চলচ্চিত্রের ভাষাঃ সত্যজিতের বিশ্লেষণে । (পর্ব-১)
Share on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on TwitterPin on Pinterest0

সাহিত্য নাটক চিত্রকলা সঙ্গীত ইত্যাদির প্রভাব স্বত্বেও চলচ্চিত্রশিল্প নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ভাস্বর এবং এই শিল্পের গুণাগুণ বিচারে এক বিশেষ ধরনের সমঝদারির প্রয়োজন । এ সমঝদারির জন্য চলচ্চিত্রের কনভেনশন সম্পর্কে সম্যক ধারণা থাকা বাঞ্ছনীয় । সে সূত্রেই চলে আসে চলচ্চিত্রের ভাষা পর্যালোচনা ।

Screenshot_1

চলচ্চিত্রের ভাষাঃ সেকাল ও একাল নামক প্রবন্ধে সত্যজিৎ রায় সে ব্যাপারে স্বল্প পরিসরে আলোচনা করেছেন । প্রবন্ধটি দেশ পত্রিকার উপরোধে সত্যজিতের লেখা । আমার এ ব্লগ সে প্রবন্ধটি থেকে যতটুকু একজন চলচ্চিত্রপ্রেমীর জন্য না জানলেই নয় সেটুকু উল্লেখ করবার একটা ক্ষুদ্র প্রয়াস মাত্র । এতটা সহজ ও সাবলীল ভাষায় এরকম গুঢ় ব্যাপার বুঝিয়ে দেওয়া একমাত্র সত্যজিতের পক্ষেই সম্ভব । যেমন প্রাঞ্জল তার লেখনী তেমনি তার রসবোধ ও উদাহরণ দেবার ক্ষমতা, এক প্রকার মুগ্ধই বটে ।

এটিকে সিরিজ ব্লগ হিসেবে লিখবার অনেক ইচ্ছে আছে, সিরিজের শেষ দিকে নিজস্ব ধারণাও উল্লেখ করবার ইচ্ছে রাখি ।

চলচ্চিত্রের ভাষা নিয়ে সত্যজিৎ আলোচনা করতে গিয়ে শুরুতেই একটা উপমা দিয়েছেন, সেটি পোশাক সম্পর্কিত, সেখান থেকেই শুরু করছি, সত্যজিতের নিজের ভাষায় ।

“ব্যাপার গুরুতর এবং গুরুতর এই কারণেই যে, এ যুগটা হল হুজুগের যুগ, ফ্যাশানের যুগ । এই দুইয়ের দৌরাত্ম্য আমাদের এই পোড়া দেশেও লক্ষ করা যায় । বাঙালী তরুণদের মধ্যে আজকাল অনেকেই আর বাবু হয়ে বসেন না, কারণ চোঙা প্যান্টে সে কাজটা সম্ভব নয় । অথচ চোঙা প্যান্ট না পরলে ফ্যাশান থাকে না । পোশাকের ব্যাপারে যেটা সম্ভব, শিল্পের ব্যাপারেও যে সেটা ঘটতে পারে না এমন কোন ভরসা নেই । সুতরাং মনে হয় এই বেলা ভাষার ব্যাপারটা একটু তলিয়ে দেখা দরকার । সত্যিই কি এই ভাষা সিনেমায় একটা নতুন পর্ব সূচিত করল, যার ফলে এ পর্যন্ত যা হচ্ছিল তা ওল্ড-ফ্যাশান্‌ড হয়ে গেল, নাকি এ ভাষাও চোঙা প্যান্টের মত এমন একটা কিছু যাতে সব কাজ চলে না ; ফলে অনেক কাজ বাদ দিতে হয়, কারণ তা না হলে ফ্যাশান থাকে না ।

ভাষার ব্যাপারে পোশাকের উপমাটা অবান্তর নয় । পোশাকের মতই ভাষারও দুটো দিক আছে । একটা হল তার প্রয়োজন মেটানোর দিক বা functional দিক । এতে একটা বিশেষ ভাব প্রকাশের কাজটা হয় । অন্যটা হল আর্টের দিক—যেখানে ভাষার মাধুর্য, ভাষার ঋজুতা, ভাষার চটকদারিতা ইত্যাদির প্রশ্ন আসে । কোনো ভাষা যখন নতুন তৈরী হয়, তখন সেটা কোন বিশেষ ভাব-প্রকাশের প্রয়োজনেই হয় । এই প্রাথমিক উদ্দেশ্যটা মিটলে পরে ক্রমে শিল্পীর হাতে এই ভাষার শ্রীবৃদ্ধি হতে থাকে । কিন্তু পরিণত অবস্থাতেও কোন ভাষা চিরকালের জন্য টিকে থাকতে পারে না । কারণ যুগ-পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সচেতন শিল্পীর মেজাজ ও দৃষ্টিভঙ্গীর পরিবর্তন ভাষায় প্রতিফলিত হতে বাধ্য ।

সঙ্গীত, চিত্রকলা, সাহিত্য, নাটক ইত্যাদির সুপ্রাচীন শিল্পকলার ভাবভঙ্গী তালগোল পাকিয়ে আজ থেকে ষাট বছর আগে যে চলচ্চিত্রের ভাষা তৈরী হতে শুরু হয়েছিল, সে কথা অনেকেই জানেন । প্রথম যে ছবি লোক ডেকে দেখান হয় তার বিষয়বস্তু ছিল—একটি ট্রেন স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে এসে দাঁড়াচ্ছে । এ ঘটনা যদি চলচ্চিত্র না হয়ে স্থিরচিত্রে দেখান হত, তাহলেও বক্তব্য বুঝতে অসুবিধা হত না । কিন্তু একটা তফাত আছে, সেটা হল এই যে চলচ্চিত্র ঘটনাটা একটা নির্দিষ্ট সময়ের গণ্ডীর মধ্যে (অর্থাৎ যতক্ষণ ছবি পর্দায় থাকছে ততক্ষণ) বিন্যস্ত । এই উপলব্ধির সঙ্গে সঙ্গে আমরা বুঝতে পারি যে, চলচ্চিত্রের সঙ্গে সঙ্গীতের একটা সম্পর্ক রয়েছে, এবং ছবি হওয়া সত্ত্বেও সিনেমা জিনিসটা চিত্রকলা বা ফটোগ্রাফি থকে পৃথক । লুমিয়ের তোলা এই ট্রেনের ছবি ছিল নাটল ও কাহিনী বিবর্জিত সাধারণ দৈনন্দিন ঘটনার সামিল । এর কিছু পরেই ক্রমে ছবিতে গল্প বলা শুরু হয়, এবং এই গল্প বলা থেকেই সিনেমার ভাষা একটা বিশিষ্ট চেহারা নিতে শুরু করে । এই ভাষা নির্মাণের ব্যাপারে যিনি অগ্রণী ছিলেন, তিনি হলেন অসামান্য প্রতিভাসম্পন্ন মার্কিন পরিচালক ডি ডব্লিউ গ্রিফিথ । ক্যামেরা ও এডিটিং-এর যে বিশেষ বিশেষ ব্যবহারের উপর সিনেমার ব্যাকরণের ভিত্তি, তার প্রায় সব ক’টাই গ্রিফিথের আবিষ্কার । গ্রিফিথ প্রথমেই যে জিনিসটা বুঝেছিলেন সেটা হল এই যে, মুখে যেমন এক নিঃশ্বাসে গল্প বলা যায় না, অথবা সাহিত্যের গল্পও যেমন বাক্যের পর বাক্য সাজিয়ে রাখতে হয়, তেমনি সিনেমার গল্পকেও খণ্ড খণ্ড দৃশ্যে ও খণ্ড খন্ড শট্‌-এ ভাগ করে সাজিয়ে বলতে হয় । এক একটি শট্‌ এক একটি বাক্য বা শব্দের মত । কথার মতই শট্‌-এর ভাষা আছে, যেটা একান্তই ছবিরা ভাষা, দৃশ্যবস্তুর ভাষা । আবার সাহিত্যের গল্পকেও যেমন অনুচ্ছেদ ও পরিচ্ছেদে ভাগ করার দরকার হয়, তেমনি সিনেমার গল্পকেই mix বা fade জাতীয় কতগুলি বিশেষ যান্ত্রিক ও রাসায়নিক উপায়ে পর্বে পর্বে ভাগ করা সম্ভব ।”

(চলবে…)

এই পোস্টটিতে ৪ টি মন্তব্য করা হয়েছে

  1. পথের পাঁচালি পথের পাঁচালি says:

    দারুন কনসেপ্ট। অপেক্ষায় থাকলাম আরো কিছু জানার জন্য 

  2. ENAMUL KHAN says:

    খুব সুন্দর লেগেছে। মনে হচ্ছে সব একবারে পড়তে পারলে ভালো লাগতো কিন্তু সব একবারে ব্লগ -এ লেখাটা কষ্টের ব্যাপার। যাহোক বেশি দেরি কইরেন না। তাড়াতাড়ি পোস্ট দিয়েন আদ্র দা…।।

    ডি ডব্লিউ গ্রিফিথ স্যার কে নিয়ে ছোট করে একটা লেখা লিখব ভাবছি। ওনার শেষ জীবনের কথাগুলা পড়লে খুব কষ্ট লাগে। 🙁

  3. শাহরিয়ার লিমু শাহরিয়ার লিমু says:

    অস্থিরমাপের লেখা। আমার সেই পছন্দ হইসে। সিরিজ পর্বের অপেক্ষায় রইলাম। 🙂

    এই কথাগুলোই ক্লাসে শুনলে হয়তোবা ঘুমিয়ে যেতাম কিন্তু নিজেদের সাইটে এমন ইন্টেলেকচুয়াল লেখা পড়ে আসলেও ভালো লাগতেছে।

  4. সামিয়া রুপন্তি says:

    আদ্রে ভাই কিভাবে এত ভাল লিখে?? :/ এই জিনিসের পরের পর্ব পড়ার জন্যই আবার ব্লগে ঢুকতে হবে!!

    তবে এইভাবে বিনা পয়সায় যে ওয়াহিদ ভাইকে পরীক্ষায় পাস করিয়ে দিচ্ছেন, এটা কি ঠিক হচ্ছে??? 😛 😛

মন্তব্য করুনঃ

You must be Logged in to post comment.

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন