আমার দেখা “মেঘ এনেছি ভেজা”

FB_IMG_1487062257278প্রদীপের নিচে থাকে অন্ধকার, আর তার উপরেই থাকে আলো। অন্ধকার না খুঁজে আলোটাকেই বেছে নেয়া বুদ্ধিমানের কাজ।সমোলোচোনা অনেক কঠিন কাজ।সেটা করবার মত সাহস বা শক্তি কোনোটি আমার নেই যাইহোক আমি বরং আলোটি খুঁজে নেই।
সম্প্রতি বাংলাভিশনে অন-এয়ার হয়ে গেল বাংলাদেশের সবথেকে বড় ক্যাম্পেইনের নাটক ক্লোজ-আপ কাছে আসার অফলাইন গল্প। সময়ের তিন প্রতিভাবান নির্মাতা মাবরুর রাশিদ বান্নাহ, রুবায়েত মাহমুদ ও আর বি প্রিতম নির্মাণ করেছেন এই আকাঙ্ক্ষিত তিন নাটক। অন্য দুই নাটক নিয়ে নাহয় পরে কথা হবে, আজ খুঁটিনাটি আলোচনা করব “মেঘ এনেছি ভেজা” নাটকটি নিয়ে।
সময়ের ব্যাস্ততম নির্মাতা রুবায়েত মাহমুদের নির্মাণ “মেঘ এনেছি ভেজা”। এর মূল চরিত্রে আছেন- আবির, শুভ্রা এবং রনি। প্রবাস ফেরত আবিরের সাথে পরিচয় হয় একদল ভ্রমন পিপাসু ছেলে-মেয়েদের। আর এদেরই একজন শুভ্রা।
পাহাড়ের গহীন জঙ্গলে জানান দিতে ইচ্ছে করে নিজের অস্তিত্তের এমনি স্বাধীন চেতনা মেয়ে শুভ্রা।
আবির শুভ্রার ভাল লাগার গল্পটা ঐ বান্দরবনের উঁচু পাহাড়ের নির্জনতায়।কিন্তু গল্পের এখানে প্রবেশ করে রনি..রনি সাথে শুভ্রার পারিবারিক ভাবে বিয়ে ঠিক হয়েই ছিল.. সে যাইহক বান্দরবন থেকে ফিরে আবির চট্টগ্রাম এবং শুভ্রা ঢাকায় চলে গেলেও তাদের যোগাযোগ চলে ফেসবুকে। কিন্তু বাঁধ সাধে যখন বাংলাদেশে আচমকা ফেসবুক বন্ধ হয়ে যায়। মোবাইল নাম্বার বিনিময় না করার আফসোস নিয়েই তারা খুজতে থাকে একে অপরকে। কিন্তু দেখা মেলেনা কিছুতেই।
এরপর শুভ্রা স্মৃতিকাতর হয়ে ফিরে আসে বান্দরবানের সেই জায়গায়, যে জায়গাটা তাদের ভাল কিছু মুহূর্তের সাক্ষী।
অন্যদিকে আবিরও অনেক খুঁজে শুভ্রাকে না পেয়ে ফেরত আসে সেই প্রিয় জায়গায়, যেখানে দুজনে মিলে দেখেছিল প্রথম সূর্যোদয়।
আর এভাবেই গেঁথে যায় তাদের কাছে আসার গল্প।
চরিত্রায়ন নিয়ে কথা বলা আবশ্যক এবার। আবির চরিত্রে অভিনয় করেছেন হালের জনপ্রিয় এবং তরুন অভিনেতা সিয়াম। নাটকের পরতে পরতে নিজেকে ভেঙেছেন সিয়াম। কখনো বিদেশ ফেরত দেশের প্রতি কৌতুহলি এক যুবক আবার কখনোবা প্রেমের নাছোড়বান্দা দাস।
বাস্তবধর্মী অভিনয়ে তার দক্ষতা সর্বজনবিধিত। এ নাটকেও আরেকবার দর্শকের আস্থার মূল্য দিলেন তার সুনিপুণ অভিনয় দক্ষতায়। বিশেষ করে অনেক খুঁজাখুঁজির পর শুভ্রাকে পেয়ে তার আবেগগন মুহূর্ত দর্শকের আবেগের দরজায় দরজায় কড়া নেড়ে গেছে, হয়ত কারো চোখের কোণটা অজান্তেই ভিজিয়ে গেছে।
শুভ্রা মেয়েটি সাবিলা ছাড়া আর ভিন্ন কাউকে কল্পনা করা অন্যায়। শুভ্রা চরিত্রটি কেবল সেই ফুতিয়ে তুলতে পারে প্রমাণ করলেন সাবিলা তার সাবলীল অভিনয়ে। নির্মাতার চরিত্র পছন্দের গুণগান সমালোচকদের করতেই হবে।
নিজের মধ্যে ধারণ করে সাবিলা নূর “শুভ্রা” চরিত্রকে নিয়ে গেছে ভিন্ন মাত্রায়।
মাঝামাঝি দৃশে অল্পসময়ের জন্য আসা রনি চরিত্রে বাঁধন অনবদ্ধ অভিনয় করে দেখিয়েছেন। ছোট এই উচ্চব্যক্তিত্বসম্পন্ন চরিত্রে তার সুন্দর অভিনয় সত্যিই মনঃমুগ্ধকর।
প্রতিবার এই ক্লোজআপ কাছে আসার গল্পে গভীর প্রেম-ভালবাসা লক্ষণীয়। কিন্তু সেই দৃষ্টিতে এবারের মেঘ এনেছি ভেজা একটু ভিন্ন আদলে গড়া।
নাটকের ফানি দৃশ্যগুলো অবশ্যই উল্লেখ করার মত, যা দর্শকদের হাসিয়েছে বেশ। যেমন নাটকে গাইড এবং গুগোল গালিবের কথা বলতে হয়। দর্শকদের হাসির খোরাক যুগিয়েছে অনেকবার।
দৃশ্যায়ন নিয়ে কথা বলতে গেলে- একটু ভিন্ন ঘরানার নাটকই বলতে হবে “মেঘ এনেছি ভেজা” নাটকটিকে।
কেননা বাংলা নাটক যে লোকমুখে প্রচলিত আছে বাংলা নাটক মানেই ড্রয়িং রুম ভিত্তিক নাটক, কিন্তু সেই ধারণা পাল্টে দিয়েছে এই “মেঘ এনেছি ভেজা” নাটকটি।
বিভিন্ন মনরম লোকেশনে শুটিং হয়েছে নাটকটির। দৃষ্টিনন্দন বান্দরবান ছাড়াও এই নাটকে দেখা গেছে চিটাগাং ইউনিভার্সিটির সাটল ট্রেন, যা পূর্বে সম্ভবত এইভাবে দেখানো হয়নি কোন নাটকে। এজন্য নির্দেশক বড়সড় ধন্যবাদ প্রাপ্য।
বিশ্বনন্দিত চলচিত্র নির্মাতা কাওসাকিকে জিজ্ঞেস করা হল- “একটা ভাল সিনেমা নির্মাণের জন্য কি দরকার?” তাঁর অকপট উত্তর – “ভাল একজন সহকারী নির্দেশক”। নাটকের লোকেশনগুলো ছিল দুর্লভ সব জায়গায়। সেদিক বিবেচনায় পুরো টিমের পরিশ্রমের পরিমাণ অনঅনুমেয়। যারা একটি ভাল কাজ উপহার দেয়ার নেশায় এত পরিশ্রম স্বীকার করতে পারে, তারা সার্থক।
আমি বলব, শুধু আমি কেন এই নাটক দেখা মানুষগুলো বলবে- “লাল সালাম গ্রহন কর হে! মেঘ এনেছি ভেজা পুরো টিম..
বিখ্যাত মানুষের কথা মাঝে মাঝে মনে পড়ে সময়ের খাতিরে। এক বিখ্যাত লেখক বলেছিলেন- “যখন তোমার কাজের সমালোচনা হচ্ছে তখন বুঝতে হবে অবশ্যই ভাল কিছু হচ্ছে। যার মধ্যে স্বতন্ত্র কিছু আছে”। আর তাই “মেঘ এনেছি ভেজা” নাটকটির সমালোচনা হতেই পারে। গঠনমূলক সমালোচনা যেকোনো কাজের জন্যই মঙ্গলজনক।
বেশকিছু অনলাইন পেজ এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে লক্ষ্য করলাম লোকজন বলাবলি করছে, ফেসবুক বন্ধ হয়েছেতো কি হয়েছে VPN তো আছে। আমিও তাদের সাথে সায় গুনলাম। কিন্তু একটু পর মনে হল VPN বেআইনি এবং দেশের আইন-বিরুদ্ধ কাজ। একাজটি কি নির্মাতার উচিত নাটকে দেখানো!??
এই নাটকটির চিত্রনাট্যকার ছিলেন মেজবাহ-উদ্দিন সুমন। বরেণ্য লেখক এবং নির্মাতা হুমায়ূন আহমেদের সেই উক্তিটি মনে পড়ে এখানে। তিনি বলেছিলেন- একটি ভাল চিত্রনাট্য একটি ভাল কাজকে ৪০ শতাংশ এগিয়ে নিয়ে যায়। হ্যাঁ, মেজবাহ উদ্দিন আপনি একাই ৪০%কাজটিই আগায় নিয়ে গেছেন.
সবশেষে এটাই বলতে চাই, এবারের ক্লোজ-আপ কাছে আসার গল্পের অন্যতম সেরা নাটক ছিল “মেঘ এনেছি ভেজা”। ধন্যবাদ ক্লোজ-আপ, ধন্যবাদ নাটকের সাথে জড়িত সবাইকে, দর্শকদের এমন সুন্দর ভালবাসার ২৯টি মিনিট উপহার দেবার জন্য।

–Andy Adnan
লেখক ও নির্মাতাFB_IMG_1487082283914

(Visited 609 time, 1 visit today)

মন্তব্য করুনঃ

You must be Logged in to post comment.

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন