মুক্তিযুদ্ধের দশ চলচ্চিত্র . . . .

বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে প্রামাণ্য, স্বল্পদৈর্ঘ্য এবং পূর্ণদের্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে এত বেশিসংখ্যক চলচ্চিত্র নির্মাণ হয়েছে যে, দেশের বাইরেও তা প্রশংসা কুড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের হেরাল্ড ট্রিবিউন পত্রিকার ভাষায় ‘আগামী প্রজন্মের কাছে সবচেয়ে গৌরব, গর্ব আর বেদনাগাথা মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস তুলে ধরতে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র পালন করে যাচ্ছে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা। দেশটির জন্য সত্যিই এটি আশা ও অহঙ্কারের বিষয়’। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এক বছরের মধ্যেই ১৯৭২ সালে মুক্তি পায় চারটি চলচ্চিত্র। এগুলো হলো_ চাষী নজরুল ইসলামের ‘ওরা ১১ জন’, সুভাষ দত্তের ‘অরুণোদয়ের অগি্নসাক্ষী’, মমতাজ আলীর ‘রক্তাক্ত বাংলা’ এবং আনন্দের ‘বাঘা বাঙ্গালী’। এর পর ৪১ বছরে নির্মিত হয়েছে প্রায় দেড় ডজন মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে_ আলমগীর কবিরের ‘ধীর বহে মেঘনা’ (১৯৭৩), চাষী নজরুল ইসলামের ‘সংগ্রাম’ (১৯৭৪), আলমগীর কুমকুমের ‘আমার জন্মভূমি’ (১৯৭৪), হারুণর রশীদের ‘মেঘের অনেক রং’ (১৯৭৬), শহীদুল হক খানের ‘কলমী লতা’ (১৯৮১), নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বাচ্চুর ‘৭১-এর যীশু’ (১৯৯৩), হুমায়ূন আহমেদের ‘আগুনের পরশমণি’ (১৯৯৪), তারেক মাসুদের ‘মুক্তির গান’ (১৯৯৫), চাষী নজরুলের ‘হাঙর নদী গ্রেনেড’ (১৯৯৭), হুমায়ূন আহমেদের ‘শ্যামল ছায়া’ (২০০৫), তৌকীর আহমেদের ‘জয় যাত্রা’ (২০০৮), চাষী নজরুলের ‘ধ্রুবতারা’ (২০০৯) এবং নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বাচ্চুর ‘গেরিলা’ (২০১১)। এ চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে জাতীয় ও বাচসাস পুরস্কার, আন্তর্জাতিক ও বোদ্ধা শ্রেণীর প্রশংসার নিরিখে ১০টি চলচ্চিত্রকে মুক্তিযুদ্ধের সেরা চলচ্চিত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে-

মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক প্রথম এই চলচ্চিত্রটি। মুক্তিযুদ্ধের সরাসরি পটভূমি ও অ্যাকশন নিয়ে নির্মিত এই চলচ্চিত্র বাঙালির মরণপণ মুক্তি সংগ্রামের প্রতীক হয়ে ওঠে। এতে ১১ জন মুক্তিযোদ্ধার ১৯৭২ সালের ১৩ আগস্ট মুক্তি পায় ‘ওরা ১১ জন’। চাষী নজরুল ইসলাম নির্মাণ করেন চরিত্রে অভিনয় করেন ১১ মুক্তিযোদ্ধা। যারা পেশাদার শিল্পী ছিলেন না। এরা হলেন_ খসরু, মঞ্জু, হেলাল, ওলীন, আবু, আতা, নান্টু, বেবী, আলতাফ, মুরাদ ও ফিরোজ। ১১ দফার ছাত্র আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের ১১টি সেক্টরকে মাথায় রেখে প্রতীকী অর্থে এ চলচ্চিত্রের নামকরণ করা হয় ‘ওরা ১১ জন’। চলচ্চিত্রের শুরুতে টাইটেলে ছয়টি কামানের গোলার শব্দ শোনা যায়। নির্মাতার মতে, এ ছয়টি শব্দ হচ্ছে ছয়দফা দাবির প্রতীকী শব্দ। এই চলচ্চিত্রে যে অস্ত্রশস্ত্র, গোলাবারুদ ব্যবহার হয়েছিল সবই ছিল সত্যিকারের। ‘ওরা ১১ জন’ মস্কো, ইংল্যান্ড, জামশেদপুর, রাচী, কলকাতা ও বোম্বেতে প্রদর্শিত হয়েছিল। বলিউডের প্রখ্যাত নির্মাতা রাজকাপুর চলচ্চিত্রটি দেখে এ চলচ্চিত্রের নির্মাতাকে প্রশ্ন করেছিলেন ‘হাউ- ইট পসিবল’, সদ্য স্বাধীন দেশে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এমন জীবন্ত চলচ্চিত্র নির্মাণ কীভাবে সম্ভব। তিনি বলেন, বলিউডে আমরা এ ধরনের বিষয় নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণে সাহস পাইনি’। এ চলচ্চিত্রের প্রযোজক মাসুদ পারভেজ (অভিনেতা সোহেল রানা) বলেন, ‘এটি আসলে শুধু একটি চলচ্চিত্র নয়, মুক্তিযুদ্ধের প্রামাণ্য দলিলও বটে’।

১৯৭২ সালে মুক্তি পেয়েছিল সুভাষ দত্ত পরিচালিত ‘অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী চলচ্চিত্রটি। তৎকালীন মুক্তিযুদ্ধের ওপর নির্মিত চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে বিষয়বস্তুগত দিক দিয়ে এ চলচ্চিত্রটিকে একেবারেই অন্যরকম বলে মন্তব্য করেছিলেন বুদ্ধিজীবীরা। এ চলচ্চিত্রের ঘটনা মূলত এক চিত্র অভিনেতার মুক্তিযুদ্ধকালের অভিজ্ঞতাকে ঘিরেই।

যিনি যুদ্ধের বিভীষিকা থেকে রক্ষা পেতে পশ্চিমবঙ্গে পালিয়ে যান এবং দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বিবেকের দংশনে দংশিত হতে থাকেন। এ চরিত্রে অভিনয় করেন আনোয়ার হোসেন। অন্যদিকে পাকবাহিনী ও রাজাকারদের হাতে নারীর সম্ভ্রমহানির ঘটনাগুলো মর্মস্পর্শীভাবে উঠে এসেছে এই চলচ্চিত্রে। সুভাষ দত্তের পাণ্ডুলিপি ও নিজের পরিচালনায় এ চলচ্চিত্রে ববিতা বীরাঙ্গনার চরিত্রে অনবদ্য অভিনয় করেন।

১৯৯৪ সালে নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ নিজের লেখা গল্পে নির্মাণ করলেন ‘আগুনের পরশমণি’। যুদ্ধকালীন একটি পরিবারের দুঃখ, ভয় ও প্রাপ্তির স্বপ্নঘেরা গল্পে জীবন্ত হয়ে উঠেছিল চলচ্চিত্রটি। ঢাকায় বসবাস করা নিতান্ত সাধারণ একটি পরিবার। পরিবারের কর্তা পাকবাহিনীর ভয়ে তটস্থ থাকলেও তার স্ত্রী ও কন্যা মুক্তিযোদ্ধা জেনেও এক যুবককে তাদের বাড়িতে আশ্রয় দেয়। সহযোগিতা করে। এক সময় সেই যুবকের প্রতি কন্যাটি দুর্বল হয়ে পড়ে। যুদ্ধে অংশ নিতে গিয়ে যুবকের মৃত্যু এবং স্বাধীনতার সূর্য উদয়ের মধ্য দিয়ে গল্পের সমাপ্তি ঘটে। এর প্রধান অভিনয়শিল্পীরা হলেন_ আবুল হায়াত, ডলি জহুর, বিপাশা হায়াত, আসাদুজ্জামান নূর প্রমুখ। ‘আগুনের পরশমণি’ ১৯৯৪ সালের শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র হিসেবে জাতীয় পুরস্কার লাভ করে। বিপাশা হায়াতও শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর স্বীকৃতি পান। এ ছাড়া বিদেশেও চলচ্চিত্রটি প্রশংসিত হয়।

প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেনের গল্প অবলম্বনে ১৯৯৭ সালে চাষী নজরুল ইসলাম নির্মাণ করেন ‘হাঙ্গর নদী গ্রেনেড’। মুক্তিযুদ্ধের সময় এক স্নেহময়ী মা মুক্তিযোদ্ধাদের রক্ষা করতে গিয়ে তার প্রতিবন্ধী পুত্রকে তুলে দেন পাক সেনাদের হাতে। তারা তাকে নির্মমভাবে হত্যা করে। মা নিজের পুত্রের চেয়েও দেশকে বড় করে দেখেছিলেন। এমন মর্মস্পর্শী ত্যাগের গল্পের এই চলচ্চিত্রটি শুধু প্রশংসাই পায়নি, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারও লাভ করে। এতে অভিনয় করেছেন সোহেল রানা, সুচরিতাসহ অনেকে।

মুক্তিযোদ্ধা ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু নিজের পাণ্ডুলিপি নিয়ে ১৯৯৩ সালে নির্মাণ করেন ‘৭১-এর যীশু’। এতে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষ সব পেশা ও শ্রেণীর মানুষের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের চিত্রের পাশাপাশি বাঙালি জাতির ওপর পাক বাহিনীর নির্মম নির্যাতনের চিত্র মর্মস্পর্শী রূপে ফুটে উঠেছে। পাকসেনারা মুক্তিযোদ্ধাদের ক্রুশবিদ্ধ করে হত্যা করার পথ বেছে নেয়। তাই গল্পকার ক্রুশবিদ্ধ মুক্তিযোদ্ধাদের যীশুর সঙ্গে তুলনা করে চলচ্চিত্রের নামকরণ করেছেন ‘৭১-এর যীশু’। এর মূল দুটি ভূমিকায় অভিনয় করেছেন পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায় ও হুমায়ুন ফরীদি। জাতীয় ও বাচসাসসহ দেশে-বিদেশে পুরস্কার এবং প্রশংসা অর্জন করে এ চলচ্চিত্রটি।

১৯৭৯ সালে হারুনুর রশীদ নির্মাণ করেন ‘মেঘের অনেক রং’। এ চলচ্চিত্রের পুরো কাহিনী উঠে এসেছে একটি শিশুর দৃষ্টিকোণ থেকে। সদ্যবোধসম্পন্ন যে ছেলেটি তার মাকে খুঁজে বেড়ায়। এরই ফাঁকে চলে আসে যুদ্ধের কথা। যুদ্ধে তার মা পাক বাহিনীর লাঞ্ছনার শিকার হয়ে আত্দহত্যার পথ বেছে নেয়। এতে অভিনয় করেন রওশন আরা, ওমর এলাহী মাথিন ও মাস্টার আদনান।
শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র হিসেবে এটি জাতীয় পুরস্কার অর্জন করে। একই সঙ্গে বাচসাস ও আন্তর্জাতিক নানা স্বীকৃতিতে ভূষিত হয় এবং কাব্যিকধর্মী চলচ্চিত্র হিসেবে সমালোচকদের প্রশংসা কুড়ায়।

সাংবাদিক ও চলচ্চিত্রকার শহীদুল হক খান সরকারি অনুদানে ১৯৮১ সালে নির্মাণ করেন ‘কলমিলতা’। এতে মুক্তিযোদ্ধা ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পাকসেনার বিরুদ্ধে দুঃসাহসিক অভিযানের গল্প উঠে এসেছে। বাচসাসসহ নানা সংগঠনের পুরস্কার ও প্রশংসা অর্জন করে চলচ্চিত্রটি। এতে প্রধান দুটি চরিত্রে অভিনয় করেন সোহেল রানা ও সুচরিতা।

মুক্তিযুদ্ধকালীন আমেরিকান সাংবাদিক লিয়ার লেভিন সেখানকার এক টেলিভিশন কোম্পানির জন্য মুক্তিযুদ্ধে শিল্পীরা কীভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন এর ওপর ছবি তোলেন। স্বাধীনতার ২২ বছর পর সেই ছবি উদ্ধার এবং বাছাই করে তরুণ চলচ্চিত্রনির্মাতা তারেক মাসুদ ও ক্যাথরিন মাসুদ একটি চমৎকার চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। চলচ্চিত্রের শিরোনাম দেন ‘মুক্তির গান’। এটি ১৯৯৫ সালে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র হিসেবে জাতীয় পুরস্কার লাভ করে।

নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ নিজের লেখা মুক্তিযুদ্ধের গল্প নিয়ে ২০০৫ সালে নির্মাণ করেন ‘শ্যামল ছায়া’। মুক্তিযুদ্ধে এক তরুণীর আত্দত্যাগের ঘটনাসহ যুদ্ধকালীন নানাদিক উঠে এসেছে এই চলচ্চিত্রে। চলচ্চিত্রটি অস্কারে মনোনয়ন পেয়েছিল এবং জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করে। এর প্রধান অভিনয়শিল্পীরা হলেন_ হুমায়ুন ফরীদি, চ্যালেঞ্জার, রিয়াজ, শাওন, ডা. এজাজ প্রমুখ।

সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হকের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস ‘নিষিদ্ধ লোবান’ অবলম্বনে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও চলচ্চিত্রকার নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু ২০১১ সালে নির্মাণ করেন ‘গেরিলা’। যুদ্ধকালীন পাক হানাদার বাহিনী ও রাজাকার, আল বদর, আল শামসদের ঘৃণিত তৎপরতা ও বর্বরতা এ চলচ্চিত্রে মর্মস্পর্শীভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। পাক সেনাবাহিনীর এক কর্মকর্তার পৈশাচিক রূপ এবং এক সাংবাদিকের স্ত্রীর মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার দিকটি মূলত এ চলচ্চিত্রের মূল উপজীব্য। গেরিলা ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন পুরস্কার ও প্রশংসা অর্জন করেছে। ২০১১ সালের শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র, পরিচালকসহ বেশ কয়েকটি ক্যাটাগরিতে এই চলচ্চিত্রকে জাতীয় পুরস্কার দেওয়ার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে। এতে অভিনয় করেছেন জয়া আহসান, ফেরদৌস, শতাব্দী ওয়াদুদ প্রমুখ।

[সংগৃহীত]

(Visited 356 time, 1 visit today)

মন্তব্য করুনঃ

You must be Logged in to post comment.

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন