Laskar Pelangi (2008)—আশা তার একমাত্র ভেলা!
Share on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on TwitterPin on Pinterest0
শিশুতোষ চলচ্চিত্রগুলোর একটা সাধারণ ছক হলো দর্শকের ছেলেবেলার স্মৃতিকে আন্দোলিত করা, এক্সপ্লয়েট করা জীবনের ঐ ম্যাজিকাল মোমেন্টগুলোকে। ক্রমশ স্মৃতিকাতর করে তোলা—তা সে সামগ্রিক গল্পের মাধ্যমে হোক বা পরিচিত কোন চরিত্রের ভিজ্যুয়ালাইজেশনেই হোক। আর অভিজ্ঞ দর্শকরা এই ব্যাপারে যথেষ্ট সচেতন থাকেন বৈকি, তাই ন্যারেটিভে সাটল্‌টি না থাকলে হিতে বিপরীত হয়ে যাওয়াটা খুবই স্বাভাবিক। লস্কার পেলাঙ্গি সিনেমার উল্লেখযোগ্য দিক হলো এর সহজ সাবলীলভাবে দর্শকের সাথে কানেক্ট করবার দুর্দান্ত মাধ্যম। মানবিক উপাদান—এক অব্যর্থ কৌশল, যার মাধ্যমে সিনেমাটি অতি পরিচিত আবহে দর্শকের সাথে সম্পর্ক এস্টাব্লিশ করে। কৈশোরের যে সরলতা, অনুভূতি, অ্যাডভেঞ্চারাস মনটা এই আপনাকে আপনি বানিয়েছে তার সাথে স্পষ্টভাবে কোন ভণিতা ছাড়া কথা বলে।
‍‍‍‍‍‍
মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়। তেমনই বড় মাপের মানুষ হবার স্বপ্ন দেখে আলোচ্য সিনেমার ছেলেমেয়েরা। সুবিধাবঞ্চিত, হতদরিদ্র এই ছেলেমেয়েদেরকে নিয়েই সম্ভবত গিরিষচন্দ্র ঘোষ লিখেছেন ‘সংসার সাগরে দুঃখ তরঙ্গের মেলা, আশা তার একমাত্র ভেলা।’ ইন্দোনেশিয়ার সবচেয়ে সমৃদ্ধ দ্বীপে বাস করেও নূন্যতম প্রাথমিক শিক্ষাটাও যে এদের কাছে আকাশ–কুসুম স্বপ্নেরই মতো। জন্মই তাদের আজন্ম পাপ। যেন প্রোডাক্ট ট্যাগের মতো সিল–ছাপ্পড় দেওয়া আছে শরীরে—কুলির ঘরের ছেলে কুলি হবি, লেখাপড়াটা আবার কী বস্তু!
‍‍‍‍‍‍
বলছি ৭০–এর দশকের ইন্দোনেশিয়ার কথা। খনিজ সম্পদে ভরপুর বেলিতঙ দ্বীপ ‘টিনের’ জন্য ব্যাপকভাবে প্রসিদ্ধ। ঔপনিবেশের দাসত্ব থেকে মুক্তি পাওয়া স্বাধীন দেশ হয়েও সাধারণ মানুষ ‘সাধারণ’ জীবনযাত্রাও ভোগ করতে পারছেনা আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও ক্ষমতালোভী ১ম শ্রেণীর নাগরিকদের কল্যাণে! খুবই পরিচিত চিত্র মনে হচ্ছে কি? এ নিতান্তই কোইন্সিডেন্স! এরকম পরিস্থিতিতেই দুইজন সাহসী শিক্ষক স্বপ্ন দেখেন উজ্জ্বল সম্ভাবনার। ছেলেমেয়েদের কম খরচে শিক্ষা দেবার ব্যাপারে তারা পর্বতের ন্যায় অটল। অন্তত ১০ জন শিক্ষার্থী লাগবে স্কুল হিসেবে স্বীকৃতি পাবার জন্য। প্রথম দিনের সেই ১০ নম্বর শিক্ষার্থীর দৈব আগমনের মধ্য দিয়ে নোঙ্গর তোলে আশা নামক ভেলাটি।
 ‍‍‍
সিনেমাটি বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত একই নামের বিখ্যাত উপন্যাস অবলম্বনে নির্মাণ করা হয়েছে। লেখকের আত্মজীবনীমূলক এই গল্পে সামিল হয়ে যাওয়াটা সিমপ্লি কয়েক মুহূর্তের ব্যাপার। একদম শুরুতেই ওপেনিং ফ্রেমে ইন্দোনেশিয়ান ফোক ইন্সট্রুমেন্টের মাধ্যমে যে নৈসর্গিক সুরের সূচনা হয় তার রেশ পুরো সিনেমা জুড়েই থাকে। মিউজিক যেন এক অবিচ্ছেদ্য দিক সিনেমাটির। সাথে আছে মন ভোলানো প্রকৃতির রূপ।
‍‍‍‍‍‍
সবথেকে শক্তিশালী দিক হলো একেবারেই নন-প্রফেশনাল কিন্তু এই দ্বীপেই বেড়ে ওঠা কিশোর–কিশোরীর বাস্তবধর্মী পারফর্ম্যান্স। সংলাপ–অভিব্যক্তি দেখে মনেই হবেনা সিনেমা এটা, বরং অতি পরিচিত আশেপাশেরই কেউ যেন। সুনির্দিষ্ট এই কারণেই এখানে জন্মানো এবং বেড়ে ওঠা শিশুদের অভিনয়ে নেওয়া হয়েছে, ওয়াইজ প্রোডাকশন ডিসিশন। এদেরকে সযত্নে পূর্ণতা দিয়েছেন পেশাদার অভিনেতারা।
‍‍‍‍‍‍
শ্রেণী সংগ্রামের বক্তব্যগুলো কোনোভাবেই আরোপিত নয়। উৎফুল্ল শিশুদের মূল্যবোধের শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে—একটু খেয়াল করলেই দেখা যায় বয়সী দর্শকদের জন্য পরতে পরতে গল্প। একটা সাব–প্লটের খানিকটা শেয়ার না করে পারছিনা—ফলাও করে আপাতদৃষ্টিতে যে হাস্যকর পরিস্থিতে “To be smart and successful, study and work hard!” এই দৃশ্যের অবতারণা হয় তা ঐ শিশু–গণ্ডীতেই আটকে থাকেনা।
‍‍‍‍‍‍
সিনেমাটির বাজে দিক হচ্ছে এর ড্রিম সিক্যুয়েন্সগুলো। পুরো সিনেমা জুড়েই সাধারণ নিয়মমাফিক, সাজসজ্জাহীনভাবে দৃশ্যধারণ করা হয়েছে—তা নিয়ে কোন আপত্তি নেই। কোথাও কোন আই ক্যান্ডি শট নেই—এতেও কোন সমস্যা নেই। শুধু এই সিক্যুয়েন্সগুলোর ব্যতিক্রমী—নট ইন এ গুড ওয়ে—শটগুলো প্যাথেটিক। পুরো সিনেমার ভারসাম্যকে খানিকটা টালমাটাল করে দেয় এগুলা!
‍‍‍‍‍‍
সিনেমাটি রিলিজের কিছুদিনের মধ্যেই বেলিতঙে পর্যটন ব্যুম লাগে। জাকার্তা থেকে সবগুলা ফ্লাইটেই এক সপ্তাহের মধ্যে বুকিং শেষ হয়ে যায়! অভাবনীয়। মজার ব্যাপার হচ্ছে দ্বীপটির লোকেশনগুলো প্রায় সব আগের মতই আছে। তাই ভ্রমনপিপাসু কেউ যদি এখনো সেখানে যায় হয়তো লিংতাঙের সেই স্কুলটা চোখে পড়বে। বা স্কুলের পথের ঐ কুমিরের ট্রেইলটা হয়তো একইভাবে উদ্বেলিত করবে! কে জানে!
‍‍‍‍‍‍
৪/৫

মন্তব্য করুনঃ

You must be Logged in to post comment.

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন