চলচ্চিত্রের ভাষাঃ সত্যজিতের বিশ্লেষণে । (পর্ব-২)

396921_640821455944673_1923627037_n

 

সিনেমার ভাষা বিষয়ে সত্যজিতের বিশ্লেষণ তথা সিনেমার স্বকীয়তা ব্যাপারে বিশদ ধারণা প্রদানের লক্ষ্যে সৃষ্ট এ সিরিজের ২য় পর্ব এটা ।

গত পর্বে চলচ্চিত্রের সাথে স্থিরচিত্র, সঙ্গীত এবং সাহিত্যের সাদৃশ্য ও তফাতটা ঠিক কোথায় সে ব্যাপারে আলোচনা হয়েছে । গুরু সত্যজিতের ভাষাকে অন্তর্জালিক দুনিয়াতে কিবোর্ডের অক্ষরে নেওয়ায় মূলত আমার উদ্দেশ্য, পাশাপাশি সম্ভব হলে নিজস্ব চিন্তা-ভাবনা প্রকাশের ক্ষীণ প্রচেষ্টা এটা । 

এ পর্বে বিভিন্ন রকম শট, নাটক, সুর-লয়ের সাথে চলচ্চিত্রের সম্পর্ক, থিয়েটার ও চলচ্চিত্রের সম্যক ধারণা পাওয়া যাবে আশা রাখি । 

১ম পর্বের পর থেকে 

 

"এছাড়া ক্যামেরার দৃষ্টিকোণ পরিবর্তনের ফলে ক্লোজ-আপ, মিড-শট, লং-শট, টপ-শট ইত্যাদির উদ্ভব, এবং বক্তব্য অনুযায়ী তাদের সার্থক প্রয়োগও প্রথম গ্রিফিথই করেন । চরিত্রের মনের ভাব তার আকৃতি বা অঙ্গভঙ্গীর ডিটেলের সাহায্যে প্রকাশ করার জন্য ক্লোজ-আপের উদ্ভব । এই ক্লোজ-আপ ব্যবহার না করে আজও ছবি করা সম্ভব নয় ।

ক্লোজ-আপ যখন এল, তখন নাটকীয় উপাদান স্বত্বেও মঞ্চের নাটকের সঙ্গে সিনেমার একটা স্পষ্ট পার্থক্য স্থাপিত হল, কারণ *নাটকের দর্শকের পক্ষে অভিনেতার অত কাছে যাওয়া সম্ভব নয় ; এখানে দর্শক প্রেক্ষাগৃহের চৌকিতে অনড়, ফলে নাট্যদৃশ্য থেকে তার দূরত্ব এদিক ওদিক হবার কোন উপায় নেই ।

সিনেমাতে সে সুযোগ আছে বলেই ক্যামেরাকে আগু-পিছু করা হয় তা নয় ; এর একটা শিল্পগত প্রয়োজনও আছে, এবং এই প্রয়োজনটা গ্রিফিথই প্রথম অনুভব করেন । তিনি বুঝেছিলেন যে, মঞ্চের নাটকের সঙ্গে দর্শকের যে সরাসরি সম্পর্ক, সিনেমায় সেটা নেই । এখানে সে সম্পর্কটা স্থাপিত হচ্ছে ক্যামেরার মাধ্যমে । কোন তৃতীয় ব্যক্তির জবানীতে যদি আমাদের একটি নাটকীয় ঘটনার বিবরণ শুনতে হয়, তাহলে সেই বিবরণে নাট্যরস সঞ্চারিত হল কি না সেটা সম্পূর্ণ নির্ভর করে বর্ণনাদাতার উপর । সিনেমার ক্যামেরা এই বর্ণনাদাতার ভূমিকা গ্রহণ করে । ঘটনা যাই হোক না কেন, সেটা রসিয়ে বলার ভার পরিচালকের আজ্ঞাধীন ক্যামেরার উপর । সিনেমার ভাষা তাই প্রধানত ক্যামেরার ভাষা ; একথা গ্রিফিথের সময় যেমন সত্য ছিল, আজও তেমনি সত্য রয়ে গেছে । 

গল্প বলার প্রয়োজনে শটের পর শট জুড়ে গ্রিফিথ চলচ্চিত্রের সাংগীতিক দিকটা সম্পর্কে সচেতন হন । বক্তব্য বিন্যাসের জন্য সিনেমার একটা নির্দিষ্ট সময়ের প্রয়োজন হয় সেটা আগেই বলেছি । গ্রিফিথ দেখলেন যে, বিভিন্ন দৈর্ঘ্যের বিভিন্ন ভাব-সম্বলিত শট পর পর জুড়লে শুধু যে গল্প বলার কাজ হচ্ছে তা নয়, তার সঙ্গে কাহিনী-বিন্যাসে একটা ছন্দের সঞ্চার হচ্ছে । সংগীতের তাল ফাঁক লয় ও স্বরের হ্রস্বতা-দীর্ঘতা বা ওঠা-নামার সঙ্গে সুরের ভাব-বৈচিত্রের সমন্বয়ে যেমন একটা মিশ্র ছন্দ তৈরী হয় তেমনি এখানেও দৃশ্যবস্তু থেকে ক্যামেরার দূরত্বের তারতম্য ও শট-এর দৈর্ঘ্যের তারতম্যের সঙ্গে বিষয়বস্তুর ভাব-বৈচিত্রের সমন্বয়ে একটা জটিল মিশ্র ছন্দের উদ্ভব হচ্ছে ।

গ্রিফিথের প্রাথমিক উপলব্ধির ফলে সিনেমার এই ছন্দোময় সাহিত্য-নাটক-চিত্রকলা-সংগীতাশ্রিত ভাষা নির্বাক যুগের মাঝামাঝি (অর্থাৎ ১৯১৫ নাগাদ) বেশ একটা স্পষ্ট চেহারা নিয়েছিল । এই ভাষার ব্যাকরণকে আয়ত্ত করে মোটামুটি চলনসইভাবে ছবির বক্তব্য প্রকাশ করা প্রায় যে কোন পরিচালকের পক্ষেই সম্ভব ছিল । এই ভাষা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তাকে আরও জোরালো ও সমৃদ্ধ করে তুলতে সাহায্য করেছিলেন আমেরিকা ও আমেরিকার বাইরে ইউরোপে কয়েকজন প্রতিভাবান শিল্পী ।

 

হলিউডেই স্ল্যাপস্টিক কমেডির চলচ্চিত্র ব্যাকরণ রচনা করলেন ম্যাক সেনেট । থিয়েটারে যা ছিল ভাঁড়ামো, সিনেমায় তা হয়ে দাঁড়াল উঁচু দরের আর্ট । সেনেটও বুঝেছিলেন যে, থিয়েটারের ব্যাঙ্গ-কৌতুক শুধু ক্যামেরায় তুলে গেলে কমেডি কমিক হবে না । এখানেও ক্যামেরা ও এডিটিং-কে হাসির খোরাক জোগাতে হবে । সেনেটের সূত্র ধরেই যেসব কৌতুকাভিনেতা সিনেমায় খ্যাতি অর্জন করেছিল, তাদের মধ্যে চার্লি চ্যাপলিন ও বাস্টার কীটনের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য । 

সমাজ-সচেতন দরদী শিল্পী চ্যাপলিন তার কমেডির মধ্যে মানবিক আবেদন এনে ফেললেন । নতুন নতুন সূক্ষ্মভাব প্রকাশ করার প্রয়োজনে ত্নি সেনেটের ভাষার উপর নিজস্ব কারুকার্য প্রয়োগ করতে শুরু করলেন । Mime বা মূক অভিনয়ে চ্যাপলিন ছিলেন অদ্বিতীয় । অঙ্গভঙ্গীর যে কতরকম ভাষা হতে পারে তা চ্যাপলিনের ছবিতেই প্রথম দেখা গেল । তাছাড়া চোখ-মুখের ভাবের ভাষাতেও চ্যাপলিন অতুলনীয় । City Lights-এর বিখ্যাত শেষ ক্লোজ-আপে হাতে ধরা একটি গোলাপের ডাঁটায় মৃদু কামড়ের সঙ্গে একটি বিশেষ হাসি ও চোখের একটি বিশেষ চাহনিতে মনের একটা জটিল কুণ্ঠা ও সংশয় মিশ্রিত ভাবপ্রকাশ যারা দেখেছে, তারা কোনদিনও ভুলবে না । কথার আশ্রয় না নিয়ে কেবল সূক্ষ্ম অভিনয়ের সাহায্যে কীভাবে মানুষের মনের ভাব ক্যামেরার সামনে ব্যক্ত করা যায়, এ নিয়ে চিত্র-রচয়িতারা অ্যাজ এই সবাক যুগেও সর্বদাই চিন্তা করেন । 

              131204175328-charlie-chaplin-tramp-city-lights-horizontal-large-gallery

City Lights-এর সেই বিখ্যাত হাসির ক্লোজ-আপ

Gold Rush ছবির একটি দৃশ্যে চ্যাপলিন বোঝাতে চাইলেন যে, দারুণ ক্ষুধার তাড়নায় তার বন্ধু তাকে বার বার মুরগি বলে ভ্রম করেছে । এই ভাব প্রকাশ করার জন্য তাকে সিনেমার একটা বিশেষ রাসায়নিক উপায় অবলম্বন করতে হল । এর নাম Superimposition । এর ফলে এই দেখছি মানুষ, আবার এই হয়ে গেল মুরগি – অথচ পরিবেশ একই রয়েছে । আর একটি যান্ত্রিক উপায়ে নির্বাক যুগের স্ল্যাপস্টিক কমেডির প্রায়ই ব্যবহার করা হতো, যেটাকে বলা হয় fast motion । এটাও একটা ক্যামেরার কারসাজি, এবং এর ফলে মানুষ চেহারায় মানুষ থাকলেও তার গতিবিধি ক্ষিপ্রগতি কলের মানুষের মত হয়ে যায় । 

                Gold-Rush-Chicken

Gold Rush-এ চ্যাপলিনের মুরগী হবার দৃশ্য ।

শিল্পী হিসেবে বাস্টার কীটন চ্যাপলিনের চেয়ে কোন অংশে কম ছিলেন না, তবে তার মেজাজ ছিল অন্যরকম । কীটন যেন আরও নৈর্ব্যক্তিক, আরও নিরাবেগ, আরও মননশীল । তার ছবিতে চ্যাপলিনের মত চোখের জল ফেলার সুযোগ নেই । তার নিজের মুখে একটি বই দ্বিতীয় কোন অভিব্যক্তি কখনো প্রকাশ পায়নি । এবং এই অভিব্যক্তিকে অভিব্যক্তির অভাব বললে ভুল হবে না । কীটনের হাসির দৃশ্যের বিমূর্ত জ্যামিতিক প্যাটার্নের দিকটা চ্যাপলিনের চেয়েও অনেক বেশী প্রকট । ফলে কীটনের ছবিতে ক্লোজ-আপের চেয়ে মিড-শট লং-শটের ব্যবহার অনেক বেশী ।"

 

*বর্তমানে মঞ্চ-নাটকে দর্শকদের অনেক কাছাকাছি যাবার সুযোগ থাকে অভিনেতাদের, মিনিমালস্টিক সেট ডিজাইনের একটা কী-এলিমেন্ট হচ্ছে এটা । পুরো থিয়েটার জুড়েই আসলে সেখানে মঞ্চ নির্মিত হয়, দর্শক যেহেতু থিয়েটারের মধ্যেই থাকে সেহেতু অভিনেতা তার মঞ্চের যথেচ্ছা ব্যবহারের মাধ্যমে এই সেটে দর্শকের খুব কাছাকাছি যাবার সুযোগ পান । 

(চলবে…)

 

(Visited 190 time, 1 visit today)

এই পোস্টটিতে ২ টি মন্তব্য করা হয়েছে

  1. পথের পাঁচালি পথের পাঁচালি says:

    আরো অনেক কিছু জানলাম। ভালো লাগছে পড়তে। 🙂

  2. ENAMUL KHAN says:

    সিটি লাইট-টা কিছু দিন আগে দেখলাম অসাধানর একটা মুভি। সাথে আরও দেখেছি, দ্যা কিড, মডান টাইম, দ্যা গোল্ড রাশ। সকল দুঃখ বেদনা গুলা হাসির মধ্য দিয়ে উপস্থাপন, এমন অসাধারণ কাজটা চ্যাপলিন ছাড়া আর কাউ কে দিয়ে হতো না। আসলে ওর নিজের জীবনে অনেক দুঃখ কষ্ট করেছে তো, সব কিছু মিলে অসাম্ননা ব্যাপার।

    এদিকে বুস্টার কেইটনও অসামান্না অভিনেতা। দ্যা জেনারেল দেখে আমি অবাক। একটা মানুষ ফিজিক্যালি হার্ড হয়ে এতো ভালো অভিনয় করেন কি করে। খুব যে বড় করে চ্যাপলিন এর মতো হেঁসে দিচ্ছে তা কিন্তু না। ওরা চলা ফেরা দেখলেই হাঁসি পেয়ে যাবে। সার্লক জে.আর. আরও একটা অন্যতম মুভি। বুস্টারের ট্রেডমার্ক -ই ফিজিক্যাল কমেডিয়ান।

    এই সব মানুষ গুলা কে নিয়ে আলাদা আলাদা করে লেখার দরকার।

     

    আপনার লেখা চলছে… চলতে থাক। পড়ছি… পড়তে থাকবো…।।

মন্তব্য করুনঃ

You must be Logged in to post comment.

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন