হংকং এর ‘প্রতিভা সঙ্কট’ এর কারণ এবং ভবিষ্যত সম্ভাবনা

হংকং ইন্ডাস্ট্রি ৮০-৯০ দশকে পৃথিবীর ৩য় বৃহত্ত ইন্ডাস্ট্রি ছিল। বলিউড,হলিউডের পরই অবস্থান ছিল হংকং এর। তবে হংকং এর মার্কেট বর্তমানের চীন পর্যায়ে ছিল না,তাদের মার্কেট ছোট ছিল কিন্তু সচল ছিল। তাদের ফিল্মিং মার্কেটিং এর সিস্টেম ছিল মাল্টি কাস্ট সিনেমা,সিকুয়েল,রিমেক এবং স্পিন-অফ। এইসব টেকনিকে হংকং ইন্ডাস্ট্রি নিজেদের সচল রাখতো। হংকং আরেকটা জিনিস বেশ ভালো করেছিল,তাঁরা পপ আইডলদের অনেক গুরূত্ব দিতো। এটাও তাদের মার্কেটিংয়ে সাহায্য করতো। মুভির অভিনেতা,অভিনেত্রীদের ‘আইডল ইমেজ’ মুভির আয়ের অনেক বড় উৎস ছিল। যে বিষয়টা হংকং এর কাজ টা সহজ করে দিয়েছিল সেটা হচ্ছে তাদের ‘পপ আইডল’ এর অসীম প্রতিভা। বিষয়টা এমন ছিল না যে কারো জনপ্রিয়তা ব্যবহার করার জন্য তার অভিনয় গুন না থাকাও সত্বেও তাকে সিনেমায় নিয়ে নিতো “হ্যান্ডসাম ফেস” ব্যবহার করার জন্য যেমনটা বর্তমানে চীন ইন্ডাস্ট্রিতে অহরহ হচ্ছে। হংকং এর পপ আইডলদের অভিনয় করার দক্ষতাও ছিল মুগ্ধকর। লেজলি চিউং,অ্যান্ডি লাউ,টনি লিউং চিউ-ওয়াই এই ৩ জন যে গোটা এশিয়ার ইতিহাসের সেরা অভিনেতাদের তালিকায় পড়ে এটা নিয়ে কে দ্বিমত পোষন করবে? কেউই না,লেজলি চিউং কে তো CNN এশিয়া ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ ২৫ অভিনেতার একজন হিসেবে বেছে নিয়েছিল। এই ৩ জনই ছিল পপ আইডল,হংকং এর মানুষদের প্রিয় গায়ক (টনি লিউং এর পপ আইডল ইমেজ যদিও অতটা সমৃদ্ধ ছিল না)। সেই সময় হংকং পপ মিউজিক তথা ক্যান্টোপপ ছিল পুরো এশিয়াতে জনপ্রিয়। হালের কে-পপ তখন এতটা জনপ্রিয় ছিল না বরং কোরিয়াতেই লেজলি চিউং দের জনপ্রিয়তা ছিল অনেক।  এছাড়াও জাপান,ভিয়েতনাম,ইন্দোনেশিয়াসহ বিভিন্ন এশিয়ান দেশে ছিল ক্যান্টোপপের তুমূল জনপ্রিয়তা। লেজলি চিউং তার ক্যারিয়ারে জাপানেই করেছিলেন ১৬ টি কনসার্ট। ক্যান্টোপপ সিঙ্গারদের এই জনরপ্রিয়তার জন্যও সেই সময় হংকং এর ফিল্ম মার্কেটিং বেশ ভালো হতো তাছাড়া ৮০,৯০ দশকে “হংকং মার্শাল আর্টস” সিনেমার মর্যাদা কেমন ছিল তা তো আমরা বাংলাদেশে থেকেও টের পেয়েছি। এছাড়া ৮০ দশকে মুক্তি পাওয়া A Better Tomorrow (1986,John Woo) ছিল এশিয়া সিনেমার ঐ সময়ের সবচেয়ে বড় নাম। লেজলির গাওয়া A Better Tomorrow মুভির থীম গান এখনো সাউথ কোরিয়ান ভ্যারাইটি শো গুলোতে শোনা যায়। (most notable: Running Man)

মার্শার আর্টিস্ট জ্যাকি চ্যান,সাম্মো হাং,উয়েন বিয়াওসহ আরো বিখ্যাত তারকারা তাদের প্রতিভা,দক্ষতা দিয়ে পুরো এশিয়া ছাড়িয়ে পুরো বিশ্বে তাদের নাম করে নেয়। তাদের ছাড়া হংকং ইন্ডাস্ট্রির “Talent Supply” এর মূল দায়িত্ব ছিল TVB স্টেশনের। হংকং ইতিহাসের সবচেয়ে জনপ্রিয় টিভি চ্যানেল। টিভিবির ড্রামা সিরিয়াল গুলো ছিল কোয়ালিটি নির্ভর এবং দর্শকদের কাছে প্রিয়। TVB স্টেশনে কাজ করেই লেজলি চিউং,টনি লিউং চিউ-ওয়াই,অ্যান্ডি লাউ,চাও ইউন-ফাট সহ বিখ্যাত বিখ্যাত তারকারা ইন্ডাস্ট্রিতে পা রাখেন। জনি টোর মত পরিচালকরাও টিভিবি থেকেই হাত পাকা করে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে এসেছিলেন।

জনি টো পরিচালিত সিনেমা Election (2005)

হংকং ট্যালেন্ট সাপ্লাই,মার্কেটিং নিয়ে তো আলোচনা হলো। এবার আসি বর্তমান সময়ে প্রতিভা সঙ্কটের কারণ। ১৯৯৭ হ্যান্ডওভার পর থেকে পুরোপুরিভাবে হংকং এর উপর রাজত্ব করছে চীন। তাদের বিশাল মার্কেটের কাছে অসহায় হংকং। চীনের মানুষ ম্যান্দারিন ভাষায় কথা বলে,তারা অক্ষর হিসেবে ব্যবহার করে simplified characters আর হংকং এর মানুষ ক্যান্টোনিজ ভাষায় কথা বলে,তারা ব্যবহার করে traditional characters বিধায় মানুষ হংকং চীনকে যতই এক সুতোয় গাথার চেষ্টা করুক এটা হবে না,বরং চীনের ক্ষমতার কাছে অসহায় হয়ে আসতে আসতে হারিয়ে যাবে হংকং। আসলে এমনটাই হয়েছে। প্রথমত ক্যান্টোপপের চাহিদা অনেক দূর কমে গেছে। এক সময় লেজলি,অ্যান্ডিদের ক্যান্টোপপে এখন রাজত্ব কারা করছেন এটা কেউই জানে না। ইনফ্যাক্ট আমি ক্যান্টোপপের বিশাল বড় ফ্যান হওয়া সত্বেও জানি না বর্তমানে লিডিং ক্যান্টোপপ সিঙ্গার কারা। এর পেছনে কারণ হচ্ছে চীনের বড় মার্কেটে সবাই ইনভেস্ট করছে। ভালো ভালো প্রোডিউসাররা ম্যান্দারিন ভাষায় গান করছে। ক্যান্টোপপ সিঙ্গাররাও ম্যান্দারিন ভাষায় গান করছে। ওখানে এক্সপোজার বেশি। শুধু বেশি না,অনেক বেশি। এছাড়া কে-পপের তুমূল জনপ্রিয়তাও ক্যান্টোপপে কিছুটা প্রভাব পড়েছে। আগে যেসব দেশে ক্যান্টোপপ রাজত্ব করতো এখন সেইসব দেশে কে-পপ রাজত্ব করছে। আর চীনে ক্যান্টোপপ ছেড়ে সবার মনযোগ ম্যান্ডোপপে। এখন হংকং এর মানুষরাও ভালো জিনিস না পেয়ে কোরিয়ানসহ বিভিন্ন ইন্ডাস্ট্রিতে ঝুঁকে পড়েছে।

জনপ্রিয় সাউথ কোরিয়ান অভিনেতা গোং ইউ হংকং ফ্যান মিটিংয়ে দর্শকদের ভীড় কি পরিমাণ!!

চীন আরেকটা কাজ করেছে হংকং কে ধ্বংস করে দেওয়ার জন্য সেটা হচ্ছে হংকং এর ট্যালেন্ট সাপ্লাই TVB ই ধ্বংস করে দিয়েছে। এমন টা নয় তাঁরা টিভিবি বন্ধ করে দিয়েছে। তাঁরা টিভিবি নিজেদের আয়ত্তে নিয়ে নিয়েছে। এখন টিভিবি প্রচার হয় ম্যান্দারিন ভাষায় যা হংকং এর ভাষা নয়। সাবটাইটেল হিসেবে ব্যবহার হয় simplified characters যেগুলা চীনের মানুষ ব্যবহার করে হংকং এর নয় বিধায় টিভিবিতে এখন হংকংয়ীজদের চেয়ে চাইনিজদেরকেই বেশি পাওয়া যায়। এজন্য হংকং এর মানুষ এখন আর টিভিবি দেখে না আবার টিভিবি থেকে হংকংয়ীজ প্রতিভাও বের হয়ে আসছে না।

.

আর যারা হংকং এর বড় বড় পরিচালক আছে তাঁরা ইতোমধ্যে চীনে নিজেদের জায়গা পুক্ত করে নিয়েছে। এখন সবাই প্রোপোগান্ডা ফিল্ম বানাতে চায়,এখন সবাই অভিনয়ের অ টাও না জানা ম্যান্ডোপপ তারকাদের নিয়ে ফিল্ম বানাতে চায়। কারণ এগুলা করলে বক্স-অফিস সাক্সেস গেরান্টেড। সুযোগ পাচ্ছে না হংকং এর তারকারা। স্টিফেন চাও এর সর্বশেষ ২ টি সিনেমার কথাই ধরুন। The Mermaid,Journey to the West দুইটি সিনেমাই তিনি করেছেন তাইওয়ান এবং চীনের অভিনেতাদের নিয়ে। হংকং এর কাওকে হারিকেন দিয়ে খুঁজেও পাবেন না। হংকং এর প্রতিভারা এখন জায়গা পাচ্ছে না,ভালো মানের পরিচালক পাচ্ছে না। চীনের বড় মার্কেটের সামনে বড্ড অহসায় হংকং।

হংকং এর ডাউনহিলের অনেক গুলো কারণের মধ্যে ৩ টি এতক্ষণ বর্ননা করলাম।

১.ক্যান্টোপপের জনপ্রিয়তা কমে যাওয়া

২.চীনের বড় মার্কেটের সামনে অসহায় আত্মসমার্পণ

৩.টিভিবির ম্যান্দারিন চ্যানেল হয়ে যাওয়া।

১৯৯২ সালের জনপ্রিয় টিভিবি ড্রামা Green of the Man এর এক দৃশ্য।

 

এতক্ষণ তো অনেক হলো হতাশার কথা,হারিয়ে যাওয়ার কথা,হারিয়ে ফেলার কথা। এবার আসি ভবিষ্যত সম্ভাবনা নিয়ে। খুব বেশি সম্ভাবনা বাংলাদেশে বসে আমি দেখছি না। আমি ১০ বছর পর হংকং এর “টোটাল ভ্যানিশ” দেখতে পাচ্ছি বাট। বাট,স্টিল দেয়ার ইজ হোপ। এখনো আশা আছে। আশার কারণই হচ্ছে চিন্তাবাদী তরূন সমাজ। হংকং এর কিছু তরুণ পরিচালক আছে যারা চীনের টাকার ধার ধারে না,এর বড় উদাহরণ জেভানস আউ। সে পরিচালক হিসেবে যুক্ত ছিলেন দুই মুভিতে। ২ টি মুভিই “শ্রেষ্ঠ চলচিত্র” এর পুরষ্কার জিতেছে,মজার বিষয় হচ্ছে ২ টি সিনেমাই চীনে নিষিদ্ধ।। জেভানস আউকে যখন হংকং এর বর্তমান অবস্থা আর তার অবস্থান নিয়ে জিজ্ঞেস করা হয় তখন তিনি বলেন,

“হংকং সিনেমা থেকে বর্তমানে একজন পরিচালক যা আয় করেন তা দিয়ে জীবন যাপন করা সম্ভব নয় তবে আমি এখানে টাকা কামাতে আসিনি। আমি এখানে এসেছি কারণ আমি কিছু বলতে চাই আমার সিনেমার মধ্য দিয়ে।”

জেভানস আউ এর এই বিবৃতিতে দুটি জিনিস স্পষ্ট। এক,হংকং এর বেহাল দশা।তরুণ পরিচালকরা ঠিকমত উপার্জনও করতে পারছেন না এখানে। দুই,জেভানস আউয়ের ডেডিকেশন অথবা চিন্তাধারা।

হংকং এর ভক্তরা আরেকটা বিষয় নিয়ে আশায় থাকতে পারে। ২০১৬ সালে হংকংয়ে ২৮ জন তরুণ পরিচালকের ডেব্যু হয়েছে। অনেকের মাঝে পোটেনশিয়াল দেখা গিয়েছে। যার মধ্যে ওয়াং চুনে আমি বড় আশাবাদী। দেখা যাক,ক্লাসিক,ওয়াইড-ওপেন ইন্ডাস্ট্রির তরুণরা এই ইন্ডাস্ট্রির পুনরুদ্ধার করতে পারেন কিনা।

(Visited 715 time, 1 visit today)

এই পোস্টটিতে ১টি মন্তব্য করা হয়েছে

  1. its very different kind of writing about the forgotten foreign industy,
    i like the way its analyzed and i like the writing, lots of love

মন্তব্য করুনঃ

You must be Logged in to post comment.

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন