আলোর ফ্রেমে স্বপ্নের বিচ্ছুরণঃ সদ্য সমাপ্ত ৬ষ্ঠ আন্তর্জাতিক শিশু চলচ্চিত্র উৎসব বাংলাদেশ ২০১৩ চট্টগ্রাম এবং আমার কিছু অনুভূতি।
Share on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on TwitterPin on Pinterest0
টি আই সিতে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে শিশু দর্শকরা।

টি আই সিতে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে শিশু দর্শকরা।

 

আলোর ফ্রেমে স্বপ্নের বিচ্ছুরণঃ সদ্য সমাপ্ত ৬ষ্ঠ আন্তর্জাতিক শিশু চলচ্চিত্র উৎসব বাংলাদেশ ২০১৩ চট্টগ্রাম এবং আমার কিছু অনুভূতি।

———- আদিম পুরুষ———–

গত ১৯ শে জানুয়ারী ২০১৩ তারিখে শুরু হওয়া ৬ষ্ঠ আন্তর্জাতিক শিশু চলচ্চিত্র উৎসব বাংলাদেশ ২০১২ চট্টগ্রামের  যবনিকা  হল  গত  ২৭ শে জানুয়ারী ২০১৩ তারিখে। কেন্দ্রীয় ভাবে ঢাকায় উদ্বোধনী হয় ১৯ শে জানুয়ারী ২০১৩ তারিখে পাবলিক লাইব্রেরী  প্রাঙ্গন এবং জাতীয়  জাদুঘর মিলনায়তনে। ৭ টি বিভাগীয় শহরে একযোগে উৎসব শুরু হয়। ঢাকায় উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন চিলড্রেন ফিল্ম সোসাইটি বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক মুনীরা মোরশেদ মুননী, উৎসব পরিচালক মোরশেদুল ইসলাম, টি আই বির  প্রধান  নির্বাহী  ইফতেখারুজ্জমান, কানাডিয়ান চলচ্চিত্র নির্মাতা ন্যান্সি ট্রিটস বটকিন, ইউনিসেফের বাংলাদেশ প্রতিনিধি প্যাস্কেল ভিলেনভিঊ, চিলড্রেন ফিল্ম সোটাইটি বাংলাদেশের সভাপতি মুহাম্মদ জাফর ইকবাল ও উৎসব উপদেষ্টা পরিষদের চেয়ারম্যান মুস্তফা মনোয়ার। উদ্বোধনের পর প্রদর্শিত হয় স্পেনের একটি  আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে পুরস্কার প্রাপ্ত বাংলাদেশী চলচ্চিত্র ‘ ওয়াটার ফর লাইফ’, সুইজারল্যান্ডের ‘ দি উইন্ডো’, রাশিয়ার ‘ আম্বিশাস’ ও নেদারল্যান্ডের টনি টেন। এই ছিল ঢাকার উদ্বোধনী দিনের প্রদর্শন সূচি। একই সাথে ৭টি বিভাগীয় শহরেও উদ্বোধনী প্রদর্শনী শুরু হয়। এবারের উৎসবে এসেছেন ভারতের চলচ্চিত্রকার বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত সহ সিঙ্গাপুর, ব্রিটেন এবং কানাডার তিনজন শিশু চলচ্চিত্রকার। উৎসব স্লোগান ” ফ্রেমে ফ্রেমে আগামীর স্বপ্ন” ।

বেলুন উড়িয়ে উৎসবের উদ্বোধন।

বেলুন উড়িয়ে উৎসবের উদ্বোধন।

 

আন্তর্জাতিক শিশু চলচ্চিত্র উৎসব বাংলাদেশ– ২০০৮ সাল থেকে কেন্দ্রীয় ভাবে ঢাকায় শুরু হলেও চট্টগ্রামে আন্তর্জাতিক শিশু চলচ্চিত্র উৎসব অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে আরো আগে ২০০৫ সাল থেকে এবং দেশে প্রথম আন্তর্জাতিক শিশু চলচ্চিত্র উৎসবের উদ্যোক্তা চিলড্রেন ফিল্ম সোটাইটি চট্টগ্রাম যা ২০০৪ সালে প্রতিষ্টিত হয়। গত বছরের শেষ দিক থেকেই আমরা চট্টগ্রাম চলচ্চিত্র কেন্দ্রের সদস্যরা এই উৎসবটির জন্য মানসিক প্রস্তুতি শুরু করেছিলাম। যথা সময়ে আমাদের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়। ঢাকা থেকে পোস্টার এল। ছবির ডিভিডি আসার পর শিডিউল তৈরি,  ভেনু নির্বাচন, শিডিউল অনুযায়ী লিফলেট তৈরি ইত্যাদি কাজের পর ১৯ শে জানুয়ারী ২০১৩ তারিখে অপেক্ষার পালা ফুরোলো। ওই দিন বিকেল ৪টায় থিয়েটার ইন্সটিটিউট চট্টগ্রামের উন্মুক্ত লনে শুভ উদ্বোধন হল ৬ষ্ঠ আন্তর্জাতিক শিশু চলচ্চিত্র উৎসব বাংলাদেশ ২০১৩ চট্টগ্রামের। উদ্বোধন করেন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক  অধ্যক্ষ মোহাম্মদ আলী চৌধুরী। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে চট্টগ্রামে আন্তর্জাতিক শিশু চলচ্চিত্র উৎসব আয়োজনের পেছনের কথা , বিশ্ব শিশু চলচ্চিত্রের বর্তমান অবস্থা, শিশু চলচ্চিত্রের প্রয়োজনীয়তা, শিশু চলচ্চিত্র উন্নয়নে করণীয়, ভবিষ্যতে আরো ব্যাপক ভাবে শিশু চলচ্চিত্র উৎসব আয়োজনে বিভিন্ন পক্ষের সহযোগিতা ইত্যাদি শিশু চলচিত্র সংশ্লিষ্ট নানান দিক উঠে আসে চট্টগ্রাম চলচিত্র কেন্দ্রের পরিচালক জনাব শৈবাল চৌধুরীর উদ্বোধনী বক্তৃতায়। অনুষ্ঠানে সি এফ সির পরিচালনা কমিটির সদস্যরা শিশু চলচ্চিত্র বিষয়ে তাঁদের বক্তব্য তুলে ধরেন। অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন ইউনিসেফের চট্টগ্রাম আঞ্চলিক প্রধান মিসেস মাধুরী। তিনি তাঁর বক্তব্যে শিশুদের নিয়ে চলচ্চিত্র উৎসবে ইউনিসেফের সব সময় পাশে থাকার এবং সহযোগিতার কথা তুলে ধরেন। এছাড়া টি আই বির পক্ষ থেকেও আন্তর্জাতিক শিশু চলচ্চিত্র উৎসব নিয়ে তাঁদের অনুভূতি তুলে ধরা হয়। অনুষ্ঠানে চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক জগতের ব্যক্তিত্ব এবং শিশুদের নিয়ে কাজ করে এমন সমাজসেবীরা ও উপস্থিত ছিলেন এবং শিশু চলচ্চিত্র বিষয়ে তাদের অনুভূতি তুলে ধরেন।  প্রচুর শিশু দর্শকের উপস্থিতিতে টি আই সি মেইন অডিটোরিয়ামে শুরু হয় উদ্বোধনী প্রদর্শনী। এতে দেখানো হয় Emillie (Germany, 10 min), Just A Little (Sweden, 10 min), A Good Family (Iran, 11 min), The Boy & The Moon (Italy, 7 min) এবং Tony Ten (Netherland, 82 min).

এবারের উৎসবে ৫০ টি দেশের দুই শতাধিক শিশু চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হয়। চট্টগ্রামের উৎসবে  প্রদর্শিত হয় ৩৫ টি দেশের ৫৮ টি ছবি মোট সাতটি ভেনুতে। কেন্দ্রীয় ভাবে আয়োজনে ছিলেন চিলড্রেন ফিল্ম সোসাইটি বাংলাদেশ। স্পন্সরে ছিলেন ইউনিসেফ এবং ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ। চট্টগ্রামে ফেস্টিভ্যাল আরেঞ্জার ছিলেন চিলড্রেন ফিল্ম সোসাইটি চট্টগ্রাম, চট্টগ্রাম চলচ্চিত্র কেন্দ্র।

শিশু দর্শকরা লাইন ধরে মিলনায়তনে ঢুকছে।

শিশু দর্শকরা লাইন ধরে মিলনায়তনে ঢুকছে।

গত বছরের উৎসবেও দায়ত্বে ছিলাম কিন্ত অনেক বেশি সক্রিয় ছিলাম না। এবারের উৎসবের শহরের বাইরের একটি  ভেনুতে এবং শহরে একটি আবাসিক স্কুলে প্রদর্শনীর দায়িত্ব নেই আমরা ৫ জন। আমি, ইকবাল, মামুন ভাই, সোহেল এবং বাবলু। আগে কখনো এধরণের দায়িত্ব সরাসরি পালন করিনি। তাই কিছুটা দ্বিধাও কাজ করছিল অনভিজ্ঞতার কারণে। শহরের প্রদর্শনী চলছিল টি আই সি এবং ফুলকিতে ২১ শে জানুয়ারী পর্যন্ত। এর পরে ২২ শে জানুয়ারীতে ছিল শহরের বাইরে ফটিকছড়িতে মাইজভান্ডারী আহমদীয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে। আগের দিন সন্ধায় টি আই সি তে প্রদর্শনীর পর পুরো প্রদর্শন সিস্টেম আমাদের সি এফ সি অফিসে নিয়ে আসা হয়। পরদিন সকালেই ফটিকছড়ি রওনা দিতে হবে তাই উৎসবের ছবি গুলো, সাউন্ড সিস্টেম, প্রজেক্টর অর্থাৎ পুরো সিস্টেমটাই ইকবালের বাসায় নিয়ে যাই। এক একটা জিনিসের ওজন এত বেশী তা ওই দিন ই বুঝলাম। বিশেষ করে প্রদর্শন স্ক্রিনটা। ওটা প্রায় আমার অনুমান হিসেবে ৬ কেজির কম হবে না। ওই রাতেই সব গুলো সি এন জি করে ইকবালের বাসায় রেখে আসি। বাসায় এসে সারা দিনের ক্লান্তির কারণে ঘুম আসার কথা, কিন্তু আগামী কালের কথা ভেবে উত্তেজনায় পুরো রাত ঘুমই হয়নি। আগে থেকে আমরা ৫ জন যাওয়াটা নিশ্চিত হলেও শেষ মুহূর্তে এসে সোহেল এবং বাবলুর যাওয়ার ব্যাপারে অনিশ্চয়তা দেখা দেয় ওদের ওই দিন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিগত কাজ কিংবা অন্য কোন ব্যক্তিগত কারনে। তবে মামুন ভাই আসবেন সে ব্যাপারে পাকা কথা দিলেন। টেকনিক্যাল ব্যাপারগুলো সোহেল ভাল বোঝে। তাই একটু দুঃশ্চিন্তায় ছিলাম।

ফটিকছড়িতে আমরা ক'জন সিনেমার ফেরীওয়ালা। বাঁ থেকে বাবলু, সোহেল এবং আমি।

ফটিকছড়িতে আমরা ক’জন সিনেমার ফেরীওয়ালা। বাঁ থেকে বাবলু, সোহেল এবং আমি।

 

ফটিকছড়িতে প্রদর্শনের শিডিউল টাইম সকাল ১১ টা। তখন মাইজভান্ডারের ওরসের মৌসুম । দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে মানুষ মাইজভান্ডারে যাচ্ছে। তাই রাঙামাটি – খাগড়াছড়ি রোডে যানজটের আশংকায় আমরা সকাল ৮টায় শহর থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেই। পরদিন সকাল ৮ টায় সবাই মুরাদপুর থেকে সি এন জি তে ফটিকছড়ির উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করি। শহরে কুয়াশা থাকলেও শীতের তীব্রতা কম। যত শহর ছেড়ে গাড়ি গ্রামের দিকে এগুচ্ছে তত কুয়াশা কমছে কিন্তু হাড় কাপানো শীতল হাওয়া। রোদের মাঝেও তীব্র শীত। আমরা সকাল সাড়ে নয়টায় ফটিকছড়ি মাইজভান্ডারী আহমদিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে পৌঁছাই। স্কুল কর্তৃপক্ষ আগে থেকেই বড় একটি কক্ষকে সিনেমা প্রদর্শনের জন্য প্রস্তুত রেখেছিলেন। আমরা আমাদের সাথে আনা প্রদর্শন যন্ত্রপাতি ওই রুমে রাখলাম। উৎসবের ব্যানার গুলো টানানো জন্য বাইরে উপযুক্ত স্থান খুঁজছিলাম। স্কুলটি অনেক বড়। সাথে সামনের মাঠটিও অনেক বড়। স্কুলের বারান্দায় গাছের সাথে ব্যানার গুলো টানিয়ে দেখলাম দূর থেকে খুব বেশি দৃশ্যমান হচ্ছে না। তাই মাঠের ফুটবলের গোল পোস্টের লোহার বার গুলোতে ব্যানার গুলো টাঙ্গিয়ে দিলাম। এখন খুব সুন্দর ভাবে দৃশ্যমান হচ্ছে। সকালে রওনা হওয়ায় আমদের মধ্যে ইকবাল এবং মামুন ভাই নাস্তা করতে পারেন নি। পাশের একটি দোকানে চা নাস্তা খেলাম। এর পরই আমাদের কাজ শুরু করে দিলাম। সোহেল এবং বাবলু ফোন করে জানাল তারা আসছে। কিছুক্ষণ পর তারাও এসে পৌঁছুল।

ক্যানভাসের স্ক্রিন।

ক্যানভাসের স্ক্রিন।

 

স্কুলের রুমটাতে সাউন্ড, প্রজেকশন, ডিভিডি প্লেয়ার এগুলোর কানেকশন এবং সেটিংস ঠিক করলাম। সব চেয়ে ঝামেলা হয়েছে প্রজেকশন স্ক্রিনটা দেয়ালের সাথে টাঙানোর সময়। এখানে আসার আগে ভেবেছিলাম যেহেতু এক সাথে অনেক স্টুডেন্ট সিনেমা দেখবে তাই স্ট্যান্ডিং প্রজেকশন স্ক্রিনের চেয়ে নরমাল ক্যানভাসের স্ক্রিনই নিয়ে যাই। নরমাল ক্যানভাসের স্ক্রিন কে পুরো দেয়ালের বেশিরভাগ অংশে জুড়ে দিতে পারলে ফোকাস থেকে ইচ্ছা মত ফ্রেমের সাইজ বড় করা যাবে। পেছনের সারির দর্শকরাও সিনেমা হলের স্বাদ পাবে। এখন এত ওজনদার স্ক্রিনটাকে দেয়ালে টাঙানোতে চরম সমস্যা হচ্ছিল। দেয়ালে কোন ড্রিল নেই, পেরেক নেই। অনেক কষ্টে দু প্রান্ত লাগালাম কাজ চালানোর মত করে। স্কুলের ছেলে মেয়েরা উঁকি ঝুকি মেরে আমাদের কাজ দেখছিল আর কখন সিনেমা দেখাব জানতে চাইছিল। আমাদের সিস্টেম সেটিংস শেষ। স্কুলের মাঠে প্রাত্যহিক সমাবেশ শুরু হল। দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষক আমাদেরকে ছাত্র ছাত্রীদের সাথে পরিচয় করে দিলেন। আন্তর্জাতিক শিশু চলচ্চিত্র উৎসবের জন্য ওই দিন স্কুলে ক্লাস মুতলবি করা হয়েছিল। আমরাও আমাদের আসার উদ্দেশ্য, সিনেমা দেখানোর উদ্দেশ্য, আন্তর্জাতিক শিশু চলচ্চিত্র উৎসব সম্পর্কে ওদেরকে সংক্ষিপ্ত ধারণা দিলাম। প্রাত্যহিক সমাবেশের শেষে আমরা রুমে আসলাম। বিশাল রুমটাতে অনেক জানালা। রুম ডার্ক করতে সব জানালা বন্ধ করে দিতে হল। ততক্ষণে ছাত্র ছাত্রীরা এসে গেছে। রূমে তিল ধারনের জায়গা নেই। লগো ফিল্মটা চালালাম। এর পর শিডিউলে ছিল ”আমার বন্ধু রাশেদ” । যেহেতু গ্রাম। ছবিটা স্কুলের ছেলে মেয়েরা কতটুকু নিতে পারবে সন্ধিহান ছিলাম। এ কারনে প্রথমে উৎসবের আরেকটি ছবি জার্মানির ১০ মিনিটের এনিমেশন ফিল্ম ”এমিলি” চালালাম। প্রচন্ড তালি দিয়ে ওরা ছবিটি উপভোগ করল। এর পরই ” আমার বন্ধু রাশেদ ” প্লে করলাম। রুমে জায়গা নেই। বারান্দায় ভিড় করছে আরো অনেক ছাত্র ছাত্রী। বদ্ধ রুমে জানালার ফোঁকর দিয়ে উঁকি মেরে দেখার চেষ্টা করছে।

টেস্টিং- লগো ফিল্ম।

টেস্টিং- লগো ফিল্ম।

 

কিশোর মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে ছবির গল্প। শিশুদের বৈশিষ্ট্যই হল যখনই ওরা ভিজ্যুয়াল মিডিয়ায় তাদের প্রতিনিধি দেখতে পায় সেটা তারা বুঝুক, না বুঝুক গ্রহণ করে। এখানেও তার ব্যতিক্রম হয়নি রাশেদ কিশোর মুক্তিযোদ্ধা, স্কুলে পড়ে, ইবুর সাথে মুক্তি বাহিনীর ক্যাম্পে যাওয়া, স্কুলের নানান মজার ঘটনা সব কিছুই শিশু কিশোর দর্শকরা মনোযোগ দিয়ে দেখছিল। কিছু ক্ষেত্রে শহরের শিশু দর্শকদের আবেগের সাথে এখানকার শিশুদের আবেগের পার্থক্য চোখে পড়ল। যেখানে একটি দৃশ্যে শহরের একজন শিশু -কিশোর মন খারাপ করবে সেখানে এ ধরণের একটি দৃশ্যে এখানকার শিশুরা উৎফুল্ল হয়ে হাসছে। বাবা – মায়ের স্বাভাবিক আবেগের দৃশ্যে কিশোরী দর্শকদের কয়েকজন বিব্রত/ লজ্জা পেয়ে রুম ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য উঠে। পর ক্ষণেই অন্য দৃশ্যের অবতারনা হওয়ায় তারা স্বাভাবিক হয়। এতে একটা বিষয় পরিষ্কার উপলব্ধি করা যায়, রক্ষণশীল পরিবেশের কারণে স্বাভাবিক অনেক কিছু মন থেকে মেনে নেয়ার মানসিকতা এখনো তাদের গড়ে ওঠে নি। ঠিক বিপরীত চিত্র দেখলাম ওই ছবির একটি দৃশ্যে ম্যাচিউরড নায়িকার সাথে নায়কের রোমান্টিক কথনের সময় ওরা স্বাভাবিকভাবে নিল দৃশ্যটা। এ আপাত স্ববিরোধী মনোভাবটা কেমন অদ্ভূত ঠেকল। এখানে টেকনিক্যাল কোন সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়নি। শীত কাল। তাই লোড শেডিংয়ের ঝামেলা হবে না এমনটা নিশ্চয়তা দিয়েছিলেন স্কুল কর্তৃপক্ষ। ”আমার বন্ধু রাশেদ” প্লে করার ৩৫ মিনিটের মাথায় বিদ্যুৎ চলে গেল। অন্ধকার রুমে বিশৃঙ্কল অবস্থার মধ্যে শিশু দর্শকরা বেরিয়ে মাঠে ঘোরা ফেরা করতে লাগল। এই চান্সে আমরা ও হালকা চা পর্ব সেরে নিলাম। প্রায় ১ ঘন্টা পর বিদ্যুৎ আসে। ছবি পুনরায় শুরু হয়। ভেবেছিলাম বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারনে ছাত্র ছাত্রীরা হয়ত পুনরায় আসবে না। যেহেতু ক্লাস নেই, সুতরাং সম্ভাবনাটা ছিলই। কিন্তু আমাদের ধারণা পাল্টে দিয়ে সবাই পুনরায় আসল। ছবি পুনরায় শুরু হল। স্কুলের আয়া থেকে শুরু করে সব শিক্ষক মনোযোগ দিয়ে ছবি দেখছিল। এপর্যায়ে শিশু দর্শকদের প্রতিক্রিয়া আগের চেয়ে ভিন্ন মনে হল। যারা ছবিটি দেখছে তাদের বয়স সর্ব নিম্ন ৮ থেকে সর্বোচ্চ ১৪ বছর। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ওরা বই, টেলিভিশনে যতটুকু দেখেছে তার ভিত্তিতেই ওদের প্রতিক্রিয়া বোঝা যাচ্ছিল। মুক্তি বাহিনীর সফল অপারেশনের দৃশ্যে , রাজাকারদের হেনস্থা হওয়ার দৃশ্যে ওদের চোখের উৎফুল্ল প্রতিক্রিয়ায় আমরা শিশুদের মাঝে সদা জাগ্রত দেশত্ববোধ দেখতে পাই। ছবি শেষ হওয়ার পর দেখি কেউ হাত তালি দেয়নি। শিশু দর্শকরা রাশেদের মৃত্যু স্বাভাবিক ভাবে নিতে পারেনি। কেউ একজন হাত তালি দিয়ে উঠল। সাথে সাথে পুরো রুমের সবাই একসাথে হাত তালি দিল। এই হাত তালিটা পরিচালকের প্রাপ্য।  মুক্তি যুদ্ধ ভিত্তিক আরো বেশী শিশুতোষ চলচ্চিত্র নির্মাণ হওয়া দরকার। একজন প্রবীণ শিক্ষক বললেন ” তোমরা যে ছবিটি দেখাতে নিয়ে এসেছ আমরা ঠিক ছবির কিশোর চরিত্র গুলোর মতই ছিলাম। মুক্তিযুদ্ধ কালীন বরং এর চেয়ে ভয়াবহ অবস্থা বিরাজমান ছিল। ”

আলোর ফ্রেমে স্বপ্নের বিচ্ছুরণ।

আলোর ফ্রেমে স্বপ্নের বিচ্ছুরণ।

 

প্রথম শো শেষ হওয়ার পর দুপুরের খাবারের বিরতি। ইকবালের গ্রামের বাড়ী স্কুলের অনতি দূরেই। আমাদের দুপুরের খাবারটা ওদের বাড়ি থেকেই এল। খেয়ে সবাই আশে পাশের দৃশ্য দেখতে বেরুলুম। স্কুলের আশে পাশের প্রাকৃতিক পরিবেশ খুবই মনোরম। প্রাচীন বট, অশ্বথ বৃক্ষের বন, আশে পাশে ছোট টিলা,পাহাড়, বন-জঙ্গল , বড় পুকুর, ছোট বাজার সব মিলিয়ে পর্যটনের একটি অবহ বিরাজমান। স্কুল থিম নিয়ে যেকোন শিশুতোষ ছবি শুটিং করার উপযুক্ত বলা যায়। পাশের দোকান থেকে চা খাওয়ার পর স্কুলের রুমে ফিরলাম। প্রায় ২ টায় শুরু হল দ্বিতীয় পর্যায়। শিশু দর্শকের অধিকাংশই এই প্রথম বড় পর্দায় ছবি দেখছে। অনেকে ছবি শুরুর আগে দেয়ালে লাগানো ক্যানভাসের মোটা স্ক্রিনটা ছুঁয়ে দেখছে। একজন আরেক জনকে বলছে ” হর ইয়ানোত টিভির নান ছবি দেহাইবো (পর্দাটায় টিভির মত ছবি দেখা যাবে)। এবারের প্রদর্শন সূচিতে ছিল ইন্দোনেশিয়ার ছবি ” The Mirror Never Lies” ২০১১ সালে মুক্তি পাওয়া ছবিটি পরিচালনা করেছেন কামিলা আন্দিনি। রান টাইম ৯০ মিনিট। ইন্দোনেশিয়ান ছবি আগে তেমন দেখা হয়নি। একটা পারফেক্ট সিনেমা বলতে যা বোঝায় তার সবই ছিল ”দি মিরর নেভার লাইস” এ। সিনেমার প্রতিটি ফ্রেম থেকে যেন স্বপ্নের বর্ণিল রংয়ের বিচ্ছুরণ ঘটছিল। শিশু – কিশোর দর্শকরা ছবিটির প্রতিটি মুহুর্তই উপভোগ করছিল। এমনকি আমিও ওই নব্বই মিনিট সিনেমার ভিতরেই ছিলাম। এবারে উৎসবে যত গুলো ছবি এসেছে তাদের মধ্যে আমি এটাকেই নিঃসন্দেহে পছন্দের তালিকায় শীর্ষে রাখব। গল্পের প্লট, দৃশ্যায়ন সবকিছু এমনই ছিল নিশ্চিত এই ছবিটি দেখার পর তাদের মনের জানালার নতুন একটি কপাট খুলে গিয়েছে। আমার দেখা এ পর্যন্ত কোন শিশুতোষ ছবির সাথে এর কোন দিক থেকে মিল খুঁজে পেলাম না। সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি মাত্রা। ছবিটি প্রদর্শনের সময় প্রতিটি দৃশ্যের সাথে তালি, শীষ , অনেকে ছবির শিশু চরিত্র গুলোর নাচের তালে নেচে ছবিটি উপভোগ করছিল। পর পর দুটো প্রদর্শনী দর্শক নন্দিত হওয়ার মনে হল এখানে আসাটা আসলেই বৃথা যায়নি। এরপরে শিডিউলে ছিল ভারতের ছবি ” রয়েল বেঙ্গল রহস্য” । ছবিটি অনেকে দেখেছে ইতোমধ্যে। আমি এখানে প্রদর্শনের আগে দেখিনি। তখন পড়ন্ত বিকেল। ইন্দোনেশিয়ান ছবিটি দেখার পর ”রয়েল বেঙ্গল রহস্য” কিশোর দর্শকরা গ্রহন করতে পারেনি। বিকেলের দিকে অনেকে বাড়িতে ফিরে যাওয়ার তাড়াও ছিল। অবস্থা উপলব্ধি করে প্রায় ৩৫ মিনিট প্রদর্শনের পর আমরা ওটার পরিবর্তে  উৎসবে আসা আরো কয়েকটি শর্ট এনিমেশন ফিল্ম প্রদর্শন করে সিডিউল টাইমটুকু মেনটেইন করি। এরই মাঝে আমাদের চট্টগ্রাম ফেস্টিভ্যাল কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান ফটোগ্রাফার আহমেদ রাসেল ভাই ও চলে এসেছেন। এখানে প্রদর্শনী শুরু হয়েছে শিডিউল টাইমের এক ঘন্টা পর। সে কারনে বিকেল ৫টার শোটা শুরু হয় সন্ধ্যা ৬ টায়। তাই সন্ধ্যার শোতে শিশু – কিশোর দর্শকরা তেমন ছিল না। একারণে আমরা আমাদের প্রজেকশন সিস্টেম স্কুলের বাইরে উন্মূক্ত মাঠে নিয়ে আসলাম। মাঠের ফুটবল খেলার লোহার গোল বারে স্ক্রিন লাগিয়ে সেখানে সিডিউলের বাকী ছবি গুলো প্রদর্শন করলাম। এবারে সিডিউলে ছিল একটি ফুল লেন্থ এবং ৩টি শর্ট লেন্থের ইরানী ছবি। সন্ধার অন্ধকারে রাস্তা থেকে স্কুল মাঠে বড় স্ক্রিনে ছবির প্রদর্শনী দেখে আশে পাশের লোকজন মাঠে এসে ছবি দেখছিল। ওদের আগ্রহ দেখে বুঝলাম ঊন্মুক্ত মাঠে রাতে বড় পর্দায় ছবি দেখার অভিজ্ঞতা ওদের এই প্রথম।

শিশু-কিশোর দর্শকদের ভীড় নিয়ন্ত্রণের চেষ্টায় কর্তব্যরত শিক্ষক।

শিশু-কিশোর দর্শকদের ভীড় নিয়ন্ত্রণের চেষ্টায় কর্তব্যরত শিক্ষক।

 

ইরানী ছবি গুলোর মধ্যে ”A Good Family ” ভালো ছিল। একটি ভালো পরিবার বলতে আমরা কি বুঝি তা স্কুলের কয়েকজন ছাত্রের দৃষ্টিতে উঠে এসেছে। এ ছবিটি আমরা বিকেলের শোতেও দেখিয়েছিলাম। ”রয়েল বেঙ্গল রহস্য” এর পরিবর্তে শিডিউল  টাইম  মেনটেইনের  সময় প্রদর্শন করেছিলাম। স্কুল ভিত্তিক কাহিনী হওয়ার শিশু – কিশোর দর্শকরা এটি ভালো ভাবে নিয়েছিল এবং ছবিটিতে ভালো একটি ম্যাসেজ ও ছিল শিশু-কিশোরদের জন্য। এর পর শিডিউলে ছিল ”The Sound of Rain” ইরানী এই ছবিটিও ভালো ছিল। শিশুদের জন্য উপভোগ্য একটি ছবি। আমাদের শিডিউল ফিনিশড টাইম সন্ধ্যা ৭ টা। তাই বাধ্য হয়ে এ ছবিটি ৩০ মিনিট দেখানোর পর অনুষ্ঠানের সমাপ্তি করতে হল। ফেস্টিভ্যাল ভাইস চেয়ারম্যান আহমেদ রাসেল ভাই তাঁর সমাপনী বক্তব্যে উৎসবের সমাপ্তি ঘোষণা করেন এবং আগামীতে আরো ভালো ফিল্ম নিয়ে আসার আশাবাদ ব্যক্ত করেন। সর্বশেষে স্কুল কর্তৃপক্ষ, ছাত্র-ছাত্রী এবং এলাকাবাসীকে এই সফল আয়োজনের সুযোগ করে দেয়ার জন্য উৎসব কমিটির পক্ষ থেকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন।। আমাদের প্রদর্শন যন্ত্রপাতি প্যাকিং করে গাড়ী ছুটল শহরের পানে। পরদিনই ২৩ শে জানুয়ারী শহরের একটি আবাসিক স্কুল সারমন স্কুল এন্ড কলেজে ফ্যস্টিভ্যাল।

সারমন স্কুলে প্রদর্শনী।

সারমন স্কুলে প্রদর্শনী।

 

ইকবাল সারমনের শিক্ষক হওয়ায় ওই স্কুলে ভেনু নির্বাচনে বিশেষ বেগ পেতে হয় নি। সকালেই আমি আর ইকবাল আমাদের প্রদর্শন যন্ত্রপাতি নিয়ে সারমনে হাজির হলাম। স্কুলে তখন স্পোর্টস চলছিল। ক্লাস অফ। ৫ তলায় অনেক গুলো ক্লাস রুমের মাঝখানের বোর্ড সরিয়ে চেয়ার বসিয়ে ফ্লোরটিকে অডিটোরিয়ামের মত করে সাজানো হয়েছে। এখানেও ফটিকছড়ির মত স্ক্রিন টাঙানোর সমস্যায় পড়তে হয়েছে। চারপাশের খোলা জানালা গুলো দিয়ে সকালের রোদ আসছিল। হোস্টেলের ছেলেরা তাদের বিছানার চাদর নিয়ে এসে জানালা ঢেকে রুম ডার্ক করল। যথা সময়ে শুরু হল প্রদর্শনী। আগেই অনুমান করেছিলাম অনেক বেশি দর্শক সমাগম হবে। কিন্তু এত বেশি সংখ্যক শিশু-কিশোর দর্শক হবে সেটা ধারণাতেও ছিল না। হোস্টেলের ছাত্র- ছাত্রীদের বিনোদনের অভাব রয়েছে। হয়ত একারণেই এমন প্রোগ্রাম পেয়ে সবাই দেখতে এসেছে। সব চেয়ার ভর্তি হয়ে গেছে। জায়গা না পেয়ে অনেকে পিছনে দাঁড়িয়ে দেখছে। একবারে পিচ্চি বাচ্চা গুলোকে স্ক্রিনের সামনে মেঝেতে বসিয়ে দেয়া হল। এখানে শিডিউলে ছিল সুইজারল্যন্ডের ৫ মিনিটের ছবি ” The Window” এর পরই প্রদর্শন করা হয় জার্মানীর ছবি ” Wickie and the treasure of the Gods (90 min) । ক্রিশ্চিয়ান দিতার পরিচালিত এ ছবিটির কাহিনী গড়ে ওঠেছে নরডিক ফ্যাবলস নিয়ে। ফান্টাসী ধর্মী ছবিটির প্রতিটি মুহূর্তই শিশু – কিশোর দর্শকরা উপভোগ করেছে। ছবির সংগে সাবটাইটেল ছিল। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ছবি নিজেই ভাষার বাধাটা অতিক্রম করে দর্শকদের মনে জায়গা করে নেয়।  এখানেও সেটি ঘটেছে। জার্মান ভাষা কিংবা ইংরেজী সাবটাইটেল কোনটাই তেমন প্রয়োজন ছিলনা ছবিটি বোঝার জন্যে। রূপকথার গল্পের ন্যায় ছবিটির ফ্যান্টাসিতে শিশু-কিশোর দর্শকরা মুদে ছিল। ১টায় ছিল সুইডেন এবং ইরানের কয়েটি ছবির শিডিউল ছিল। ইরানী ছবি ” The sound of rain” ছিল মূল ছবি এ পর্যায়ের। কিন্তু সেটির প্রিন্ট আটকে যাওয়ায় প্রদর্শন সূচি থেকে বাদ দিতে হল। এবং তার বদলে ইন্দোনেশিয়ান ছবি ” The Mirror Never Lies” প্রদর্শন করা হল। ফটিকছড়ির স্কুলটির ন্যায় এখানেও শিশু-কিশোর দর্শকরা ছবিটি আনন্দের সাথে উপভোগ করে। দুপুর প্রায় ২টা। খাবারের বিরতি।

সারমনে দর্শকদের একাংশ।

সারমনে দর্শকদের একাংশ।

 

বিরতির পর বিকেল ৩টায় ছিল ” আমার বন্ধু রাশেদ” । সারমনের প্রিন্সিপাল এসময় ছাত্র-ছাত্রীদের উদ্দেশ্যে আন্তর্জাতিক শিশু চলচ্চিত্র উৎসবের বিভিন্ন দিক, সারা বিশ্বর শিশুদের মননের সাথে আমাদের দেশের শিশুদের মননের একাত্মতা, এবং সর্বোপরি তাঁর স্কুলকে ভেনু হিসেবে বেছে নেয়ার জন্য উৎসব কমিটিকে ধন্যবাদ জানান।এরপর শুরু হয় ” আমার বন্ধু রাশেদ” পুরো রুমে নীরবতা। সবাই সিনেমার ভিতর ঢুকে গেছে। মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক ছবি এবং প্রধান চরিত্র গুলো কিশোর হওয়ায় এখানেও শিশু – কিশোর দর্শকরা ফটিকছড়ির শিশুদের মতই আবেগ প্রকাশ করেছে। আমার আসনের ঠিক পেছনেই একটা বাচ্চা ছেলে বসেছিল। বয়স ৮ বছরের বেশি হবে না। অবাক করার মত ব্যাপার সিনেমার ডায়ালগ গুলো তার মুখস্ত। রাশেদ কিংবা ইবুর বলা ডায়ালগ গুলো সে পেছন থেকে দৃশ্য শুরু হওয়ার আগেই বলে দিচ্ছে। বাংলা ছবির প্রতি, ভালো শিশুতোষ ছবির প্রতি শিশুদের আগ্রহ এখনো হ্রাস পায়নি তা্র প্রমাণ পেলাম। বিকেল ৫টায় ছিল আমেরিকার ছবি ”The kid” । এটাও প্রিন্ট সমস্যার কারণে প্রদর্শন করা সম্ভব হয়নি। এবারের উৎসবে এই স্কুলের প্রদর্শনী গুলোতেই সবচেয়ে বেশি দর্শক পেয়েছি। সন্ধ্যায় সমাপনী বক্তব্যে ভবিষ্যতে আরো ভালো ছবি নিয়ে প্রদর্শনী করার আশাবাদ ব্যক্ত করে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘোষণা করল উৎসব কমিটি সদস্য ইকবাল হাসান।

সারমনের ক্ষুদে দর্শকদের একাংশ।

সারমনের ক্ষুদে দর্শকদের একাংশ।

 

এই দুটো প্রদর্শনীতে আমরা যারা জড়িত ছিলাম , আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা করেছি উৎসব সফল করার। কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতি বাদ দিলে এ দুটো প্রদর্শনী সফল বলা যায়। ২৬ শে জানুয়ারী ছিল শহরে পোর্ট কলোনীর দুর্বার মুক্ত স্কাউট ফিল্ডে প্রদর্শনী। এখানে প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয় সন্ধ্যা ৬ টায়। উন্মুক্ত মাঠে বিশাল স্টান্ডিং স্ক্রিন বসিয়ে। জার্মানীর তৈরি এ পর্দাটা এত ভারী হবে জানলে আমি দেরী করে প্রোগ্রামে যেতাম। এত ওজন আমি টানা ৫/৬ সেকেন্ড এক প্রান্ত ধরে রাখতে পারিনি। অনেক কষ্টে ভ্যান গাড়ীতে তুলে ওঠা মাঠে আনা হয়। প্রদর্শনী শুরু হয় বেলজিয়ামের ছবি ”The kid with a bike” দিয়ে। ৮৭ মিনিটের এ ছবিটি এখানের শিশু দর্শকরা গ্রহণ করতে পারেনি। ফরাসী ছবিগুলো এমনিতেই একটু ধীর গতির হয়। একারণে বোধ হয় অনেক বেশী দর্শক প্রতিক্রিয়া পাইনি। তাই অবস্থা উপলব্ধি করে সেটির পরিবর্তে নেদারল্যান্ডের ছবি ”Tony Ten”প্রদর্শন করা হয়। এটিও এখানে শিশু দর্শকদের মনোযোগ আকর্ষণে ব্যর্থ হয়। টনি টেন অনেক ভালো একটি ছবি। উৎসবের উদ্বোধনী দিনে টি আই সি তে এই ছবিটি শিশু দর্শকরা আনন্দের সাথে উপভোগ করে। দর্শকের মানসিকতার পার্থক্যের জন্যই হয়ত এমন হয়েছে। পরে বেশ কিছু দক্ষিণ আমেরিকান শর্ট এনিমেশন ফিল্ম প্রদর্শন করে সিডিউল শেষ করি। শুর্ট এনিমেশন ফিল্ম গুলোর মধ্যে আর্জেন্টিনার ৭ মিনিট দৈর্ঘ্যের ” Luminaris” শিশুরা আনন্দের সাথে গ্রহণ করে। ওদের স্বতস্ফূর্ত প্রতিক্রিয়া দেখে ওটা আবার প্লে করলাম। পরদিন সন্ধ্যায় বন্দরের আরেকটি ভেনুতে প্রদর্শনী। তাই যন্ত্রপাতি সব প্যাকিং করে পোর্ট কলোনীতে মিজান ভাইয়ের বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়। আবার কষ্ট করে ওই দৈত্যাকার ওজনের স্ক্রিনটা লম্বা কাঠের বাক্সে ভরে ভ্যানে পোর্ট কলোনী সবুজ সংঘ ক্লাবের মাঠে নিয়ে যাওয়া হয়। পরদিন ২৭ জানুয়ারী ওই মাঠেই ক্লোজিং সিরামনি হবে।

ইন্দোনেশিয়ান ছবি '' দ্যা মিরর নেভার লাইস'' এর একটি দৃশ্য।

ইন্দোনেশিয়ান ছবি ” দ্যা মিরর নেভার লাইস” এর একটি দৃশ্য।

 

এবারের উৎসবে আসা ছবি গুলো নিয়ে অনেক আলোচনা শুনেছি। অনেকের মতে অনেক গুলো ছবি পুরোপুরি ”শিশুতোষ ” নয়। বিষয়টি নিয়ে আমি পুরোপুরি একমত নই। সবার আগে আমাদের ” শিশুতোষ চলচ্চিত্রের সংজ্ঞা” নির্ধারণ করতে হবে। ঠিক কোন ধরণের ছবি গুলোকে আমরা শিশুতোষ ছবি বলতে পারি? শিশুতোষ ছবিতে স্বাভাবিক ম্যাচিউরড আবেগ দেখানো যাবে কিনা, যদি তা গল্পের প্রয়োজনে আবশ্যক হয়। সংজ্ঞার জটিল দিকে না গিয়ে উদাহরণ দিলে ব্যাপারটি আরো স্পষ্ট হবে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ভালো শিশুতোষ ছবি বলতে আমরা ”দিপু নাম্বার টু, এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী, ছুটির ঘন্টা এবং সাম্প্রতিক আমার বন্ধু রাশেদকে উল্লেখ করা যায়। এসব ছবি নান্দনিক এবং শিশু মনের আবেগের সাথে সংগতি পূর্ণ। আমাদের দেশের সংস্কৃতির সাথে সাংঘর্ষিক নয়। পশ্চিমা বিশ্বে একটি শিশু শৈশব থেকেই মা- বাবার প্রকাশ্যে চুম্বনকে স্বাভাবিক ভাবে নিচ্ছে। তার কাছে প্রেমিক – প্রেমিকা, বাবা-বার আবেগী চুম্বন হাসি , কান্নার মতই ইমোশন প্রকাশের একটি স্বাভাবিক পদ্ধতি এবং পশ্চিমা জীবন যাপন এবং সংস্কৃতির অংশও বটে।  তাই এ ব্যাপারগুলো পশ্চিমা শিশু দর্শকের কাছে বিশেষ গুরুত্ব পাবার মত কোন বিষয় নয়। এখন যদি ভারতীয় উপমহাদেশীয় প্রেক্ষাপট বিবেচনা করা হয় তাহলে ব্যাপারটি এখানে ঠিক উলটো। তাই পরিচালক কাহিনীর প্রয়োজনে স্বাভাবিক আবেগী দৃশ্য রাখতে চাইলেও তা পারেন না। যদি রাখেন তাহলে তা ” শিশুতোষ চলচ্চিত্র” না হয়ে সাধারণ ছবি হিসেবেই নির্মিত হবে।

আবার কিছু ছবি আছে যেগুলোতে এডাল্টরি বিষয় অবলম্বন করে কাহিনী এগুলেও দৃশ্যায়নের মুন্সিয়ানার কারণে একজন শিশু দর্শক ছবিটি দেখে আনন্দ পাবে। ঠিক একইভাবে একজন প্রাপ্ত বয়স্ক দর্শক ছবিটি দেখে চিন্তার অনেক খোরাক পাবে। উদাহরন স্বরূপ সত্যজিতের ”পিকু” কে বিবেচনা করা যায়। একজন শিশু দর্শক ছবিটিতে পিকুকে ছবি আঁকতে দেশে, বাগানে ঘুরে বেড়াতে দেখে আনন্দ পাবে। দৃশ্যায়নের মুন্সিয়ানায় শিশু দর্শকের কাছে পিকুর মায়ের পরকীয়ার ব্যাপারটি চিন্তায় আসবে না। সে পরকীয়ার নায়ককে ” কাকু” হিসেবে দেখবে। প্রাপ্ত বয়স্ক দর্শকই আসল বিষয়টি বুঝতে পারবে। এ কারণে পিকু একদিকে শিশুতোষ ছবি এবং অন্যদিকে স্বাভাবিক প্রাপ্ত বয়স্ক ছবিও বটে। এবারের উৎসবে আসা নেদারল্যান্ডের টনি টেন কেও অনেকটা ওরকম বলা যায়। নেদারল্যান্ডের প্রেক্ষাপটে নির্মিত ছবিটিতেও পরকীয়াকে কেন্দ্র করে এগিয়েছে। পরকীয়ার কারণে সন্তানের মনস্তাত্বিক সমস্যা, বাবার বান্ধবীকে মেনে নিতে না পারা, মায়ের প্রতি ভালোবাসা সব মিলে জটিল মনস্তাত্বিক টানাপোড়ন। নেদারল্যান্ডের সংস্কৃতিতে এটি একটি আদর্শ শিশুতোষ ছবি বলা যায়। কিন্তু বাংলাদেশের শিশুরা এধরণের ছবি গুলো দেখে ধাক্কা খাবে। অনেক কিছু মেনে নিতে পারবে না। কারণ এখানের সংস্কৃতির সাথে সামঞ্জস্য পাবে না। ইন্দোনেশিয়ার ছবি দ্যা মিরর নেভার লাইস ও একই সমস্যায় দুষ্ট। কিন্তু দৃশ্যায়নের ভিন্নতা, উপস্থাপনের ভিন্নতার কারণে উৎরে গেছে।

জার্মানীর ছবি ''ভিকি এন্ড দ্যা ট্রেজারস অব দ্যা গড'' এর একটি দৃশ্য।

জার্মানীর ছবি ”ভিকি এন্ড দ্যা ট্রেজারস অব দ্যা গড” এর একটি দৃশ্য।

 

যেহেতু এটা একটা আন্তর্জাতিক শিশু চলচ্চিত্র উৎসব তাই পৃথিবীর সব দেশের শিশুদের চিন্তা ভাবনা সিনেমার ফ্রেমের মাধ্যমে দেশের শিশুদের তুলে ধরাই মূল উদ্দেশ্য। এ কারণে বিদেশী শিশুতোষ ছবি গুলোতে সব কিছুই আমাদের দেশের সংস্কৃতির মতই হবে এটা আশা করাটাই ভুল। বিদেশী শিশুতোষ সব ছবিই বাংলাদেশী শিশুদের অনুকূলে নয় তাও ভুল। রেটিং করে প্রদর্শন করা গেলে এধরণের সমস্যা আর থাকে না। যেসব শিশুতোষ ছবিতে এমন দৃশ্য থাকে যা বাংলাদেশের সংস্কৃতির সাথে প্রচলিত নয়, সেগুলো ১৬- ১৮ বছরের শিশুদের দেখনো যায়। এখানে ছবি নির্বাচনে আরো অনেক বিষয় জড়িত। বিগত কয়েক বছর ধরে আন্তর্জাতিক শিশু চলচ্চিত্র উৎসবের ছবিগুলো বিভিন্ন সোর্স থেকে সংগ্রহ করেন জাতিসংঘের শিশুদের নিয়ে কাজ করে এমন সংস্থা ইউনিসেফ। তাই ওদের সংগ্রহ করা ছবি গুলো থেকেই উৎসব কমিটি প্রদর্শন উপযোগী ছবি বাছাই করেন। দেখা যায় বছর ঘুরে সারা পৃথিবীতে যত আন্তর্জাতিক শিশু চলচ্চিত্র উৎসব হয় , সব খানে ঘুরে ফিরে একই ছবি গুলোরই প্রদর্শন চলে। একারণে ছবির ” শিশুতোষ” হওয়া নিয়ে উৎসব কমিটির কোন প্রত্যক্ষ ভূমিকা নেই। আরেকটি বিষয় পীড়াদায়ক বিগত কয়েক বছরে সারা বিশ্বে উল্লেখ যোগ্য হারে শিশুতোষ চলচ্চিত্র নির্মাণের হারও কমে গেছে। শিশুতোষ চলচ্চিত্র নির্মাণে পৃথিবীতে অগ্রণী ভূমিকায় আছে স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশ গুলো। নেদারল্যান্ড, সুইডেন, জার্মানী বিগত কয়েক বছর ধরে অনেক ভালো শিশুতোষ ছবি নির্মাণ করে যাচ্ছে। একারণে আমরা প্রতিবছরই অন্তত বেশ কয়েকটা নতুন শিশুতোষ ছবি পাচ্ছি। আমরা আশা করি ইউনিসেফ তাদের সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে এবং উৎসব কমিটির কাছ থেকে আগামীতে আরো ভালো ছবি প্রদর্শনের জন্য পাব। আলোর ফ্রেমে বিচ্ছুরণ হোক আগামীর স্বপ্ন।

s1


মন্তব্য করুনঃ

You must be Logged in to post comment.

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন