শুভ জন্মদিন লিও, লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিও !
Share on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on TwitterPin on Pinterest0
এই যুগের হলিউড দাপিয়ে বেড়ানো প্রভাবশালী অভিনেতাদের তালিকাটি নেহায়েত ছোট নয়। এক্টিং স্কিল, ফ্যান ফলোয়িং কিংবা ক্রিটিকদের মাপকাঠিতে একজনকে ফেলে আরেকজনকে বাছাই করার প্রক্রিয়াটি বেশ কষ্টসাধ্য বলাই চলে। তার উপর ডিস্টিঙ্কটিভ এওয়ার্ড জেতার তালিকাটিও থাকে নির্ণায়কের ভূমিকায়। তবে ব্যাক্তিগত পছন্দের ক্ষেত্রে এই সকল স্ট্যান্ডারাডকে খানিকটাই মূল্যায়ন করা হয় বলে ধারণা করা যায়। এক্ষেত্রে যুক্তি কিংবা যোগ্যতার চাইতে স্পেসিফিক এক্টর এক্ট্রেসের প্রতি ”আবেগ” বা ”ভালবাসা” ই প্রধান ভুমিকা পালন করে।

 

আর তামাম দুনিয়ার এমন সব ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভালবাসায় সিক্ত হয়ে একজন এক্টর কিংবা এক্ট্রেস ”ওয়ার্ল্ড সেনশসন” বা ”সুপারস্টার” এর তকমা পান। আর এমনই একজন এক্টর আমাদের ”লিওনারদো ডিক্যাপ্রিও”। চলচ্চিত্র প্রেমি, কলাকুশলী, আলোচক-সমালোচক থেকে শুরু করে সাধারন দর্শকের ভালবাসায় সিক্ত হয়ে এই ভার্চুয়াল তথা সারা দুনিয়ার অন্যতম সেনশন বনে আছেন তিনি। অবশ্য এর পিছনে তার পরিশ্রম, সময় এবং প্রতিভা সকলকিছুই প্রভাব ফেলে আছে।

প্রতিভাবান এই অভিনেতার জন্মই যেন হলিউডকে আগ থেকে কিছু জানান দিয়ে আসছিল, তিনি নভেম্বরের ১১ তারিখে ক্যালিফোরনিয়ার খোদ ”হলিউড” এই জন্ম গ্রহন করেন। লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্ছির নামানুসারে তার নামকরন করা হয় ”লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিও”। ”বর্ণ ইন হলিউড” এই অভিনেতা যেন ”বর্ণ টু বি এক্টর” এর জন্যেই বেড়ে উঠেছেন। মাদক, প্রস্টিটুশনে ভরা রুগ্ন সমাজে থেকেও মাত্র ১৬ বছর বয়সেই অভিনেতার যোগ্যতা অর্জন করেন। এতটুকুন বয়েসেই মুক্তি পায় তার ডেব্যু ফিল্ম Critters 3।

 

ডেব্যু ফিল্মের পর আলোচনায় আসতে খুব একটা সময় নিতে হয়নি এই অভিনেতাকে। ৯৩ এর জনি ডেপ অভিনীত ড্রামা ফিল্ম What’s Eating Gilbert Grape এ একজন বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী বালকের চরিত্রে অভিনয়ের জন্যে উপযুক্ত অভিনেতা খুঁজছিলেন পরিচালক। অবসেটির দরুন কার্যত অকেজো মা এবং মানসিক বিকারগ্রস্থ ছোট ভাইকে ঘিরে উঠা জনি ডেপের দিনগুলো নিয়ে আবর্তিত হতে থাকা এই সিনেমাটির জন্যে অটিস্টিক রোলে কম সুদর্শন ছেলেকেই প্রাধান্য দেওয়ার মনস্থির করেন পরিচালক। কিন্তু অডিশনে ডিক্যাপ্রিওর পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা সেই পরিচালকের সুদৃষ্টি এড়াতে ব্যর্থ হয়। প্রতিভার জোরেই জনি ডেপের আদুরে ছোট ভাইয়ের চরিত্রে অভিনয় করার সুযোগ পেয়ে যায় লিটল ডিক্যাপ্রিও। প্রস্তুতি স্বরূপ মেন্টালি ডিজেবলড ছেলেদের সাথে থেকে তাদেরকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ শুরু করে দেন ডিক্যাপ্রিও। ক্যারিয়ারের শুরুতেই এমন পেশাধারী প্রস্তুতির উত্তম ফলাফলটিও পান তিনি। সিনেমাটিতে অসাধারন অভিনয়ের জন্যে রাতারাতি আলোচনায় চলে আসেন, মিলে যায় জীবনের প্রথম একাডেমিক এওয়ার্ডের মনোনয়নও।

 

শেক্সপ্যিওরের রোমান্টিক ট্র্যাজেডি ”রোমিও এন্ড জুলিয়েট” থেকে এডাপ্টেড এবং স্বনামে নির্মিত সিনেমা Romeo+Juliet’র পর ডিক্যাপ্রিওর সবচেয়ে আলোচিত সিনেমা ”টাইটানিক”। বলার অপেক্ষা রাখেনা সিনেমাটি এখনো পর্যন্ত তার ক্যারিয়ারে তুমুল জনপ্রিয় সিনেমা হয়ে আছে। এই সিনেমার মধ্যে দিয়েই ৯০ এর বেশিরভাগ টিন এজারদের হলিউড পরিচিতি ঘটে। আইকনিক জ্যাক এবং রোজ চরিত্র দুটি সেরা প্রেমের জুটি হিসেবে সবার মনে গেঁথে যায়। জ্যামেস ক্যামুরন পরিচালিত ও প্রযোজিত এই সিনেমাটি তৎকালীন সময়ের সবচেয়ে ব্যায়বহুল সিনেমা। ডিজাস্টার এপিক রোমান্টিক ঘরনার এই সিনেমাটি বক্সফিসে এখনও ২য় অবস্থান ধরে রেখেছে। কেট উইন্সলেটকে সাথে নিয়ে তিনি Revolutionary Road নামে আরো একটি রোমান্টিক ঘরনার ফিল্মে অভিনয় করেন। ব্যাক্তিগত জীবনে দীর্ঘসময়ের এই বান্ধবী এবং তিনি একইসাথে তিন বার অস্কার নমিনেটেড হন।

 

দ্যা লাস্ট সামুরাই খ্যাত ডিরেক্টর Edward Zwick এর সাথে যুটি বেঁধে ডিক্যাপ্রিও অভিনয় করেন Blood Diamond সিনেমায়। সিনেমাটিতে তাকে একজন ডায়মন্ড চোরাচালানির চরিত্রে পাওয়া যায়। সমাজের প্রথমশ্রেণির নিকট অতিমুল্যবান এই পাথরের উৎপাদনে মিষে থাকা রক্ত, শোষণ, পাশবিকতার তাৎপর্যপূর্ণ চিত্রায়ন ফুটে উঠে সিনেমাটিতে। হীরাকে ঘিরে পশ্চিমা রাষ্ট্রের যুদ্ধনীতি, ভায়োলেন্স এবং শিশুদের সাথে অমানবিক আচরনের বিপরীতে পরিবারের প্রতি, সন্তানের প্রতি একজন বাবার আবেগ ভালবাসার মত মানবিক সংস্পর্শগুলোর সুন্দর উপ্সাথাপনও রয়েছে। সিনেমাটিতে অসাধারণ অভিনয়ের জন্যে ডিক্যাপ্রিও এবং ডিজিমন হন্সু দু জনেই অস্কারে মনোনীত হন।

 

লিওর বর্নাঢ্য অভিনয় জীবন পরিপূর্ণ হয়ে আছে বরেন্য সকল এক্টর ডিরেক্টরের সাথে অভিনয়ের মধ্যে দিয়ে। তার ফিল্মগ্রফাইতে সর্বাধিক সংখ্যকবার যুক্ত হওয়া ডিরেক্টর হিসেবে আছেন মারটিন স্করসেজি। লিওর ব্যাক্তিগতভাবে প্রিয় এই পরিচালকের সাথে প্রথম যুক্ত হন Gangs of New York এর মধ্যে দিয়ে। মারটিন স্করসেজির সাথে করা তার আরেকটি গ্যাংস্টার সিনেমা Departed. ইনফারনাল এফেয়ারস থেকে অনুপ্রাণিত এই স্পাই-র‍্যাট ঘরনার সিনেমাতে আরো অভিনয় করেন ম্যাট ডেমন, জ্যাক নিকোলসন এবং গালিবাজ সার্জেন্টের চরিত্রে মার্ক ওহাল্বারগ। (উল্ল্যেখ Stanley Kubrick পরিচালিত Shinning তার সেরা দশটির মধ্যে অন্যতম সিনেমা। ডিপারটেডের সহঅভিনেতা এই জ্যাক নিকোলসনও ডিক্যাপ্রিওর সেরা অভিনেতাদের মধ্যে একজন।এবং মার্ক ওহাল্বারগ তার ব্যাক্তিগত জীবনে ঘনিষ্ঠ বন্ধু ) লিওকে এমন এজেন্টের চরিত্রে আরেকবার পাওয়া যাই টনি স্কট সহদর রিডলি স্কটের পরিচালনায় Body of Lies সিনেমাতে। জনপ্রিয় ইরানিয়ান চলচ্চিত্র A Separation এর পরিচালক Asgar Farhadi এর About Elly’র অভিনেত্রি ‘’গলশিপ্তেহ ফারহানি’’ একজন নার্সের ভুমিকায় অভিনয় করেন।

 

মারটিন স্করসেজির সাথে যুক্ত হয়ে নির্মিত তার অন্য সিনেমাগুলো Aviator. Shutter Island, এবং Wolf of wall street উল্লেখযোগ্য। যাদের মধ্যে Cate Blanchett অভিনীত এভিয়েটর সিনেমায় তাকে ট্রমাগ্রস্ত পরিচালকের ভূমিকায় দেখা যায়। সিনেমাটিতে তাকে তার পরিচালিত সিনেমাকে আরো বাস্তবিক করার জন্যে প্রচুর এয়ারক্রাফটের যোগানে একপ্রকার বিকারগ্রস্ত হয়ে ব্যাক্তিগত জীবন এবং আইনি জামেলায় জড়িয়ে পড়তে দেখা যায়। এমন মানসিক অসঙ্গতি নিয়ে নির্মিত তার আরেকটি সিনেমা Shutter Island. যেটিতে তাকে বিচ্ছিন্ন দ্বীপে স্থাপিত একটি মানসিক হাসপাতালের অনিয়ম নিয়ে তদন্দকারীর চরিত্রে দেখা যায়। কিন্তু সিনেমার শেষে তার আরেক পরিচয়ের নিয়ে সৃষ্টি হয় একপ্রকারের ভ্রম। উল্ল্যেখ্য ঃ সিনেমার শেষে তার সহকর্মী মার্ক রাফেলোর উদ্দেশ্য করা তার উক্তিটি সিনেমাপ্রেমিদের কাছে বেশ অর্থপূর্ণ হয়ে আছে। (হুইচ উড বি ওরস ? টু লিভ এজ এ মন্সটার অর টু ডাই এজ এ গুডম্যান)। মারটিন স্করসেজির ব্ল্যাক কমেডি ঘরনার সিনেমা The Wolf of Wall Street এ তাকে একজন বাকপটু শেয়ারব্রোকারের চরিত্রে দেখা যায়। সত্য ঘটনা অবলম্বনে নির্মিত এই ফিল্মে রাতারাতি সফল বনে যাওয়ার পাশাপাশি তার উদ্যাম জীবন, মাদক, যৌনতার এবং পরিণয়ের দিকে আলোকপাত করা হয়।

বিগ বি'র সাথে লিও

(সহ অভিনেতা বিগ বি’র সাথে লিও)

শুধু মারটিন স্করসেজির মত সেরা পরিচালকের সাথেই নয়, ডিক্যাপ্রিওকে পরিচালনার তালিকায় যুক্ত আছেন স্টিভেন স্পিল্বারগের মত পরিচালকের নামও। স্পিল্বারগ পরিচালিত বায়োগ্রাফিকাল ঘরনার ”Catch Me If You Can” সিনেমায় তাকে একজন ধূর্ত চেক জালকারী চরিত্রে দেখা যায়। সিনেমাটিতে লিওকে গ্রেফতারের নিষ্ফল চেষ্টারত এফবিআইয়ের এজেন্ট হিসেবে টম হ্যাঙ্কসও অভিনয় করেন। ওয়েস্টার্ন, ক্রাইম ভায়োলেন্স শিল্পের পিকাসো Quentin Tarantino পরিচালিত Django Unchained সিনেমাটির খানিকাংশে কৃষ্ণাঙ্গদের একজন পাশবিক মনিবের ভূমিকায় অভিনয় করেন তিনি। উল্ল্যেখ্য কুয়েন্টিন টারান্টিনর পরিচালিত Inglorious Bastard সিনেমাটিতে Christoph Witz এর চরিত্রটিতে লিওকে কাস্ট করার প্রাথমিক পরিকল্পনা ছিল। ‘’ওয়েস্টার্ন’’ শন্দটির সাথে অঘোষিত ভাবে চলে আসা সব্যসাচী পরিচালক অভিনেতা Clint Eastwood এর সাথে যুক্ত হয়য়ে লিও অভিনয় করেন J. Edgar সিনেমাটতেও।

 

 

সমসাময়িক প্রতিভাবান পরিচালক Christopher Nolan বহু অপেক্ষার পর তার সাইফাই ঘরনার ফিল্ম Inception এ লিওকে কাস্ট করার সুযোগ পান। সিনেমায় তাকে স্বপ্নের বিভিন্ন পর্যায়ের ভেতর দিয়ে তথ্য উদ্ঘাটনকারীর ভুমিকায় দেখা যায়। শাটার আইল্যান্ড এর মত এই সিনেমার শেষ দৃশ্যটিতেও লিও তার দর্শকদের খানিকটা বিভ্রমে রেখে যান। দ্যা গ্রেট গ্যাটসবি উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত চলচ্চিত্রে তাকে রহস্যময়ী ব্যবসায়ীর চরিত্রে দেখা যায়। প্রিয়তমার আগমনের সম্ভাবনায় তার জমকালো এক পার্টিতে একটি বিশেষ চরিত্রে ‘’অমিতাভ বচ্চন’’ও অভিনয় করেন। Death Triology খ্যাত পরিচালক আলেহান্দ্রো ইনারিতুর The Revenant সিনেমায় দ্বিতীয়বার টম হারডির সাথে অভিনয় করেন লিও। বায়োগ্রাফি ঘরনার এই সিনেমাটিতে বৈরি পরিবেশের বিপরীতে ডিক্যাপ্রিও প্রতিশোধ পরায়ণতা, পিত্রস্নেহ, এবং টিকে থাকার লড়াইয়ে অসাধারণ অভিনয় করেন। যার জন্যে দর্শক সমালোচকের পাশাপাশি বহুবার হাত গলে ভেস্তে যাওয়া সেই দীর্ঘ প্রতীক্ষিত অস্কারে সেরা অভিনেতার পুরস্কাটিও পান। এর আগে তিনি পাঁচ পাঁচবার অস্কার নমিনেশন পান। এর মধ্যে Wolf of Wall Street এ প্রযোজক হিসেবে মনোনীত হন। প্রসঙ্গত, লিও বেশ কয়টি দারুন সিনেমার প্রযোজনাও করেন যার মধ্যে টুইস্টেড সাইকোলজিক থ্রিলার ঘরনার অরফান এবং আউট অব দ্যা ফারনেস উল্লেখযোগ্য।

 

 

দর্শক-সমালোচক নন্দিত দারুন সব সিনেমাতে অভিনয় এবং প্রযোজনার পাশাপাশি লিও নিজকে একজন একনিষ্ঠ পরিবেশবাদী হিসেবে ব্যস্ত রেখেছেন। শুরু থেকেই বিভিন্ন অঙ্গসঙ্গঠনের সাথে নিজকে যুক্ত রেখে কাজ করে চলছেন এই পৃথিবীকে আরেকটু বসবাসযোগ্য করে তুলতে। পরিবেশ নিয়ে তার স্বেচ্ছাসেবকমুলক কাজের পাশাপাশি তিনি অবদান রেখে চলছেন অরফানেজ সহ আরো সামাজিক কর্মকাণ্ডে। ইন্টারনেট তথা গ্লোবালি পপুলার এমন গোল্ডেন হারটেড অভিনেতার জন্মদিনে বিশেষ শুভেচ্ছা। শুভ জন্মদিন লিও ! শুভ জন্মদিন লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিও !

 

 

(এ বছরের শুরুর দিকে পারসিয়ান কবি ‘’রুমি’’র চরিত্রে ডিক্যাপ্রিওকে নিয়ে একটি গুজব চাউরে উঠে, যদিও পরে সেটি স্রেফ গুজব বলেই প্রমান পায়। এইছাড়া এখনো তার আপকামিং সিনেমার কোন অফিশিয়াল ঘোষণা আসেনি। আশা রাখি বরাবরের মতই দারুন কোন সিনেমা নিয়ে হাজির হবেন তিনি।)


মন্তব্য করুনঃ

You must be Logged in to post comment.

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন