Ten Years (2015) পুরষ্কার-জয়ী হংকং এর রেভলুশন সিনেমা??

হংকং ফিল্ম অ্যাওয়ার্ডস এশিয়ার জনপ্রিয় ফিল্ম অ্যাওয়ার্ডস গুলোর মধ্যে অন্যতম। এশিয়ার বিভিন্ন জায়গায় সম্প্রচার হয় এই ফিল্ম অ্যাওয়ার্ডস।

 

বিভিন্ন জায়গায় মত চীনেও এই অ্যাওয়ার্ড শো অনেক জনপ্রিয়। সব সময়ের মত ২০১৬ সালেও চীনে সম্প্রচারিত হওয়ার কথা ছিল হংকং ফিল্ম অ্যাওয়ার্ডসের ৩৫তম আসর। কিন্তু হুট করে হংকং ফিল্ম অ্যাওয়ার্ডস বাদ দিয়ে একটি রান্নার অনুষ্ঠান দেখানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। পরের দিন খবরে হংকং ফিল্ম অ্যাওয়ার্ডসের ২০ টি অ্যাওয়ার্ডসের খবর দেখানো হয়, শ্রেষ্ঠ অভিনেতা, শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী, শ্রেষ্ঠ পরিচালক ইত্যাদি ইত্যাদি কিন্তু শ্রেষ্ঠ চলচিত্রের পুরষ্কার কোন সিনেমা জিতছে এটা উল্লেখ করা হয়নি, চীনের কোন নিউজেই এটা উল্লেখ করা হয়নি।

 

এবার বুঝতে পারছেন কী জন্য চীনে হংকং ফিল্ম অ্যাওয়ার্ডস নিষিদ্ধ হয়েছিল? এর পিছনে কারণ ছিল Ten Years মুভির নমিনেশন পাওয়া। হংকং ফিল্ম অ্যাওয়ার্ডসের চেয়ারম্যান ড্যারেক ই জানান “কেউ ভয়ে এই পুরষ্কার ঘোষণা করতে চায়নি”।

 

৩৫তম হংকং ফিল্ম অ্যাওয়ার্ডসে Port of Call মুভির জন্য শ্রেষ্ঠ অভিনেতার পুরষ্কার জিতেছিলেন অ্যারন কক, এই একই মুভির ঝুলিতে পড়েছিল শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী, শ্রেষ্ঠ সহযোগী অভিনেতা, শ্রেষ্ঠ সহযোগী অভিনেত্রী, শ্রেষ্ঠ সিনেমাটোগ্রাফি, শ্রেষ্ঠ স্ক্রিনপ্লে ইত্যাদি ইত্যাদি পুরষ্কার। শ্রেষ্ঠ পরিচালকের পুরষ্কার জিতেছিলেন সাই হার্ক The Taking of Tiger Mountain মুভির জন্য কিন্তু অন্য কোন ক্যাটাগরিতে জেতা তো দূরের কথা, নমিনেশন পর্যন্ত পায়নি Ten Years. কিন্তু শ্রেষ্ঠ চলচিত্রের পুরষ্কার ঠিকই জিতেছিল এই ইন্ডিপেনডেন্ট ফিল্ম। এর পিছনে অবশ্য অনেক কারণ আছে, সেগুলো পরে বলছি।

 

এই ফিল্ম শ্রেষ্ঠ চলচিত্রের পুরষ্কার জেতাতে অনেকে ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন। পিটার লাম, মিডিয়া এশিয়ার চেয়ারম্যান বলেছিলেন, “এই সিনেমার শ্রেষ্ঠ চলচিত্রের পুরষ্কার জেতার যোগ্যতা নেই, এই সিনেমা শ্রেষ্ঠ অভিনেতা, অভিনেত্রি কোন কিছুর জন্য নমিনেশন পায়নি, এটা ব্লকবাস্টারও ছিল না।”

 

হংকংয়ে এটা পজিটিভ রেসপন্সই পেয়েছিল, এই সিনেমা দেখা শেষে কাঁদতে কাঁদতে থিয়েটার থেকে বেরিয়েছিলেন অনেকে। তবে চীনের চাইনিজ কমিউনিস্ট পার্টির নিয়ন্ত্রিত গ্লোবাল টাইমস এর মতে Ten Years একটি হাস্যকর সিনেমা। গ্লোবাল টাইমসে আরো বলা হয় এই সিনেমার পরিচালক, প্রয়োজকরা বিনা কারণে মানুষদের মধ্যে দুশ্চিন্তা ছড়ানোর চেষ্টা করছে। 

 

এবার আসা যাক মুভিটির সম্পর্কে। Ten Years (2015) হচ্ছে একটি dystopian, speculative fiction, anthology ফিল্ম। চীনের আন্ডারে ২০২৫ সাল পর্যন্ত হংকং এর অবস্থা কেমন হতে পারে এমন ভিন্ন ভিন্ন ৫ টি গল্প নিয়ে বানানো এই সিনেমা। ৫ টি গল্প পরিচালনা করেছেন ৫ জন পরিচালক, কক জুন, ওয়াং ফেই-পাং, জেভানস আউ, চাও কুন ওয়াই এবং উং কা-লিউং। (এই ৫ পরিচালকের মধ্যে জেভানস আউর পরিচালিত ২য় সিনেমাও চীনে নিষিদ্ধ। ৩য়টি সামনে মুক্তি পাবে, দেখার বিষয় সেটাও নিষিদ্ধ হয় নাকি)।

 

মুভিটি চীনের ভালো না লাগলেও ভালো লেগেছে সাম্প্রতিক সময়ে Palme D’or জয়ী জাপানিজ সিনেমা Shoplifters মুভির পরিচালক হিরোকাজু কোরি-ইডার।

 

কোরি-ইডা এবং Ten Years এর প্রজোযক অ্যান্ড্রিউ চই ্মিলে একটি pan-franchise করার পরিকল্পনা করছেন যেখানে নির্মাণ করা হবে Ten Years Japan, Ten Years Taiwan, Ten Years Thai সিনেমা। সবগুলো সিনেমা একদম নতুন ৫ জন পরিচালক নিয়ে নির্মিত হবে।

 

মুভিটি আমি সিনেপ্রেমিক হিসেবে বললে আহামরি ভালো লাগেনি, কিন্তু এরকম সেনসিটিভ বিষয় একটা ইন্ডিপেন্ডেন্ট ফিল্ম বানানোও কতটা কষ্টের তা আমরা সবাই আঁচ করতে পারি, এই ফিল্মটা দেখা আর উপভোগ করার ফিল্ম না। এটা অনেক কিছু জানার ফিল্ম, আসলে হংকংয়ে কী হচ্ছে অথবা কী হতে যাচ্ছে।

 

হংকং এর সিনেপ্রেমিক হিসেবে এই সিনেমা আমার খুব ভালো লেগেছে এবং আমি বলবো এই সিনেমার শ্রেষ্ঠ চলচিত্রের পুরষ্কার জেতাটাও খুব জরুরি ছিল। হংকংয়ের অভিজ্ঞ পরিচালক, তারকারা সবাই চীনের মার্কেট ধরে নিয়েছে কারণ চীনের সিনেমা মার্কেট পুরো বিশ্বের ২য় বৃহত্তম মার্কেট। জ্যাকি চ্যান, স্টিফেন চাও এর মত মেগাস্টাররা এখন চীনেই সিনেমা করেন। এমন পর্যায়ে হংকং আস্তে আস্তে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। হংকং এর হাল ধরার জন্য দরকার নতুন প্রজন্মের। নতুন প্রজন্মে অনেক চিন্তাবাদী প্রতিভা আছে কিন্তু সমস্যা এক্সপোজারে। হংকং এ এখন সেই এক্সপোজার নেই, নতুন প্রজন্ম নিজেদের মেলে ধরার সেই সুযোগ টা পাচ্ছে না। এই সময়ে ইন্ডেপেনডেন্ট সিনেমা অনেক বড় একটি ভূমিকা রাখতে পারে এই মুহূর্তে। Ten Years শ্রেষ্ঠ চলচিত্রের পুরষ্কার জেতার পর থেকে অনেক হংকং সিনেপ্রেমী এখন হংকং এর ইন্ডিপেন্ডেন্ট সিনেমার উপর ভরসা রাখছেন, কারণ তাদের এইটুকু বিশ্বাস হয়েছে যে হংকং এর নতুন প্রজন্মের সত্য বলার সাহস আছে, তাঁরা টাকার কাছে বিক্রি হবেন না। Ten Years শ্রেষ্ঠ চলচিত্রের পুরষ্কার না জিতলে হংকং এর বাহিরে কেউই এই সিনেমা নিয়ে জানতে পারতো না। হংকং এর জন্য এই সিনেমাটাকে এক্সপোজার দেয়া খুব জরুরি ছিল এবং সেটা তাঁরা দিয়েছেও এখন দেখা যাক ভবিষ্যতে কী হয়।

 

(Visited 389 time, 1 visit today)

এই পোস্টটিতে ২ টি মন্তব্য করা হয়েছে

  1. রাজনৈতিক চাপের মুখে এরকম ইন্ডি সিনেমা পড়লে এক ধরনের চাপা ক্রোধ জন্ম নেয়। পাশাপাশি নিজের অসহায়ত্ব ফিরে ফিরে আসে!

মন্তব্য করুনঃ

You must be Logged in to post comment.

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন