বাংলাদেশে শিশুতোষ চলচ্চিত্র নির্মাণঃ অতীত, সমস্যা ও সম্ভাবনা
Share on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on TwitterPin on Pinterest0

সাধারণ ভাবে শিশুতোষ চলচ্চিত্র বলতে বোঝায় শিশুদের উদ্দেশ্য করে,তাদের চারপাশের জগৎ, বোঝাপড়া ও কল্পনার জগৎকে কেন্দ্র করে যে চলচ্চিত্র নির্মাণ করা হয় । শিশুতোষ চলচ্চিত্র শুধুমাত্র শিশুদের অভিনীত চলচ্চিত্র নয়। শিশু অভিনেতা-অভিনেত্রী ছাড়াও শিশুদের উপযোগি চলচ্চিত্র হতে পারে। বিশ্বজয়ী বাংলা চলচ্চিত্র নির্মাতা সত্যজিৎ রায়ের গুপি-বাঘা সিরিজের চলচ্চিত্রগুলো তার স্পস্ট প্রমাণ।আবার শিশু অভিনেতা-অভিনেত্রী থাকার কারণেও শিশুতোষ চলচ্চিত্র হয় না।তার প্রমাণ সত্যজিৎ রায়ের পথের পাঁচালি চলচ্চিত্রটি। চলচ্চিত্রটির প্রধান দুই চরিত্র অপু আর দূর্গা দুজনেই শিশু। কিন্তু চলচ্চিত্রটাকে কোন অর্থেই শিশুতোষ চলচ্চিত্র বলা যায় না। শিশুতোষ চলচ্চিত্র নির্ভর করে চলচ্চিত্রটির বিষয়বস্তুর উপর। যেখানে শিশুরা অভিনেতা-অভিনেত্রী হিসেবে কাজ করতেও পারে আবার নাও করতে পারে। বাংলাদেশে শিশুতোষ চলচ্চিত্র বলে যে চলচ্চিত্রগুলো নির্মাণ করা হচ্ছে তাকে বাস্তবিক অর্থে শিশু চলচ্চিত্র বলা যায় না,সেগুলো মূলত কিশোর চলচ্চিত্র। সেই অর্থে বাংলাদেশে শিশুতোষ চলচ্চিত্র নির্মাণের সংস্কৃতি এখনও গড়ে ওঠেনি।
পাকিস্তানী পর্বে বাংলাদেশের ঢাকায় চলচ্চিত্র নির্মাণের যাত্রা শুরু হলেও ছোটদের জন্য চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রচেষ্টা তেমন একটা দেখা যায় নি। এর একটি কারণ হতে পারে চলচ্চিত্র তখন ছিল অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও অলাভজনক একটি মাধ্যম। সবশ্রেণীর দর্শকের কথা মাথায় রেখে তৈরি চলচ্চিত্রেরও লগ্নিকৃত অর্থ ফেরত আসত না। এছাড়া সামাজিক ও পারিপার্শ্বিক অবস্থাও চলচ্চিত্রের অনুকুলে ছিল না।কেবল একমাত্র ব্যতিক্রম ১৯৬৬ সালে ফজলুল হক পরিচালিত ‘সান অব পাকিস্তান’। শুরুতে চলচ্চিত্রটির নাম ‘প্রেসিডেন্ট’ থাকলেও সেন্সর জটিলতায় পরবর্তীতে সান অব পাকিস্তান নামে পরিচিত হয়। সান অব পাকিস্তান ছিল একটি অ্যাডভেঞ্চার কাহিনীর চলচ্চিত্ররূপ। যদিও এ চলচ্চিত্রটিও ব্যবসায়িকভাবে সাফল্য বয়ে আনতে পারেনি। তবে বাংলাদেশে শিশু চলচ্চিত্র নির্মাণের একটি ভিত তৈরি করে এ চলচ্চিত্রটি নিঃসন্দেহে।
স্বাধীন বাংলাদেশে সুভাষ দত্ত পরিচালিত ‘ডুমুড়ের ফুল’ কে শিশুদের উপযোগী চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রথম চেষ্টা বলা যায়। যদিও ১৯৭৮ সালে নির্মিত এ চলচ্চিত্রটি নির্মাণকালে নির্মাতা শিশুদের কথা ভেবে তৈরি করেননি। তৈরি করেছেন সামগ্রিক দর্শকের কথা মাথায় রেখেই। কিন্তু এই প্রথম কোন চলচ্চিত্র শিশু-কিশোরেরা নির্ভাবনায় হলে গিয়ে দেখে। কারণ সে-সময় আশরাফ সিদ্দিকীর ‘গলির ধারের ছেলেটি’ পাঠ্যসূচীর অন্তর্ভূক্ত থাকায় শিশু-কিশোরদের মধ্যে ছিল খুবই পরিচিত। তাছাড়া কাহিনী প্রায় সকলের জানা ছিলো বলে অভিভাবকরাও নিশ্চিন্তে ছোটদের সিনেমা হলে নিয়ে গিয়েছিলেন।
তবে স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৮০ সালে প্রথম সর্বাঙ্গীন শিশু চলচ্চিত্র হিসেবে নির্মিত হয় ‘এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী’। বাদল রহমান পরিচালিত এই চলচ্চিত্রটি সরকারী অনুদানে নির্মিত হয়েছিল। এরিখ কাস্টনারের কাহিনি নিয়ে নির্মিত এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী চলচ্চিত্রটি শুধু জনপ্রিয়ই হয়নি; সে বছর শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র, সম্পাদনা, শিশুশিল্পী, রঙিন চিত্রগ্রহণ এবং পার্শ্ব-অভিনেতা ক্যাটাগরিতে পাঁচটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করে। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের মূলধারার চলচ্চিত্রে শিশুচরিত্রের বেশ প্রাধান্য লক্ষ্য করা যায়। আজিজুর রহমানের ছুটির ঘণ্টা (১৯৮০), শেখ নজরুল ইসলামের এতিম (১৯৮০) এবং মাসুম (১৯৮১), শহীদুল আমিনের রামের সুমতি (১৯৮৫) ইত্যাদি চলচ্চিত্রের প্রধান চরিত্র বা অন্যতম প্রধান চরিত্র ছিল শিশুরা। আশির দশকে মাস্টার সুমন কিংবা মাস্টার শাকিল তারকাখ্যাতি পেয়েছিলেন, কারণ তারকা হয়ে ওঠার মতো যথেষ্ট পরিসরজুড়ে শিশু-কিশোর চরিত্রের উপস্থিতি থাকতো।
নব্বইয়ের দশক বাংলা চলচ্চিত্রের অধঃপতন দশক। এই দশক থেকে পারিবারিক-সামাজিক ঘরাণার চলচ্চিত্র নির্মানের প্রবণতা কমে যায় অসম্ভবরকমে, সহিংস-অপরিশীলিত রুচির ছবির সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়, ফলে চলচ্চিত্রগুলোতে শিশুচরিত্র থাকে না বললেই চলে, থাকলেও তার উপস্থিতি স্বল্প সময়ের জন্য এবং ব্যবহৃত সহিংসতার অনুষঙ্গ হিসেবে। এই সময়ে এগিয়ে আসেন বিকল্পধারার চলচ্চিত্র নির্মাতা মোরশেদুল ইসলাম। ১৯৯৩ সালে তার নির্মিত দীপু নাম্বার টু চলচ্চিত্রটি নির্মিত হয়েছে ছোটদের কথা মাথায় রেখেই।মুহাম্মদ জাফর ইকবালের কাহিনী অবলম্বনে নির্মিত চলচ্চিত্রটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা ও আলোচনার জন্ম দেয়। এছাড়া চলচ্চিত্রটি আরেকটি কারণে গুরুত্বপূর্ণ -এমিলের গোয়েন্দা বাহিনীর পর এই চলচ্চিত্রটিই শিশুদের সত্যিকারের মমতা ও শৈল্পিক তাড়না থেকে তৈরি করা হয়েছে। তবে দুঃখজনক বিষয় হলো দীপু নাম্বার টু এর প্রচণ্ড সফলতার পরও দীর্ঘকাল কোন নির্মাতার কাছ থেকে শিশুতোষ চলচ্চিত্র পাওয়া যায়নি।
সরকারী ভাবে শিশুতোষ চলচ্চিত্র নির্মাণের বেশ প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা যায় স্বাধীন বাংলাদেশে। ১৯৭৮ সালে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ভালো চলচ্চিত্র নির্মাণকে উৎসাহিত করতে সরকারী অনুদান প্রদানের ঘোষণা দেন। এর আওতায় প্রতিবছর ৩টি চলচ্চিত্র নির্মাণে সরকারী অনুদান প্রদানের সিদ্ধান্ত হয়, যার মধ্যে একটি অবশ্যই শিশু চলচ্চিত্র হবে বলে শর্ত আরোপ করা হয়। এরই আওতায় বাদল রহমানের এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী চলচ্চিত্রটি নির্মিত হয়েছিল। তবে এই অনুদানপ্রথা নিয়মিত থাকেনি। তবে বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শিশু চলচ্চিত্র নির্মাণের উপর বিশেষ জোড়ারোপ করেন। তিনি প্রতিবছর দুইটি করে শিশুতোষ চলচ্চিত্রে অনুদানের ঘোষণা দেন। তাঁর ঘোষণা অনুযায়ী মোরশেদুল ইসলামের আমার বন্ধু রাশেদ নির্মিত হয়।মুহাম্মদ জাফর ইকবালের কাহিনী অবলম্বনে নির্মিত এই চলচ্চিত্রটিও শিশুদের মধ্যে প্রচণ্ড সাড়া ফেলে।অনুদানে সজল খালেদ নির্মাণ করেন কাজলের দিন রাত চলচ্চিত্রটি। এটিও মুহম্মদ জাফর ইকবালের কাহিনী অবলম্বনে নির্মিত হয়।কিন্তু ছাড়পত্র পাওয়ার পরও কোন হলে এটি মুক্তি না দেওয়ায় চলচ্চিত্রটি অনেকটা লোকচক্ষুর আড়ালেই থেকে যায়।এছাড়াও আরও কিছু শিশুতোষ চলচ্চিত্র সরকারী অনুদান পাওয়ার পর কাজ শুরু করার মাঝপথেই থেমে যায় বিভিন্ন কারনে। তবে এখানে একটা বিষয় উল্লেখ করতেই হবে যে কেবলমাত্র অনুদানের মাধ্যমে নির্মিত হচ্ছে শিশুতোষ চলচ্চিত্রগুলো । এর বাইরে ব্যতিক্রম ইমপ্রেস টেলিফিল্ম এর উদ্যোগে মোরশেদুল ইসলামের দূরত্ব (২০০৪)। তারপর আর ইমপ্রেস এরও তেমন একটা উদ্যোগ দেখা যায়নি।
বাংলাদেশ শিশু একাডেমী ১৯৮০ সাল থেকে শিশুদের উপযোগি চলচ্চিত্র নির্মাণ করার চেষ্টা চালিয়ে আসছে। নির্মিত বেশিরভাগ চলচ্চিত্রের দৈর্ঘ্য ৩০ থেকে ৬০ মিনিটের । চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে খান আতাউর রহমানের ডানপিটে ছেলে (১৯৮০) , সি বি জামানের পুরস্কার (১৯৮৫), শেখ নেয়ামত আলীর রাণীখালের সাঁকো (১৯৯০) শিশুদের মধ্যে বেশ সাড়া ফেলেছিল। বাদল রহমানের ছানা ও মুক্তিযুদ্ধ (১৯৯৯) চলচ্চিত্রটিও খানিক আলোচিত হয়েছিল। শিশু একাডেমী প্রযোজিত বেশিরভাগ চলচ্চিত্রের বিষয়বস্তু মুক্তিযুদ্ধ।
শিশুদের দেশীয় সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্য বিষয়ে সচেতন করে তোলা দরকার বিভিন্ন সৃজনশীল প্রকাশের মধ্য দিয়ে। কেননা গ্লোবালাইজেশনের এই যুগে শিশু-কিশোরদের অজ্ঞ বা মুর্খ ভাবার কোনো কারণই নেই। স্বভাবতই শিশু-কিশোরেরা অ্যাডভেঞ্চার, রূপকথা বা ফ্যান্টাসিধর্মী গল্প পছন্দ করে। আর বর্তমান সময়ে শিশুদের সবচেয়ে আগ্রহের বিষয় হলো অ্যানিমেশন। আর তাই শিশু একাডেমীর নির্মিত চলচ্চিত্রগুলোর সেসব বিষয় স্পর্শ করা উচিত।২০০৮ সাল থেকে বাংলাদেশ শিশু একাডেমী ও ইউনিসেফ এর উদ্যোগে শিশু একাডেমীতে প্রতিবছর শিশুতোষ চলচ্চিত্র নির্মান কর্মশালার আয়োজন করা হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে কিছুটা অনিয়মিত হলেও প্রতিবছর ৩-৪ টি করে চলচ্চিত্র নির্মিত হচ্ছে। যার নির্মাতা কর্মশালায় অংশ নেওয়া শিশুরা। যথাযথ তত্ত্বাবধানে এ উদ্যোগ শিশু চলচ্চিত্রে বড় ধরণের পরিবর্তন নিয়ে আসতে পারে। এমনকি ভবিষ্যতে ভাল নির্মাতা গড়ে তোলার কারিগর হিসেবে কাজ করতে পারে।
বাংলাদেশ চিল্ড্রেনস ফিল্ম সোসাইটির উদ্যোগে প্রতি বছর আন্তর্জাতিক শিশু চলচ্চিত্র উৎসব আয়োজন এবং তার উদ্যোগে শিশুতোষ চলচ্চিত্র নির্মাণ বাংলাদেশের শিশু চলচ্চিত্রে একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন।এছাড়াও বাংলাদেশ চিলড্রেন টেলিভিশন ফাউন্ডেশন ইউনিসেফের সহায়তায় দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিশুদের শিশুতোষ চলচ্চিত্র নির্মাণে উৎসাহিত করে তুলছে।শিশুরা এক মিনিট ব্যাপ্তির চলচ্চিত্র নির্মাণ করছে যা তাদের ভবিষ্যতে শিশুতোষ চলচ্চিত্র নির্মাতা হবার স্বপ্ন দেখায়।
এছাড়াও আরো বেশ কয়েকজন নির্মাতা শিশুদের জন্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন। তবে তাদের নির্মিত চলচ্চিত্রগুলো বিষয়বস্তু ও নির্মাণের দিক দিয়ে এতটাই দূর্বল যে তা উল্লেখ করার মতো না।বর্তমানে বাংলা চলচ্চিত্রে পরিবর্তনের হাওয়া এসে লেগেছে। এই ছোয়া এসে লাগুক শিশুতোষ চলচ্চিত্রেও। তৈরি হোক ভাল মানের শিশুতোষ চলচ্চিত্র। শিশুতোষ চলচ্চিত্রকে কেবল বাণিজ্যিক অনুসঙ্গ হিসেবে না দেখে শিল্পের তাগিদ হিসেবে বিবেচনা করা হোক। আমাদের দেশের নতুন প্রজন্মের কাছে চলচ্চিত্র হয়ে উঠুক সুস্থ বিনোদন ও জীবন গঠনের হাতিয়ার।

 

তথ্যসূত্রঃ পার্থিব রাশেদ, সংস্কৃতি ডট কম

এই পোস্টটিতে ২ টি মন্তব্য করা হয়েছে

  1. চমৎকার একটা লেখা লিখেছেন। দরকারী এবং ব্যতিক্রমী। চলচ্চিত্রের এই দিকগুলো নিয়ে কেও খুব একটা আলোচনা করে না। আশা করি আপনি এই দিকগুলো নিয়ে আরো লিখবেন।

মন্তব্য করুনঃ

You must be Logged in to post comment.

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন