অজানা স্পিলবার্গঃ আন অথরাইজড বায়োগ্রাফী

s1494468

অজানা স্পিলবার্গঃ আন অথরাইজড বায়োগ্রাফী

—— আদিম পুরুষ——-

The Unauthorized Biography : Steven Spielberg -By- John Baxter. অনেক আগে সি এফ সি আর্কাইভ থেকে এই বইটা পড়তে নিয়েছিলাম। আজ পড়া শেষ হল। টানা ছয় মাস লেগেছে পড়তে। যখন সময় পাই তখন অল্প অল্প পড়ি। একারণে এত দীর্ঘ সময় লেগেছে। ইংরেজী এত জটিল হতে পারে এই বইটি পড়ার আগে ধারনাতেও ছিল না। অস্ট্রেলিয়ান ইংলিশে লেখা। একারণে বোধহয় এত অপরিচিত শব্দের সমাহার বই জুড়ে। স্টিভেন স্পিলবার্গ আমার প্রিয় হলিউডি পরিচালকদের মধ্যে একজন। সত্তর দশকের শুরুতে পুরান হলিউড তার ক্লাসিক্যাল খোলস ছেড়ে নিউ হলিউডে পদার্পনের করেছে। জর্জ লুকাসের সাথে স্পিলবার্গও নিউ হলিউডের সেই নতুন ধারণার মিছিলে সামিল হয়েছিলেন। তাঁর ফিল্ম ক্যারিয়ারের উত্থানের সময়কার দিকের হলিউডের পরিবেশ, নতুন হিসেবে পুরনো মায়েস্ত্রোদের ভিড়ে নিজের জায়গা করে নেওয়া , তাঁর শৈশব, কৈশোর, ফিল্মের প্রতি অনুরাগ সবকিছুই ডিটেইলস তুলে ধরেছেন লেখক। জর্জ লুকাসের পর নিউ হলিউডে নতুন ধারার সাই ফাই সিনেমার দিকপাল স্পিলবার্গ। সাই ফাই সিনেমাকে গৎবাঁধা ফর্মূলা থেকে বের করে তিনি নিয়ে গিয়েছিলেন নতুন একটি দিগন্তে যেখানে মানুষের আবেগের সাথে এলিয়েনের আবেগ মিশে সৃষ্ট ঐকতান আশার কথা বলে, প্রমিজের কথা বলে, সুন্দর স্বপ্ন নিয়ে জীবনের কথা বলে। ইটি দিয়ে সূচনা, এর পর ক্লোজ এনকাঊন্টার, পর্যায়ক্রমে জুরাসিক পার্ক সিরিজ।

স্পিলবার্গ নিয়ে আমাদের মধ্যে প্রচলিত সাধারণ অনেক ধারণা আছে। এই বইয়ে লেখক এসব ধারণা ভেঙ্গে দিয়েছেন। ফিল্ম ডিরেক্টর বলতে আমরা যে ইমেজটি মনে লালন করি তার অনেক কিছুই স্পিলবার্গের সাথে মিলবে না। আকিরা কুশাওয়ারা, ঋত্বিক ঘটক, কিংবা সত্যজিত রায়ের ফিল্মের প্রতি যেরকম কিছু সাধারণ অনুরাগ দেখি তার সিকি ভাগ ও স্পিলবার্গের ছিল না। বলতে গেলে ভাগ্য এবং সঠিক স্টুডিওতে নিজেকে নিয়োজিত করাটাই তাঁর জীবনের গতি পাল্টে দেয়। ফিল্মের প্রতি একেবারে প্যাশন না থাকলে কেউ ফিল্ম লাইনে আসবে না এটা যেমন সঠিক তেমনি সবাই প্যাশন থেকেই ফিল্ম লাইনে আসে না এটাও সঠিক। ফিল্মের রঙিন জগতে অনেকে অনেক উদ্দেশ্য নিয়ে আগমণ করে। এখানে শিল্পের সাথে বাণিজ্যে একই জাহাজের যাত্রী। একটিকে ছাড়া অন্যটি অচল। অনেক পরিচালক শিল্পকে বেশি গুরুত্ব দেন। বাণিজ্য তাদের কাছে গৌণ। সিনেমার ইতিহাসে দেখা যায় এধরণের পরিচালকদের সিনেমাই শেষ মেশ কালের গর্ভে টিকে থাকে। কিছু পরিচালক শিল্পের সাথে বাণিজ্যের সাম্যবস্থা রক্ষা করে চলেন। কিছু পরিচালকের কাছে বাণিজ্যটাই মূখ্য। স্পিলবার্গ  দ্বিতীয় ক্যাটাগরিতে পড়েন। টিভি সিরিজ দিয়েই প্রফেশনাল পরিচালক হিসেবে কাজ শুরু করেন। টিভি সিরিজ গুলোতে রেটিং একটি মূখ্য বিবেচ্য বিষয়। রেটিং এর সাথে বাণিজ্যিক  স্পন্সরও জড়িত ; হয়ত একারণেই পরিচালক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাবার শুরু থেকেই তাকে তার কাজের মান, শিল্পের চেয়ে দর্শক চাহিদা, দর্শক প্রতিক্রিয়া , ব্যবসা কেমন হবে সেটাতেই বেশী মনযোগী হতে দেখা যায়। যা একজন পরিচালক হিসেবে ফিল্মের প্যাশনের সাথে সাংঘর্ষিক।

পোল্যান্ডে শিন্ডলার লিস্ট ছবির সেটে স্পিলবার্গ।

পোল্যান্ডে শিন্ডলার লিস্ট ছবির সেটে স্পিলবার্গ।

শুরুর দিকে অন্য দশ জন নবিশের মতই নিজের তৈরি কিছু ডকুমেন্টারী নিয়ে হলিঊডের স্টুডিউতে জুতোর তলা ক্ষয়। ভাগ্যক্রমে ইউনিভার্সালে  ছোট প্রডাকশন ইঊনিটে চাকরি লাভ, এভাবেই তার ফিল্মে যাত্রা শুরু। জর্জ লুকাসের সাথে পরিচয় এবং বন্ধুত্ব তাকে বড় বড় স্টুডিও এবং স্বাধীন প্রযোজকদের সান্নিধ্যে আসতে উপযুক্ত অনুঘটকের ভূমিকা পালন করে। একজন ভালো পরিচালক হতে গেলে প্রয়োজন অনেক বেশী বিষয়ে ব্যাপক পড়া শুনা। যা স্পিলবার্গের ছিল না। তার জবানিতেই স্পষ্ঠ তিনি কখনো একটি বই পুরো পুরি পড়েন নি। বই পড়ার চেয়ে টিভি এবং সিনেমা দেখাতেই তাঁর আগ্রহ বেশী ছিল। হয়ত একারণেই তিনি অনেক বেশী ডিটেইলস এবং ইতিহাস আশ্রিত বিষয়কে সিনেমা তৈরির জন্য বেছে নিতেন না। তার পরিবর্তে আপাত সমসাময়িক এবং বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর দিকেই তাঁর ঝোঁক বেশী ছিল। তাঁর বেশিরভাগ ছবিতেই তিনি ভাড়া করা লেখক দিয়ে চিত্রনাট্য লেখাতেন এবং সেই চিত্রনাট্য নিজের পছন্দ না হওয়া পর্যন্ত লেখক কে দিয়ে উপর্যপরি সংশোধন করাতেন। ইতিহাস আশ্রিত একটি উপন্যাসের প্লট তাঁর পছন্দ হওয়ায় তিনি সেটা চিত্রনাট্যে রূপ দেয়ার প্রয়াস নেন। এলিস ওয়াকারের ”The Color Purple” উপন্যাসের পটভূমি আঠার শতকের  আফ্রিকা থেকে উনিশ শতকের শুরুর দিকের আমেরিকার নিগ্রো দাস অধ্যুষিত কৃষি ফার্ম। এই বিস্তৃত পটভূমিতে কাহিনী বিস্তৃত। স্পিলবার্গ  ”The Color Purple” কে সিনেমায় রূপ দেয়া অবধি একবার ও বইটি পড়ে দেখেন নি। চিত্রনাট্যটি পড়েছেন। এই হল একজন পরিচাকক হিসেবে সিনেমার প্রতি স্পিলবার্গের প্যাশনের নমুনা। একটি ব্যাপারে তিনি অন্য পরিচাকলদের চেয়ে ব্যতিক্রম। তিনি কখনো স্টার ইমেজের নায়কদের তাঁর পরিচালিত ছবিতে নেয়ার আগ্রহ দেখাতেন না। চরিত্র যাকে ডিমান্ড করে তাকেই তিনি নিতেন। এ কারণে তাঁর শুরুর দিকের ছবিগুলোতে তখনকার সময়ের হলিউডের পরিচিত মুখদের উপস্থিতি কম থাকত।

স্পিলবার্গ চূড়ান্ত রকমের পেশাদার ছিলেন। এখন আমরা আধুনিক সাই ফাই ক্লাসিকের লিস্ট করতে বললে জুরাসিক পার্ক সিরিজের সবগুলো ছবিই তালিকায় আসবে। অবাক করার মত ব্যাপার হল স্পিলবার্গ নিজে জুরাসিক পার্ক নিয়ে ছবি বানানোতে আগ্রহী ছিলেন না। বেশ কয়েকজন প্রযোজকের হাত ঘুরে মূল বইয়ের স্বত্ত্ব স্পিলবার্গের প্রযোজনা সংস্থা কিনে নেন। ঠিক ওই সময় আরো একটি বিষয়ের উপর ছবি বানানোর চিন্তা ভাবনা করেন তিনি। তা হল ” Schindler’s List ” । এখানেও চিত্রনাট্য তৈরির আগে এবং পরে মূল বইটি তিনি পড়েন নি। । বরং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের হলোকাস্টের  উপর নির্মিত ডকুমেন্টারী গুলো ভালোভাবে দেখেন।  ছবিটিও বানানোর জন্য অত বেশি আগ্রহী ছিলেন না। মূল লেখক  এবং পরিচিত বলয়ের প্রভাবে তিনি এটি নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেন। একই সাথে চলে জুরাসিক পার্কের নির্মান কাজ ও। সপ্তাহের কিছু দিন জুরাসিক পার্কের জন্য এবং কিছু দিন শিন্ডলার লিস্টের জন্য ব্যয় করেন। হয়ত বাণিজ্য এবং শিল্পের দোটানায় পড়ে তিনি কোনটা ছেড়ে কোনটা রাখবেন এ দ্বিধায় ভুগছিলেন। জুরাসিক পার্ক দিয়ে বাণিজ্য হবে এটা তিনি দেরীতে হলেও বুঝেছিলেন। আগাম খবর চাঊর হওয়ায় আমেরিকান টিনেজ এবং যুবক শ্রেণী আরেকটি ইটি’র মত ছবির অপেক্ষায় ছিলেন। অন্যদিকে নিজে ইহুদি হওয়ায় শিন্ডলার লিস্ট নিয়ে ছবি করার জন্য নিজ ধর্মীয় সম্প্রদায়ের কাছে ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতাও ছিল। একারণে তিনি শিন্ডলার লিস্টের জন্য যে পরিমাণ পরিশ্রম করেছেন তা অন্য কোন ছবির জন্য ওই সময় পর্যন্ত করেননি। ফলাফল ও পেয়েছিলেন নগদ। ১৯৯৪ সালের অস্কারে শিন্ডলার লিস্ট শ্রেষ্ট পরিচালক, শ্রেষ্ট ছবি সহ অস্কারের ৭টি বিভাগে পুরষ্কার জিতে নেয়। এর পর আর তাঁকে পিছনে তাকাতে হয়নি। একই বছর শিন্ডলার লিস্টের সাথে জুরাসিক পার্ক ও অস্কারের ৩ টি শাখায় পুরষ্কার জিতে নেয়। যে সময় শিন্ডলার লিস্টের কাজ চলছিল , একই সময় জুরাসিক পার্কের শুটিং ও চলছিল। শিন্ডলার লিস্টের শুটিং এ স্পিলবার্গ পোল্যান্ডে। একই সময়ে হাওয়াইয়ে চলছিল জুরাসিক পার্কের শুটিং। জুরাসিক পার্কের শুটিং এ তদারকিতে ছিলেন জর্জ লুকাস। তাই সমালোচকদের অনেকে জুরাসিক পার্ককে যতটা না স্পিলবার্গ ছবি মনে করেন তার চেয়ে সেটাকে জর্জ লুকাসের ছবি বলতেই বেশি পছন্দ করেন। একই কথা ” The Color Purple” এর ক্ষেত্রেও কিছুটা খাটে। এটার আফ্রিকার অংশের শুটিংএ স্পিলবার্গ তেমন ছিলেন ই না , ওই অংশের শুটিং অন্য একজন সহকারী পরিচালককে দিয়ে করান।  ওই সময় স্পিলবার্গ আমেরিকার অংশের শুটিং এ ডিরেকশনে ছিলেন।

936full-steven-spielberg
পরিচালক হিসেবে একটি বিষয়ে স্পিলবার্গ অন্য পরিচালকদের তুলনায় ভিন্ন। ওই সময়কার হলিউড পরিচালকদের মধ্যে নারী ঘটিত নোংরা স্ক্যান্ডাল, নেশা অনেকটা সাধারণ ছিল। স্পিলবার্গকে নিয়ে এধরণের কোন স্ক্যান্ডাল কখনো প্রকাশিত হয়নি। এমনকি তিনি ওই সময় ওকাশনালি ড্রিংকস ও করতেন না। জীবনীর প্রথম দিকে স্পিলবার্গের টিনেজ লাইফ, কলেজ লাইফের অনেক মজার ঘটনা ঊঠে এসেছে। স্পিলবার্গ অনেক পরে অকপটে নির্জন মোটেলে মেয়ে বান্ধবীর কাছে ভার্জিনিটি হারানোর গল্প, কৈশোরে বাবার কিনে দেওয়া হ্যন্ডি ক্যামেরায় পিকনিকের ভিডিও চিত্র ধারণ, বয় স্কাউট হিসেবে কাজ করা, হাই স্কুলে থাকালালীন স্বল্প বাজেটে  ২য় বিশ্ব যুদ্ধের প্রেক্ষাপ্টে নির্মিত ছবি স্থানীয় মুভি থিয়েটারে কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা , আরো অনেক বিষয় উঠে আসে। পরিচালক হিসেবে আরো কিছু বিষয়ে স্পিলবার্গ অন্যদের চেয়ে আলাদা। তাঁর ছবির শুটিং এ অভিনেতা অভিনেত্রীরা ছবির কাহিনী কি তা জানত না। স্পিলবার্গ কাস্ট চূড়ান্ত করার সময় চুক্তির অংশ হিসেবে এটি থাকত। স্পিলবার্গ তাৎক্ষণিক সিন এবং ডায়ালগ বুঝিয়ে দিতেন। সেভাবে কাস্টরা অভিনয় করত। ইটির শুটিংএ অভিনেতা অভিনেত্রীরা জানত ই না এটি একটি সাই – ফাই ছবি। লক্ষ্যে পৌঁছুতে তিনি অমানুষিক পরিশ্রম করতে পারতেন। সিনেমা নির্মাণকে তিনি নেশার পাশা পাশি পেশা হিসেবে নিয়েছেন এবং উভয় ক্ষেত্রেই সফল হয়েছেন। ব্যক্তিগত জীবনের নানান দিক ও ঊঠে এসেছে। প্রথম প্রেমিকার সাথে বিয়ে এবং পরে ডিভোর্স, পুনরায় প্রেমে পড়া এবং বিয়ে ইত্যাদি। পরিচালক হিসেবে স্পিলবার্গ শুরু থেকেই সফল। সব সময়ই মিডিয়ায় আলোচনায় থেকেছেন। কখনো অর্থ কষ্টে ভুগেননি। কালের প্রবাহে তার সব ছবি হয়ত টিকে থাকবে না। সাই ফাই ছবির ইতিহাসে, নতুন হলিউডের ইতিহাসে, সিনেমার ইতিহাসে তাঁর নাম থাকবে।

(Visited 68 time, 1 visit today)

এই পোস্টটিতে ১টি মন্তব্য করা হয়েছে

  1. qamark67 says:

    The Unauthorized Biography : Steven Spielberg-পিডিএফটা কি আপলোড করা যায় বা ডাউনলোড লিংক দেওয়া যায়???
    Google এ খুজলাম,সুবিধা করতে পারি নাই।

মন্তব্য করুনঃ

You must be Logged in to post comment.

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন