A Better Tomorrow (1986) একটি সিনেমার থেকেও বেশি কিছু

জন ইউ পরিচালিত এই হংকং সিনেমায় অভিনয় করেছেন চাও ইউন-ফাট,লেজলি চিউং এবং টি লুং। আমার মুভি দেখার আগের এবং পরের অবস্থাটা খুব ভালোভাবে এই সিনেমাটার  সফলতাটা ফুটিয়ে তুলেছিল সেই ৪ বছর আগে, বিধায় এই মুভির মূল্যটা আমি বুঝি। এইজন্যই ৪ বছর আগে দেখা মুভির রিভিউ আজ লিখছি। সেইসময় গ্যাংস্টার সিনেমা পছন্দ করতাম না, এটা মোটামুটি ভালো লেগেছিল, তাই ভেবেছিলাম লেখার মত কোন সিনেমা নয়,কিন্তু পরে আসতে আসতে উপলব্ধি করা শুরু করি এই সিনেমা হংকং ফিল্ম জগতে কতটা ইনফ্লুয়েন্স রেখেছিল।

এবার আসি মূল আলাপে। ১৯৮৬ সালের ঘটনা, একজন লো-প্রোফাইল ডিরেক্টর জন ইউ সিদ্ধান্ত নিলেন একটি সিনেমা বানাবেন, (আগেই বলে রাখি, বর্তমানে এই জন ইউ এশিয়ার সবচেয়ে জনপ্রিয় ৫-১০ টা পরিচালকের একজন।) মুভিটি প্রোডিউস করবেন সাই হার্ক।
সাই হার্ক মুভিতে কাস্ট হিসেবে নিলেন টিভি সিরিজে কাজ করে সামান্য খ্যাতি পাওয়া চাও ইউন ফাট (Chow Yun-fat), মুভি জগতে স্ট্রাগল করা পপ আইডল লেজলি চিউং (Leslie Cheung) এবং, এক ৭০ দশকের জনপ্রিয় অভিনেতা, যাকে মানুষ ভুলতে চলেছে, টি লুং (Ti Lung)
তেমন আকর্ষণীয় কাস্টিং না হওয়ায়, পরিচালক হাই-প্রোফাইল না হওয়ায় এই সিনেমা নিয়ে হয়ত কারো অতটা মাথাব্যথা ছিল না। কিন্তু বিপত্তি বাধে অন্য জায়গায়। জন ইউ,সাই হার্ক সিদ্ধান্ত নেন তাঁরা বানাবেন গ্যাংস্টার সিনেমা। যেখানে “হিরো” রূপে থাকবেন একজন গ্যাংস্টার,যাদের কাছে খুনখারাপি, মানি লন্ডারিং ইত্যাদি ইত্যাদি অপরাধ করা কোন ব্যাপারই না। এমন লোকদের রিপ্রেজেন্ট করা হবে,” হিরো ” চরিত্রে।
মনে মনে ভাবছেন, ” তাতে বড় ব্যাপার কী? ” তাই না?। এটা ভাবাই স্বাভাবিক, কারণ আপনি নিশ্চয়ই ইতোমধ্যে অনেক গ্যাংস্টার সিনেমা দেখে ফেলেছেন, তাই এটা স্বাভাবিক মনে হচ্ছে কিন্তু তখন হংকংয়ে এটা ছিল অস্বাভাবিক।
যা হোক, হংকং এর সেন্সর সিস্টেম কখনই অতটা কঠোর ছিল না। বিধায়, কোন সমস্যা ছাড়াই মুভিটি মুক্তি পায়।
মুক্তির পরে যা হলো, তা কী খোদ জন ইউ আন্দাজ করতে পেরেছিলেন কি না তা নিয়ে আমার সন্দেহ আছে। এটা হয়ে যায় সেই সময়ের “হাইয়েস্ট-গ্রোসিং হংকং ফিল্ম”।
হংকং এর সকল বক্স-অফিস রেকর্ড ওলটপালট করে দেয় এই সিনেমা। মানুষের মুখে মুখে চলতে থাকে এই মুভির চর্চা। এই মুভিতে চাও ইউন-ফাটের পড়িত কাপড় হয়ে যায় তখনকার “ট্রেন্ড” আর পপ আইডল লেজলি চিউং এর গাওয়া “In the Sentimental Past” থীম গানটি হয়ে যায় হংকং এর সবচেয়ে হিট গান। সম্ভবত ক্যান্টোনিজ ভাষার সবচেয়ে জনপ্রিয় গান এটিই।
আমি একটি কথা প্রায়ই বলি, “এই গান শুনে যে কিছু অনুভব করে না,সে এখনো হংকং সিনেমার ভক্ত হতে পারেনি।” এই গানটার প্রভাব এতটাই শক্তিশালী। হংকং পেরিয়ে এই সিনেমা বনে যায় পুরো এশিয়ার সেই সময়ের “সবচেয়ে জনপ্রিয় সিনেমা”।

মুভির এই দৃশ্যটি এশিয়ান গ্যাংস্টার সিনেমাকে রিপ্রেজেন্ট করার ক্ষমতা রাখে।

একবার ভাবেন, এই সিনেমা মুক্তির ২৪ বছর পর, ২০১০ সালে কোরিয়ার এক ভ্যারাইটি শো’তে এই মুভি নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ হয়। এমন একটা শো’তে,যেখানে সিনেমা নিয়ে একদমই আলোচনা হয়না, কোরিয়ানদের নিজেদেরই মাস্টারপিস সিনেমার অভাব নেই,কিন্তু A Better Tomorrow ই একমাত্র সিনেমা যেটা নিয়ে এই ভ্যারাইটি শো’তে প্রায় ৫ মিনিট আলোচনা হয়েছিল। বলছিলাম সাউথ কোরিয়ার সবচেয়ে জনপ্রিয় ভ্যারাইটি শো Running Man এর কথা। একটা সিনেমা কতটা জনপ্রিয় হলেও আজও দেশ-বিদেশে এই সিনেমার চর্চা হয়?
এই সিনেমার পরে জন ইউ বনে যান, হংকং এর সবচেয়ে বড় পরিচালক, হংকং পেরিয়ে, আজ পুরো বিশ্বে তাঁর নাম আছে। আমেরিকায় Face Off এর মত সিনেমা পরিচালনা করেছেন। Mission Impossible এরও একটি পার্ট পরিচালনা করেছিলেন।
আর হংকং এ Bullet in the Head (1990),The Killer (1989),Hard Boiled (1992) এর মত বিখ্যাত বিখ্যাত গ্যাংস্টার সিনেমা তো আছেই।

 

A Better Tomorrow (1986) মুভির সেটে (বাম পাশ থেকে) লেজলি চিউং,চাও ইউন-ফাট এবং পরিচালক জন ইউ।

চাও ইউন-ফাট পরিণত হয় হংকং এর সবচেয়ে জনপ্রিয় অভিনেতায়। সেই সময়, ১৯৮৮ সালে, হংকং ফিল্ম অ্যাওয়ার্ডসে শ্রেষ্ঠ অভিনেতার ৭ নমিনেশনের ৩ টিই একা পান চাও ইউন-ফাট। ৩ টি ভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করার জন্য। যে ফিল্ম অ্যাওয়ার্ডসে জ্যাকি চ্যানের মত অভিনেতা শ্রেষ্ঠ অভিনেতার পুরষ্কার পাননি, ৯ টি নমিনেশন পাওয়া সত্বেও। লেজলির মত অভিনেতা মাত্র একবার শ্রেষ্ঠ অভিনেতার পুরষ্কার জিতেছিলেন, সেই ফিল্ম অ্যাওয়ার্ডসে চাও ইউন-ফাট জিতেছিলেন “ব্যাক-টু-ব্যাক” দুইবার শ্রেষ্ঠ অভিনেতার পুরষ্কার। আর কেউ হংকংয়ে পরপর দুইবার শ্রেষ্ঠ অভিনেতার পুরষ্কার জিতেননি। ২০০০ সালে চাও ইউন-ফাট অভিনয় করেন অ্যাং লির Crouching Tiger,Hidden Dragon মুভিতে, যা ৪ টি ক্যাটাগরিতে অস্কার জিতেছে। যার মধ্যে একটি “Best Foreign Language Film”।

সেই সময়ে পপ আইডল হিসেবে বিখ্যাত লেজলি চিউং এই সিনেমার মাধ্যমে ক্যারিয়ারে নতুন পথ পান। পরবর্তীতে তিনি অভিনয় করেন A Chinese Ghost Story,Rouge,Days of Being Wild,Farewell My Concubine, Ashes of Time,Happy Together ইত্যাদি ইত্যাদির মত বড় ভড় সিনেমায় যার মধ্যে অন্যতম চেন কেইজ পরিচালিত Farewell, My Concubine (1992)। এটি একমাত্র চাইনিজ-ল্যাংগুয়েজ (হংকং-চীন-তাইওয়ানের) সিনেমা যা কান চলচিত্র উৎসবে Palme D’or জিতেছে। এর আগে অথবা পরে আর কোন চাইনিজ-ল্যাংগুয়েজ সিনেমা এই পুরষ্কার জিততে পারেনি। এইরকম একটি সিনেমার মূল প্রাণ ছিল লেজলি চিউং এর অসম্ভব সুন্দর অভিনয়।
যে কেউই মানতে বাধ্য হবেন, লেজলি চিউং এশিয়ার শ্রেষ্ঠ অভিনেতার একজন।

যা হোক, এইতো হলো মুভির সাথে জড়িত মানুষদের এই সিনেমার থেকে পথ পাওয়া সাফল্যের কথা। এই সিনেমা একটি ইন্ডাস্ট্রিকেও কম সাহায্য করেননি। A Better Tomorrow দিয়ে তৈরি হয় হংকংয়ে গ্যাংস্টার সিনেমা বানানোর ট্রেন্ড। যেখানে পরবর্তীতে হংকং বানায় Infernal Affairs এর মত গ্যাংস্টার ফিল্ম, যা বিশ্লেষণে শুধু মুভির নামটিই যথেষ্ট। Infernal Affairs তো শুধু উদাহরণ, আরো কত কত দুর্দান্ত সিনেমা তৈরি হয়েছে তারপর।
এই সিনেমা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে, শুধু হংকং নয়, হংকং এর বাহিরেও প্রচুর সিনেমা নির্মাণ হয়েছে।
এশিয়ান জগতের গ্যাংস্টার সিনেমার কথা বললে জাপানের তাকেশি কিটানোর সাথে, সাউথ কোরিয়ার A Bittersweet Life সহ অসাধারণ অসাধারণ সিনেমার নাম সামনে আসবে কিন্তু ইনফ্লুয়েন্সের বিবেচনায় A Better Tomorrow কে আপনি শীর্ষ ৩-৫ এ রাখতে পারেন চোখ বন্ধ করে। এক ভাই একবার বলেছিলেন, সাউথ কোরিয়ার উথানের অন্যতম কারণ ছিল ১৯৯৯ সালের সিনেমা Shiri, সেই সিনেমার অন্যতম অনুপ্রেরণা ছিলেন A Better Tomorrow মুভির পরিচালক John Woo।

যা হোক, এই সিনেমাটা একটি মাস্টারপিস, তাতে কোন সন্দেহ নেই, কিন্তু এই সিনেমাটা শুধুমাত্র দেখে যতটুক ভালো লাগবে, শুধু ততটুক দিয়ে আলোচনা করার সিনেমা নয়। A Better Tomorrow (1986) একটি সিনেমার চেয়ে বেশি কিছু।

(Visited 176 time, 1 visit today)

মন্তব্য করুনঃ

You must be Logged in to post comment.

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন