হংকং সিনেমার অতীত,বর্তমান,ভবিষ্যত; আশা আশংকার কথা
Share on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on TwitterPin on Pinterest0

সাম্প্রতিক সময় চাইনিজ নিউ ইয়ারে Journey to the West: Demons strike Back এবং Kungfu Yoga টাকার বন্যা বসিয়ে দিয়েছে,দুইটি ফিল্মই জায়গা করে নিয়েছে চাইনিজ ইতিহাসের ১০ টি হাইয়েস্ট গ্রসিং মুভির তালিকায়। এই ২ টি মুভির পিছনেই ছিল হংকং এর মাস্টারমাইন্ড স্টিফেন চাও এবং জ্যাকি চ্যান।

Kung Fu Yoga ১.৭৫৩ বিলিয়ন নিয়ে হাইয়েস্ট গ্রসিং হংকং মুভির তালিকায় ৬ষ্ট অবস্থানে আছে,অন্যদিকে Journey to the West: The Demons Strike Back ১.৬৫৬ বিলিয়ন নিয়ে ৮ম অবস্থানে আছে।
হংকং এর হাই প্রোফাইল যেসব পরিচালক আছে তারা সবাই চীনের বড় বাজেটের প্রোজেক্টে ব্যস্ত। জন ইউ,ওং কার-ওয়াই রা ১ যুগের ও বেশি সময় ধরে অথেনটিক হংকং ফিল্মে কাজ করেনি। তারা সবাই যখন চীনের বড় বাজেটে কাজ করায় ব্যস্ত তখন হংকং সিনেমা বিভিন্ন সমস্যা ধুকছে। কেন বড় বড় পরিচালকরা হংকং এ কাজ করতে ইচ্ছুক নয়? উত্তর টা জেভানস আউর কাছে জানতে চাইলে সে বলে,”হংকং এর বর্তমান প্রেক্ষাপটে একটা ফিল্ম যা আয় করে তা জীবন যাপনের জন্য যথেষ্ট নয়।”
বিষয় টা বেশ চিন্তার,বিজনেস সব জায়গায়ই দরকার,নাহলে পুরো বিষয়টা কল্যাপ্স করবে,এবং সেটাই হয়েছে। এক সময় হংকং এর বক্স অফিস খুব সচল ছিল,পৃথিবীর ৩য় বৃহত্ত ইন্ডাস্ট্রি ছিল হংকং,এছাড়া তাদের যেসব হেভিওয়েট ছিল জ্যাকি চ্যান,লেজলি চিউং,টনি লিউং চিউ-ওয়াই,অ্যান্ডি লাউ সবার পুরো এশিয়ার বিভিন্ন বিভিন্ন দেশে ফ্যানবেস ছিল,লেজলি চিউংদের অ্যালবাম কোরিয়াতে মনসটার হিট হতো। এখন যারা তারকা আছে তাদের কোন ফ্যানবেস নেই,শক্তিশালি ফ্যানবেস নেই। বিশেষ করে ১৯৯৭ এর চাইনিজ হ্যান্ডওভারের পর হংকং থেকে তেমন কোন স্টার জনপ্রিয়তা পায়নি কারন হংকং এর সব তারকারা চাইনিজ জনপ্রিয়দের সাথে কাজ করায় ব্যস্ত,কারন তাদের স্টারডম ব্যবহার করে টাকা আয় করা সহজ হয়ে যায়।

চীনের জনপ্রিয় ২ তারকার সাথে স্টিফেন চাও। The Mermaid (2016) মুভির সেটে

চীনের জনপ্রিয় ২ তারকার সাথে স্টিফেন চাও। The Mermaid (2016) মুভির সেটে

এবার কথা বলা যাক একটু পুরনো সময় নিয়ে:
হংকং সিনেমার উথান শুরু ৬০ দশক থেকে,৭০ দশকে আসে হংকং এর পিক টাইম। তবে তখন হংকং এর নামিদামি প্রোডাকশনই ছিল Shaw Brothers। সেই সময় হংকং এ চীনের ভাষা ম্যান্দারিন ভাষায় মুভি হতো,আর Shaw Brothers এর স্টাইল বিশ্বমানের ছিল না,তাদের প্রোডাকশনের স্টাইল ছিল,কেউ জনপ্রিয়তা পেলে তাকে দিয়ে বছরে ৫-৭ টা মুভি বের করে যত বেশি সম্ভব টাকা কামানো যায়,মুভিতে ইনভেস্ট ও তারা করতো না,ইনফ্যাক্ট অনেক আউটসাইড দৃশ্য ও স্টুডিওর মধ্যেই নেয়া হতো,পিছনে বোর্ডে আকাশ এঁকে শ্যুটিং করা হতো,যাতে যখনই তারা চায় তখনই শ্যুটিং চালিয়ে যেতে পারে।

Shaw Brothers মুভির এক ঝলক।

Shaw Brothers মুভির এক ঝলক।

পরে আসে Golden Harvest এর যুগ,ব্রুস লি সবাইকে অবাক করে দিয়ে Shaw Brothers রেখে Golden Harvest এ চুক্তি করে,তখনই হংকং সিনেমার সুদিন শুরু হয়,তবে কিছুটা ভাটা পরে মাঝে ব্রুস লির মৃত্যুতে। অনেক বছর সাফারের পর জ্যাকি চ্যান পরিচালক হিসেবে সাইন করে Golden Harvest এ। আর চলে আসে জ্যাকি চ্যানের ক্যারিয়ারের সেরা সময়,একজন জ্যাকি চ্যান কে তৈরি করতে Golden Harvest এর অবদান ও কম নেই,যেই দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ের স্টুডিও জলদি জলদি মুভি বানিয়ে টাকা কামাতে ব্যস্ত সেখানে Golden Harvest প্রতিটা মুভির জন্য সময় দিতো,জ্যাকি চ্যানের অনেক ২-৩ মিনিটের ফাইট দৃশ্য শ্যুট করতে ১-২ মাস সময় লেগে যেতো,কিন্তু সে প্রোডাকশন থেকে পুর্ন স্বাধীনতা পেয়েছিলো নিজের মত করে কাজ করার সুযোগ পেয়েছিল বলেই সে সর্বকালের অন্যতম সেরা অ্যাকশান তারকার ক্ষ্যাতি পেয়েছে,তার Dragon Lord (1982) মুভির শাটাল কক ম্যাচের দৃশ্য শ্যুট করতে ২৯৯০ টি টেক নিতে হয়েছিলো যা একটি রেকর্ড। Golden Harvest বলেই জ্যাকি চ্যান এই স্বাধীনতাটা পেয়েছিল। তার সময়ে তারই ২ বন্ধু উয়েন বিয়াও,সাম্মো হাং ও পেয়ে যায় নিজেদের ক্যারিয়ারের সেরা সময়। এতেই জমজমাট হয়ে যায় হংকং,একের পর এক বিশ্বমানের মুভি বের হতে থাকে,মার্শাল আর্টস কে মুভিতে শিল্পের পর্যায় নিয়ে যায় তারা।

Dragon Lord মুভির শাটাল কক ম্যাচের দৃশ্য।

Dragon Lord মুভির শাটাল কক ম্যাচের দৃশ্য।

তারপর জন ইউর হাত ধরে শুরু হয় ক্রাইম মুভির যুগ A Better Tomorrow (1986) পুরো এশিয়ার ফিল্মিং স্টাইলে ছাপ রেখে যায়,মুভির গান বিভিন্ন দেশের মানুষের মুখে মুখে ছিল। সেই ফিল্ম হংকং এও অনেক influential হয়,চাও ইয়ুন ফাটের মত একজন অভিনেতার ক্যারিয়ারের পিক টাইম শুরু হয় এই ফিল্ম দিয়ে। লেজলির মত জাত অভিনেতার ও যাত্রা শুরু হয় ইন্ডাস্ট্রিতে। একদিকে জ্যাকি চ্যান,সাম্মো হাং,উয়েন বিয়াওদের অ্যাকশান সিনেমা,একদিকে জন ইউর ক্রাইম ফিল্ম,একদিকে ওং কার-ওয়াইর আর্ট ফিল্ম,অন্যদিকে স্টিফেন চাওর কমেডি ফিল্ম। এক কথায় হংকং সিনেমা হয়ে যায় অন্যন্য,কিন্তু সব কিছুই পরিবর্তন হতে শুরু করে ১৯৯৭ সালের হ্যান্ডওভারের পর। বর্ষীয়ান অভিনেতা অ্যানথনি ওয়াং এর কাছে যখন হংকং এর বর্তমান সময়কে মুল্যায়ন করতে বলা হয় তখন সে বলে,”এক সময় হংকং এর ইন্ডাস্ট্রি অনেক সচল ছিল,কিন্তু ১৯৯৭ এর পর পরিবর্তন হয়ে গেছে,আমাদের ইন্ডাস্ট্রিতে এখন আর আয় নেই,যা আয় হয় তা খুবই সামান্য”

A Better Tomorrow মুভির আইকনিক দৃশ্য।

A Better Tomorrow মুভির আইকনিক দৃশ্য।

এক যুগ ধরে কোন হংকং ফিল্ম বক্স অফিসে রেকর্ড করতে পারেনি,সব অভিজাত পরিচালকরা ইতিমধ্যে চীনের বক্স অফিস ধরে নিয়েছে,দিন দিন হংকং সিনেমার আয় কমছে,ইনভেস্ট করার হার ও দিন দিন ক্রমেই কমে যাচ্ছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে হংকং সিনেমা কি চীনের মার্কেট ধরতে পারে না যেমন দাঙ্গাল ইন্ডিয়ান ফিল্ম কয়েকদিন আগে চীনে আগুন ধরিয়ে দিলো,সেভাবে কি হংকং এর ফিল্ম চাইনিজ মার্কেট ধরতে পারে না? না,পারে না। হংকং এর প্রোডাকশন চীনে বড় রিলিজ পায়না,পেলেও দর্শক সাড়া পায়না,এজন্য সবাই হংকং-চাইনিজ যৌথ প্রযোজনার ফিল্ম মুক্তি দেয়,আর সেখানেই সমস্যা,মুভির বেশিরভাগ তারকাই চাইনিজ থাকে,ভাষায় ও শ্যুট হয় ম্যান্দারিন ভাষায়,মোট কথায় চাইনিজ ফিল্ম শুধুমাত্র “হংকং-চীন” নামে মুক্তি পায়। এতো বৈষ্যমতা কেনো?? এটার উত্তর কে খুঁজবে??

২০১৫ এবং ২০১৬ শেষ ২ বছরে হংকং এর সেরা চলচিত্র পুরষ্কার জয়ী ২ টি ফিল্মই চীনে নিষিদ্ধ হয়েছে,ইনফ্যাক্ট হংকং ফিল্ম অ্যাওয়ার্ডসের খবর চীনে প্রকাশ করা হলেও সেরা চলচিত্রের নাম প্রকাশ করা হয়নি,তারমধ্যে প্রথম টা Ten Years (2015) চীন বিরোধি ছিল,সেটা নিষিদ্ধ হবে অনুমেয় ছিল কিন্তু পরের টা Trivisa (2016) কেন নিষিদ্ধ হয়েছে তা আজ ও একটা রহস্য। এই ২ টি মুভির কোনটিও একক পরিচালনার ছিল না,প্রথম টি Ten Years অনেক জন পরিচালক সেগমেন্ট সেগমেন্ট করে পরিচালনা করেছিলো আর দ্বিতীয়টি Trivisa ৩ জন পরিচালক পরিচালনা করেছিলো। ২ টি মুভিতেই পরিচালক হিসেবে যুক্ত ছিল জেভান্স আউ,তার কাছে হংকং সিনেমায় তার অবস্থান জানতে চাওয়া হলে সে উত্তরে বলে,”আমি আসলে জীবিকার তাগিদে মুভি বানাই না,আমি কিছু একটা বলতে চাই,তার জন্য মুভি বানাই”
তার কথায় একটা জিনিস স্পষ্ট,সে স্বাধীন ফিল্ম পরিচালক হবে,টাকা আয় করা নিয়ে মাথা ব্যাথা নেই,তার পরিচালনার ২ টি ফিল্মই হংকং এ সেরা চলচিত্রের পুরষ্কার জিতেছে আর ২ টি ফিল্মই চীনে নিষিদ্ধ হয়েছে,তার অবস্থান হংকং এবং চীনে স্পষ্ট। ২০১৭ সালের হংকং ফিল্ম অ্যাওয়ার্ডসে সেরা নতুন পরিচালকের পুরষ্কার জিতেছে ওয়াং চুন,ওর মধ্যেও আমি ভবিষ্যত দেখতে পাই,এছাড়া ২০১৬ সালে নতুন ২৮ জন পরিচালকের অভিষেক হয়েছে হংকং এ,অনেকের মতে এটাই হতে পারে হংকং এর সামনের সময়ের টার্নিং পয়েন্ট। আর লয়্যাল ফ্যানরা তো আছেই,সব মিলিয়ে হংকং এর সুদিন ফিরবে,এমন কথা উড়িয়েও দেয়া যায় না,আবার খুব বেশি আশা নিয়ে বসে থাকাও যায় না। হংকং এর প্রতি রইলো গুড উইশ

মন্তব্য করুনঃ

You must be Logged in to post comment.

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন