দ্যা ইমিটেশন গেম: একটি এ্যানিগমা মেশিন ও গনিতবিদ এ্যালান টুরিং। (পর্ব :১)

কম্পিউটারের জনক কে?

= চালর্স ব্যাবেজ

আধুনিক কম্পিউটার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জনক কে?

= চালর্স ব্যাবেজ ই তো।  :3

কে বলছে চালর্স ব্যাবেজ?  এ্যালান টুরিং হবে।

এ্যালান টুরিং কে?  কি আবিস্কার করেছে?

 

আপনি যদি আমার মত এ রকম প্রশ্ন পর্ব চালান।  তবে কথোপকথন টা এমননি হবে। কারন আধুনিক মানুষরা টুরিং, টেসলার কাজ মনে রাখে নি,  অথচ টুরিং, টেসলার কাজ তাদের আবিস্কার কোন অংশে কম না। তারা দুইজন সায়েন্স এর দুনিয়ার ডার্ক নাইট। তাদের প্রতিটি কাজ মহৎ অথচ লোকচোখের আড়ালে তাদের এই কাজ তাদের অবদান আজ আমরা জানি না,  আমাদের জানতে দেওয়া হয় নি,  টুরিং এর কাজ পঞ্চাশ বছর ছিল টপ সিক্রেট। দুনিয়াটা বড় ধরনের সার্থপর।

FB_IMG_1456473451993

১৯১২ সালের লন্ডন, মাইডা ভেল। এ বছরের ২৩শে জুন জন্মগ্রহন করে এ্যালান টুরিং(পুরোনাম: এ্যালান ম্যাথিসন টুরিং)। তার বাবা জুলিয়াস ম্যাথিসন টুরিং ছিলেন ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসের সদস্য। জুলিয়াস ও তার স্ত্রী ইথেল সারা স্টোনী তার অনাগত সন্তানের জন্মের আগেই ব্রিটিশ ইন্ডিয়া থেকে ইংল্যান্ডে চলে যান। তাদের ইচ্ছা নিজ দেশে নিজের মত করে তাদের ছেলেকে তারা বড় করবেন। টুরিং এর বয়স যখন ৩ থেকে ৪ এ যাচ্ছে তার বাবা ম্যাথিসন টুরিং বুঝতে পারেন কি প্রতিভা নিজে ছেলে জন্মেছে। গানিতিক বিষয়গুলোতে ছোট্ট টুরিং এর আগ্রহ খুব বেশি অল্পেতেই সহজ যোগবিয়োগ সে করতে পারে। বাসায় যতটুকু শেখানো যায় শিখিয়ে টুরিংকে তার পিতা ভর্তি করেন সেণ্ট মাইকেলস স্কুলে। নরম সাদাসিদে ছোট্ট টুরিং বাকি সবার সাথে মানিয়ে নিতে পারত না,  তার সহপাঠী রা তাকে নিয়ে মশকরা করত এমন কি নানাভাবেও হেনস্তা করত।  সবার থেকে ব্যাতিক্রম টুরিং এর কোন বন্ধু ছিল না,  একজন বাদে সে ক্রিস্টোফার। একমাত্র এ সহপাঠীর সাথে বেশ বনিবনা হত এবং বন্ধুকে খুব পছন্দ ছিল টুরিং এর। এতটাই ভালবাসত যে পরর্বতীতে একমাত্র বন্ধু মারা যাবার পর তার কম্পিউটার এর নাম রাখে ক্রিস্টেফার এর নামে।

file (1)

এখান থেকে তার স্কুল জীবন শুরু করে ১৯২৬ সালে চৌদ্দ বছর বয়সে সে ভর্তি হয় ডরসেট এ  ডরসেটের শেরবর্ন স্কুলে। এই প্রতিষ্ঠানটি প্রাচীন গ্রিক, রোমান ভাষা ও সাহিত্যে বেশি গুরুত্ব দিত। অন্যদিকে টুরিং অসাধারণ দক্ষতা রাখতে থাকেন তার পছন্দের বিষয় গুলোতে। তিনি এমন কিছু গনিত করতে থাকেন যার মুল বিষয় কি তা তিনি জানেন না। তিনি ১৫ বছর বয়সে ক্যালকুলাস এর সমস্যা সমাধান করতে শুরু করেন অথচ ক্যালকুলাস কি কী এর মুলভাব তা তিনি জানেন না।১৯২৮ সালে ১৬ বছর বয়সে আলবার্ট আইস্টাইনের কাজের সংস্পর্শে আসেন তিনি। আরো উৎসাহ পেয়ে নতুন উদ্যোমে কাজ শুরু করেন তিনি। তিনি গনিত চর্চার পাশাপাশি  ম্যারাথন দৌড় প্রতিযোগীতায় অংশগ্রহন করতেন।  এ দৌড়ের জন্য তিনি বেশ কয়েকটা পুরস্কার ও পেয়েছেন।

file

 

যাইহোক,

বেশি পারলে যা হয় তাই হলো টুরিং এর।  নিজের পড়া না পরার কারনে কেমব্রিজ এর ট্রিনিটি  কলেজ এর বৃত্তি থেকে বঞ্চিত হন। তিনি ভর্তি হন কিংস কলেজে এবং স্নাতক পাস করেন। ১৯৩৫ সালে কার্লস গাউসের এরর ফাংশনের উপর কাজ করে ফেলোশিপ অর্জন করেন।এরপর তিনি পাটিগনিতের গনিতগুলোকে তার মেশিনে রুপান্তিত করার চেস্টা করেন এবং তিনি এর প্রমান দেখান ‌‘অন কম্পিউটেবল নাম্বারস, উইথ এন এপ্লিকেশন টু দ্য এনসিডুংস প্রবলেম” পেপারে।

file (2)

তিনি প্রমান করেন এ সকল গানিতিক সমস্যা যন্ত্র দ্বারাই মোকাবিলা করো একটি লগারিদম রুপ আনা সম্ভব। ১৯৩৭ ও ১৯৩৮ সালের বেশির ভাগ সময় আলোনজো চার্চের অধীনে গবেষণায় প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে কাটান তিনি। ১৯৩৮ সালে প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয় তাকে পিএইচডি দেয়।তার গবেষণাপত্র রিলেটিভ কম্পিউটর ধারণার সূচনা করে।

 

ততদিনে পৃথিবীতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে মানে ১৯৩৮ সাল থেকে টুরিং গভর্নমেণ্ট কোড এ্যান্ড সাইফার স্কুলে খণ্ডকালীন চাকরি করা শুরু করলেন, প্রতিষ্ঠানটি ছিল  ব্রিটিশ সংকেত উন্মোচনকারী।

 

বিশ্বযুদ্ধে জার্মানি মহা প্রলয়ঙ্কারী রুপে যুদ্ধ করতেসে। এক কথায় অপ্রতিরোধ্য। যুদ্ধের রসদ থেকে প্রযুক্তি পর্যন্ত এগিয়ে জার্মান রা, কখন কোথায় কীভাবে তারা আক্রমন চালাবে কেউ জানে না। এভাবে হঠাৎ আক্রমন এর ফলে কোনঠাসা হয়ে পড়ছে বাকি সবাই। কীভাবে রুখতে হবে তাদের? কেউ জানত না এর উত্তর। জানা যাবে একটি মাধ্যমে “এ্যানিগমা” যন্ত্র দিয়ে। জার্মান নাৎসী বাহিনীরা এই এ্যানিগমা যন্ত্র দিয়েই তাদের সকল গোপন তথ্য চালান করত। এই মেশিনের মাধ্যমেই জার্মান রা তাদের তথ্য এক ধরনের কোডিং করে বেতার তরঙ্গ হিসেবে পাঠাত এবং তথ্যের  প্রাপককারী  সেই কোডকে ডিকোড করে সকল তথ্য জেনে বুঝে আডালে আবডালে হামলা চালাত। প্রচন্ডকারে গোপন ও শক্তিশালি ছিল এই এনিগ্যামি যন্ত্র। তাই অন্যরা একে চাইলেই ভাঙতে পারত না অথবা কোডকে ডিকোড করতে পারত না। এই মেশিন এ ছিল ১৬০ মিলিয়ন এর কাছাকাছি কনফিগারেশন।  আর জার্মানরা দিনে প্রচুর তথ্য আদান প্রদান করত তাই সঠিক তথ্য সংগ্রহ করে তা ডিকোড করা অসম্ভব ছিল তাছাড়া জার্মানরা প্রতি ২৪ ঘন্টা পর পর মেশিনের কনফিগারেশন পরিবর্তন করত যা আদতেও ভাঙা সম্ভব হত না।

 

কিন্ত ভাঙা যাবে না ভাঙা যাবে না বলে চিল্লালে তো হবে না তাদের চেস্টা চালাতে হবে তাই তারা ইল্যান্ড এ অ্যানিগমা এর কোড ভাঙ্গার জন্য একটি দল গঠন করে। প্রথমে দলের দায়িত্বে থাকে হিউ আলেকজান্ডার কিন্ত পরে টুরিং কে এর মুল দায়িত্ব দেওয়া হয়। টিউরিং প্রথম থেকেই ভাবছিল এ এসব ডিকোড অথবা কনফিগারেশন ভাঙা খামাখা মাথা নস্ট করা ছাড়া কিছু না কিন্ত আলেকজান্ডার এর সাথে তার তেমন ভাল সম্পর্ক নয় বলে সে কিছু বলে না।  কিন্ত নিজে মুল দায়িত্ব পাবার পর সে তার মনোভাব প্রকাশ করে এবং তার মেশিন বানানো শুরু করে, মেশিন বানানোর সময় সে কাওকেই পাশে পায় নি উলটে তাআ দলের মেম্বাররা তাকে থামানোর জন্য চেস্টা চালাত,  টুরিং থামে নি তার কাজ সে শেষ করে, মেশিন এর নাম রাখে হারানো বন্ধুর নামের সাথে “ক্রিস্টেফার”।

00turing4 qlow-220px-Bombe-rebuild

 

কিন্ত এত কিছুর পর ও টুরিং তেমন কোন বিশেষ ফল পাচ্ছিলেন না কারন তার বানানো যন্ত্র প্রায় ১৬০ মিলিয়ন কনফিগারেশন  এলোমেলোভাবে হাতরে পাতরে খুজছিল। কিন্ত সাফল্য আসতে থাকে, প্রায় অসম্ভব জটিল কনফিগারেশন ভাঙার উপায় টুরিংকে হাতছানি দিতে থাকে। একদিন এক খাবারের দোকানে কথা বলতে বলতে টুরিং কে একজন জার্মানী থেকে বার্তা পাঠায়, প্রচুর বার্তা আসে ঘন্টায় কিন্ত টুরিং তার পরিচিত বার্তা চিনতে পারেন কারন প্রাপ্ত বার্তায় সবসময় প্রথম পাচ বর্ণ এক থাকে। টুরিং কিছুটা আন্দাজ করে ছেড়ে দেয়, কিন্ত এ অল্প তথ্য তার কাছে বৃহৎ তথ্যরুপে বুমেরাং হয়ে ফেরত আসে।  তার মনে পরে প্রতিদিন সকালে জার্মানরা যে বার্তা পাঠায় তাতেও শব্দ কমন থাকে প্রতি বার্তার শেষে থাকে “Heil Hitler”। আরেহ হবে তো।

_60922338_enigma

এই “Heil Hitler” শব্দ কমন ধরে টুরিং প্রথম অ্যানিগমা কোড ব্রেক করে ফেলেন। পৃথিবীর অন্যতম শক্তিশালি প্রযুক্তি টুরিং এর তাড়াহুড়ো করে বানানো যন্ত্রের কাছে হার মেনে যায়।  জার্মানরা তখনো জানে না তাদের প্রযুক্তি এক মানব সন্তান ভেঙে ফেলেছে, তারা বার্তা পাঠাতেই থাকে কিন্ত তাদের সব গোপন তথ্য জেনে ব্রিটিশরা তাদের থামাতে থাকে এবং এক সময় আর না পেরে জার্মানরা ধরাশায়ী হয়।

 

ইতিহাস বলে টুরিং এর এই কাজের জন্য দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মেয়াদ কমে যায় ২ বছর, বেচে যায় প্রায় ২ কোটি প্রান। এ্যালান টুরিং মানুষটা এভাবে কাজ করেছিল,  কিন্ত তার কাজ তার অবদান পরবর্তীতে মানুষ জানতে পারে নি, কারন ৫০ বছর তার কাজ ছিল লুকানো। তাকেও সাবধান করে দেওয়া হয়েছিল এই কাজ সম্পর্কে কোন কথা না বলতে। সাদাসিদে নরম মনের মানুষ টুরিং কিছুই বলেন নি। যুদ্ধের শেষে এ্যালান টুরিং ন্যাশনাল ফিজিক্যাল ল্যাবরেটরিতে যোগ দেন। সেখানে রসায়ন সস্পর্কৃত কিছু কাজ করেন। এখান থেকে আবার তিনি১৯৪৮ সালে ম্যানচেস্টার ইউনিভার্সিটিতে ম্যাক্স নিউম্যানের কম্পিউটার  ল্যাব এ যোগ দেন। সেখানে ম্যানচেস্টার কম্পিউটার তৈরিতে বিশেষ দায়িত্ব পালন করেন। তিনি স্পন্দিত রাসায়নিক বিক্রিয়া সম্বন্ধে ধারণা দেন, যা পরে প্রথম লক্ষ করা হয় ১৯৬০ সালে।

 

অনেকেই জানেন টুরিং সমকামী ছিলেন।কিংস কলেজে থাকাকালীন এক নারীর সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। তিনি অকপটে বলেন যে তিনি সমকামী। মেয়েটি এ কথা শুনেও তার কাছে থাকতে চেয়েছিল তাকে ভালবাসতে চেয়েছিল। কিন্ত টুরিং  পরে নিজ থেকে সরে যান আমাদের মত ভাল মানুষ এর মহৎ ব্যবহারের কারনে ।আহারে, মানুষটা তার কাজকে উৎসর্গ করেছিলেন আমাদেরই জন্য অথচ আমরাই তাকে বাচতে দিলাম না সরকারের বাজে নীতি তাকে বেচে থাকতে দিল না। ১৯৫২ সালে টুরিংকে সমকামিতার জন্য দোষী সাব্যস্ত করা হয়। সে সময় যুক্তরাজ্য  সমকামীদের দোষী বলে দায়ী করা হতো। তাকে বলা হয় শাস্তি হিসাবে, নয় জেল খাটতে হবে নয়ত এস্ট্রোজেন ইঞ্জেকশন গ্রহণ করতে হবে।  তিনি দ্বিতীয় চয়েজটাই মেনে নেন।

 

এ্যালান টুরিংকে ১৯৫৪ সালের ৮ জুন বাসায় মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। পাশে থাকা সায়ানাইডের বোতল থেকে ধারণা করা হয় আত্মহত্যা করেছেন। ময়নাতদন্তে বলা হয় এক দিন আগে তিনি মারা গেছেন।

qlow-220px-Alan_Turing_78_High_Street_Hampton_blue_plaque

২০০৯ সালে ব্রিটিশ সরকারের পক্ষে প্রধানমন্ত্রী গর্ডন ব্রাউন বলেন টুরিংকে যে ক্ষতিকর চিকিৎসায় বাধ্য করা হয়েছিল, এবং তারা ক্ষমা প্রার্থনা করেন। ২০১৩ সালে রাণী এলিজাবেথ তাকে মরণোত্তর ক্ষমা প্রদান করেন।

qlow-220px-David_Chalmers%2C_delivering_a_talk_at_De_La_Salle_University-Manila%2C_March_27%2C_2012

এ্যালান টুরিং কে আজ অনেকেই চেনে, প্রযুক্তি তার ইতিহাসকে টেনে বের করে এনেছে আমাদের সামনে।এই যে আপনি ফোনে নয়ত কম্পউটারে লেখাটি পড়লেন,এই দুই যন্ত্র এসেছে তার হাত থেকেই। তার বানানো যন্ত্রই রুপান্তর হয়েছে  যাকে আমারা চিনি কম্পিউটার নামে।

 

দ্বিতীয় পর্বে আসব টুরিং এর জীবন নিয়ে বানানো দ্যা ইমিটেশন গেম সিনেমা এবং টুরিং সম্প্রর্কিত আরও তথ্য নিয়ে। ততদিন ভাল থাকবেন।

(Visited 233 time, 1 visit today)

মন্তব্য করুনঃ

You must be Logged in to post comment.

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন