‘দুরবীন’ (২০১৪) When ‘ফেলুদা’ Meets ‘ব্যোমকেশ বক্সী’… !!!
Share on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on TwitterPin on Pinterest0

544231_449163278523034_866375163_n

 

 

 

বাংলা সাহিত্যে বিখ্যাত গোয়েন্দা চরিত্রের নাম নিতে গেলেই যে দুটি নাম সর্ব প্রথমে আসবে তারা হল ‘সত্যজীৎ রায়’ এর সৃষ্টি ‘ফেলুদা’ ও ‘শরদিন্দূ বন্দ্যোপাধ্যায়’ এর সৃষ্টি ‘ব্যোমকেশ বক্সী’। এই দুটি চরিত্র নিয়ে সেই ৯০ এর দশক থেকে এখন পর্যন্ত মুভি ও টিভি সিরিজ কম হয়নি। ‘ফেলুদা’র কথা ভাবলেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে একটিই চেহারা ‘সব্যসাচী চক্রবর্তী’ এবং ‘ব্যোমকেশ’ হিসেবে ‘আবীর চট্টোপাধ্যায়’ এবং ‘যীশু সেনগুপ্ত’। বিখ্যাত পরিচালক ‘সন্দীপ রায়’, ‘অঞ্জন দত্ত’ ও অরিন্দম শীল’ এর হাত ধরে এই দুটি চরিত্র এখনো রূপালী পর্দায় সমান তালে দর্শকদের মন জয় করে আসছে কিন্তু আমরা কি কখনো ভেবে দেখেছি এই দুটি চরিত্রকে যদি পরস্পর পরস্পরের সাথে দেখা করিয়ে দেয়া হত তবে কি হত ?

 

 

 

maxresdefault

 

 

 

এই অসাধ্যটিই সাধ্য করেছেন পরিচালক ‘স্বাগত চৌধুরী’ তার নির্মিত ‘দুরবীন’ মুভিতে। এ মুভির গল্প এগিয়েছে একটি কাল্পনিক পাঁড়াকে কেন্দ্র করে, যার নাম ‘গোয়েন্দা পাঁড়া’। এই পাঁড়ায় একই বাড়িতে বাস করেন এক সময়ের দুই জনপ্রিয় গোয়েন্দা ‘ফেলুদা’ ও ‘ব্যোমকেশ বক্সী’। ‘ফেলুদা’ থাকেন উপর তলায় ও ‘ব্যোমকেশ’ নিচ তলায়। দুজনেই এখন গোয়েন্দাগিরি থেকে অবসর নিয়েছেন কারণ বাজার খুবই খারাপ। এখন আর সেই আগের মত মক্কেল খুঁজে পাওয়া যায় না। তাই পেটের দায়ে ‘ফেলুদা’ ‘তপসে’কে নিয়ে তার বাসায় খুলে বসেছেন বাচ্চাদের কোচিং ক্লাস এদিকে ‘লালমোহন বাবু’ ওরফে ‘জটায়ু’ তার গোয়েন্দা বই লেখা দিব্যি চালিয়ে যাচ্ছেন আর ‘ব্যোমকেশ’ শুরু করেছেন ‘অজিত’কে নিয়ে লাইফ ইন্সুরেন্সের ব্যবসা। এক বাড়িতে থাকা নিয়ে এই দুই গোয়েন্দার মধ্যে হরদম ক্যাচাল লেগেই আছে। কেউ কাউকে দেখতে পারে না। একজনের কাছে মক্কেল এলেই অন্যজন সেই মক্কেলকে ভাগিয়ে নিজের কাছে নিয়ে আসে। বিশেষ করে ‘তোপসে’ আর ‘অজিত’ এর মধ্যে দেখা হলেই দুজনই দুজনকে এক হাত দেখে নিতে ছাড়ে না। এই পাড়াতেই থাকে ‘পুপুল’, ‘ভেবলি’ আর ‘তাতাই’ নামের ৩ জন পিচ্চি যাদের শখ হচ্ছে তারা মস্ত বড় গোয়েন্দা হবে, বিশেষ করে ‘পুপুল’ যেকিনা নিজেকে বিখ্যাত গোয়েন্দা ‘ক্যাপ্টেন স্পার্ক’ ভাবে। পাড়ার সবাই এই ৩ পিচ্চিকে ‘তিন গোয়েন্দা’ হিসেবেই জানে। এমন সময় পাড়ায় একটি খুন হয়ে যায়, যাকে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেবার চেষ্টা করা হয় আর এই গোটা খুনটাই ‘পুপুল’ তার দুরবীন দিয়ে দেখে ফেলে। শুরু হয়ে যায় ‘তিন ক্ষুদে গোয়েন্দা’র খুনীকে ধরার দুঃসাহসীক প্রচেষ্টা অন্যদিকে অনেক দিন পর পাড়ায় একটি ক্রাইম হওয়ায় ‘ফেলুদা’ ও ‘ব্যোমকেশ’ দুজনেরই টার্গেট থাকে একে অন্যের চোখে ধুলো দিয়ে এই কেসটা নিজেরা বাগিয়ে নেয়া। অবশেষে রহস্য ধীরে ধীরে জড় পাকাতে থাকে। সন্দেহভাজনের লিস্ট বাড়তে থাকে। কি হবে শেষ পর্যন্ত ? ‘তিন গোয়েন্দা’, ‘ফেলুদা’ নাকি ‘ব্যোমকেশ’ কে পারবে এই রহস্যের জাল উন্মেচন করতে ?

 

 

 

28432488.cms

 

 

 

‘দুরবীন’ মুভিটির সব থেকে বড় পাওয়া ‘ফেলুদা’ ও ‘ব্যোমকেশ’ কে একই সাথে তদন্ত করতে দেখতে পাওয়া যা বাংলা সিনেমার ইতিহাসে দেখা যায়নি কখনো। সেই সাথে ‘তোপসে’ এবং ‘অজিত’ এর মধ্যকার ঝগড়া, ‘লালমোহন বাবু’ ওরফে ‘জটায়ু’ এর মজার মজার সব কথা ও ‘ফেলুদা’ এবং ব্যোমকেশ’ এর মধ্যকার হিউমার পুর্ণ ডায়লগ গুলো দর্শককে চরম ভাবে বিনোদিত করবে। পাশাপাশি তিন ক্ষুদে গোয়েন্দার দারুন সব গোয়েন্দাগিরি গুলো আমাদের নস্টালজিক করে দেবে ‘রকিব হাসান’ এর বিখ্যাত সিরিজ ‘তিন গোয়েন্দা’র প্রতি। এ মুভিতে অনেকেই থাকলেও গোটা মুভিটি ছিল মূলত ‘ফেলুদা’র ওয়ান ম্যান শো এবং ‘ব্যোমকেশ’ এর ব্যাপ্তি ছিল মূলত অতিথী চরিত্রের মত। আর এ মুভিতে ‘ফেলুদা’র তদন্তের প্যাটার্ন গুলো ইন্সপায়ার হয়েছে ‘সন্দীপ রায়’ এর ‘ফেলুদা’ মুভি গুলো থেকে। সব মিলিয়ে কেউ যদি ‘দুরবীন’ মুভিটি ‘সন্দীপ রায়’ ও ‘অঞ্জন দত্ত’ এর মুভি গুলোর সাথে তুলনা করে দেখতে যান তবে কিন্তু তাকে হতাশ হতে হবে কারণ এ মুভিটি সম্পুর্ণ একটি শিশুতোষ মুভি যেখানে শিশুদের কল্পনাকে বেড়ে ওঠার জন্য ইন্সপায়ার করা হয়েছে। আমাদের প্রত্যেকেই যারা ছোট বেলায় গোয়েন্দা গল্প পড়তাম, তারা মনের মাঝে একটি সুপ্ত বাসনা পুষে রাখতাম যে আমরা বড় হয়ে ‘শার্লক হোমস’, ‘জেমস বন্ড’, ‘তিন গোয়েন্দা’, ‘ফেলুদা’, ‘ব্যোমকেশ’, ‘কাকাবাবু’ ইত্যাদীদের মত গোয়েন্দা হবো এবং তখন আমাদের অনেকেরই চাল-চলন, হাব-ভাব ছিল গোয়েন্দাদের মত। সব খানে রহস্য খোঁজাটা ছিল আমাদের নেশা। কয়েকজন বই পাগল বন্ধুদের নিয়ে আমরা খুলে বসতাম ‘গোয়েন্দা ক্লাব। ‘তিন গোয়েন্দা’ পড়তে গিয়ে আমার নিজের সাথেও এমনটিই হয়েছিল বলে আমি বললাম। ছোটবেলার সেই মধুর স্বপ্ন গুলো আস্তে আস্তে বড় হবার সাথে সাথে বাস্তবতার হাতে খুন হয়েছে অনেক আগেই। ‘দুরবীন’ মুভিটি আমাদের মতই সেই সকল শিশুদের সুন্দর শৈশবের অবাধ্য, দুঃসাহসীক ও বেপরোয়া স্বপ্ন গুলোর প্রতিচ্ছবি। এ মুভিটি শিশুদের স্বপ্ন দেখাতে শেখাবে। অন্যায়ের প্রতিবাদ ও দুঃসাহসীক কিছু করার অনুপ্রেরণা জোগাবে যা তারা শিখবে ‘ফেলুদা’ ও ‘ব্যোমকেশ’কে দেখে।

 

 

 

9d1c2ad5269a1b783bb2991e594271be

 

 

 

মুভিতে ‘ফেলুদা’ চরিত্রে বরাবরের মতই ছিলেন ওয়ান এন্ড অনলি ‘সব্যসাচী চক্রবর্তী’ এবং ‘ব্যোমকেশ বক্সী’ চরিত্রে ছিলেন বিখ্যাত প্রবীণ অভিনেতা ‘সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়’, যেহেতু ‘ব্যোমকেশ’ এর বয়স ‘ফেলুদা’র তুলনায় বেশী তাই এই অভিনেতাকে নেয়া। মজার ব্যাপার হচ্ছে ‘সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়’ ছিলেন রূপালী পর্দার প্রথম ‘ফেলুদা’ যার মাধ্যমে ‘ফেলুদা’র চলচ্চিত্র জগতে অভিষেক ঘটে ১৯৭৪ সালে ‘সত্যজীৎ রায়’ এর ‘সোনার কেল্লা’ মুভি দ্বারা। এরপর তিনি আরো ৩টি ‘ফেলুদা’ মুভিতে অভিনয় করেন (‘জয় বাবা ফেলুনাথ’, ‘ঘুরঘুটিয়ার ঘটনা’ ও ‘গোলকধাম রহস্য’)। এই সাবেক ‘ফেলুদা’ এই প্রথম ‘ব্যোমকেশ বক্সী’ চরিত্রে অভিনয় করলেন এবং ‘বর্তমান ‘ফেলুদা’ ‘সব্যসাচী’র সাথে তিনি তার রসায়নটাও জমিয়েছেন দারুণ। গোয়েন্দাগিরিতে ‘ব্যোমকেশ’ যে আসলেই ‘ফেলুদা’র বাপ দেখিয়ে দিয়েছেন তিনি এই মুভিতে। মুভির একটি বিশেষ চরিত্রে অসাধারণ অভিনয় করেছেন ‘বেলাশেষে’ ও ‘প্রাক্তন’ খ্যাত টিভি ও মুভি অভিনেত্রী ‘অপরাজিতা আঢ্য’। পাশাপাশি ‘তিন ক্ষুদে গোয়েন্দা’র চরিত্রে অভিনয়কারী ৩ পিচ্চির অভিনয় ছিল প্রশংসনীয় তবে গোয়েন্দা প্রধাণ ‘পুপুল’ ওরফে ‘ক্যাপ্টেন স্পার্ক’ চরিত্রে অভিনয় কারী ছেলেটার অভিনয় ছিল খুবই ভারিক্কি টাইপের যা চরম বিরক্তির সৃষ্টি করেছে। যাই হোক, ‘দুরবীন’ মুভিটি অন্যান্য ‘ফেলুদা’, ‘ব্যোমকেশ’ মুভির মত এত বেশী হাইলাইটে আসেনি কারণ এটি কোন কমার্শিয়াল মুভি নয়। এটি একটি নির্মল বিনোদনের শিধুতোষ ড্রামা এবং যারা যারা ‘ফেলুদা’ ও ‘ব্যোমকেশ’ ভক্ত আছেন তাদের জন্য একটি মাস্ট ওয়াচ মুভি। সুতরাং মিস করবেন না যেন… !!!

 

 

 

‘দুরবীন’ মুভির ট্রেলার –

 

মন্তব্য করুনঃ

You must be Logged in to post comment.

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন