‘মিরাক্কেল অন দ্যা হাডসন’ -একটি রোমাঞ্চকর নায়কোচিত অধ্যায়
Share on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on TwitterPin on Pinterest0

US Airways 1549US Airways 1549

জানুয়ারি ১৫, ২০০৯ সাল। অন্যান্য সাধারণ দিনের মতই শুরু হয়েছিল দিনটি। “US Airways Flight 1549” নামক অ্যামেরিকার লোকাল এয়ারক্রাফট নিউইয়র্ক এর লাগার্দিয়া এয়ারপোর্ট থেকে শার্লট/ডাগলেস ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট দিকে রওয়ানা দেয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল। এই প্লেনের পাইলটের দায়িত্বে ছিলেন বর্তমানে অবসর প্রাপ্ত এয়ারলাইন ক্যাপ্টেন, সেফটি এক্সপার্ট এবং গ্লাইডার পাইলট ‘ক্যাপ্টেন চ্যাসলে বার্নেট “সালি” সালেনবার্গার, দ্যা থার্ড” এবং ফার্স্ট অফিসার জেফ্রি স্কাইলেস। সকল প্রকার প্রস্তুতি শেষে ১৫০ জন প্যাসেঞ্জার এবং ৫ জন ক্রু নিয়ে এয়ারপ্লেনটি ঠিক বিকেল ৩ টা ২৪ মিনিটে শার্লট, উত্তর ক্যারোলাইনা এর উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে। কোন প্রকার সমস্যা ছাড়াই এয়ার প্লেনটি আকাশে উড়তে সক্ষম হয়। কিন্তু প্লেনটি উড়ার তিন মিনিট পরেই ঘটে দুর্ঘটনা। অ্যামেরিকান লোকাল টাইম ৩ টা ২৭ মিনিটে দুর্ভাগ্য বশত প্লেনের সাথে একদল কানাডিয়ান রাজহংসীর কলিশন হয়। এতে প্লেনের দুটি জেট ইঞ্জিনই সাথে সাথে অকার্যকর হয়ে পরে। জেট ইঞ্জিনের পাওয়ার লসের সাথে সাথে প্লেনের অল্টিটিউড এর পতন ঘটে। দ্রুত নিচে দিকে পতিত হতে থাকে প্লেনটি। ক্যাপ্টেন সালি সহ সকল ক্রু মেম্বাররা বুঝতে পারে যে, দুর্ঘটনা আসন্ন। কোন প্রকার মিরাক্কেল না ঘটলে প্রাণ হারাতে যাচ্ছে ১৫৫ জন মানুষ। প্লেনের ভিতর খবরটি ছড়িয়ে পড়ার পর সকল প্যাসেঞ্জাদের মৃত্যু ভয় পেয়ে বসে। শুরু হয় প্যানিক। ফ্লাইট ক্রুরা প্যাসেঞ্জারদের মনে সাহস আর আশা যোগীয়ে এই পরিস্থিতিকে খুব সুন্দর ভাবে নিয়ন্ত্রন আনে। প্লেনের প্যাসেঞ্জারদের পাশাপাশি খবরটি পুরো অ্যামেরিকায়ও ছড়িয়ে পড়ে। সবাই অধীর আগ্রহে টিভির সামনে বসে ছিল এই প্লেইনটির ভাগ্যে কি ঘটে তা জানার জন্য। এদিকে ক্যাপ্টেন সালি এবং অফিসার জেফ্রি কিভাবে এতোগুলো মানুষকে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচানো যায় তার পরিকল্পনা করতে থাকে। প্রথমে ভাবা হয় নিকস্থ কোন এয়ারফিল্ড এ ক্র্যাশ লেন্ডিং এর কথা কিন্তু ক্র্যাশ ল্যান্ডিং করার মত কাছাকাছি কোন এয়ারফিল্ড না থাকায় তা সম্ভব হয়নি। অন্য কোন উপায় না দেখে তাঁরা দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয় প্লেনটিকে হাডসন নদীতে ল্যান্ড করানোর চেষ্টা করবে, আপাত দৃষ্টিতে যা অসম্ভব। শুধু মাত্র তিন মিনিট সময় নিয়ে শুরু হয় এক অসম্ভবকে সম্ভব করার আপ্রাণ চেষ্টা। অনেক চেষ্টা, বুদ্ধিমত্তা আর মানুষকে বাঁচানোর এক অদম্য ইচ্ছার কারণে তাঁরা শেষ পর্যন্ত এয়ারক্রাফটটিকে গ্লাইডিং করার মাধ্যমে হাডসন নদীতে ল্যান্ড করাতে সমর্থ্য হয়েছিলেন। ল্যান্ড করার সাথে সাথেই ক্যাপ্টেন সালি এর অনুমতিক্রমে শুরু হয় এভাকোয়েশন। এভাকোয়েশন শেষে জানা যায় মাত্র পাঁচ জন প্যাসেঞ্জার নন-ফেটাল সিরিয়াস ইঞ্জুরির স্বীকার হয়েছিলেন এবং মাত্র অল্প কজন প্যাসেঞ্জার মাইনর ইঞ্জুরির স্বীকার হয়েছিলেন। বাকি প্যাসেঞ্জাররা সুস্থ শরীর নিয়েই আপন জনের কাছে ফিরে গিয়েছিলেন।

133230212ক্যাপ্টেন সালি এবং ফার্স্ট অফিসার জেফ্রি স্কাইলেস

ক্যাপ্টেন সালী এবং অফিসার জেফ্রি এর সাহসিকতা এবং বুদ্ধিমত্তার কারণে সেদিন বেঁচে গিয়েছিল ১৫৫ টি মানুষের প্রাণ। রচিত হয়েছিল ‘মিরাক্কেল অন দ্যা হাডসন’ নামে নায়কোচিত এক অধ্যায়ের।

এই নায়কোচিত ঘটনা এই প্লেনের সকল ক্রু মেম্বারদের রাতারাতি হিরো বানিয়ে দেয়। পুরো অ্যামেরিকা জুড়ে চলে তাদের বন্ধনা। দ্যা গিল্ড অফ এয়ার পাইলট এন্ড এয়ার ন্যাভিগেটর এর পক্ষ থেকে পান মাস্টার’স মেডেল।

এই ঘটনার অল্প কিছুদিন পরেই ফেডারেল এভিয়েশন এডমিনিস্ট্রেশন এর মুখপাত্র লউরা ব্রাউন উদ্দেশ্য প্রনদিত ভাবে এই নায়কোচিত ঘটনায় সন্দেহ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন যে, “হতে পারে এয়ারপ্লেনটি নিজে গিয়ে রাজহংসীদের সাথে কলিশন তৈরী করেছে”। এই সন্দেহের বশে এই ঘটনার উপর তৎকালীন সিনিয়র এয়ার সেফটি ইনভেস্টিগেটর রবার্ট বেঞ্জন কে প্রধান করে অফিসিয়েলি একটি ইনভেস্টিগেশন শুরু হয়।  তদন্ত শেষে ১৬ই জানুয়ারি রবার্ট বেঞ্জন তদন্তের প্রাথমিক রিপোর্ট প্রকাশ করেন। যাতে লউরা ব্রাউন এর সন্দেহ ভুল প্রমাণিত হয়।

41R0eNOR+xL._SX331_BO1,204,203,200_Highest Duty: My Search for What Really Matters এর কভার

এই ‘মিরাক্কেল অন দ্যা হাডসন’ এবং এর পরবর্তি ঘটনার বর্ণনা দিয়ে ‘চেসলে সালেনবার্গার’ বিখ্যাত অ্যামেরিকান লেখক এবং ওয়ালস্ট্রিট জার্নালের কলামিস্ট ‘জেফ্রি জেস্লো’ এর সাথে মিলে ‘Highest Duty: My Search for What Really Matters’ নামে একটি মেময়ের প্রকাশ করেন। প্রকাশ হওয়ার অল্প কিছুদিনের মধ্যেই বইটি দ্যা নিউইয়র্ক টাইম বেস্টসেলিং অটোবায়োগ্রাফিতে পরিণত হয়।

044-ew-sully_0ক্যাপ্টেন সালি চরিত্রে টম হ্যাংকস এবং পরিচালক ক্লিন্ট ইস্টউড

সম্প্রতি অস্কার জয়ী পরিচালক এবং অভিনেতা ‘ক্লিন্ট ইস্টউড’ যিনি অসাধারণ ওয়েস্টার্ন মুভি ‘আনফরগিভেন’ এর পরিচালনার জন্য সেরা পরিচালকের অস্কার পেয়েছিলেন এই মেময়ের এর উপর ভিত্তি করে একটি চলচ্চিত্র নির্মান করেছেন। নাম ‘Sully’। এই পর্যন্ত পরিচালনা জীবনে প্রচুর ওয়েস্টার্ন, থ্রিলার, একশন, ক্রাইম এমনকি রোমান্টিক কমেডি, ড্রামা জনরার মুভি নির্মাণ করেছেন,  করেছেন বায়োগ্রফি জনরার মুভিও। অন্য সব মুভির মত এই মুভিতেও তিনি সফল হবেন তা হলফ করেই বলা যায়। এই মুভি যে সফল হবে তা হলফ করে বলা যায় এর আরেকটি কারণ হল মুভিটিতে ক্যাপ্টেন সালি চরিত্রে আছেন আরেক অস্কার জয়ী অভিনেতা টম হ্যাংক্স। অসাধারণ অভিনয় দক্ষতা সম্পন্ন ৬০ বছর বয়সী এই অভিনেতা ১৯৯৩ সালের ‘পিলাডেলফিয়া’ মুভিতে এবং এরপরের বছর ‘ফরেস্ট গাম্প’ মুভিতে অসাধারণ অভিনয় দক্ষতার গুনে সেরা অভিনেতা হিসেবে অস্কার পেয়েছিলেন। বায়োগ্রাফি জনরায় ক্লিন্ট ইস্টউড প্রথম হলেও টম হ্যাংকস কিন্তু এই জনরায় নতুন নন। এর আগে তিনি ক্যাপ্টেন ফিলিপ্স, সেভিং মি. ব্যাংক্স, ক্যাচ মি ইফ ইউ ক্যান এবং চার্লি উইলসন্স ওয়ার এর মত বায়োগ্রাফি মুভি গুলোতে সফল ভাবে অভিনয় করে দর্শক এবং সমালোচকদের মন জয় করে নিয়েছেন। সুতরাং এই মুভিতেও তার ব্যতিক্রম হবে বলে মনে হয় না। টম হ্যাংক্স এর সাথে ফার্স্ট অফিসার জেফ্রি স্কাইলেস চরিত্রে আছেন কিস্টোফার নোলান এর বিখ্যাত সুপার হিরো মুভি দ্যা ডার্ক নাইট এ হার্ভি ডেন্ট চরিত্রে অভিনয় করা এরন এখহার্ট। ভাল মানের একজন অভিনেতা। হলিউডের এখনো নিজের অবস্থান খুব একটা পাকাপোক্ত করে উঠতে পারেন নি। তবে আশা করা যায় এই মুভিটির মাধ্যমে হলিউডে উনার ভিত কিছুটা হলেও শক্ত হবে। টম এবং এরন ছাড়াও আরো দুটি গুরুত্ব পূর্ণ চরিত্রে আছেন তিনবার অস্কার মনোনয়ন পাওয়া অভিনেত্রী লউরা লিন্নে এবং বিখ্যাত টিভি সিরিজ ব্রেকিং ব্যাড এ স্কাইলার হোয়াইট চরিত্রে অভিনয় করা এনা গুন। মুভির মিউজিক শাখার দায়িত্বে আছেন ক্রিশ্চিয়ান জেকব। এর আগে উনি শুধুমাত্র একটি মুভিতে মিউজিক কম্পোজারের দায়িত্বে ছিলেন।  মুভিটা দেখা হয়নি। সুতরাং উনার কাজ সম্পর্কে আমার তেমন ধারণা নেই। তবে ক্লিন্ট ইস্টউড যেহেতু পরিচালক সেহেতু উনার প্রতি আস্তা রাখাই যায়।

images“Sully” মুভির পোস্টার

শেষ কথা,

প্রথম একটি রোমাঞ্জকর সত্য ঘটনা। দ্বিতীয়ত, পরিচালক ক্লিন্ট ইস্টউড এবং তৃতীয়ত, অভিনয়ে টম হ্যাংকস। সব মিলিয়ে অসাধারণ অসাধারণ একটি মুভি হবে তা আশা করাই যায়। ট্রেলার এতো মধ্যে রিলিজ হয়ে গেছে। মুভি আসবে আসছে সেপ্টেম্বর মাসের ৯ তারিখে।

মন্তব্য করুনঃ

You must be Logged in to post comment.

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন