাল মার্কা কথা রাখেন। আর আপনার মত nerd গুলার সাথে কথা বলার টাইম নাই। আরেকটা কথা আপনি বলছেন ভদ্র ভাবে কথা বলতে। লেল। demn you are funny -_-

    • Rashed Amin says:

      Sorry meanwhile, I noticed you are a female person :v I took you for a boy. Okay sis, PEACE. 🙂

    • Okay, peace, but আমি ছেলে হই বা মেয়ে হই, আপনার দ্বিতীয় কমেন্টটা কাউকেই করা উচিত না। ডিসির ফ্যান আপনি হতেই পারেন এবং আমারও ততটুকু অধিকার আছে মারভেলের ফ্যান হওয়ার। তাই বলে আরেকটা ইন্ডাস্ট্রির প্রশংসা করলে এই ধরনের অযৌক্তিক স্টেটমেন্ট (“আবালের মত কথা বলেন কেন?” “এটা কেন মারভেলের মুখে শোভা পাবে?” এটা তো আমি মুভিতে ইউজ করার কথা বলিনি। এটা আমি মারভেলের সবকিছুকে সিরিয়াসলি না নেয়ার স্পিরিটটা বোঝাতে বলেছি। এটা মারভেলের মুভির ডায়লগ না।) সেটা এই ধরনের ভাষায় করা উচিত না। আপনি কোনো কারণ ছাড়াই মাথা গরম করেছেন। অযথা আশা করি ঠিকমত না বুঝে শুধু শুধু মাথা গরম করবেন না এবং অন্যের মতামতকে শ্রদ্ধা করবেন ও ইম্ম্যাচিওর আচরণ না করে নিজের মতামতে ম্যাচিওরিটি দেখাবেন। ভালো থাকুন 🙂

  3. এনামুল রেজা says:

    এজ অফ আল্ট্রন দিয়ে এভেঞ্জারসদের গতী শ্লথ হয়ে গেল মেবি। প্রথমটা যত দুর্দান্ত ছিল, এটা দেখে ততোটাই বিরক্ত হয়েছি।

মন্তব্য করুনঃ

You must be Logged in to post comment.

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন