ট্রেইলারের ইতিকথা !
Share on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on TwitterPin on Pinterest0

মুভি ট্রেইলার – মুভি দেখাদেখি অভিজ্ঞতার একটি অন্যতম অংশ । আসুন জেনে নেওয়া যাক ‘ট্রেইলার’ এর বিবর্তন – নির্বাক যুগের জোড়া লাগানো ছবি দিয়ে যার শুরু, হলিউডের স্বর্ণালী যুগের টেমপ্লেট রীতির মধ্য দিয়ে, ৬০’র আদর্শ অধিপতিদের নতুন রূপ এবং সবশেষে ব্লকবাস্টার যুগে এর বিচরণ ।  

i165077_trailer

প্রারম্ভে

মুভি ট্রেইলারের বিবর্তন জানতে শুরুতেই কীভাবে-আমরা-মুভি-দেখি তার ক্রমবিকাশ জানা জরুরী । এখনকার মত মাল্টিপ্লেক্স সে সময় ছিলনা, ১৯১০ এর প্রথম সেই থিয়েটারে শুধুমাত্র একটি স্ক্রিন ছিল !

1

একজন পাঁচ পয়সা দিয়ে টিকেট কিনে যতক্ষণ ইচ্ছে ততক্ষণ থিয়েটারে বসে থাকতে পারতো । নির্দিষ্ট কোন শো টাইম ছিল না – একটা পূর্ণ দৈর্ঘ্য ছবির সাথে স্বল্প দৈর্ঘ্যের ছবি, কার্টুন ধারাবাহিকভাবে চলতে থাকতো, যতবার ইচ্ছে ততবার সেগুলো দেখা যেত ।

অধিকাংশ ঐতিহাসিকের মতে ১৯১৩ হল ট্রেইলারের জন্ম সাল ।

2

                                                   নিলস্‌ গ্রানলান্ড্‌

নিউ ইয়র্ক সিটির মার্কাস লাউ থিয়েটারের বিজ্ঞাপন বিভাগের ম্যানেজার নিলস্‌ গ্রানলান্ড্‌ ‘প্লেজার সিকারস’ নামক একটি নাটিকার প্রচারণামূলক চলচ্চিত্র তৈরী করেন । এখানে রিহার্সালের ফুটেজ ব্যবহার করা হয়েছিল । সিনেমা চলাকালীন সময়ে বিজ্ঞাপন দেখানোর আইডিয়াটা ব্যাপক সাড়া ফেলে – অন্তত মুভি থিয়েটারের মালিকদের কাছে । প্রচারণামূলক এ বিজ্ঞাপন চর্চা খুব দ্রুত লাউ থিয়েটার তথা অন্যান্যরা পুরোদমে শুরু করে ।

3

                  কর্নেল উইলিয়াম সেলিগ ।

প্রায় একই সময়ে শিকাগোতে চলচ্চিত্রের গোড়ার দিকের পথিকৃত কর্ণেল উইলিয়াম সেলিগ দর্শকদের থিয়েটারে আনতে অন্য আরেকটি পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন । সেলিগ পত্রিকাতে ছাপানো সিরিয়ালের জনপ্রিয়তা লক্ষ্য করেন । তাই তিনি শিকাগো ট্রিবিউন নামের একটি পত্রিকাতে চলচ্চিত্রের মুদ্রণ সংস্করণ হিসেবে ১৩ পর্বের ‘দ্য অ্যাডভেন্সারস অফ ক্যাথিলিন’ নামক সিরিয়াল বানিয়ে ফেলেন ।

4

                                          দ্য অ্যাডভেন্সারস অফ ক্যাথিলিন

সত্যিকারে এটাই যে প্রথম সিরিয়াল ছিল তা নয়, বরং এটা দ্বিতীয় । কিন্তু এটা চলচ্চিত্র মার্কেটিং-এর একটা নতুন অধ্যায় খুলে দিয়েছিল ।

সুতরাং এভাবেই মূলত ট্রেইলারের ধারনার জন্ম হয় – এ পরিভাষার উৎপত্তিও তখনই । আসন্ন আকর্ষণের একটা সংক্ষিপ্ত সংস্করণ ছবির শেষে দেখানো হতো – এটাই মূলত ট্রেইলার ।

অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই প্রচারণাগুলো থিয়েটারের নিজের খরচে তৈরী হতো । কিন্তু ১৯১৬ সালের দিকে চলচ্চিত্র স্টুডিয়োগুলো নিজেরাই অফিসিয়ালি ট্রেইলার নির্মাণ করা শুরু করে । প্রথমদিকের এই ট্রেইলারগুলো একেবারেই সাদামাটা ছিল । মূলত কিছু স্থিরচিত্র নিয়ে তাতে কিছু লেখা যেমন তারকাদের নামের আচ্ছাদন দিয়ে বানানো হতো এগুলো ।

কিছু হারিয়ে যাওয়া নির্বাক যুগের ট্রেইলার –

 

প্রথম সবাক চলচ্চিত্রের ট্রেইলারঃ দ্য জ্যাজ সিংগার

ট্রেইলার বানানো এবং ভাড়া ব্যবসায় খুবই সামান্য টাকা আসতো সে সময় – নিদেনপক্ষে স্টুডিয়োর জন্য । কতিপয় চতুর ব্যবসায়ী অবশ্য এ ব্যবসাতেই পয়সা কামানোর রাস্তা বের করে ফেললো । তৈরী হয়ে গেল এক প্রতিষ্ঠান যা প্রায় চার যুগ ধরে ট্রেইলার নির্মাণ ব্যবসাতে একচেটিয়ে আধিপত্য বিস্তার করে ফেলে !

 

ন্যাশনাল স্ক্রিন সার্ভিস (এনএসএস) এর আধিপত্য

হলিউডের ক্ষমতা সম্পর্কে ভাবতে গেলে আমরা সাধারণত বৃহৎ নিরাপদ মঞ্চ কিংবা স্টুডিয়োর কথায় প্রথমে ভাবি । কিন্তু প্রকৃতপক্ষে, হলিউডের ক্ষমতা নিহিত এর পরিবেশনা শক্তির উপরে । বিশ্বের যেকোন প্রান্তে টাকা থাকলেই যে কেউ স্টুডিয়ো খুলে বসতে পারে কিন্তু পরিবেশনার জন্য হলিউডের সমকক্ষ আর কেউ নেই । ইন্টারনেট বিহীন সে যুগে যখন এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ফোন করাটাও খুব একটা সহজতর ছিলনা তখন চলচ্চিত্র পরিবেশনা এবং ট্রেইলার, পোস্টারের প্রচার একটা ভয়ানক দুঃস্বপ্নের নাম ছিল ! ঠিক তখনই ন্যাশনাল স্ক্রিন সার্ভিস তথা এনএসএস এর আবির্ভাব হয় ।

হারমান রবিনস্‌ ১৯১৯ সালের দিকে নিউ ইয়র্ক সিটিতে এ প্রতিষ্ঠান উদ্ভাবন করেন । তাদের কাজ ছিল চলচ্চিত্রের স্থিরছবি, জোড়া লাগানো পোস্টার, ট্রেইলার ইত্যকার যাবতীয় কাজ পরিচালনা ও পর্যালোচনা, ধারণ করা । শুরুর দিকে তারা স্টুডিয়োগুলোর কোন অনুমতিরই তোয়াক্কা করতোনা । অবশ্য স্টুডিয়োগুলো প্রায়শই খুশী হতো এরকম ব্যবস্থাতে । ১৯৪০ সালের দিক থেকে এনএসএস তাদের শাখা খুলে ফেলে এবং হলিউডের বিভিন্ন স্টুডিয়োর সাথে ব্যবসায়িক লেনদেনের চুক্তি স্থাপন করে ফেলে !

এভাবে প্রতিষ্ঠানটি মোটা অংকের টাকা কামানো শুরু করে । তাদের কাজ ছিল প্রতি সপ্তাহে পোস্টার, ট্রেইলার প্রচার ও পরিবেশন করা, যার মাধ্যমে তারা অতি সামান্যই স্বত্ব ফেরত পেতো । কিন্তু ব্যবসাটি একচেটিয়া হবার দরুণ মুনাফার পরিমাণটা জ্যামিতিক হারে বাড়তে থাকতো । অবশ্য কতিপয় স্টুডিয়ো যেমন ওয়ার্নার ব্রস বা কলোম্বিয়া পিকচারস মাঝেমধ্যে নিজেরাই এ কাজ করবার পরীক্ষণ যে চালাতো না তা ঠিক নয় কিন্তু বাকী সবক্ষেত্রেই এনএসএস-এর আধিপত্য ছিল সর্বদা । ১৯২০ থেকে ৬০’র দশক পর্যন্ত এমন রাজত্ব করে প্রতিষ্ঠানটি ।

এনএসএস কর্তৃক তৈরী করা কিছু উল্লেখযোগ্য ট্রেইলার –

 

 

মায়েস্ত্রোদের ট্রেইলারকে নবরূপ প্রদান

৬০’র দশকের সময় থেকে তারকা পরিচালকদের নতুন প্রজন্মের শুরু যারা ট্রেইলারকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করা শুরু করেন । তন্মধ্যে অ্যালফ্রেড হিচকক ছিলেন অন্যতম । তার সাইকো সিনেমার ট্রেইলারটি দেখলে কিছুটা ধারণা পাওয়া যায় –

স্ট্যানলি কুবরিকও এক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন । তার অভিনব চিন্তাধারার ছোঁয়া ট্রেইলার নির্মাণেও দেখা যায় –

 

আবহ সঙ্গীতে জোর দেওয়া হয় – দ্য গ্র্যাজুয়েট সিনেমার ট্রেইলার যার প্রমাণ –

 

ট্রেইলার ব্যবসার জোয়ার তখন ভিন্ন খাতে বওয়া শুরু করে । ৮০’র দশক থেকে এনএসএস এর আধিপত্য ছিন্ন হয় কেননা ৭০’র দিক থেকে মাল্টিপ্লেক্স আসা শুরু হয় যেখানে স্টুডিয়োগুলো নব উদ্যমে ট্রেইলারের অধিকার কেড়ে নেওয়া শুরু করে ।

 

ব্লকবাস্টার যুগ

১৯৭০ এর সময় থেকে পরিবেশনা পদ্ধতিতে আমূল পরিবর্তন আসে – যার প্রমাণ ১৯৭৫ এ মুক্তি পাওয়া জ্যস –

জ্যস চলচ্চিত্র দিয়েই মূলত বিশ্বব্যাপী চলচ্চিত্র মুক্তির সূচনা । এই বিশ্বব্যাপী মুক্তির কৌশলটার কেন্দ্রে ছিল ট্রেইলার পুনঃনির্মান এবং সেখান থেকেই ব্লকবাস্টার কৌশলের প্রারম্ভ । স্পষ্ট বিশাল দর্শন ভিজুয়ালস বড় বড় সিনেমার জন্য – আদতেই এক নতুন যুগের সূচনা নির্দেশ করে । সেসব ট্রেইলারে ন্যারেটরের আবির্ভাব নতুন কৌশলকেই ইঙ্গিত করে । সেসমস্ত ব্লকবাস্টারে সবচেয়ে খ্যাতিসম্পন্ন ছিলেন ডন লাঁফন্টেইন – যাকে ‘ঈশ্বরের স্বর’ বলেও আখ্যায়িত করা হয়েছিল । প্রায় ৫০০০ ট্রেইলার, হাজার হাজার টিভি বিজ্ঞাপন এ খ্যাতি এনে দিতে যথেষ্ট ছিল ।

 

বর্তমানের যে ট্রেইলার সংস্করণ আমরা দেখছি তার পিছনে আছে এমটিভি কাটিং রীতি । দ্রুত সম্পাদনা, দৃশ্যের মধ্যে কাট ইত্যাদি ট্রেইলারকে বর্তমান আকার দেয় ।

১৯৮০ থেকে ২০০০ পর্যন্ত কিছু উল্লেখযোগ্য ট্রেইলার –

 

ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা এবং বিশ্বব্যাপী পরিবেশনার এ বর্তমান যুগে ট্রেইলার নিজেই এখন একটি জনরা-তে পরিণত হয়েছে ! যেখানে বিভিন্ন হাউজ গড়ে উঠেছে এই বিজ্ঞাপন শিল্পকে নতুন নতুন রূপ দিতে ।

একটা বিশ্ব যেখানে টিভি থেকে শুরু করে গেইম সবখানেই প্রতিযোগিতা চলছে সীমিত রিসোর্স অর্থাৎ আমাদের সময় এবং পয়সাকে পাবার – সেখানে ট্রেইলারের ভূমিকা অগ্রগণ্য । কেননা বর্তমানে মূল চলচ্চিত্র দেখবার আগে তার প্রচারণা, আসন্ন আকর্ষণীয় কী কী আছে তার বিবরণী এগুলো গুরুত্বপূর্ণ – এবং সেক্ষেত্রে ট্রেইলারের কোন বিকল্প নেই ।

 

সূত্রঃ ফিল্মমেকারiq

এই পোস্টটিতে ৩ টি মন্তব্য করা হয়েছে

  1. তন্ময় তনয় says:

    বাহ্‌! দারুন! ম্যালা ব্যাপার জানলাম! 😀

  2. ENAMUL KHAN says:

    সুন্দর লিখেন। অনেক কিছু জানা গেলো।

  3. পথের পাঁচালি পথের পাঁচালি says:

    সেই ১৯১৩ থেকে ২০১৪ পর্যন্ত এসে আমরা ট্রেইলারের বিবর্তন দেখতে পাচ্ছি। কী অসাধারণ একটা ব্যপার। অনেক কিছু জানতে পেরে নিজেকে বেশ শিক্ষিত মনে হচ্ছে। :p 

মন্তব্য করুনঃ

You must be Logged in to post comment.

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন