‘ম্যালেফিসেন্ট’ (২০১৪) এক প্রতারিত হৃদয়ের ভালবাসার গল্প…

maleficent poster-1

 

আমরা ছোটবেলায় অনেক বিদেশী রূপকথা পড়েছি। ‘সিনড্রেলা’, ‘স্নো হোয়াইট’, ‘অ্যালিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড’, ‘বিউটি এন্ড দ্য বিস্ট’, ‘দ্য প্রিন্সেস এন্ড দ্য ফ্রগ’, ‘স্লিপিং বিউটি’ ইত্যাদী। তবে বিদেশী রূপকথা গুলোর মধ্যে একটা কমন মিল আছে তা হল, অধিকাংশ গল্পের ভিলেন হচ্ছে মহিলা। এসব গল্প নিয়ে বই আছে, কমিক আছে, কার্টুন আছে এবং মুভিও আছে। প্রতিটা গল্পেই একটা লেজেন্ডারী ভিলেন আছে যে তার কুচক্র ও জাদুকরী শক্তি দিয়ে গল্পের নায়িকা কে নানান রকম বিপদে ফেলে ও ক্ষতি করার চেষ্টা করে এবং অবশেষে নায়ক এসে নানান বাধা বিপত্তি এড়িয়ে নায়িকা কে উদ্ধার করে ও ভিলেনকে শোচনীয় ভাবে পরাজীত করে। অতঃপর নায়ক নায়িকা দুজনে সুখে শান্তিতে বসবাস করতে থাকে। এটা সকল গল্পেরই কমন ফিনিশিং যা সকলেই জানে। কিন্তু সকলে যা জানে না সেটা হল এই পরাজীত ভিলেনের গল্প। নায়ক নায়িকার মত প্রতিটি ভিলেনেরও নিজের কিছু গল্প থাকে। এমন গল্প যেখানে কোন নায়ক নায়িকা থাকবে না, শুধু থাকবে সে। যে গল্পে থাকবে তার দুঃখ, কষ্ট, আবেগ, ভালবাসা এবং সব কিছুর উপর একজন সাধারণ সত্তা থেকে কিভাবে সে ভিলেন হয়ে উঠলো তার গল্প। আর এ সব কিছু নিয়েই তৈরী ‘ম্যালেফিসেন্ট’।

 

 

আমরা সবাই কম বেশী ‘স্লিপিং বিউটি’ এর গল্প জানি। রাজা ‘স্টেফান’ এর মেয়ে রাজকুমারী ‘অরোরা’, যার জন্মের পর এক দুষ্টাত্মা পরী ‘ম্যালেফিসেন্ট’ এসে তাকে অভিশাপ দিয়ে যায় যে রাজকুমারীর ১৬ তম জন্মদিনে সূর্য ডোবার আগে সে তার আংগুলে সুঁই এর আঘাতে এক মৃত্যুসম গভীর ঘুমে তলিয়ে যাবে এবং একমাত্র এক সত্যিকার ভালবাসার মানুষের চুম্বনের ফলেই তার এই ঘুম ভাংবে। অতঃপর রাজা ‘স্টেফান’ এর সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে রাজকুমারী ‘অরোরা’ ঠিকই তার ১৬ তম জন্মদিনে ‘ম্যালেফিসেন্ট; এর অভিশাপে তলিয়ে যায় সেই মৃত্যু ঘুমে। অবশেষে তার ভালবাসার মানুষ রাজকুমার ‘ফিলিপ’ ‘ম্যালেফিসেন্ট’ কে পরাজীত করে তার ভালবাসার চুম্বন দিয়ে জাগিয়ে তোলে ‘স্লিপিং বিউটি’ রাজকুমারী ‘অরোরা’ কে।

 

 

‘স্লিপিং বিউটি’ এর এই অরিজিনাল গল্প নিয়ে সর্ব প্রথম ১৯৫৯ সালে ‘ওয়াল্ট ডিজনি’ নির্মাণ করে অ্যানিমেশন মুভি ‘স্লিপিং বিউটি’। অবশেষে, ২০১৪ সালে ‘ওয়াল্ট ডিজনি’ স্লিপিং বিউটি’ কে আবার রূপালী পর্দায় নিয়ে আসে লাইভ অ্যাকশন মুভি হিসেবে। তবে এবার তারা গল্পে রাজকুমারী ‘অরোরা’ এর থেকে ভিলেন পরী ‘ম্যালেফিসেন্ট’ এর উপর জোর দেয় এবং তাকে কেন্দ্র করেই গোটা মুভির গল্প আবর্তিত হয়। এখানে ‘ম্যালেফিসেন্ট’ এর গল্প শুরু হয় একদম তার শৈশব থেকে যখন তার কোমল হৃদয় শুধুই ভালবাসায় পরিপূর্ণ ছিল। সে চাইতো তার জীবনে কেউ আসবে, তাকে সত্যিকারের ভালবাসায় ভরিয়ে দিবে। এক সময় তার সাথে দেখা হয় এক বালকের যার সপ্ন এক দিন সে রাজা হবে। আস্তে আস্তে তারা বড় হয়। তাদের মাঝে ভালবাসা সৃষ্টি হয়। কিন্তু সেই ছোট্ট বালক যৌবনে উঠে অনেক বদলে যায়। মানুষ বলে কথা। তার মাঝে রাজা হবার তিব্র বাসনা এতই প্রবল হয়ে ওঠে যে সে প্রতারণা করে ‘ম্যালেফিসেন্ট’ এর নিষ্পাপ ভালবাসার সাথে। রাজা হবার শর্ত হিসেবে সে ‘ম্যালেফিসেন্ট’ এর সৌন্দর্য তার পাখা দুটি কেটে নেয় ও তার ভালবাসাকে বলি দিয়ে সিংহাসনে বসে ও হয়ে যায় রাজা ‘স্টেফান’। আর এদিকে প্রতারিত ‘ম্যালেফিসেন্ট’ রাগে, দুঃখে ও ঘৃণায় তার হৃদয় পাথরে পরিণত হয়। কোমল ও নিষ্পাপ ‘ম্যালেফিসেন্ট’ বদলে যায় এক ভয়ানক দুষ্টাত্মায় যার মনের মাঝে জলতে থাকে প্রতিশোধের ভয়াবহ আগুন। অতঃপর রাজা ‘স্টেফান’ এর ঘরে যখন রাজকুমারী ‘অরোরা’ এর জন্ম হয়, তখন ‘ম্যালেফিসেন্ট’ প্রতিশোধ হিসেবে তাকে অভিশাপ দেয় সেই মৃত্যু ঘুমের। তারপর কি হয় ? এতক্ষন যা যা বললাম তা তো জানা গল্প, কিন্তু এর পর যা হয়, তা গোটা ‘স্লিপিং বিউটি’ এর গল্পের ধারাই বদলে দিয়েছে। ভালবাসা যেমন আত্মাকে কলুষিত করে হৃদয়কে পাথর বানিয়ে দিতে পারে, আবার সেই ভালবাসাই পারে আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে হৃদয়কে নির্মল করে দিতে। আর সত্যিকারের ভালবাসার কাকে বলে ? ভালবাসা কি শুধু একটি মেয়ে ও একটি ছেলের মাঝেই তৈরী হয় ? সত্যিকারের ভালবাসা বলতে কি শুধু এটাই বোঝায় ? এ সকল বিষয়ের উত্তর পাওয়া যাবে ‘ম্যালেফিসেন্ট’ এ।

 

 

‘ম্যালেফিসেন্ট’ মুভির সব থেকে বড় পাওয়া, এ চরিত্রে অভিনয় করা ‘অ্যাঞ্জেলিনা জোলি’ যার সর্ব শেষ লাইভ অ্যাকশন মুভি ‘সল্ট’ ও ‘দ্য টুরিস্ট’ রিলিজ পেয়েছিল ৪ বছর আগে। মাঝখানে এক দীর্ঘ বিরতী। আর ফিরে এসেই ‘জোলি’র বাজিমাত। এ মুভির সব থেকে বড় সারপ্রাইজ ছিল ছোট্ট রাজকুমারী ‘অরোরা’ এর ভূমিকায় অল্প সময়ের জন্য অভিনয় করা ‘অ্যাঞ্জেলিনা জোলি’র ছোট্ট মেয়ে ‘ভিভিয়েন জোলি-পিট’। যদিও এই পিচ্চি মেয়েকে দিয়ে অভিনয় করাতে বেশ বেগ পেতে হয়েছে শ্যুটিং টিমকে তবুও মা ও মেয়েকে এক সাথে পর্দায় অভিনয় করতে দেখে নিঃসন্দেহে আপনি বিমোহিত হয়ে যাবেন। ‘অ্যাঞ্জেলিনা জোলি’ এক কথায় অসাধারণ ছিল। তার নজর কাড়া গ্ল্যামারাস লুক, মুখ বিস্তৃত হাসি, কথা বলার স্টাইল সব মিলিয়ে ৪ বছর পর ‘জোলি’কে রূপালী পর্দায় দেখে পুরাই মাথা নষ্ট, দিল একদম ঠান্ডা হয়ে গেছে। আর রাজকুমারী ‘অরোরা’ এর চরিত্রে ‘এলি ফ্যানিং’ কে অসম্ভব রকমের সুন্দর মানিয়েছে। এই ‘স্লিপিং বিউটি’র কাছে তো ‘অ্যালিস’, ‘স্নো হোয়াইট’ কিছুই না। ‘ম্যালেফিসেন্ট’ এর ডান হাত ‘ডিয়াভাল’ চরিত্রে ‘স্যাম রাইলি’ কে খুব ভাল লেগেছে, কিন্তু রাজা ‘স্টেফান’ চরিত্রে ‘শার্লটো কপলে’ ভাল করলেও, তাকে তেমন একটা মানায়নি। গোটা মুভির ভিজুয়াল ইফেক্ট ও গ্রাফিক্স এর কাজ এক কথায় অসাধারণ ছিল। কোন বাড়াবাড়ি ধরণের স্পেশাল ইফেক্ট নেই এ মুভিতে, যেটুকু আছে তা দেখে আপনার চোখ জুড়াবে সেই সাথে মনও ভরবে। এ মুভি দেখার সময় আপনি হারিয়ে যাবেন এক অসাধারণ জাদুর দুনিয়ায়, মিশে যাবেন ‘ম্যালেফিসেন্ট’ এর দুঃখ, কষ্ট, বেদনার সাথে। যখন ভালবাসার মানুষের কাছে প্রতারিত হয়ে ‘ম্যালেফিসেন্ট’ কাঁদে, সেই সাথে আপনিও কাদঁতে থাকবেন, আপনার মনেও জেগে উঠবে প্রতিশোধ স্পৃৃহা, এবং রাজকুমারী ‘অরোরা’র নির্মল সৌন্দর্য ও সারল্য দেখে আপনিও তার প্রেমে পড়তে বাধ্য হবেন সেই সাথে এ মুভির ফিনিশিং আপনাকে ভালবাসা সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে শেখাবে যা আপনি কোন রূপকথায় পাবেন না। এ ভালবাসা কোন রূপকথার ভালবাসা নয়, এ ভালবাসা বাস্তব যুগের ভালবাসা। আর এটাই এ মুভির সব থেকে বড় অর্জন। চেষ্টা করবেন মুভিটি 3D তে দেখার।

 

 

১৮০ মিলিয়ন বাজেটে নির্মিত ‘ম্যালেফিসেন্ট’ ডমেস্টিক (নর্থ আমেরিকা) বক্স অফিসে আয় করেছে ২৩৯ মিলিয়ন ও গোটা ওয়ার্ন্ড ওয়াইড আয় করেছে ৭৫৪ মিলিয়ন, যা এখন পর্যন্ত ‘অ্যাঞ্জেলিনা জোলি’র ফিল্ম ক্যারিয়ারে সর্বাধিক আয় করা মুভি। অবশেষে, গত কয়েক বছরে যত রূপকথা ভিত্তিক ফ্যান্টাসি মুভি এসেছে যেমন ‘অ্যালিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড’, ‘ওজ-দ্য গ্রেট এন্ড পাওয়ারফুল’, ‘মিরর মিরর’, ‘স্নো হোয়াইট এন্ড দ্য হান্টসম্যান’ এসব গুলো মুভি থেকে স্টোরি, সিনেম্যাটোগ্রাফি, স্ক্রিনপ্লে, ভিজুয়াল ইফেক্ট সব দিক থেকে আমি এগিয়ে রাখবো ‘ম্যালেফিসেন্ট’ কে। It’s a perfect fantasy movie with a strong realistic emotion…

(Visited 563 time, 1 visit today)

এই পোস্টটিতে ৩ টি মন্তব্য করা হয়েছে

  1. ট্রিপল এস ট্রিপল এস says:

    লেখায় আরো দুএকটা ছবি যুক্ত করলে ভাল হতো। আপনার উপস্থাপনা সুন্দর… 🙂

  2. ANEECQUE ANEECQUE says:

    আপনাকে অনেক ধন্যবাদ লেখাটা কষ্ট করে পড়ার জন্য… 🙂

  3. পথের পাঁচালি পথের পাঁচালি says:

    আপনার লেখা ভাল লেগেছে। মুভিটি সম্পর্কে একতা আইডিয়া পেতে চাচ্ছিলাম আর তা পেয়ে গেলাম। ধন্যবাদ।

মন্তব্য করুনঃ

You must be Logged in to post comment.

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন