Assassins Creed: গেম, বাস্তব ইতিহাস এবং… সিনেমা
Share on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on TwitterPin on Pinterest0

AC ddd

দুই ধারার দর্শকের উদ্দেশ্য লিখছি, যারা গেম খেলেছেন এবং যারা খেলেননি। সিদ্ধান্ত নিয়েছি ভূমিকা বাদ দিয়ে সোজা আলোচনায় চলে যেতে। যারা সিনেমা দেখে ভাবছেন, এত সব কী— তাঁদের কনফিউশন কিঞ্চিৎ দূর করবে বলে আমার বিশ্বাস।
.
ইতিহাসঃ
.
সবার আগে জানা দরকার, কারা এই অ্যাসাসিন? এই অ্যাসাসিনরা আদতে ছিলো কিনা। ইতিহাস থেকে জানা যায় অ্যাসাসিনদের অর্ডার আসলেই ছিলো এবং ১১ শতকে পারস্যে দাপট দেখিয়ে বেড়িয়েছে। তাঁদের খুনের তালিকায় ছিলো প্রধাণত শত্রু পক্ষের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা, বিভিন্ন সুলতান, উজির, নাজির ইত্যাদি। বিশেষ করে ক্রুসেডাররা তাঁদের জমের মতো ভয় পেতো। অ্যাসাসিনদের সাথে ল্যাটিন চার্চের ক্রুসেডারদের বিরোধ ইতিহাস বিখ্যাত।
.
ধারণা করা হয় প্রথম ক্রুসেডের পর অ্যাসাসিনদের সিক্রেট অর্ডার গড়ে ওঠে হাসান-ই-সাবাহ এর হাত ধরে। খ্রিষ্টান ক্রুসেডাররা তখন হানাদার। মুসলমানদের থেকে তাঁদের তথাকথিত পবিত্র ভূমি কেড়ে নিয়েছে। কিন্তু হাসান-ই-সাবার লক্ষ্য কেবল ধর্মীয় কিনা এ ব্যপারে সন্দেহ আছে।
খ্রিষ্টানদের সাথে তো বটেই, তাঁর অ্যাসাসিন্স অর্ডার লড়েছে তৎকালীন মুসলমানদের সাথেও।
.
মুসলিমদের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি সালাহ-আদ-দিনের সাথে অ্যাসাসিনদের বিবাদ লেগেই ছিলো। তবে অ্যাসাসিনরা ছিলো দারুণ দক্ষ। মুভিতে যেমন দেখেছেন বা দেখবেন হয়ত তেমনই। ওই সময়ের জেসন বোর্নেরা, তবে বাস্তব। সংখ্যায় তাঁদের সংখ্যা কম হলেও সালাহ-আদ-দিনকে দৌড়ের উপর রেখেছিলো এবং সালাহ-আদ-দিন কখনোই অ্যাসাসিনদের পরাজিত করতে পারেনি। কথিত আছে, একবার সালাহ-আদ-দিনের নিজের তাবুতে বিষমাখা কেক অথবা রক্তমাখা ছুরি রেখে আসে অ্যাসাসিনরা, উদ্দেশ্য সাবধান করে দেয়া, “বেশী বেড়ো না সালাহদিন, যেকোন সময় তোমাকে ফেলে দিতে পারি।”
পরবর্তীতে অ্যাসাসিনরা এবং সালাহ-আদ-দিন শান্তি চুক্তি করেন এবং তাঁদের কমন এনেমি ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে লাগতে মনোনিবেশ করেন।
.
ছিলো টেম্পলার বা নাইটস টেম্পলাররাও, তাঁরাও ইতিহাস স্বীকৃত। ক্রুসেডের সময় গড়ে ওঠে এবং চার্চ তথা খ্রিষ্টান অর্থায়নে মিলিটারি শাসন করে বেরিয়েছে।
.
অ্যাসাসিনরা ভালো ছিলো নাকি ক্রুসেডার টেম্পলারেরা, এটা আলোচনার বিষয় না আসলে। সময়টা ছিলো ধর্মভিত্তিক যুদ্ধের এবং দু’পক্ষের হাতেই লেগে আছে বহু মানুষের রক্ত। ভালোলাগা বা মন্দলাগা থেকে আমরা কেউকে ভালো বা খারাপ বানিয়ে দিতে পারি না।
.
গেমঃ
.
Assassins Creed গেম সিরিজ বাস্তবের অ্যাসাসিনদের নিয়ে হলেও এখানে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আছে। যেমন, গেমে অ্যাসাসিনদের লড়ে যাওয়ার কারণ দেখানো হয় “ফ্রি-উইল বা স্বাধীন ইচ্ছেশক্তি বজায় রেখে শান্তি অর্জন”, অন্যদিকে টেম্পলারদের কারণ ছিলো, “নিয়ন্ত্রণ এবং কঠোর শাসনের মাধ্যমে শান্তি অর্জন।”
গেম-এ দেখানো হয় অ্যাসাসিন এবং ক্রুসেডার টেম্পলারদের বিরোধ কেবল তাঁর পরবর্তী কয়েক শতাব্দীতেই শেষ হয়ে যায়নি, চলেছে যুগের পর যুগ, বিভিন্ন ইতিহাসে বিভিন্ন যুদ্ধে। একটা গোপন যুদ্ধ, দুই গোপন সংগঠনের মাঝে। একদল শুভ বুদ্ধি আর মুক্ত চিন্তার বাহক আর আরেকদল কড়া শাসন আর ভয়ের প্রতীক।
এবং তাঁরা দুই দলই রূপকথার “স্বর্গের আপেল” খুঁজছে। জিনিসটা গোলাকার একটা সোনালী বল। কথিত আছে এই আপেল এর পাওয়ার আছে যে শক্তি ব্যবহার করে এক পক্ষ অন্য পক্ষের উপর করায়ত্ব স্থাপন করতে পারবে। এইখানে ব্যপারটা ফ্যান্টাসি মনে হলেও, আসলে সাইফাই। কেন সাইফাই তা বললে গেম স্পয়লার হয়ে যাবে। তো দুপক্ষই এই আপেল এর অধিকার গ্রহণ করার উদ্দেশ্যে শতাব্দীর পর শতাব্দী লড়ে যাচ্ছে।
.
এইটুকু গেম এর ফিকশন আসলে। এছাড়া বাদবাকি সবকিছু বাস্তব ইতিহাস কেন্দ্রিক। গেম ডেভেলোপাররা চেয়েছিলেন ইতিহাসভিত্তিক গেম বানাতে এবং তাঁরা সফল। গেমগুলোতে লিওনার্দো ডা ভিঞ্চি থেকে শুরু করে অ্যামেরিকার প্রবাদ পুরুষ জর্জ ওয়াশিংটন পর্যন্ত এসেছেন। আরো এসেছে বিভিন্ন যুদ্ধ, বিভিন্ন সময়ের বিভিন্ন শাসক, বিভিন্ন অ্যাসাসিনেশনের ঘটনা এবং সবগুলোই সত্যিকারের ইতিহাস থেকে। যার ফলে, Assassins Creed গেম সিরিজ এর গল্প আসলে বিশাআআআআল এবং কিছুটা বোরিংও বটে 😛 (আমি যদিও ভালোবাসি।)
.
আর গেমপ্লে এবং গেমের ওয়ার্ল্ডও অসাধারণ। গেমের শহরগুলি বাস্তবের শহর। অনেক পোস্ট দেখেছি যেখানে AC গেমার ওই শহরের একই বিল্ডিং এর নিচে গিয়ে ছবি তুলেছে, ক্যাপশন দিয়েছে, “জানো, আমি এই বিল্ডিং এর আগায় বেঁয়ে উঠেছি!”
আসলেই তাই। গেমের মধ্যে প্রোটাগনিস্ট এর চরিত্রে কেবল ধুন্ধুমার মারপিট করতে হয় না, এক্সপ্লোর করতে হয় দুনিয়াকে। অসামাজিকের মতো দ্রূত দৌড়াচ্ছেন? হুট করে দেয়াল বেঁয়ে উঠছেন? পাশ থেকে গেমের লোকজন বলে উঠবে, “শালায় পাগল নাকি?” “দেখ দেখ কী করে, কই বাইয়া উঠে।”
Assassins Creed সিরিজ বাস্তবিকই কেবল গেম না, একটা এক্সপেরিএন্স।
.
সিনেমাঃ
.
বাংলায় কিছু প্রবাদ আছে। যেমন, ‘টাক বেলতলায় একবারই যায়।’ অথবা কাছাকাছি কিন্তু ভিন্ন প্রসঙ্গে, ‘ঘরপোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে ভয় পায়।”
তবুও গেম-টু-মুভি মেকাররা ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিলো না। Assassins Creed এর ক্ষেত্রেও তাই। অরিজিনাল স্টোরি ফলো না করে কেবল মূল থিম রেখে সম্পূর্ণ নতুন কিছু চরিত্র দিয়ে সিনেমা বানিয়েছে নতুন এক গল্পে। এবং জোড়াতালি দেয়ার চেষ্টা করে, হয়েছে চরমভাবে ব্যর্থ।
.
যে অ্যাসাসিন ক্রিড জীবনেও খেলেনি, তাঁর কাছে মুভিটাই একটা জবরজং ধোঁয়াশা। যে কথাগুলো ব্যপক গুরুত্ব সহকারে বলা হচ্ছিলো, এগুলো একজন গেমার বাদে অন্য কারও কাছে আবেদন রাখবে না।
যেমন, “Leap of faith” এর সময়টাতে আমার গায়ের সবগুলো রোম খাঁড়া হয়ে গিয়েছিলো উত্তেজনা আর নস্টালজিয়ায়, গেম না খেলা দর্শকের কাছে ব্যপারটা নেহাতই একটা লম্ফঝম্ফ মনে হবে।
অ্যাপল অফ ইডেন, টেম্পলার, অ্যাসাসিন বিরোধ সিনেমায় কেবল ছুঁইয়ে গেছে না ছোঁয়ার মতো। দর্শকের বোঝার উপায় নেই সিনেমার আসলে কাহিনীটা কী! অন্য টেকনিকাল ব্যপার একদম বাদ দিচ্ছি না হয়।
সিনেমার উদ্দেশ্যই যদি সফল না হয়, তবে সিনেমা বানিয়ে লাভটা কী?
আবার AC গেম সিরিজ ভক্ত হিসেবে পরিবর্তিত গল্প এবং স্টাইল নিয়ে সন্তষ্ট নই, বিশেষ করে সাউন্ডট্রাক এবং OST এর বারোটা বাজিয়েছে। যে AC খেলেনাই, সেও AC-তে জ্যাসপার কিড এর সাউন্ডট্রাক শুনেছে।
আর সবথেকে বড় কথা, যদি সিনেমা বানাতেই হয়, সোর্স ম্যাটেরিয়াল অবজ্ঞা করার কী দরকার ছিলো?
.
ইতিহাসে প্রচুর অ্যাডাপশন হয়েছে সিনেমায়। এবং যেগুলো সোর্স ম্যাটেরিয়াল ফলো করেছে, বেশীরভাগ ক্ষেত্রে সফল হয়েছে। কারণ আছে, সোর্স ম্যাটেরিয়ালকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে নিজের মতো পরিবর্তন করে গ্রেট ফিল্ম বানাতে কুব্রিকের লেভেলের হতে হয়। Assassins Creed এর পরিচালক বা রাইটার সেই লেভেলে নন। নিজেদের দৌড় বোঝা উচিৎ ছিলো।
.
আরেকটা ব্যপার উল্লেখ করার মতো। সাধারণত একটা গেমে কাট-সিন কতক্ষণ থাকে সব মিলিয়ে? ১০/২০ মিনিট? অ্যাসাসিন্স ক্রিড সিরিজে ৯ টা গেম আছে। সবগুলো গড় করলে প্রত্যেক গেমে কেবল কাট-সিনই ৩ ঘণ্টা করে। 😛 ইন এ সেন্স, AC মুভি আছে। একটা না, ৯ টা। নতুন গল্প দিয়ে ১ ঘণ্টা ৪০ মিনিটের গোঁজামিল দেয়ার প্রয়াস হতাশাজনক।
.
সিনেমার একমাত্র ভালো দিক মাইকেল ফ্যাসবেন্ডারের অভিনয়। দারুণ একজন অ্যাসাসিন হতে পারতো সে সন্দেহ নেই। 😉
.
3/10 আমার থেকে।
.
ঐতিহাসিক ঘটনাবলীর সূত্র—
১। অ্যাসাসিনরা কারা – https://en.wikipedia.org/wiki/Assassins
২। টেম্পলাররা কারা – https://en.wikipedia.org/wiki/Knights_Templar
.
বিঃ দ্রঃ আপনি হয়ত গেম খেলেননি কখনও এবং ভবিষ্যতেও খেলবেন না। কিন্তু চাইলেই ইউটিউবে অ্যাসাসিন্স ক্রিডের প্রতিটা গেমের কাট-সিন ভিডিও দেখতে পারেন। দারুণ কিছু ফিকশনাল হিস্টোরি পাবেন। হ্যাপি ওয়াচিং।

Assassin's Creed (2016)
Assassin's Creed poster Rating: N/A/10 (N/A votes)
Director: Justin Kurzel
Writer: Michael Lesslie (screenplay), Adam Cooper (screenplay), Bill Collage (screenplay)
Stars: Michael Fassbender, Marion Cotillard, Jeremy Irons, Brendan Gleeson
Runtime: 140 min
Rated: PG-13
Genre: Action, Adventure, Fantasy
Released: 21 Dec 2016
Plot: When Callum Lynch explores the memories of his ancestor Aguilar and gains the skills of a Master Assassin, he discovers he is a descendant of the secret Assassins society.

এই পোস্টটিতে ১টি মন্তব্য করা হয়েছে

  1. শান্তনু চৌধুরী শান্তনু চৌধুরী says:

    ইতিহাসের অংশটুকু অনেক কিছু জানালো । ধন্যবাদ 🙂

মন্তব্য করুনঃ

You must be Logged in to post comment.

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন