সাগর পুত্র (২০১২) নিয়ে কিছু কথা: ——- আদিম পুরুষ———-

সাগর পুত্র রাজু ভাই।

সাগর পুত্র (২০১২)  নিয়ে  কিছু কথা:

——-  আদিম পুরুষ———-
আমাদের কোর্স কমপ্লিটিং পার্ট হিসেবে শর্ট ফিল্ম সাগর পুত্রের থিমটা যথার্থ ছিল। নানান ব্যস্ততায় কোর্সের একটি কি দুটি ক্লাসে উপস্থিত থাকতে পারিনি। শর্ট ফিল্মের চিত্রনাট্য লেখার টিমে নাম দিলেও চিত্রনাট্য লেখার কাজে ছিলাম না। শুটিং স্পট হান্টিংয়ে ছিলাম। শুটিংয়ে উপস্থিত থাকার ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও নানান পিঁছুটানে তাও সম্ভব হয়নি। সি.এফ.সিতে নিয়মিত যাওয়ার সুবাদে ইকবাল, সোহেল, বাবলু, রানা ভাই, সাইফুল ভাইদের সাথে নিয়মিত দেখা হত। সি.এফ.সিতে যাওয়া আসার মাধ্যমে শুটিংয়ের খবরাখবর পেতাম। শুটিংয়ের নানান কড়চা, নানান অভিজ্ঞতা শুনতাম। জাস্ট মিস করতাম।

পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতে অনেকবার যাওয়া হলেও কাটগড় জেলেপাড়া সৈকতের দিকে কখনো যাওনা হয়নি। শুটিংস্পট হান্টিংয়ের সুবাদে সেখানে সবার সাথে গিয়েছিলাম। পতেঙ্গার পর্যটকের ভিড়ের চেয়ে এদিকটা অনেকটা শান্ত। বেলাভূমি ঘেঁষে সাগরের ঢেউয়ে অসংখ্য মাছ ধরার ট্রলার, সাম্পানের দুলুনি , বিকেলের আকাশে সাগরে গাংচিলের ওড়া উড়ি, অনেক দূরে দিগন্তে জাহাজের সারি, একটা দুটো বিমানের অনেক নিচু দিয়ে উড়ে যাওয়া, বাঁধের ধারে জেলেদের নিত্য ব্যস্ততা, কিশোরদের ফুটবল, ক্রিকেট খেলা  সবকিছু মনোমুগ্ধকর। এখানে শৈবালদার একটি ডকুমেন্টারীর কিছু আউটডোরের শুটিং হয়েছিল। জায়গাটা শুটিংয়ের উপযোগী মনে হল। চিত্রনাট্যের কিছু আবশ্যকীয় উপাদানের অনুপস্থিতির জন্য জায়গাটা বাদদেয়া হল। প্রথম দিকের অংশের শুটিংয়ের জন্য পতেঙ্গা মূল সৈকতকেই বেছে নেয়া হল।

 

এর পর  শুটিং সংশ্লিষ্ট প্রত্যক্ষ কোন কাজে তেমন অংশগ্রহণ করতে পারিনি। ফাঁকে ফাঁকে অনেক কথাই শুনতাম। রাজীব ভাই টিমের সবাইকের চরম খাটিয়েছেন যার যার ভালটি বের করে আনার জন্য। যারা অভিনয় করেছেন তারা একজন ছাড়া বাকীরা অ্যামেচারের চেয়েও অ্যামেচার। সুতরাং শুটিংয়ে রাজীব ভাইয়ের ডিরেকশন স্টাইলের সাথে সহজ হয়ে উঠতে বেগ পেতে হচ্ছিল। অনেক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও  দ্রুত ২/৩ দিনে পুরো ফিল্মটির শুটিং শেষ করতে পারাটা অনেকটা অসম্ভব মনে হচ্ছিল। অসম্ভব কাজটিই শেষে সম্ভব হল।

চারুকলাতে রাজীব ভাইয়ের ক্লাসগুলোর মধ্যে সব থেকে ভাল লেগেছিল তাৎক্ষণিক গল্প তৈরির মাধ্যমে চিত্রনাট্যে রূপ দেয়ার লেকচারটা। ওই দিনের ক্লাসেই সাগরপুত্রের থিমটি জন্ম নেয়। সবার অংশগ্রহণ, মতামতের মাধ্যেমে কাহিনী নির্বাচন হয়েছে। ক্লাস শেষে সন্ধ্যায় কাহিনীতে আরো  কি কি ঢুকানো যায়, চিত্রনাট্যে যোগ হওয়া কোন কোন বিষয়গুলো এ অঞ্চলের জীবনযাত্রার সাথে অসংগতিপূর্ণ আরো অনেক বিষয়ে আমাদের মধ্যে আলোচনা হত। সবার একটু আধটু মন খারাপ করা ব্যাপারও ছিল। রাজীব ভাই সবার কাছ থেকে মুভির গল্পের সিনোপসিস আহবান করেছিল। প্রায় সবাই যার যার আইডিয়া জমা দিয়েছিল। আমাদের জমা দেয়া আইডিয়া গুলো নির্বাচিত হয়নি । কারণটাও রাজীব ভাই বলেছেন। কোর্স কমপ্লিটিং শর্ট ফিল্ম হিসেবে এমন আইডিয়া নির্বাচন করা উচিত যেখানে স্বল্প বাজেটে, লোকেশন , কাস্ট , প্রপস সব কিছুর সহজ সমন্বয় সম্ভব। যা হয়ত আমাদের জমা দেয়া আইডিয়া গুলোতে ছিল না।

সাগর পুত্রের থিম চট্টগ্রাম অঞ্চলের সমসাময়িক কিছু ঘটনা নিয়ে আবর্তিত। এ অঞ্চলের গরীব, বর্ডার পার হয়ে এপারে আসা বার্মিজ রিফিউজিদের অবৈধ পথে মালেশিয়া গমন অনেকটা নিয়মিত ঘটনা। অন্য জেলার লোকেরাও অবৈধ পথে মালেশিয়া যাওয়ার জন্য এই অঞ্চলের সাগর, নদীর রুটগুলো ব্যবহার করে। আমরা ”সাগর পুত্রে” এই ইস্যুটি এবং একই সাথে অনেক গুলো সমসাময়িক ইস্যুকে দেখাতে চেয়েছি এবং বলা যায় আমরা প্রায় সফলও হয়েছি। ২০ মিনিট দৈর্ঘ্যের ভিতর ছোট ছোট ফ্রেমে অনেক কিছুই উঠে এসেছে। শুটিং এর পর থেকেই অপেক্ষা করছিলাম কবে এডিটিং হবে। অবশেষে এডিটিংও শেষ হল। রাজীব ভাই লাস্ট ক্লাসের সেমিনারের পর আমাদের বললেন ”তোমরা কে কে আমার সাথে হোটেলে আসবা? .এডিটিং রাতেই কমপ্লিট করে ফেলতে হবে..”। ইকবাল, সনি ভাই, রানা ভাই, মামুন ভাই সহ আরো কয়েকজন সারা রাত রাজীব ভাইয়ের সাথে এডিটিং করলেন। এখানেও আমি ফাঁকি দিলাম। চাইলেই এডিটিংয়ে থাকতে পারতাম। কয়েকটি সিরিজ জমে আছে। একটার দুইটা এপিসোড বাকি। ওগুলো দেখার জন্য আমি আর এডিটিংয়ে গেলাম না।

পরের দিন ছিল (৮ ডিসেম্বর)।  ”সাগর পুত্রের” প্রিমিয়ার। সন্ধ্যায় চারুকলার লেকচার হলটিতে আমরা প্রশিক্ষণার্থীরা এবং আমন্ত্রিত অতিথিরা জড়ো হয়েছিলাম। শৈবালদা আমাদের সি.এফ.সির ২০ বছর পূর্তিতে আগামী বছর যে সব ইউনিক প্রোগ্রামগুলো হবে সেগুলো সম্পর্কে আলোকপাত করলেন। আবুল মোমেন ভাই চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের প্রথম দিকের অনেক অভিজ্ঞতা শেয়ার করলেন। সার্টিফিকেট বিতরণের পর শুরু হয় ”সাগর পুত্রের” প্রদর্শনী। অন্ধাকর হলে প্রথম শটটি দেখেই উপলদ্ধি করলাম আমাদের পরিশ্রম বৃথা যায় নি।

সাগর পুত্র একটি প্রতীকি চরিত্র। এই চরিত্রটির মাধ্যমে মালেশিয়ায় আদম পাচারকারী চক্রের খপ্পরে পড়ে সর্বস্ব হারানো , এমনকি জীবনহানির বিষয়টি ও তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। সাগর পুত্র চরিত্রটি বীচের ক্যামেরা বয়। যে পর্যটকদের টাকার বিনিময়ে ছবি তুলে দেয়। তার মা মালেশিয়ায় পাচার হয়। বাবা ভাটিয়ারী শিপ ব্রকিংয়ে কাজ করার সময় অ্যাক্সিডেন্টে মারা যায়। মাকে অনেকদিন সে দেখেনা। একদিন সে দালালের মাধ্যমে মালেশিয়া যাওয়ার সুযোগ পেয়ে যায়। এই সুযোগকে কাজে লাগানোর জন্য মারিয়া হয়ে সে পাচারকারীদের ফাঁদে পা দেয়। যেহেতু শর্ট ফিল্ম তাই এখানে কাহিনীর অনেক বেশী ঘনঘটা দেখানোর সুযোগও অনেক কম। সাগর পুত্রের চরিত্রে অভিনয়ের জন্য ৫ জন ছেলের স্ক্রিন টেস্ট নেয়া হয়। স্ক্রিন টেস্টের পূর্বেই আমরা রাজু ভাইকে প্রায় নির্বাচিত করেই রেখেছিলাম চরিত্রটির জন্য। শেষমেশ রাজু ভাই ই চরিত্রটি পেল।

সী বিচের ক্যামেরা বয় হিসেবে ”সাগর পুত্র ” রাজু ভাইয়ের অভিনয় দেখে মনেই হয়নি উনি নবিশ। অনেকটা পেশাদারিভাব ওনার অভিনয়ে। অনেক স্বপ্রভিত মনে হয়েছে। প্রথম যে শটে ওনাকে দেখানো হয়েছে তখনই ওনাকে সাগর পুত্র বই অন্যকিছু মনে হয়নি। সাগর পুত্রের পাশাপাশি আরো দুটি পর্যটকের চরিত্র ছিল। নতুন দম্পতি। বীচে বেড়াতে এসেছেন। পুরুষটির ভূমিকায় বাবলু ভালো অভিনয় করেছে। কিন্তু বেড়াতে আসলে এমন রোমান্টিক পরিবেশে স্ত্রীর সাথে কথোপকথনে যে ধরণের অভিব্যক্তি থাকার কথা তা বাবলু তেমন ফুটিয়ে তুলতে পারেনি। বরং এর আগে সে তার করা মিউজিক ভিডিওটিতে অনেক স্বপ্রভিত ছিল।

পর্যটকের স্ত্রীর ভূমিকায় নাদিয়া তার সীমাবদ্ধতা স্বত্ত্বেও উৎরে গেছে। প্রথম ৩/৪ মিনিটের দৃশ্যায়ন দর্শককে পুরোপুরি চোখের আনন্দ দিবে। দৃশ্যগুলোও অনেক রঙিন এবং বর্ণিল। ঘোড়া নিয়ে সাগর পুত্রের হেঁটে আসার দৃশ্য , পেছনে সাগরের নীল জলরাশির শট গুলো যথেষ্ট ভালো লেগেছে। ঝিনুকের দোকানে থেকে মালা কিনে গলায় পরার ক্লোজ শটে নাদিয়াকে দারুণ লেগেছে। একটা ব্যাপার খটকা লাগল। সাগর পুত্র পর্যটক দম্পতির ছবি তুলে দেয়ার সময় ক্যামেরার শাটারের শব্দ হচ্ছিল। অনেক গুলো জায়গায় অন্ধকার ছিল। কোন ফ্ল্যাশ ইউজ করেনি। ব্যাপারটা ক্যামেরা হাতে শাটার না টিপে ছবি তোলার ভাব করার মত মনে হচ্ছিল। এদিকটা আরো রিয়েল করা যেত।

নাদিয়ার অভিনয় যথেষ্ট ভাল ছিল। এক জায়গায় দেখলাম প্রায় সব চরিত্রই একই রকম হীনমন্যতায় ভুগেছে। সাগর পুত্রের ব্যাকগ্রাউন্ড, ফ্যামিলি, মা, বাবা ইত্যাদি দৃশ্যায়নের মাধ্যমে দেখানো সম্ভব ছিল না। তাই আশেপাশের চরিত্র গুলোর মুখ দিয়ে ডায়ালগের মাধ্যমেই সেটা বলে দেয়া হয়েছে। ”তার বাবা শিপ ব্রেকিংয়ে মারা গেছে, মা মালেশিয়া পাচার হয়েছে, ছেলেটি বড় ভাল” এই ডায়ালগটা বলার সময় সবার মুখভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছিল ব্যাপারটা আরোপিত। স্বতস্ফূর্ততা ছিল না।

পর্যটক দম্পতির ভূমিকায় বাবলু এবং নাদিয়া।

”সাগর পুত্রের ” আরো দুটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র ছিল দুজন মালেশিয়ায় আদমপাচারকারী। আদমপাচারকারী একজনের  ভূমিকায় সনি ভাইকে সত্যিই আদম পাচারকারী মনে হচ্ছিল। অপরজনের ভূমিকায় সোহেলকে সনি ভাইয়ের যোগ্য সহকারী মনে হচ্ছিল। ওদের দুজনের শট গুলো আরো ক্লোজে ভালভাবে নেয়া যেত। ফ্রেমে কেমন ধোঁয়াশা মনে হয়েছে। একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্য ছিল সাগর পুত্র তার ভাড়ায় আনা ক্যামেরাটি বিক্রি করার জন্যা কয়েকজন লোকের কাছে আসল। লোকগুলো বীচে পাথরের উপর বসে একমনে তাস খেলছে। তারা প্রত্যেকেই ওই দৃশ্যটিতে অনেক বাস্তবসম্মত অভিনয় করেছে। বিশেষ করে শফিক। ওর ডায়ালগটা অবশ্য মনে নেই। সমস্যাটা ছিল অন্যখানে । যেভাবে দৃশ্যটিকে ফ্রেমে আনা হয়েছে তাতে পুরোপুরি দৃশ্যটি আসেনি। মিডিয়াম শটের পর ক্লোজ নেওয়া যেত। এখন সাইড থেকে ক্লোজ নেওয়াতে অত ভাল আসেনি।

সাগর পুত্রের অন্যান্য লোকদের সাথে মালেশিয়াগামী বোটে উঠার দৃশ্যটি ভালো হয়েছে। মালেশিয়াগামী আদমপাচারকারী বোটগুলো অবশ্য সাইজে আরো অনেক বড় হয়। বড় বোট হয়ত পাওয়া যায়নি। তাই মিডিয়াম সাইজের বোটটাতে শুটিং করতে হয়েছে। রানা ভাই প্রডাকশনে ছিলেন। উনি অভিনয়ও করেছেন শুনেছি। এখন ওনাকে পেয়েও গেলাম একটি দৃশ্যে। উনিও আদমপাচারকারী দলের হয়ে মালেশিয়াগামী বোটে উঠেছেন এবং মালেশিয়াগামী সবার ছবি হ্যান্ডিক্যামে ধারণ করছিলেন।

মালেশিয়াগামী যাত্রীদের উদ্ধারকারী বোট।

কিছু দৃশ্য মনে রাখার মত। বিকেলে নাদিয়া বীচের পাথরের উপর হাটছে। মিড শটে আলো ছায়ার মধ্যে কালো অবয়বে নাদিয়া এবং গাছের পাতার নড়াচড়ার ফাঁকে রূপালী আলোয় সাগরের চকচকে ঢেউ। এই দৃশ্যটি খুবই ভালো লেগেছে। আরেক দৃশ্য ও উল্লেখ করার মত। সাগর পুত্র সাগরের মাঝে ভাসমান বোটে হ্যালুসিনেশনে তার মায়ের কথা ভাবছে। অনেক দূরে দ্বীপের মত পাহাড় , উপকূল রেখা। একটু পর জেটি। জেটিতে তার মা হেঁটে আসছে। সাগর পুত্র মাকে পেয়ে আবেগে কাঁদছে। এই দৃশ্যটি এতই বাস্তব সম্মত ছিল অভিনয় বলে মনেই হয়নি।

আমরা কোর্স কমপ্লিট ফর্মালিটির কারণে অনেকটা তাড়াহুড়ো করে শর্ট ফিল্মটি প্রিমিয়ার করেছি। এখনো একটি দৃশ্য এবং এডিটিংয়ে আরো কিছু সংযুক্ত করা বাকি। সব কাজ হয়ে গেলে এটা একটা ইউনিক কাজ হবে।

শুটিং ইউনিট সকালবেলা পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতে।

কোর্সটি করার সময় রাজীব ভাই অনেকগুলো শর্ট ফিল্ম দেখিয়েছেন। যেগুলো ওনার ছাত্র ছাত্রীরা তৈরি করেছেন। আমি তুলনায় যাব না। আমার ব্যক্তিগত অভিমত রাজীব ভাইয়ের দেখানো শর্ট ফিল্ম গুলোর চেয়ে এটি অনেক ভালো হয়েছে। অনেক বেশি সিনেমাটিক। নাটক নাটক ভাবটা নেই। সর্বোপরি রাজীব ভাইকে কৃতজ্ঞতা এবং পুরো ইউনিটকে ধন্যবাদ এমন একটি ভালো শর্ট ফিল্ম তৈরিতে সবার স্বতস্ফূর্ত অংশগ্রহণের জন্য।

ছবি কৃতজ্ঞতা : সনি ভাই।

(Visited 37 time, 1 visit today)

মন্তব্য করুনঃ

You must be Logged in to post comment.

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন