দ্যা ইমিটেশন গেম: একটি এ্যানিগমা মেশিন ও গনিতবিদ এ্যালান টুরিং (শেষপর্ব)

১৯৮৩ সালে এন্ডূ হজ নামক এক লেখক একটি বই লেখেন,  Alan Turing :The Enigma নামে। এ্যালান টুরিংকে তখন মানুষ নামে চেনে কারন টুরিং সুইসাইড করেছিল,আর অন্য যত খবরই হোক এ রকম খবর পলক ফেলার আগেই মানুষের কানে চলে যায়। এন্ডূ হজ টুরিং এর জীবনে অনেক তথ্য তুলে আনে বইটিতে। ততদিনে সবাই টুরিং এর অবদানের কথা কিছুটা করে জানতে শুরু করেছে কিন্ত এ বইটিতে এতো বিস্তারিত সত্য তারা আগে জানে নি।

file (1)

যতদুর শোনা যায় এ বইটি নিয়ে বেশ জলঘোলা করা হয়, কারন বইটিতে টুরিং সম্প্রকৃত অনেক নতুন তথ্য দেওয়া হয়েছিল ব্রিটিশ সরকার যা পরে ফাস করে কিন্ত তারা নানা অজুহাত পেশ করে যাতে তারা নিজেদের নির্দোষ দাবি করে বলে টুরিং সম্প্রকৃত কোন সত্য তারা গোপন করে নি।

 

অনেক পরের কথা, পরিচালক মরটেন টেইল্ডাস তার নতুন সিনেমা নিয়ে ভাবছেন। সিনেমা জগতে তিনি মোটামুটি ভাবে পরিচিত, তার আগের করা কাজগুলো সিনেমা ক্রিটিক্সদের প্রশংসা পেলেও অার্থিকভাবে তার সিনেমা ব্যার্থ। তিনি লেখক এবং চিত্রপরিচালক গ্রাহাম মূর এর সাথে মিলে এন্ড্রু হজের বই অনুসারে একটি গল্প রেডি করেছেন। গল্পটি বায়োপিক গনিতবিদ এ্যালান টুরিং এর জীবন অনুসারে। এমনিতে বায়োপিক নির্মানে পরিচালকরা কম লাভবান হন আবার টুরিং চরিত্রকে ভালভাবে না ফুটিয়ে তুলতে পারলে সিনেমা মুখ থুবরে পড়বে।  তিনি রিস্ক নিলেন টুরিং এর চরিত্রে কাজ করার জন্য অভিনেতা খুজতে লাগলেন তিনি প্রথম পছন্দ করলেন প্রতিভাধর অভিনেতা লিওনার্দো দি ক্যাপ্রিও কে। কিন্ত কোনকারনে ক্যাপ্রিও তার অফার ফিরিয়ে দিলেন। তিনি গেলেন শার্লক খ্যাত বেনেডিক্ট কাম্বারব্যাচ এর কাছে। কাম্বারব্যাচ উৎফুল্ল সহকারে রাজি হলেন।  সিনেমার কাজ শুরু হল, কাম্বারব্যাচ এবং পরিচালক টেইল্ডাস কেউই তখন জানতেন না তারা ইতিহাসের এক অন্যতম গনিতবিদকে নিয়ে কাজ করে ইতিহাসেরই অংশ হতে চলছেন।

The-Imitation-Game-Final-Poster

Something It Is The People Who No One Imagines Anything Of Who Do The Things That No One Can Imagines.

উপরের কথাটি বলা দ্যা ইমিটেশন সিনেমাতে, সিনেমাটিকে মুক্তি দেওয়া হয় ২০১৪ সালের শেষের দিকে,আমার মনে আচ্ছে ১৪ সালে কোন সিনেমা দেখে শান্তি পাচ্ছিলাম না। অতপর টানা তিনদিনে ইন্টারস্টেলার,ইমিটেশন গেম আর বার্ডম্যান দেখে আমার ১৪ সালের হতাশা চলে গেল ।পরিচালক মরটেন টেইল্ডাস কোন নামকরা অভিনেতা নন কিন্ত প্রথম ইংরেজি সিনেমা তিনি এত আবেগ ,হতাশার ভাব বা আনন্দের উচ্ছাসটা তিনি দুর্দান্তভাবে পর্দায় ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন।

 

তিনি চিত্রনাট্য রেডি করেছিলেন টুরিং এর এ্যানিগমা মেশিনের কোড ব্রেক করার কাহিনী নিয়ে।কিন্ত তিনি শুরু করেছেন সেই টুরিং এর জীবনের শুরু থেকে। তার শৈশবকাল,কলেজ এর দিনগুলো যেখানে তিনি প্রথম মেশিন বানানোর উপর কাজ করছিলেন এবং এ্যানিগমা মেশিনের কোড ভাঙার পর তার পরিনতি মোট তিনটি  স্টেপ এ পরিচালক গল্পটি সাজিয়েছেন। প্রত্যেকটিতেই স্টেপ এ দর্শকেরা মূল চরিত্রের সাথেযোগাযোগ স্থাপন করতে পারবেন। কিন্ত যেহেতু মুল গল্পটি কোড ব্রেক করার নিয়ে তাই ঐ সময়টিতে বেশি জোরদার ভাবে উপস্থাপন করা।  কাহিনী অনেকের জানা এবং আগের পোস্টে এই বিষয় নিয়েই আলোচনা করা হয়েছে তাই এই পর্বে এগুলা নিয়ে কথা বললাম না।

 

আমি মনে করি ইমিটেশন গেম সিনেমা নির্মান করতে গিয়ে পরিচালক সবচেয়ে সফল হয়েছে চরিত্র বাছাই করতে গিয়ে।  বেনেডিক্ট কাম্বারব্যাচ এক অসাধারন প্রতিভাধর অভিনেতা, দুর্দান্ত কন্ঠ এবং মুখের অভিব্যাক্তি। টুরিং চরিত্রে বাস্তবে রুপ দিতে লাগত এমন এক অভিনেতার যার চেহারাই স্পস্ট বলে দেবে তার কঠোর খুরধার মস্তিস্ক, সেই কঠোরতার মধ্যে একটু মেয়েলি ভাব, আর মোহনীয় কন্ঠস্বর।

file

 

কাম্বারব্যাচ এ সবকিছুই দুর্দান্তভাবে পর্দায় তুলে ধরেছে আবারও দর্শকদের তার প্রতিভায় মুগ্ধ করেছে, ভেবে দেখুন শার্লক সিরিজে দুর্দান্ত মস্তিস্ক ব্যাবহার করে কাম্বারব্যাচ অবাস্তব সব বাস্তবকে সামনে এনে দিচ্ছে আবার ইমিটেশন গেম এ টুরিং চরিত্রে সেই কাম্বারব্যাচই টুকটুক করে এ্যানিগমা কোড ভাঙার চেস্টা করছে, মনে হচ্ছে একই পর্দায় নিশ্চই শার্লক এবং টুরিং কে মেলাতে পেরেছেন। 🙂 আর বলতেই পারেন এই কোড ব্রেকার এর অভিনয় কাম্বারব্যাচের থেকে ভাল আর কেউই করতে পারত না। আর অভিনয়ের দিক দিয়ে টুরিং চরিত্রে বেনেডিক্ট কাম্বারব্যাচ পুরা ফাটিয়ে দিয়েছে।যাস্ট অসাধারণ। শেষের দিকের দৃশ্যগুলিতে তার কাজের প্রতি মায়া এবং জীবনযুদ্ধে ধীরে ধীরে হেরে যাওয়ার ব্যাপারটা ছিল দুর্দান্ত। বেশ কিছু দৃশ্য ছিল চোখে পানি এনে দেয়ার মত। কাম্বারব্যাচের সেরা কাজ ছিল এবং অস্কারে নমিনেশন ও পেয়েছিল, যদিও অস্কার আসে নি।  তবে কাম্বারব্যাচ পর্দায় আরও আসবে আর এভাবে যদি অসাধারন প্রতিভাধর অভিনয় করে যেতে পারো তবে অস্কারকে নিজের করে নিতে তার বেশি সময় লাগবে না।

tumblr_ngc41sULiQ1rnwoh4o9_1280

 

মুভিতে আরও জন ক্লার্ক চরিত্রে কিরা নাইটলীকে বেশ ভাল লেগেছে।  সিনেমায় নায়ক নায়িকাকে একটু ব্যাতিক্রমভাবে উপস্থাপনা করা হয়েছে। হিউজ আলেকজান্ডার চরিত্রে ম্যাথু গোজী ভাল অভিনয় করেছে এছাড়াও আরও ছিল চার্লস ডেন্স ও মার্ক স্ট্র এর মত অভিনেতারা।

 

সিনেমার মিউজিক নিয়ে কথা বলা আবশ্যক। মিউজিকের দায়িত্বে ছিলেন আলেকজান্দ্রে ডেসপ্লাট। এক কথায় মারাত্নক মিউজিক করেছে,  সিনেমার একটি বড় অংশ জুড়ে এই মিউজিক এর প্রভাব ছিল,  ডেসপ্লাটেরর মিউজিক আর কাম্বারব্যাচেরর অভিনয় বেশ কিছু জায়গায় নিজেকে হারিয়ে ফেলছিলাম। নিজের অজান্তে চোখে পানি চলে আসছিল।  মিউজিক কম্পোজার আলেকজান্দ্রে ডেসপ্লাট দ্যা ইমিটেশন গেম এবং দ্যা গ্রান্ড বুদাপেস্ট হোটেল সিনেমার মিউজিক এর জন্য অস্কারে নমিনেশন পান এবং প্রথম অস্কার জয় করেন দ্যা গ্রান্ড বুদাপেস্ট হোটেল সিনেমার জন্য।

 

সিনেমায় পরিচালক সুন্দর পরিচালনা করেছেন। মেকিং দুর্দান্ত ছিল, একটু খাটুনি এবং মনোযোগ দিয়ে সিনেমা তৈরি করলে কত সুন্দর হয় এর প্রমান তিনি আবার দিয়েছেন।  তবে আনকোরা হবার কারনে তিনি বেশকিছু প্লটহোল দিয়ে ফেলেছেন। সেগুলো নিয়ে বলতে চাই না কারন এ বিষয় এ আলোচনা করলে একটি অসাধারন বায়োপিক সিনেমার সলিল সমাধি করা হবে।

 

 

ইমিটেশন গেম সিনেমা বলেন অথবা টুরিং এর জীবন গল্পই বলেন একটা মাত্র গল্প বাস্তব জীবনে আপনাকে কতটা শেখায়? এ্যালান টুরিং নিজের জন্য ভেবেছেন?  নিজের কাজকে সবার সামনে তুলে ধরেছেন? না কিছুই করেন নি আড়ালে থেকে তিনি দু কোটি প্রান বাচিয়েছেন, কোন শব্দ না করেই চলে গেছেন পরলোকে। ইমিটেশন গেম আরও অনেক তথ্য,মেসেজ ও বেচে থাকার উপকরন দিয়ে গেছে। প্রত্যেকটা জিনিসের সৃষ্টি যেমন আছে বিনাশ ও আছে, এ্যানিগমা মেশিন বানানোর পর জার্মানরা ভেবেছিলো আমাদের কেউ আটকাতে পারবে না, অথচ ঠেকিয়ে দিল একরোখা এক মানুষের নেতৃত্বে থাকা সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত একদল গনিতবিদ।আবার মেশিন মাত্রই মেশিন একে বানিয়েছে মানবরাই তাই ক্রুটি থাকবেই।  সেটি শুধুমাত্র খুজে পেতে হবে। পেয়েছিল একাধারে গনিতবিদ,দার্শনিক,অাধুনিক কম্পিউটারের জনক এ্যালান টুরিং।এত কথা বলার পর শুধু একটা কথাই বলতে হয় “একটি নস্ট ঘড়িও দিনে দু বার সঠিক সময় দেয়, তাই  ভাগ্যের ফলে একবার সফলতা আসলে নিজের জীবনকে ভাগ্যের হাতে ছেড়ে দেওয়াটা পুরোদোমে বোকামি “

FB_IMG_1456473451993

ইতিহাসে টুরিং এর নাম আজীবন থাকবে, দীর্ঘ ৫০ বছর টুরিংকে লুকিয়ে রাখা ছিল কিন্ত এরপর আর পারা যায় নি,  কেউ তা বের করে ফেলেছে,  আজ আমরা টুরিংকে জানতে পারছি বই পড়ে,  সিনেমা দেখে।  আমেরিকানরা যখন মারা যায় তখন তার শবযাত্রার গাড়ি কোন রেড সিগন্যাল না মেনেই চলার অনুমতি পায়,  অথচ এ বিরল সম্মানের কথা মৃত মানুষটি বুঝতে পারে না, এ রকম সম্মানই আজ আমরা টুরিংকে দিয়েছি, মানুষটি চলে গেছে পরপারে নিজ ইচ্ছায় না, আমরা তাকে ঠেলে দিয়েছি। পরে মাফ চেয়েছি,  মাফ করবেন টুরিং ,  আপনি হয়তবা জানেন না দুনিয়াটা বড় অদ্ভুদ।

 

“Do you know why people like violence? It is because it feels good. Humans find violence deeply satisfying. But remove the satisfaction, and the act becomes… hollow.”

 

সিনেমা টি না দেখা থাকলে খুব তাড়াতাড়ি দেখে ফেলবেন,পারলে মুল বইটিও পড়তে পারেন,  ইংরেজি ভাষার বইটি খুজলেই পাবেন, বাংলা ভাষায় অনুবাদ হয়েছে কিনা বলতে পারছি না।

 

Part 1  Link: http://bioscopeblog.net/arnabkabir/48606

Torrent Download Link: http://www.mkvcage.com/the-imitation-game-2014-720p-brrip-1gb /

 

 

The Imitation Game (2014)
The Imitation Game poster Rating: 8.4/10 (16,434 votes)
Director: Morten Tyldum
Writer: Andrew Hodges (book), Graham Moore (screenplay)
Stars: Benedict Cumberbatch, Keira Knightley, Matthew Goode, Rory Kinnear
Runtime: 114 min
Rated: PG-13
Genre: Biography, Drama, Thriller
Released: 25 Dec 2014
Plot: English mathematician and logician, Alan Turing, helps crack the Enigma code during World War II.

(Visited 175 time, 1 visit today)

এই পোস্টটিতে ১টি মন্তব্য করা হয়েছে

  1. আকর্ষণীয় ডিজাইনের চশমা ও সানগ্লাস ঘরে বসে পেতে চাইলে ক্লিক করুন ড্রিমারস অনলাইন শপ

    ফেসবুক পেজ থেকে বেছে নিন পছন্দের চশমা বা সানগ্লাস আর অর্ডার করুন ফেসবুক থেকেই। সরাসরি পৌঁছে যাবে আপনার ঠিকানায়। পন্য হাতে পেয়ে মুল্য পরিশোধ করুন।
    পেজটিতে লাইক দিয়ে একটিভ থাকুন এবং বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন। ধন্যবাদ ।

    ভিসিট করুন https://www.facebook.com/dreamersdreambd

মন্তব্য করুনঃ

You must be Logged in to post comment.

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন