“District 9” – সাই-ফাইয়ের আড়ালে কিছু নির্মম বর্তমানের কশাঘাত……

 

মুভির নামঃ District 9 (2009)
পরিচালকঃ  Neill Blomkamp
প্রযোজকঃ Peter Jackson and Carolynne Cunningham
গল্পঃ Neill Blomkamp, Terri Tatchell
অভিনয়েঃ Sharlto Copley, David James, Jason Cope and others
রেটিং- IMDb: 8/10
            Rotten Tomatoes: 90% Fresh

মুভি শেষে আমার অনুভূতিঃ সাইন্স ফিকশন নিয়ে এত মুভি দেখেছি, কিন্তু এতটা ভালো কখনোই লাগে নি। কেন এরকম মনে হল? তাহলে একটু গল্পে চলে যাই……

কাহিনীঃ

গল্পের শুরু ১৯৮২ সালে। হঠাৎ করেই দক্ষিন আফ্রিকার জোহানেসবার্গে দৈত্যাকায় এক এলিয়েন শিপ এসে শূন্যে স্থির হয়ে থাকে। একেবারে নট নড়নচড়ন এবং সেই জিনিস থেকে আবার কিছু অংশ খসে খসে পড়তেও থাকে তাই সবাই বুঝতে পারে টেকনিক্যাল কোন সমস্যাই হয়েছে। তাই আর্মি যখন হেলিকপ্টারে করে সেই স্পেসশিপের ভেতরে ঢোকে তারা আবিস্কার করে লাখ লাখ অপুষ্ট, রুগ্ন এলিয়েনদের এবং তাদের মাটিতে নামিয়ে আনে। এলিয়েনগুলোকে বলা যায় বস্তি বানিয়ে সেই বস্তির বাসিন্দা করে রাখা হয় রিফিউজিদের মত এবং সেই এলিয়েন বসতিই হল ‘District 9’। মানুষেরা তাদের সাথে রীতিমত যুদ্ধবন্দীর মত আচরণ করে এবং লোকাল মাফিয়া গ্যাংও গড়ে ওঠে সেখানে। তারা আবার বিড়ালের খাবার দিয়ে এলিয়েনদের কাছ থেকে অস্ত্র কিনে নেয় যদিও সেসব অস্ত্র ঐ এলিয়েনরাই একমাত্র ব্যবহার করতে পারে। তবুও সন্ত্রাসী বলে কথা! অস্ত্র নিয়ে রাখলে দোষের কি! এভাবে ১৮বছর কাটবার পর একসময় ঐ দেশের জনগণের দাবির মুখে এবং কিছু গুন্ডা কিসিমের এলিয়েন ভাইদের মাস্তানির কারণে অথোরিটিকে সব এলিয়েনদের নতুন এক জায়গায় স্থানান্তর করতে হয়। দায়িত্ব দেয়া হয় Wikus van der Merwe নামের এক এলিয়েন বিষয়ে কর্মরত কর্মীকে যে কিনা আবার ওপরের লেভেলের এক হর্তাকর্তার মেয়েজামাই। তো এই Wikus সাহেব বেশ প্রাণখোলা লোক। দায়িত্ব পেয়ে মহাখুশি যদিও আসলে খুব একটা সম্মানের কোন কাজ সে পায়নি। মাথায় চিংড়ি মাছের মত শুঁড় থাকায় “The Prawns” ডাকনামে ডাকা এই এলিয়েনদের ঘরে ঘরে গিয়ে রীতিমত পেপারে সাইন নিয়ে স্থানান্তর করার এক পর্যায়ে Wikus একটি ছোট সিলিন্ডারের মত টিউব খুঁজে পায় এবং সেটিতে চাপ পড়তেই কিছু তরল ছিটকে যায় তার মুখে। ঘটনার শুরু এখানেই। ধীরে ধীরে শারীরিকভাবে এলিয়েনদের মত হয়ে যেতে থাকে সে। ব্যবহার করতে পারে ‘Elien-only’ টাইপ সব অস্ত্র। তাকে নিয়ে রীতিমত টানাটানি শুরু করে আর্মি থেকে শুরু করে নিষিদ্ধ গ্যাং সবাই। সবার কাছ থেকে, স্বজাতির কাছ থেকে পালিয়ে বেড়ানোর ক্ষণগুলোতে তার সঙ্গী হয় এক এলিয়েন পিতা আর ছেলে। লক্ষ্য একটাই- সেই ক্যানিস্টার খুঁজে বের করা যার তরল দিয়ে স্পেসশিপ চালু হলে সব এলিয়েন যেতে পারবে ঘরে আর Wikus ও পারবে পুরোপুরি স্বাভাবিক মানুষ হয়ে যেতে। সেই আকাঙ্খিত তরল কি ধরা দেবে? এলিয়েনগুলো কি ফিরতে পারবে নিজের ঘরে? আর Wikus কি পারবে স্বাভাবিক হয়ে তার প্রিয়তমা স্ত্রীর কাছে ফিরে যেতে? নাকি সে পরিণত হবে কোনকিছুতে যা তার দুঃস্বপ্ন?? আমার গল্পবলা এখানেই শেষ। বাকিটা পর্দায়…

কিছু কথাঃ

এই মুভির গল্পটা খুব বেশি ভালো। ঠিক যেমন গল্পে দর্শক বাধ্য হয় পুরোটা একবারে গিলতে এবং আরও কয়েকবার দেখতে। এলিয়েনরা আমাদের সমাজে নিপীড়িত মানুষদের প্রতিরুপ হয়েই যেন ছিল মুভিতে। আর অন্ধ প্রতিরক্ষা বা অস্ত্র উন্নয়নে বিশ্বাসী পাশ্চাত্য বেনিয়াদের ক্রূর রূপটা দিনের আলোর মত পরিস্কার করে তুলে ধরা হয়েছে মুভিতে। ক্ষমতাবাদীরা যে সম্পর্ককেও লোভের চেয়ে নীচে রাখে সেটা একেবারে স্পষ্ট দেখানো হয়েছে। অভিনয়ে একাই Sharlto Copley গুরু টেনে নিয়ে গেছে। এই লোকের এখন পর্যন্ত দেখলাম চারটা মুভি(The A- Team, Elysium, Oldboy & District 9) যার সব কয়টাতেই চরিত্র অনুযায়ী একেবারে দুর্দান্ত। সমালোচকের চোখে কিছু খুঁত তো থাকেই, যেমনঃ Wikus নিতান্তই গোবেচারা হওয়া সত্ত্বেও রোবটটাকে কীভাবে চালাল সেটা একটা বিষয় কিংবা এরকম দুয়েকটা ভুল থাকতেই পারে আর সেগুলোর  সপক্ষে যুক্তিও দেখানো যায় আমি মনে করি। কিন্তু বিখ্যাত সমালোচকেরাই এই মুভির জাস্ট ভূয়সী প্রশংসা করা বাদে আর কোন কথায় যান নি তো আমি কোন ছার! সোজা কথায় সাইন্স ফিকশনকে এভাবেও দেখানো যায় সেটা না দেখলে বুঝা অসম্ভব…

প্রিয় দৃশ্যঃ

একেবারে শেষের দৃশটি। অনেক নামকরা রোম্যান্টিক মুভিতেও এমন একটা অসাধারণ দৃশ্য আমি খুঁজে পাইনি…

কিছু অজানা বা ক্যামেরার পেছনের কথাঃ

১) F… এই শব্দটি মুভিতে কতবার আছে জানেন? কতই হবে? বড়জোর ৫০ বার? উহু, ৫০ না ১০০ ও না, পাক্কা ১৩৭ বার! হ্যাঁ ১৩৭ বার এই F বর্ণীয় শব্দখানা নানান ঢঙে বলা হয়েছে। জানতে চান সবচেয়ে বেশি F… উচ্চারিত হওয়া মুভির তালিকায় এর অবস্থান কত? শুনলে ভিরমি খাওয়ার মতই। টপ ১০০ তেও নেই এটি! তাহলে টপ মুভিটি কোনটি? বাণিজ্যিক মুভির মধ্যে সব থেকে বেশি F… উচ্চারিত হওয়া মুভিটির নাম— The Wolf of Wall Street!!! কতবার উচ্চারিত? গুনে গুনে ৫০৬ বার! মানে প্রতি মিনিটেই প্রায় তিনবার!!!!!

২) আসলেই কি District 9 কিংবা Area 51 আছে? বিভিন্ন ইন্টেলিজেন্স সংস্থার ফাঁস হওয়া কিছু নথি কিন্তু একদম অথেনটিক হ্যাঁবোধক ইঙ্গিতই দেয়!!! এছাড়া এই মুভিটি Neill Blomkamp এর শর্ট ফিল্ম ‘Alive In Joburg’ থেকে অনুপ্রাণিত। শর্ট ফিল্মটিতে কিছু কৃষ্ণাঙ্গ আফ্রিকানদের সাক্ষাৎকার নেয়া হয় এলিয়েনদের অস্তিত্বের ব্যাপারে এবং তারা বলেন এলিয়েন আছে এবং বেঁচেই আছে সেখানে এবং তারা নাকি যোগাযোগও রক্ষা করে!!

৩)  Sharlto Copley এর ক্যামেরার সামনে প্রথম দাঁড়ানো এই মুভিতেই! যদিও অভিনয় দেখলে তা বিশ্বাস করা মুশকিল।

৪) পুরো মুভিতে এলিয়েনদের যত উদ্ভট আওয়াজ বা কথা শোনা যায় তা একজন মানুষের ডাবিংয়েই করা- Jason Cope!

৫) চিংড়ি মাছ এর কিন্তু ক্যাটফুড খেতে ভালোই লাগে। এজন্য মুভির এক প্রযোজক বড়শিতে ক্যাটফুড গেঁথে চিংড়ি মাছ ধরতেন। পরিচালক এটা দেখেন এবং সিদ্ধান্ত নেন তার মুভির চিংড়ি মাছ তথা ‘Prawn’ দেরও প্রিয় হবে এই ক্যাটফুড!!

৬) এই মুভির ব্র্যান্ডিং এর জন্য আমেরিকা আর ইংল্যান্ডের বিভিন্ন শহরে একটি পোস্টার বা হোল্ডিং লাগিয়ে দেয়া হয় যাতে একটি নাম্বার দেয়া ছিল এবং বলা ছিল কেউ যদি এলিয়েন জাতীয় কিছু কিছু দেখে থাকেন তবে যেন অবশ্যই ফোন করেন সেই নাম্বারে। জাস্ট মজা করেই প্রচারণা কিন্তু কোথাও মুভির নাম দেয়া ছিল না শুধু সাইটের লিংক ছাড়া। অনেক ফোন আসে সেই নাম্বারে!! আসলেই কিছু দেখেই ফোন দিছিল তারা নাকি জাস্ট জানতেই কে জানে! তবে তারা ফোন করলেই একজন কল রিসিভ করে এবং বলে কীভাবে সাহায্য করতে পারি আর কথার মাঝখানে এক এলিয়েন এসে লাইন ডিসকানেক্ট করার আগে বলে, আমাদের অন্যায়ভাবে আটকে রাখা হয়েছে, আমরা বন্দি!!! আসলে সবই সাজানো, তবে এরকম প্রচারণা সত্যিই বেশ অদ্ভুত ছিল।

এই সেই প্রচারণামূলক ছবি যা দেখে অনেকেই বিভ্রান্ত হয়েছিল!!

এই সেই প্রচারণামূলক ছবি যা দেখে অনেকেই বিভ্রান্ত হয়েছিল!!

 

সব কথার শেষ কথা, দেখা না থাকলে অবশ্যই মুভিটা দেখুন। আপনার সবথেকেDIST9_TSR_1SHT_3 প্রিয় সাইন্স ফিকশন মুভির লিস্টে এটি নিঃসন্দেহে জায়গা করে নেবেই।

   

 

(Visited 138 time, 1 visit today)

এই পোস্টটিতে ১৮ টি মন্তব্য করা হয়েছে

  1. ফরেস্ট গাম্প says:

    দারুণ লিখেছেন তো, এখুনি দেখে ফেলতে ইচ্ছা করছে, এইটার নাম শুনেছি আগে।
    লিখায় প্লাসস…

  2. Shahriar kabir says:

    মুভিটা দুবছর আগেই দেখেছি , অসাধারন স্ক্রীনপ্লে … আর আপনি লিখেছেন ও দারুন 🙂

    • অনিক চৌধুরী says:

      অনেক আগেই দেখেছেন দেখছি! আমি এই দুর্দান্ত মুভি কিছুদিন আগেই দেখলাম। স্ক্রিনপ্লে আসলেই দারুণ। আর ধন্যবাদ অবশ্যই।

  3. ধ্রুব নীল says:

    দারুন লিখেছেন । লিস্টেড । 🙂

  4. পথের পাঁচালি পথের পাঁচালি says:

    আপনার লেখার ধরনটা দারুন লাগল। সাই ফাই ভালো লাগেনা কিন্তু আপনার লেখা পড়ে মনে হলো চমৎকার একটা মুভি।

    • অনিক চৌধুরী says:

      ধন্যবাদ আপনাকে। সাই ফাই থেকে একটু আলাদা আমেজের মুভিটা। দেখলেই বুঝবেন আশা করি। 🙂

  5. Arik Abeer says:

    পড়ে ভালো লাগলো । ছবিটা দেখার ইচ্ছা জাগ্রত করে দিলেন ।

  6. মিজানুর রহমান মিজানুর রহমান says:

    এতো ভালো লিখার রহস্য কি :mewek2

  7. James Bond says:

    অনেক সুন্দর করে লিখেছেন তো। একবার দেখতে বশে আর শেষ করা হয় নি। দেখতে হবে মনে হচ্ছে

  8. মেগামাইন্ড says:

    রিভিউ পরে দেখার ইচ্ছা জাগছে :thumbup

  9. রিফাত আহমেদ রিফাত আহমেদ says:

    রিভিউ দারুণ হইছে ম্যান

মন্তব্য করুনঃ

You must be Logged in to post comment.

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন