টিভি সিরিজ Terra Nova (2011– ) : আতীতেই কি ভবিষ্যতের নিয়তি ?

টেরা নোভা সিরিজ লগো।

টিভি সিরিজ টেরা নোভা (২০১১) : আতীতেই কি ভবিষ্যতের নিয়তি ?

…………………………………………আদিম পুরুষ…………………………………………………

জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং প্রাকৃতিক সম্পদের অতি ব্যাবহারে আমাদের নীল গ্রহটি ইতোমধ্যে অনেক পরিবেশগত বিপর্যয়ের মুখে পড়ছে। এর পরও আমরা নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছি। কিন্তু কল্পনা করুণ আজ থেকে ১০০ বছর পর কি আমাদের এই পৃথিবীকে আমরা বাসযোগ্য রাখতে পারব? ক্রমাগত পরিবেশ দূষণের ফলে ইতোমধ্যে অনেক প্রজাতির জীব বিলুপ্ত হয়েছে। কেমন হবে ভবিষ্যতের পৃথিবী? এর উত্তরে আমরা দুরকম সম্ভাবনা দেখতে পাই। একটি ভাল। অন্যটি খারাপ। ভালো সম্ভাবনা হলো আমরা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি পরিবেশ সচেতন, পৃথিবীটাকে বাসযোগ্য রাখার জন্য নিজের সমর্থনটা সবসময় পরিবেশ রক্ষার দিকেই থাকবে। কিন্তু আমরা যাই ভাবিনা কেন পরোক্ষভাবে এসবের নিয়ন্ত্রণ কিন্তু আমাদের হাতে নেই। সৃষ্টির শুরু থেকে ভাল আর মন্দ দু’টু ধারা পাশাপাশি থেকে এগুচ্ছে। একদিক থেকে মন্দেরই জয়জয়কার। অশুভ শক্তিরই জয়জয়কার। আদিকাল থেকেই একটি নির্দিষ্ট শ্রেণী পৃথিবীটাকে নিজেদের মুনাফা অর্জনের ক্ষেত্র হিসেবে ব্যাবহার করে আসছে। সভ্যতার অগ্রযাত্রায় প্রকৃতি কখনো বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। কিন্তু প্রকৃতির উপর নির্মম লুন্ঠন এর অবারিত ক্ষেত্রকে রিক্ত করছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উৎকর্ষতা অনেক অসম্ভবকে সম্ভব করছে এবং করে চলেছে। কিন্তু একই সাথে সমানুপাতিক হারে প্রকৃতিও ধ্বংস হচ্ছে। আমরা যতই বিজ্ঞনে এবং প্রযুক্তিতে উন্নত করিনা কেন এই সকল কিছুই কিন্তু তার কার্যকারিতার জন্য এই পৃথিবীর প্রকৃতির উপরই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নিরভরশীল। যখন এই প্রকৃতি তার দেয়ার মত সর্বশেষটুকুও ফুরিয়ে যাবার মত অবস্থায় উপনীত হবে তখন এই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিও কোন কাজে আসবে না।

টাইম পোর্টাল।

ঠিক এধরণের একটি প্রক্ষাপটকে বিবেচনায় রেখে ২১৪৯ সালের ভবিষ্যতের পৃথিবীর পটভূমিকায় এই টিভি সিরিজটি তৈরি হয়েছে। আমরা কল্পবিজ্ঞান উপন্যাস, সিনেমায় টাইম ট্রাভেলের ব্যাপারটি দেখেছি। এখানেও ঠিক এরকম টাইম ট্রাভেলের একটি ব্যাপার দেখানো হয়েছে। যে সময়টির কথা উল্লেখ করলাম তখন মানব জাতি সভ্যতার চূড়ান্ত ধাপে উন্নীত হয়েছে। এই উন্নতির জন্য তারা প্রকৃতিকে সম্পূর্ণ হত্যা করেছে। কোথাও একটা সবুজের চিহ্ন নেই। নীল পরিচিত গ্রহটি বাদামী হয়ে গেছে। মানুষ কলোনী করে বিশাল বিশাল গ্রীণ হাউসের মত কাচের তৈরি ডোমের অভ্যন্তরে নির্মিত শহরে থাকছে। জীবন্ত তাজা একটা পাতা কিংবা একটা তাজা কমলালেবু দেখে শিশু কিশোররা মিউজিয়ামের অদ্ভূত নিদর্শন দেখার মত তাকিয়ে থাকে।

টাইম পোর্টালের মাধ্যমে একজন লোক ২১৪৯ সাল থেকে ৮৫ মিলিয়ন বছর পূর্বের পৃথিবীতে প্রবেশ করছে।

প্রকৃতি ধ্বংসের কারণে মানুষ অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম করছে প্রতিনিয়ত। পৃথিবীতে একমাত্র মানুষই প্রাণী হিসেবে যেকোন প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার যোগ্যতা রেখে এসেছে। একটি সম্ভাবনা বন্ধ হয়ে গেলে বেঁচে থাকার জন্য, নিজেকে টিকিয়ে রাখার জন্য বিকল্প কোন না কোন মাধ্যম তৈরি হয়ে যায়। এখানেও তার ব্যতিক্রম নেই। বিজ্ঞানীরা পৃথিবীকে পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে ব্যর্থ হয়ে মনোযোগ দেন কোন একটা উপায় বের করে আদি পৃথিবীতে ফিরে যাওয়ার। যে পৃথিবীতে থাকবে শুধু আদিম প্রকৃতি, পানি, সাগর, বন, জীবজন্তু। কিন্তু কিভাবে? উপায় একটা বের হয়। যিনি উপায় বের করেন তাঁর উদ্দেশ্য সৎ। নতুন আদিম পৃথিবীতে নতুন স্বপ্ন নিয়ে মানব জাতি নতুনভাবে বসতি করবে। পুরাতন পৃথিবীর যা কিছু জীর্ণ,  সব পিছুটান ফেলে যাবে।

টাইম পোর্টালের মাধ্যমে টেরা নোভায় প্রবেশের পর সেভন্থ পিলগ্রিমের যাত্রীরা অবাক বিস্ময়ে দেখছে ৮৫ মিলিয়ন বছর পূর্বের পৃথিবীকে।

মানুষের টিকে থাকার এই প্রচেষ্টাকেও মুনাফা লোভী কর্পোরেট গোষ্ঠী মুনাফা অর্জনের নতুন মাধ্যম হিসেবে নেয়। উপায়ও নেই। বিজ্ঞানীরাও তাঁদের গবেষণার ফান্ডের জন্য কর্পোরেট গোষ্ঠীর উপর নির্ভরশীল। সে যাই হোক। মানব জাতিকে টিকিয়ে রাখার যে বিকল্প উপায়টি বের হয় তা এক কথায় অবিশ্বাস্য, আশা জাগানিয়া। নতুন পৃথিবীতে যাওয়ার জন্য লটারী, টাকা বা অন্য যেকোন উপায়ে যারাই নির্বাচিত হয়েছে তরাই ভাগ্যবান। সবার জীবনের একটাই চাওয়া নতুন পৃথিবীতে যাওয়া। পদার্থ বিজ্ঞানের চূড়ান্ত উন্নতি বস্তুকে কণায় পরিণত করে সময়কে ধ্রুবক ধরে মূহুর্তেই যেকোন সময়ে চলে যাওয়া। ব্যয়বহুল ব্যবস্থা। আদিম পৃথিবীতে যাওয়ার জন্য নির্মিত হয় টাইম পোর্টাল।

টেরা নোভার প্রাকৃতিক দৃশ্য।

সব থেকে উপযোগী হিসেবে ৮৫ মিলিয়ন বছর আগের পৃথিবীকে বেছে নেয়া হয়। ওখানে তৈবি করা হয় নতুন কলোনী ”টেরা নোভা”। ”টেরা নোভা” শব্দের অর্থ নতুন পৃথিবী। নিজ নিজ ক্ষেত্রে চূড়ান্ত সফল দক্ষ মানুষরাই টেরা নোভায় যাওয়ার জন্য নির্বাচিত হয়। টাইম পোর্টালের মাধ্যমে একেকটি পিলগ্রিমে এক একটি দল টেরা নোভায় যাওয়ার সুযোগ পায়। যারা টেরা নোভায় যাবে তদের যাত্রা একমুখী। একবার গেলে সেখান থেকে ফিরে আসার সুযোগ নেই। তখন পর্যন্ত শুধু একমুখী সময় ভ্রমণই আবিষ্কৃত হয়েছে। টাইম পোর্টালের মাধ্যমে ৮৫ মিলিয়ন বছর আগের পৃথিবীতে হাজির হয়ে অবাক চোখে পর্যবেক্ষণ করে এটাই কি স্বর্গ? বিশাল লম্বা ডায়নোসর, দৈত্যাকার সব গাছ, অদ্ভুত আকৃতির সরীসৃপ, অস্বাভাবিক লম্বা চওড়া ফুল, পাতা, গুল্ম। স্বচ্ছ পানির নদী, ঝর্ণা, নির্মল বুনো প্রকৃতি। টেরা নোভা বাসী এক অর্থে স্বর্গেই বাস করতে লাগল।

সিক্সারস – টেরা নোভার ভিলেন দল।

মানবজাতীর বৈশিষ্ট্যই হলো কোথাও স্থির হতে না পারা। সম্প্রদায়, গোষ্ঠীভিত্তিক বিভাজন। টেরা নোভায়ও তা শুরু হল। নতুন পৃথিবীতে হানা দিল পুরনো পৃথিবীর পাপ, হিংসা। ভাল মন্দের মিশেলে টেরা নোভায় শুরু হল নতুন জীবন। আদিম প্রকৃতির বিরুদ্ধে আদিম মানুষের মতই টিকে থাকার সংগ্রাম। আদিম মানুষ বন্য প্রকৃতির বিরুদ্ধে তীর, বর্শা ইত্যাদির সাহায্যে লড়াই করত। এখানে প্রকৃতি আরো কঠোর। তীর, বর্শার বদলে বন্য প্রকৃতির বিরুদ্ধে টিকে থাকার জন্য ব্যবহার হচ্ছে অত্যাধুনিক লেজার বিম, ইলেকট্রন বিম, ইশারা নিয়ন্ত্রিত অত্যাধুনিক হাতিয়ার।

ড. মিসেস শ্যনন ভার্চুয়াল কম্পিউটারে ভাইরাসের এন্টিডোট তৈরি করছেন।

সিরিজটির মূল কাহিনী আবর্তিত হয়েছে টেরানোভায় আসা একটি পরিবারকে নিয়ে । যার প্রধান হলেন একজন সাবেক কয়েদি শ্যানন। ঘটনা চক্রে সে টেরানোভায় এসে স্ত্রী এবং বাকী সদস্যদের সাথে মিলিত হয়। টেরানোভায় সে একজন সিকিউরিটি ইন্সপক্টেরের দায়িত্ব পায়। তাঁর স্ত্রী একজন মেডিক্যাল সাইন্টিস্ট। টিনেজ ছেলে এবং দুই মেয়ে নিয়ে তার পরিবার। আরেকটি প্রধান চরিত্র কলোনী লিডার কমান্ডার টেইলর। তিনিই পুরো টেরানোভা কলোনীর নিরাপত্তা প্রধান। তাদের প্রতি পক্ষ ”সিক্সার”। যারা সিক্সথ পিলগ্রিমে টেরা নোভায় আসে বিশেষ একটি গোপন উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে। সিক্সারদের সাথে টেরা নোভা কলোনীর দ্বন্দ্ব, ফেলে আসা পৃথিবীর সাথে গোপন যোগাযোগ, টেরানোভা থেকে পূনরায় আগের পৃথিবীতে ফিরে যাওয়ার জন্য দ্বিমুখী টাইম পোর্টাল আবিষ্কারের জন্য কয়েকজনের গোপন গবেষণা, টাইমপোর্টালের মাধ্যমে থেকে পুরান পৃথিবীতে টন টন মূল্যবান খণিজ পাচারের চক্রান্ত সব কিছু মিলে টান টান উত্তেজনার একটি সিরিজ।

টেরা নোভা থেকে পুনরায় পুরাতন পৃথিবীতে ফিরে যাওয়ার জন্য টাইম পোর্টালকে দ্বিমুখী করার গোপন গবেষণা করছেন একজন বিজ্ঞানী।

ভবিষ্যত পৃথিবীর কম্পিউটার, যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে যেসব যন্ত্র দেখানো হয়েছে তা আপাত কাল্পনিক মনে হলেও একেবারে অযৌক্তিক নয়। হাতের ইশারায় ছোট মোবাইল সিমের মত ডিভাইস থেকে চতর্মাত্রিক উপায়ে যে কোন জায়গায় ভার্চুয়াল কম্পিউটারের মত কাজ করা, লেখার কাগজ কাগজের ধারণা বিলুপ্ত হওয়া, মেডিক্যাল সায়েন্সয়ে অপারেশন রোগ নির্ণয় সবকিছুই বিশেষ মাইক্রোচিপের সাহায্যে হাতের ইশারায় রোগীর কাছে না থেকে যেকোন যায়গায় বসে করে নেওয়া এই ব্যাপারগুলো অবাক করার মত। সব থেকে ভাল লাগবে চমৎকার সব লোকেশন। লোকেশন দেখে যতটুকু মনে হল শুটিংয়ের জন্য ব্রাজিলের রেইন ফরেস্ট , মধ্য আমেরিকার বনাঞ্চল, কানাডাকে বেছে নেয়া হয়েছে। চমৎকার গ্রাফিক্স। পরিচালকের ৮৫ মিলিয়ন বছরের পুরনো পৃথিবীকে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টার কমতি ছিল না…..

ডায়নোসরের সাথে মোলাকাত।

টেরা নোভা কলোনীতে একটি বাচ্চা ছেলে ডায়নোসরকে ঘাস খাওয়াচ্ছে।

 

(Visited 87 time, 1 visit today)

মন্তব্য করুনঃ

You must be Logged in to post comment.

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন