পাঁচজন হুমায়ূন , একজন ফরীদি
Share on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on TwitterPin on Pinterest0

হুমায়ূন ফরীদিকে নিয়ে হুমায়ূন আহমেদ একটা লেখা লিখেছিলেন। সেই লেখার শুরুর অংশে তিনি দৈনিক বাংলার সহ-সম্পাদক সালেহ চৌধুরীর উদ্ধৃতি দিয়ে লিখেছিলেন, তিনি আমার শহীদুল্লা হলের বাসায় উপস্থিত হয়ে বললেন, ‘‘বাংলাদেশে পাঁচজন হুমায়ূন আছে। দৈনিক বাংলায় এদের ছবি একসঙ্গে ছাপা হবে। আমি একটা ফিচার লিখব, নাম ‘পঞ্চ হুমায়ূন’।’’

আমি বললাম, “পাঁচজন কারা?”

সালেহ চৌধুরী বললেন, “রাজনীতিবিদ হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী, দৈনিক বাংলার সম্পাদক আহমেদ হুমায়ূন, অধ্যাপক এবং কবি হুমায়ূন আজাদ, অভিনেতা হুমায়ূন ফরীদি এবং তুমি।’’

73740_585079694839412_395329513_n

 

বর্তমানে পাঁচ হুমায়ূনের একজনও বেঁচে নেই। হুমায়ূন পাঁচজন হলেও ফরীদি একজনই। আজকে তাকে নিয়েই কিছু লেখার বা কিছু শেয়ার করার চেষ্টা করব।

হুমায়ূন ফরীদির জন্ম ২৯ মে ১৯৫২ সালে ঢাকার বাবা এটিএম নুরুল ইসলাম ছিলেন জুটবোর্ডের কর্মকর্তা। মা বেগম ফরিদা ইসলাম গৃহিণী। চার ভাই-বোনের মধ্যে তাঁর অবস্থান ছিল দ্বিতীয়।দুই ভাই দুই বোন।  জন্ম ঢাকায় হলেও শৈশব-কৈশোরে স্থায়ীভাবে তার থাকা হয়নি ঢাকায়। বাবার চাকরির সুবাদে ঘুরতে হয়েছে মৌলভীবাজার, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চাঁদপুর, কিশোরগঞ্জ, মাদারীপুরসহ আরও অসংখ্য জেলায়।  হুমায়ুন ফরীদির ডাকনাম পাগলা, সম্রাট, গৌতম প্রভৃতি।

 

ইউনাইটেড ইসলামিয়া গভর্নমেন্ট হাই স্কুলের ছাত্র ছিলেন তিনি। মাধ্যমিক স্তর উত্তীর্ণের পর চাঁদপুর সরকারী কলেজে পড়াশোনা করেন। এরপর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক (সম্মান) অর্থনীতি বিষয়ে পড়াশোনান্তে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী লাভ করেন।

হুমায়ূন ফরীদির অভিনয় জীবন শুরু মঞ্চে অভিনয়ের মাধ্যমে। বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্য কার্যক্রমের সাথে জড়িত ছিলেন তিনি। ১৯৭৬ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত নাট্য উৎসবে তিনি অন্যতম সংগঠক ছিলেন। এখানে তিনি ‘আত্মস্থ ও হিরন্ময়ীদের বৃত্তান্ত’ নামে একটি নাটক লিখেন, নির্দেশনা দেন এবং অভিনয় করেন। এ নাটকটি পাঁচটি নাটকের মধ্যে সেরা নির্বাচিত হয় বিচারকদের কাছে। এ নাটকের সুবাদে পরিচয় ঘটে ঢাকা থিয়েটারের নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চুর সঙ্গে। মূলত এখান থেকে হুমায়ুন ফরীদির অভিনয় যাত্রা শুরু। তবে ক্লাস নাইন-টেনে থাকতে মাদারীপুরে বসবাসকালীন সময়ে তিনি প্রথম অভিনয় করেন। নাটকের নাম ছিল ‘মুখোশ যখন খুলবে’।

 

ঢাকা থিয়েটারের মধ্য দিয়ে হুমায়ুন ফরীদির মঞ্চযাত্রা শুরু হয়। তিনি বলেছিলেন, “চা আনা আর কস্টিউম পরিয়ে দেয়া পর্যন্ত তার প্রাথমিক গণ্ডি। আর সেলিম আল দীনের ‘চরকাঁকড়ার ডকুমেন্টারি’ নাটকের প্রোডাকশনে কাজ করি। এরপর একই দলের একই লেখক ও নির্দেশকের ‘সংবাদ কার্টুন’-এ ছোট্ট একটি চরিত্রে সুযোগ পাই।“ তারপর ‘শকুন্তলা’. শকুন্তলার পর ‘ফণীমনসা’, ‘কীত্তনখোলা’, ‘কেরামতমঙ্গল’, ‘মুনতাসীর ফ্যান্টাসি’ এবং ১৯৯০ সালে ‘ভূত’ দিয়ে শেষ হয় হুমায়ুন ফরীদির ঢাকা থিয়েটার জীবন। আর এই ভূতের নির্দেশক ছিলেন তিনি নিজে। যে ‘ভূত’ অবলম্বনে পরবর্তীতে শাহরুখ খান-রানী মুখার্জির ‘পহেলী’ নামের একটি ছবিও নির্মিত হয় মুম্বইয়ে। এটি ছিল একটি রাজস্থানি গল্প। মূলত বন্ধু-অভিনেতা আফজাল হোসেনের সাহস এবং উৎসাহে হুমায়ুন ফরীদির টেলিভিশন যাত্রা শুরু হয়।

 

হুমায়ুন ফরীদি টিভি নাটকে প্রথম অভিনয় করেন আতিকুল হক চৌধুরীর প্রযোজনায় ‘নিখোঁজ সংবাদ’-এ। তার অভিনীত অন্যান্য উল্লেখযোগ্য টিভি নাটকের মধ্যে রয়েছে ‘নীল আকাশের সন্ধানে’, ‘দূরবীন দিয়ে দেখুন’, ‘ভাঙনের শব্দ শুনি’, ‘বকুলপুর কতদূর’, ‘মহুয়ার মন’, ‘সাত আসমানের সিঁড়ি’, ‘একদিন হঠাৎ’, ‘চাঁনমিয়ার নেগেটিভ পজেটিভ’, ‘অযাত্রা’, ‘পাথর সময়’, ‘দুই ভাই’, ‘শীতের পাখি’, ‘সংশপ্তক’, ‘কোথাও কেউ নেই’, ‘সমুদ্রে গাঙচিল’, তিনি একজন’, ‘চন্দ্রগ্রস্ত’, ‘কাছের মানুষ’, ‘মোহনা’, ‘বিষকাঁটা’, ‘ভবের হাট’ ও ‘শৃঙ্খল’.

 

‘সংশপ্তক’ ধারাবাহিকে তার অভিনীত চরিত্র কান কাটা রমজানের কথা নতুন করে বলার কিছু নেই। ১৯৮৫ সালের দিকে হুমায়ুন ফরীদি অনুধাবন করেন তিনি আসলে অভিনয় ছাড়া আর কিছু করতে পারবেন না। অন্য কিছু থেকে রোজগার করে জীবন নির্বাহ করা সম্ভব নয়। তার একমাত্র অবলম্বন কিংবা পুঁজি হচ্ছে অভিনয়।

 

১৯৯০-এর দশকে হুমায়ুন ফরীদি চলচ্চিত্র জগতে প্রবেশ করেন। সেখানেও তিনি বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করেন। বলা হয়ে থাকে যে, স্যুটিংস্থলে অভিনেতার তুলনায় দর্শকেরা হুমায়ুন ফরীদির দিকেই আকর্ষিত হতো বেশি।

চলচ্চিত্রে কাজ না করলে হয়তো যাত্রা দলে ভিড়ে যেতেন তিনি। এমন প্রস্তুতিও ছিল তার মধ্যে।

চলচ্চিত্রে কিভাবে এলেন? এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছিলেন – পরিচালক খোকনের সাথে। প্রশ্নকর্তা শুধরে দিলেন, না মানে এফডিসিতে কিভাবে? বেবীটেক্সিতে করে।শহীদুল ইসলাম খোকনের ‘সন্ত্রাস’ ছবির মাধ্যমে খলনায়ক চরিত্র শুরু হয় তার। বাংলা চলচ্চিত্রে খলনায়ককে এক ভিন্ন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন তিনি, সিনেমায় নায়কের চেয়ে খলনায়কের প্রতিই দর্শকের আকর্ষণ ছিল বেশী – তিনি হুমায়ূন ফরীদি।

 

মঞ্চ, টেলিভিশন ও সিনেমায় আলোড়ন তোলা এই অভিনেতা অসাধারণ সব অভিনয়ের মাধ্যমে  সকল শ্রেণীর দর্শকদের কাছে অধিক জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন।বাংলা সিনেমায় খল নায়কের ভূমিকায় তিনি ছিলেন অসাধারণ । একটা সময় ছিল যখন টিভি নাটক মানেই ফরীদি। তারপর একটা সময় মানুষ শুধু হুমায়ন ফরীদির অভিনয় দেখতে হলে যেতেন । সেই হুমায়ূন ফরীদি ২০০৩ সাল থেকে সিনেমাতে অভিনয় প্রায়ই ছেড়ে দিয়েছিলনে । আর মানুষও হলবিমুখ হয়েছে ।

ব্যক্তিগত জীবনে হুমায়ুন ফরীদি দুবার বিয়ে করেন। প্রথম বিয়ে করেন ১৯৮০’র দশকে। স্বাধীনতার পর রমনায় প্রথম স্ত্রী মিনু ওরফে নাজমুন আরা বেগমের সাথে বেলী ফুলের মালা বদল করে বিয়ে করে সাড়া ফেলে দিয়েছিলেন। ‘দেবযানী’ নামের তাঁর এক মেয়ে রয়েছে এ সংসারে।

পরবর্তীতে বিখ্যাত অভিনেত্রী সুবর্ণা মোস্তফাকে তিনি বিয়ে করলেও তাঁদের মধ্যেকার বিবাহ-বিচ্ছেদ ঘটে ২০০৮ সালে।

২০০৪ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন হুমায়ুন ফরীদি। নাট্যাঙ্গনে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠানের ৪০ বছর পূর্তি উপলক্ষে তাঁকে সম্মাননা প্রদান করেন।

 

২০১২ সালের ফেব্রুয়ারী মাসের ১৩ তারিখে এই অভিনেতা মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর সময়ে তিনি নিঃসঙ্গ জীবন যাপন করছিলেন। সকাল ১০টার দিকে ধানমন্ডিতে নিজের বাসায় বাথরুমে পড়ে গিয়ে তিনি মারা যান। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৬০ বছর।

‘’একজন ভালো অভিনেতা দিনের চব্বিশ ঘণ্টাই অভিনয় করে চলেন,’’ বলতেন তিনি। কিন্তু তিনি আমাদের ছেড়ে ওপারে চলে গেলেন চিরতরে, এটা কোন অভিনয় নয়। সত্যিই তিনি চলে গেলেন আমাদের উদাস করে। তাকে আর আমরা কখনও ফিরে পাব না।

মৃত্যুর পর তার প্রথম জন্মদিন উপলক্ষে সঙ্গীত শিল্পী প্রীতম আহমেদকে আহ্বায়ক করে ‘হুমায়ূন ফরীদি মেমোরিয়াল ট্রাস্ট’ গঠন করা হয়েছে।

 

সংগঠনের আহ্বায়ক প্রীতম জানিয়েছেন, এই ট্রাস্ট কাজ করবে ফরীদির স্মৃতি রক্ষার্থে। তারই প্রাথমিক উদ্যোগ হিসেবে ট্রাস্টের পক্ষ থেকে ফরীদিকে নিয়ে স্মৃতিচারণমূলক লেখা আহ্বান করা হয়েছে। ট্রাস্টের মূল কমিটি খুব তাড়াতাড়ি গঠন করা হবে। এতে থাকবেন ফরীদির আত্মীয়, বন্ধু ও স্বজনরা।

 

ফরীদির একমাত্র কন্যা দেবযানী জানিয়েছেন, বর্ণাঢ্য অভিনয় ও পারিবারিক জীবনে বাবা হাজারো মানুষের সঙ্গে মিশেছেন। হাজারও গল্প আর ঘটনা রয়েছে বাবাকে ঘিরে। আমরা সেই চিত্রগুলো লেখার মাধ্যমে প্রকাশ করতে চাই বই আকারে।

 

হুমায়ূন আহমেদ তাকে নিয়ে ‘মিতা’ শিরোনামে যা লিখেছিলেন তার বাকি অংশ-

“শুরু করি প্রথম পরিচয়ের গল্প দিয়ে। ফরীদির তখন তুঙ্গস্পর্শী জনপ্রিয়তা। বিটিভির অভিনয়রাজ্য দখল করে আছেন। একদিনের কথা, বেইলি রোডে কী কারণে যেন গিয়েছি, হঠাৎ দেখি ফুটপাতে বসে কে যেন আয়েশ করে চা খাচ্ছে। তাকে ঘিরে রাজ্যের ভিড়। স্ট্রিট ম্যাজিশিয়ানরা ম্যাজিক দেখানোর সময় তাদের ঘিরে এ রকম ভিড় হয়। কৌতুহলী হয়ে আমি এগিয়ে গেলাম। ভিড় ঠেলে উঁকি দিলাম, দেখি হুমায়ূন ফরীদি। চা খাচ্ছেন, সিগারেট টানছেন। রাজ্যের মানুষ চোখ বড় বড় করে এই দৃশ্য দেখছে যেন তাদের জীবন ধন্য। হঠাৎ ফরীদির আমার উপর চোখ পড়ল। তিনি লজ্জিত গলায় বললেন, আপনি এখানে কী করেন? আমি বললাম, আপনার চা খাওয়া দেখি।

ফরীদি উঠে এসে আমার হাত ধরে বললেন, আশ্চর্য ব্যাপার। মিতা! আসুন তো আমার সঙ্গে। (নামের মিলের কারণে আমরা একজনকে অন্যজন মিতা সম্বোধন করি) তিনি একটি মনিহারি দোকানে আমাকে নিয়ে গেলেন। সেলসম্যানকে বললেন, আপনাদের দোকানের সবচেয়ে ভালো কলমটি আমাকে দিন। আমি মিতাকে গিফট করব।

ফরীদিকে আমি একটি বই উৎসর্গ করেছি। উৎসর্গ পাতায় এই ঘটনাটি উল্লেখ করা আছে।

এখন দ্বিতীয় গল্প। শুরুতেই স্থান-কাল-পাত্র উল্লেখ করি। স্থান সুইডেন, কাল ২০০৮, পাত্র মানিক। এই ভদ্রলোকের সুইডেনে একটি রেস্টুরেন্ট আছে। তিনি একদিন নিমন্ত্রণ করলেন তার বাড়িতে। দেশের বাইরে গেলে আমি কোথাও কোনো নিমন্ত্রণ গ্রহণ করি না। কারও বাড়িতে তো কখনো না।

মানিক সাহেবের বাড়িতে গেলাম, কারণ তাঁর চেহারা অবিকল হুমায়ূন ফরীদির মত। আপন ভাইদের চেহারাতেও এত মিল থাকে না। ভদ্রলোককে এই কথা জানাতেই তিনি বিনয়ী ভঙ্গিতে বললেন, অনেকেই এমন কথা বলে।

আমি বললাম, ফরীদির সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে কোনো পরিচয় কি আছে?

মানিক বললেন, সে আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। ১৯৭১ সালে আমি ও ফরীদি পাশাপাশি দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করেছি।

আমি চমকালাম। এই অভিনেতা যে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা তা আমার জানা ছিল না।

মানিকের বাড়িতে আমার জন্যে আরও বড় চমক অপেক্ষা করছিল। সেখানে দেখি তাঁর বাড়ির সবচেয়ে সুন্দর ঘরটির নাম ফরীদি। এই ঘরটি তিনি সারা বছর তাঁর বন্ধু হুমায়ূন ফরীদির জন্য সাজিয়ে রাখেন। যদি ফরীদি বেড়াতে আসেন। অন্য কারো সেই ঘরে প্রবেশাধিকার নেই।

তৃতীয় গল্প। ফরীদি টেলিফোন করেছেন। আমি ফোন ধরতেই বললেন, মিতা, আপনি কি আচার খান? আমের আচার, তেঁতুলের আচার এই সব?

আমি বললাম, খাই।

ফরীদি বললেন, সন্ধ্যায় আপনার সঙ্গে গল্প করতে আসব। ভাবছি তখন আচার নিয়ে আসব।

তিনি গল্প করতে এলেন, সঙ্গে কোনো আচারের বোতল দেখলাম না। গল্প করে চলেও গেলেন।

আমি ভাবলাম বলি, মিতা! আমার আচারের বোতল কোথায়? শেষ পর্যন্ত বলা হলো না। আমরা দুজন দুজনকে মিতা ডাকি, কিন্তু আমাদের মধ্যে তেমন ঘনিষ্ঠতা নেই।

রাত বারোটার মত বাজে। ঘুমানোর আয়োজন করছি। তখন দরজায় কলিং বেল। দরজা খুলে দেখি হুমায়ূন ফরীদির ড্রাইভার। তার সঙ্গে তেইশটা আচারের বোতল। তার দায়িত্ব ছিল দোকানে দোকানে ঘুরে যত রকমের আচারের বোতল ছিল সংগ্রহ করে নিয়ে আসা। সংগ্রহ করতে দেরি হয়েছে বলেই সে এত রাতে এসেছে।

চতুর্থ এবং শেষ গল্প। এই গল্পটি শুনেছি আমার প্রিয় প্রতিভাময়ী এক জনপ্রিয় শিল্পীর কাছে। গল্পটি আমার এতই পছন্দ হয়েছিল যে এই লেখায় উদ্ধৃত করার লোভ সামলাতে পারছি না। গল্পের পটভূমির পরিবর্তন হয়েছে। নতুন পটভূমিতে গল্পটি বলা শোভন হবে কিনা বুঝতে পারছি না।

স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়া হয়েছে। ফরীদি স্ত্রীর রাগ ভাঙানোর অনেক চেষ্টা করেছেন। রাগ ভাঙাতে পারেন নি। সুবর্ণা কঠিন মুখ করে ঘুমাতে গেছেন। ভোরবেলায় ঘুম ভাঙতেই সুবর্ণা হতভম্ব। ঘরের দেয়াল ও ছাদে ফরীদি লিখে ভর্তি করে ফেলেছে। লেখার বিষয়বস্তু, সুবর্ণা, আমি তোমাকে ভালোবাসি।

সুবর্ণা আমার সঙ্গে হাসতে হাসতেই গল্পটা শুরু করেছিলেন, একসময় দেখি তাঁর চোখে ভালোবাসা ও মমতার অশ্রু চিকচিক করছে।“

হুমায়ূন ফরীদিকে নিয়ে এক ভক্তের মন্তব্য-

ছোট বেলায় যখন সংসপ্তক নাটকটি দেখতাম, তখন একটা লোকের ঊপর আমার প্রচন্ড রাগ হতো যে, এই লোকটা এত খারাপ কেন। যখন একটু বড় হই, যখন অভিনয় কি জিনিস বুঝতে পারি তখনই ওই লোকটির প্রেমে পড়ি, প্রেমে পড়ি তার অভিনয়ের। সেই লোকটি হচ্ছেন হুমায়ুন ফরীদি। কি অসাধারন অভিনয়! টিভি খুলেই যদি কখনো হুমায়ুন ফরীদির কোনও নাটক বা সিনেমা দেখতাম, তাহলে আমি সেটা শেষ না হওয়া পর্যন্ত টিভি বন্ধ করতাম না। কিন্তু যখন এই লোকটার মৃত্যুর খবর শুনলাম, অবশ্য তখন আমি কাদিঁনি, তবে কোথায় যেন একটা শুন্যতা আনুভব করলাম। মনে হলো আমার কি যেন একটা হারিয়ে গেল। আমার বাংলাদেশ কি যেন একটা হারালো। কোন একটা স্থান যেন শুন্য হলো। যেটা কখনো আর পূরণ হবার নয় ………

এনটিভিতে একবার হুমায়ূন ফরীদির একটি সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। উপস্থাপক ছিলেন বিখ্যাত লেখক ইমদাদুল হক মিলন। সেই সাক্ষাৎকার থেকেই কিছু কথা তুলে ধরছি।

প্রথমেই তাকে জিজ্ঞাসা করা হয় যে তিনি নাকি দিনে ৪-৫বার ভাত খান। এ প্রশ্নের জবাবে ফরীদি বলেন, তিনি আসলে অল্প আহার করেন। মানুষ তিনবেলায় যা খায়, তিনি অল্প অল্প করে ৪-৫ বারে তা খান। তবে প্রতিবার যে ভাত খান তা ঠিক নয়। আইটেম হিসেবে রুটি, সবজিও খান তিনি।

এরপর প্রশ্ন করা হয় তার নাম নিয়ে। তিনি বলেন ‘ফরীদি’ লেখা সহজ বলেই তিনি শব্দটি এভাবে লেখেন, এছাড়া বিশেষ কোন কারণ নেই। আর তার মার নাম ছিল ফরিদা ইসলাম, সেখান থেকেই তার নামকরণ হয়েছে।

এরপর তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়, তার অভিনয় করাটা তার পরিবার দ্বারা কোনভাবে প্রভাবিত কিনা। তিনি এর উত্তরে ‘না’ বলেন। এবং আরও বলেন, তার বাবা একবার অভিনয় করেছিলেন। তবে তার পরিবার থেকে তিনি প্রভাবিত হননি।

যুদ্ধের পর নৈরাশ্য থেকেই তিনি অভিনয়ে যোগ দেন। অনেকে বলে তিনি যাত্রায় অভিনয় করতেন। এ বিষয়ে তিনি বলেন তিনি শুধু এক মৌসুম যাত্রায় কাজ করেছেন। যাত্রার মাধ্যমে তার অভিনয় জীবন শুরু এটা ভুল কথা।

ইন্টারমিডিয়েট এর পর যুদ্ধের কারণে তিনি ৫ বছর পড়ালেখা থেকে বিরত ছিলেন। এরপর জাহাঙ্গীরনগরে ভর্তি হন। তিনি ভালো ক্রিকেট খেলেন বলে সুনাম ছিল ঐ সময়ে।

ফরীদি শেষ মঞ্চ নাটক করেন ১৯৯২ সালে। মঞ্চে নাটক করা তার পছন্দ ছিল না।

‘নিখোঁজ সংবাদ’ নাটকে তিনি প্রথমে অভিনয় করতে চাননি। কারণ তার স্ক্রিপ্ট পছন্দ হয় নি! ঐ সময়ে বড় বড় অভিনেতারাও কোন চরিত্র মানা করার আগে ১০বার চিন্তা করতেন!

১০ বছর অভিনয় করার পাশাপাশি তিনি চাঁদপুর কর্পোরেশনে চাকরি করতেন।

তার প্রথম চলচ্চিত্র ‘দিনমজুর’ , কিন্তু প্রথম মুক্তিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র ‘সন্ত্রাস’।

স্ত্রী হিসেবে সুবর্ণা কেমন, এই প্রশ্নের উত্তরে ফরীদি বলেন তিনি তাকে স্ত্রী হিসেবে দেখেন নি, সবসময় বন্ধু হিসেবে দেখেছেন।

অভিনেত্রী হিসেবে সুবর্ণা কেমন, এই প্রশ্নের জবাবে ফরীদি বলেন ‘অত্যন্ত প্রফেশনাল’।

দেশ সম্পর্কে ফরীদি বলেন ‘দেশটা আরও সুন্দর হতে পারত’। তিনি আশাবাদী ছিলেন দেশটা আরও সুন্দর হবে।

হুমায়ূন ফরীদি কখনও জীবনের সাথে আপোস করতেন না। তার ধারণা আপোস করে তারা  যাদের মেরুদন্ড নেই। আর তার মতে তার মেরুদন্ড আছে।

‘মৃত্যু’ নিয়ে বলার সময় ফরীদি বলেন, মৃত্যু একটি ভয়ংকর সুন্দর জিনিস। কারণ মনে মৃত্যুভয় থাকলে, কেউ কখনও পাপের চিন্তা করতে পারে না। এখানেই মৃত্যুর সৌন্দর্য।

লেখার শেষে ফরীদি ভক্তদের জন্য তার আবৃত্তি করা দুটি কবিতা দিলাম।

 

এই পোস্টটিতে ৪২ টি মন্তব্য করা হয়েছে

  1. liked ur post/blog . লেখা বেশি ভালো হইছে আর টপিক টাও । ক্যাপ্রিও এর পোস্ট টাতে পিক এড করো
    । কাল আমি গ্রুপে শেয়ার দিয়ে দিমুনি তাইলে । কাল ক জন্য ?? বুঝতে পারছো তো ???

  2. ট্রিপল এস ট্রিপল এস says:

    মারাত্নক একটা শেয়ার। দূর্দান্ত উপস্থাপনা। লেখা অনেক ভাল লেগেছে…

  3. পথের পাঁচালি পথের পাঁচালি says:

    অসাধারন একটা লেখা। লেখার ধরনটা দারুন লাগল।এইরকম আরো কিছু লেখা আশা করছি।

  4. ডানা মণি ডানা মণি says:

    অসাধারণ একটা লেখা। ক্যাম্পাসের ওই ৪০ বছর পুর্তিতে উনার জন্য অপেক্ষা করে ছিলাম কিন্তু সেই অপেক্ষা আর ফুরাল না। 🙁

  5. James Bond says:

    অনেক ভালো লেগেছে পড়ে।

  6. পুরা পোস্ট অবাক হয়ে পড়লাম। বেশি রকমের ভালো হইছে পোস্ট। ফার্স্ট টু লাস্ট ওয়াও… এত সুন্দর করে গুছিয়ে লেখা যে আর কিছু বলার ভাষাই পাচ্ছি না। জাস্ট কিপ ইট আপ।

  7. অ্যান্থনি এডওয়ার্ড স্টার্ক says:

    এপিক পোস্ট। ভালোলাগা দিয়ে গেলাম; ফরিদীর জন্য, পোস্টের জন্য।

  8. দারুণ লাগল লেখাটা। অনেক কিছু অজানা ছিল… Miss the man. আমাদের সেই বিটিভির নাটকের সোনালী দিনগুলো ত হারিয়েই গেল, এগুলো যদি ডিভিডিতে সংরক্ষণ করা যেত ভাল প্রিন্টে, স্যারের সেইসব অসাধারণ পারফরমেন্স ভবিষ্যত প্রজন্মও দেখতে পারত।

  9. ডন মাইকেল করলিয়নে says:

    শিরোনাম দেখে যে টাস্কি খাইছিলাম, পুরা পোস্ট জুড়ে সেই টাসকি পর্ব অব্যাহত থাকলো। 😛 🙁 মুগ্ধতায় ভাষা হারায়া ফেলার কারণে পোস্ট সম্পর্কে কিছু বলতে পারতেছি না। কি বললে যুক্তিযুক্ত হবে সেইটাও বুঝতে পারতেছি না। চালায়া যাও অতিথি… দেশের চলচ্চিত্রের উন্নয়নের জন্য এইরাম উদ্যোগ খুবই দরকার… 😛 🙁

  10. মুশাসি says:

    মাইন্ড ব্লয়িং। মাস্টার পিস। ভাই, শব্দ খুজে পাচ্ছি না এত সুন্দর লেখার প্রশংসা করার মতো। মুগ্ধ হয়ে পড়ে ফেললাম এক নিঃস্বাসে।

  11. রীতিমত লিয়া says:

    একজন চৌকশ অভিনেতাকে হারালাম আমরা। টিপিক্যাল বাংলা সিনেমাগুলোতেও যখন তিনি ভিলেন হতেন সিনেমাটা কোন না কোন দিক দিয়ে স্বার্থক হত, হয় তাঁর কমেডী দিয়ে নয় তাঁর ভিলেনীয় কায়দা দিয়ে। বাংলাদেশ এমন অভিনেতা আর পাবে না। আর কান কাটা রমজান এর চরিত্রে হুমায়ুন ফরিদী ছিলেন দূর্দান্ত। তিনি শান্তিতে থাকুন এই কামনা করি।

  12. Kamal Kumar says:

    ekebarei dub-e giyechilam lekhatar moddhe…… priyo ovineta k niye eto sundor ekta lekha upohar deyar jonno apnake onek dhonnobad … ecche korche aro koyekbar pore feli…. 🙂 😀

  13. শাতিল আফিন্দি says:

    জটিল পোস্ট, কিপ ইট আপ!

  14. Simile says:

    apner ai post a kal k theke comment korar try korchi parchilam e na jai e hok vaia oshomvob valo hoyeche lekha!!! ak kothay chomotkar likhechen!!! ar ato information diyechen jgula jante pere khub valo lagche!!! shundor hoyeche lekha 🙂 🙂

  15. সামিয়া রুপন্তি says:

    ছোট বেলায় বিটিভিতে যখন দুপুরে সিনেমা দেখতাম তখন এই লোকটাকে খুব প্যাশনেটলি হেট করতাম। কারন আর কিছুই না, তার ভিলেন গিরি! আমার খালি মনে হত, এই লোকটা মরলেই তো সব সমস্যার সমাধান হয়, নায়ক আর নায়িকা সুখে থাকতে পারে! কিন্তু তিনি যখন সত্যি মরে গেলেন, তখন নায়ক নায়িকার চেয়ে এই খলনায়কের জন্য আমার কস্ট হয়েছে বেশি! লেখাটা পড়ে বুকের কোনায় আবার সেই ব্যাথাটা অনুভব করলাম। খুব ভাল লাগল পড়ে!

  16. আপনাকে ব্যাথা দেওয়ার কোন ইচ্ছে ছিল না। 😐

  17. মিজানুর রহমান মিজানুর রহমান says:

    মারাত্নক একটা শেয়ার। দূর্দান্ত উপস্থাপনা। লেখা অনেক ভাল লেগেছে… :2thumbup

  18. টাইটলটার মত পোস্টটাও অনেক সুন্দর হইছে। :rate

  19. ENAMUL KHAN says:

    অনেক না জানা ব্যাপার জানতে পারলাম। লেখাটা শেয়ার করার জন্য অনেক অনেক ধন্যবাদ…

মন্তব্য করুনঃ

You must be Logged in to post comment.

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন