হংকং সিনেমা ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ১০ টি সিনেমা

কয়েকদিন আগে সাউথ কোরিয়া ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিনেমা নিয়ে পড়ছিলাম, হুট করে মাথায় আসলো হংকং এর কথা। কোরিয়ার নিউ ওয়েভ এর পথচলা খুব বেশিদিন ধরে হয়নি, এই ধরেন ২০-২১ বছরের মত হবে। সেক্ষেত্রে তাদের নিউ ওয়েভ নিয়া জানা বেশ সহজ, জাপানের ইতিহাসের আবার খুব সমৃদ্ধ্য। তাদেরকে নিয়ে জানাটা বেশ কঠিন। হংকং নিয়ে জানাটা কঠিন-সহজ মিলিয়েই। হংকং সিনেমার একটি বড় অংশ অতীতে ছিল ম্যান্দারিন ভাষায়, তখন চীনের সেন্ট্রাল এন্টারটেইনমেন্ট প্লেস ছিল হংকং কিন্তু হংকং এর ভাষা হচ্ছে ক্যান্টোনিজ। তাহলে কীভাবে ম্যান্দারিন ভাষার রাজত্ব কাটিয়ে ৮০-৯০ দশকে ক্যান্টোনিজ সিনেমা রাজত্ব করেছে পুরো এশিয়ায়? এর পিছনে অবদান আছে বেশ কিছু মানুষের। আর সিনেমার কথা বলতে গেলে চলে আসবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ কিছু সিনেমা। সেই সিনেমা গুলোর মধ্যে হংকং সিনেমা ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ১০ টি সিনেমা বেছে নিলাম। হংকং এর ইতিহাস সমৃদ্ধ্য করার পিছনে এই সিনেমা গুলোর অবদান অনেক।

.

10.Shaolin Soccer (2001, Stephen Chow) 

স্টিফেন চাও পরিচালিত হংকং মো লেই তাউ ফিল্ম। ১৯৯৭ হ্যান্ডোভার পরবর্তী সময়ে হংকং এর সবচেয়ে বড় হিট সিনেমা Shaolin Soccer। এই সিনেমার ৩ বছর পর স্টিফেন চাও পরিচালিত-অভিনীত Kung Fu Hustle এই সিনেমাকেও ছাড়িয়ে গিয়েছিল বক্স অফিস বিচারে কিন্তু স্টিফেন চাওর জন্য ওয়েস্টার্ন মার্কেট খুলেছিল এই সিনেমার মাধম্যমেই। হংকং এর মার্শাল আর্টস সিনেমা পুরো বিশ্বে জনপ্রিয়, কিন্তু মার্শাল আর্টস বাদে তেমন কোন হংকং ফিল্ম সেইসময় পুরো বিশ্বে অতটা জনপ্রিয় ছিল না। Shaolin Soccer অন্য জনরার হংকং সিনেমাকে হংকং এর বাহিরে জনপ্রিয় করতে অনেক বড় অবদান রেখেছিল।

9.Zu Warriors from the Mountain (1983.Tsui Hark) 

সাই হার্ক পরিচালিত ১৯৮৩ সালের সিনেমা। হংকং অ্যাকশন এবং ওয়েস্টার্ন স্পেশাল ইফেক্টসের মিশ্রণে সিনেমা বানানোর সাই হার্কের প্রথম প্রচেষ্টা। স্পেশাল ইফেক্টস খুব ভালো হয়েছে তা বলা যাবে না কিন্তু হংকং এর মান অনুযায়ী সেই সময় এই ইফেক্টস ছিল অনেকটা অকল্পনীয় ছিল, তাছাড়া সেইসময় এমন সিনেমা বানানোর সাহস হংকংয়ে কারো ছিল না। এই সিনেমা সাই হার্কের ক্যারিয়ারে খুব গুরুত্বপূর্ণ এক রোল প্লে করেছিল, পরবর্তীতে সাই হার্ক হংকং এর সেকেন্ড নিউ-ওয়েভ সিনেমার মূল পরিচালকদের একজন হিসেবে নিজেকা প্রতিষ্ঠিতি করেন। এই সিনেমা এবং সাই হার্ককে ধরা হয় হংকং সেকেন্ড নিউ-ওয়েভের সিনেমার নতুন সূচনা।

8.The Eighth Happiness (1988,Johnnie) 

জনি টো আমার প্রিয় পরিচালক, এই ব্যাপার টা আমি সহজেই স্বীকার করে নিই। স্বীকার করা ছাড়া উপায় আছে? তাঁর ফিল্মোগ্রাফি ঘাটলে ভালো ভালো সিনেমার তালিকা দেখলে আপনার মাথায় হাত পড়ে যাবে। একজন পরিচালকের পরিচালনা ক্যারিয়ার এতটা সমৃদ্ধ্য? পরিচালনার পাশাপাশি প্রোডিউসার হিসেবেও বানিয়েছেন বেশ কয়েকটি সিনেমা। সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে আলোচিত হংকং সিনেমা Trivisa (2016,Jevons Au,Vicky Wong,Frank Hui) ও প্রোডিউস করেছেন জনি টো। হংকং ইতিহাসের খুব গুরুত্বপূর্ণ এক ব্যক্তিত্ব। জনি টোর আরেকটা পজিটিভ দিক হচ্ছে, ‘৯৭ পরবর্তী সময়ে হংকং সিনেমার ধস নামে কিন্তু জনি টোর ক্যারিয়ারের পিক টাইমই শুরু হয় ৯৭’ পরবর্তী সময় The Mission সিনেমা দিয়ে ১৯৯৯ সালে। তাঁর বেশিরভাগ মানসম্পন্ন সিনেমা বের হয়েছে এই শতাব্দীতে, যখন হংকং সিনেমা প্রায় মৃত হয়ে গেছে। সেই জনি টোর ৮৮’ সালের একটি সিনেমা কেন বেছে নিলাম এটা হয়ত অনেকেই ভাবছেন। জনি টো ওয়াইডলি পোপিউলার তাঁর গ্যাংস্টার সিনেমার জন্য কিন্তু জনি টোর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে ব্যবসা-সফল সিনেমা হচ্ছে রম-কম The Eighth Happiness। ১৯৮৮ সালে এই সিনেমা HK$37,090,776 আয় করেছিল, ১৯৮৮ সালের সবচেয়ে বেশি আয়করা হংকং সিনেমাও ছিল এটি। বলাই বহুল্য, এই সিনেমা জনি টো এবং হংকং এর ইতিহাসে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি জায়গা পাবে।

7.God of Gamblers (1989,Wong Jing) 

হংকং এর জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি সিনেমা। Gambling নিয়ে নির্মিত সিনেমা, অভিনয়ে ছিলেন সেই সময়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় হংকং অভিনেতা Chow Yun-fat। এই মুভি বক্স-অফিসে আয় করে HK$37,058,686.00। এই সিনেমার সফলতার পর পরিচালক ওং জিং এর ক্যারিয়ার সম্পূর্ণ রূপে বদলে গিয়েছিল। এই সিনেমার পরবর্তী সময়ে সে অনেকগুলো বক্স-অফিস হিট সিনেমা নির্মাণ করেন। এই সিনেমার সফলতাকে কেন্দ্র করে নির্মিত হয় ওংজিং প্রযোজিত প্যারডি ফিল্ম All for the Winner (1990,Jeffrey Lau,Corey Yuen) যেটাতে মূল চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন স্টিফেন চাও, এই সিনেমা দিয়েই স্টিফেন চাও হংকংয়ে জনপ্রিয়তা পান। পরবর্তীতে স্টিফেন চাও আবার হংকংকে উপহার দেন সবচেয়ে বেশি সংখ্যক হিট সিনেমা। অর্থাৎ এই একটি সিনেমাকে কেন্দ্র করে ৯০ দশকে হংকং পেয়েছিল অংসংখ্য হিট সিনেমা । এই সিনেমার মোট ১৬ টি সিকুয়েল, স্পিন-অফ, প্যারডি সিনেমা বের হয়েছে এই পর্যন্ত। ইনফ্যাক্ট ২০১৬ সালেও এই সিনেমার স্পিন-অফ বের হয়েছে।

6.As Tears Go By (1988,Wong Kar-wai) 

অ্যাক্লেইমড পরিচালক ওং কার-ওয়াইর প্রথম সিনেমা। ঠিক তাঁর স্টাইলের না হলেও এই সিনেমা হংকংয়ে বেশ প্রভাব ফেলেছিল। একে তো ওং কার-ওয়াইর প্রথম সিনেমা, যিনি পরবর্তীতে নির্মাণ করেছেন ক্রিটিকালি অ্যাক্লেইমড সব সিনেমা। জিতেছেন Palme D’or। সেই পরিচালকের প্রথম সিনেমা কতটা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে তা আর বলার বাকি নয়। তবে এই সিনেমা এর বাহিরেও বেশ গুরুত্ব বহন করে। এই সিনেমা দিয়ে অ্যান্ডি লাউ আসতে আসতে হংকংয়ে নিজের জায়গা পাকাপোক্ত করা শুরু করেন। ম্যাগি চিউং এই সিনেমা দিয়ে আলোচনায় চলে আসেন। ট্রায়াড সিনেমা্য রোম্যান্সের যে মিশ্রণ করে দেখিয়েছিলেন ওং কার-ওয়াই,তা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে হংকংয়ে সেই সময় বের হয়েছিল অনেকগুলো ক্লাসিক সিনেমা, যার মধ্যে অন্যতম এই মুভিরই অভিনেতা অ্যান্ডি লাউ অভিনীত A Moment of Romance (1990,Benny Chan) যদিও ওং কার-ওয়াই নিজে পরবর্তীতে এই স্টাইলের কোন সিনেমা বানাননি।

5.Project A (1983,Jackie Chan) 

খুব কঠিন একটি পিক, এই আর্টিকেল লেখার আগ পর্যন্তও এই সিনেমা আমার তালিকায় ছিল না, জ্যাকি চ্যানের অন্য একটি সিনেমা ছিল। কিন্তু বেশকিছুক্ষণ ভেবে দেখলাম, এই সিনেমাটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ট্রেডিশনাল মার্শাল আর্টস সিনেমা থেকে বেরিয়ে জ্যাকি চ্যানের প্রথম মডার্ণ অ্যাকশন সিনেমা Project A (1983)। অসম্ভব ভালো সিনেমা, অ্যাকশন গুলো দেখলে আপনার চোয়াল ঝুলে পড়ার অবস্থা হয়ে যাবে। এই সিনেমায় অভিনয় করেছেন সেই সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ৩ হংকং অভিনেতা জ্যাকি চ্যান,সাম্মো হাং এবং উয়েন বিয়াও। ৩ ছোটবেলার বন্ধু যাদেরকে আদর করে হংকংয়ে সবাই ডাকেন “The Three Dragons অথবা The Three Brothers” বলে।

4.Snake in the Eagle’s Shadow (1978,Yuen Woo-ping)

জ্যাকি চ্যান অভিনীত আরেকটি সিনেমা। জ্যাকি চ্যান নিঃসন্দেহে হংকং ছাড়িয়ে গোটা এশিয়ার সবচেয়ে বড় তারকা। পুরো বিশ্বের অন্যতম সবচেয়ে বড় তারকা জ্যাকি চ্যান তাও অকপটেই বলে দেয়া যায়। তবে এই জ্যাকি চ্যানের পথচলা এত সহজ ছিল না, সে শুরুতে একের পর এক ফ্লপ সিনেমায় অভিনয় করেছিলেন। অবশেষে ১৯৭৮ সালে উয়েন ইউ-পিং পরিচালিত Snake in the Eagle’s Shadow দিয়ে জ্যাকি চ্যান বক্স-অফিস সফল মুভির চেহারা দেখেন এবং রাতারাতি সেই সময়ে বনে যাক হংকংয়ের বড় তারকাদের একজন। মার্শাল আর্টসের সাথে কমেডির মিশ্রণ সেই সময় বেশ ইউনিক ছিল। এই সিনেমার সফলতার পর Yuen Woo-ping জ্যাকি চ্যানকে নিয়ে নির্মাণ করেন ড্রানকেন মাস্টার, যার সফলতা এটাকেও ছাড়িয়ে যায় এবং জ্যাকি চ্যানকে বানিয়ে ফেলে পাকাপোক্ত স্টার। এই সিনেমার সফলতার পরেই জ্যাকি চ্যানের ক্যারিয়ার বদলে যায়, সে তাঁর তৎকালীন কম্পানি Lo Wei Pictures কন্টাক্ট থাকা সত্বেও ছেড়ে দেন এবং Golden Harvest এর সাহায্যে নতুন করে নিজের ক্যারিয়ার শুরু করেন। Snake in the Eagle’s Shadow ছাড়া হয়ত আজকের জ্যাকি চ্যানকে আমরা দেখতে পেতাম না ।

3.The Private Eyes (1976,Michael Hui)

পরিচালনা করেছেন বড় ভাই মাইকেল হাই আর অভিনয়ে ছিলেন ৩ ভাই মাইকেল হাই, স্যাম হাই এবং রিকি হাই।

এই সিনেমা সেই সময়ের সকল বক্স-অফিস রেকর্ড ভেঙ্গে দিয়েছিল,এটা ছিল ৭০ দশকের সবচেয়ে বড় হিট ক্যান্টোনিজ সিনেমা, বলা যায় ৮০-৯০ দশকের গোল্ডেন এজ শুরু হওয়ার পিছনে এই সিনেমার সফলতা অনেক ভাইটাল ছিল।  এই সিনেমায় সেই সময় কাজ করেছিলেন অনেক মহারথীরা, কেউ হয়ত কখনই কল্পনা করেনি এই লোক গুলো পরের সময়ে কত গুরুত্বপূর্ণ নামে পরিণত হবেন। জন ইউ (The Killer, A Better Tomorrow,Mission :Impossible 2 এর পরিচালক) এই সিনেমায় কাজ করেছিলেন প্রোডাকশন ডিজাইনার হিসেবে। অ্যাকশন কোরিওগ্রাফার ছিলেন সাম্মো হাং এবং স্টান্টম্যান হিসেবে কাজ করেছিলেন জ্যাকি চ্যান। ভাবা যায় এই সিনেমার পিছনে কত বড় বড় নাম কাজ করেছিলেন যারা সেই সময় ছিলেন অপরিচিত মুখ।

2.A Better Tomorrow (1986,John Woo)

জন ইউ পরিচালিত, চাও ইউন-ফাট, লেজলি চিউং এবং টি লুং অভিনীত ১৯৮৬ সালের গ্যাংস্টার সিনেমা। এই সিনেমাটা যে হংকং এর জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা লিখতে বসলে শেষ করা যাবে না। এই সিনেমার গুরুত্ব নিয়ে আমার একটি আলাদা আর্টিকেল আছে। সেটি পড়লে বুঝতে পারবেন একটি সিনেমা কতটা ইনফ্লুয়েনশিয়াল হতে পারে।

আর্টিকেলের লিংক- A Better Tomorrow (1986) একটি সিনেমা থেকেও বেশি কিছু 

1. The House of 72 Tenants (1973,Chor Yuen)

চর উয়েন পরিচালিত বিখ্যাত সিনেমা। আপনি হয়ত এই সিনেমার নাম জীবনেও শুনেননি। কিন্তু ব্রুস লির Enter the Dragon (1973) এর নাম নিশ্চয় শুনেছেন, সেই সিনেমাকে পিছনে ফেলে কোন স্টারকাস্ট ছাড়া নির্মিত এই সিনেমা ১৯৭৩ সালে হংকংয়ে সবচেয়ে বেশ আয় করে। সেই সময় হংকংয়ে বেশিরভাগ সিনেমা নির্মিত হতো ম্যান্দারিন ভাষায়। খুব কম সিনেমা ক্যান্টোনিজ ভাষায় নির্মিত হতো, ইনফ্যাক্ট ১৯৭২ সালে ক্যান্টোনিজ ভাষায় একটি সিনেমাও নির্মাণ হয়নি। ম্যান্দারিন সিনেমার তুমুল জনপ্রিয়তাকে ছাপিয়ে সেই সময় হিট হয়ে এই ক্যান্টোনিজ সিনেমা। এই মুভির সফলতার পর থেকেই হংকংয়ে নিয়মিতভাবে ক্যান্টোনিজ ভাষায় সিনেমা নির্মাণ হওয়া করে।একবার ভেবে দেখেছেন ১৯৬৩ সালের এক সিনেমার রিমেক এই সিনেমা একটি ইনডাস্ট্রি, একটি কালচার তৈরিতে কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে? ম্যান্দারিন সিনেমাকে সম্পূর্ণভাবে ভ্যানিশ করে দিয়ে হংকংয়ে প্রচলণ শুরু হয় ক্যান্টোনিজ সিনেমার,যার হাত ধরে আমরা পাই ৮০-৯০ দশকে্র “গোল্ডেন এজ অফ এশিয়া’স হংকং সিনেমা”।

 

Honorable Mentions: The Storm Riders (1998,Andrew Lau), Infernal Affairs (2002,Andrew Lau & Alan Mak) ,Aces Go Places (1982,Eric Tsang), Chungking Express (1994,Wong Kar-wai), A Chinese Ghost Story (1987,Tony Miu)

(Visited 431 time, 1 visit today)

মন্তব্য করুনঃ

You must be Logged in to post comment.

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন