টেলিভিশন – একটা খুবই ভাল মুভি, যেটা সবার জন্য না।

television-(5)

ফারুকি একজন দক্ষ নির্মাতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে ফেললেন টেলিভিশন দিয়ে। এর আগে থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বারে যেমন শহুরে আধুনিক জীবন কে চমৎকারভাবে তুলে ধরেছিলেন, তেমনি টেলিভিশনে অজ গ্রাম্য জীবনকে একিরকম দক্ষতার সাথে প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছেন বড় পর্দায়। আজকে হলে সন্ধ্যার সো দেখতে গিয়ে মানুষের যেই ঢল দেখেছি, তাতে বাংলা সিনেমার দিনকাল পরিবর্তনের ছোঁয়া ভাল মতই লেগেছে বলা যায়।

484064_10151134566985469_2022329900_n

এখন টেলিভিশন সম্পর্কে আমার কিছু ব্যাক্তিগত মতামত শেয়ার করব।

সম্পূর্ণ অরিজিনাল একটা কনসেপ্ট কে সাফল্যের সাথে ফিকশানালাইজ করতে পেরেছেন ফারুকি। অনেক গুলা রিভিউতে পড়েছি, যে মুভিটার গল্প বলে বোঝা যায় না প্রথম থেকেই। দৃশ্যগুলার অন্তর্নিহিত অর্থ বলে অনেকেই বুঝতে পারেননি। কিন্তু আমার কাছে তো বেশ সহজবোধ্য মনে হল। এখানে গল্পবলিয়ে প্রশংসার দাবীদার। কেননা, সম্পূর্ণ আঞ্চলিক ( নোয়াখালী ) ভাষার মুভিটায় বেশিরভাগ সময়ই কথা বুঝতে সমস্যা হচ্ছিল আমার। বাকিদের টা জানিনা, তবে অবশ্যই সাবটাইটেল থাকতে পারত বলে আমি মনে করি। না হলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সংলাপ মিস হয়ে যায়।

অনেক টিভি নাটকেই আমরা নোয়াখালী ভাষা ব্যবহার দেখে এসেছি, বেশিরভাগ সময়ই সেখানে অভিনেতারা উচ্চারণে অপটু থাকার কারনে খুব একটা বুঝতে সমস্যা হয়না। কিন্তু এখানে ফারুকি বেশিরভাগ অভিনেতা দের কাছ থেকে প্রকৃষ্ট উচ্চারণ বের করে এনেছেন। চমকপ্রদ হয়েছি – তিনি মূল চরিত্রগুলা ব্যতিত প্রায় সব ছোটখাটো অভিনেতা দের ক্ষেত্রেও সত্যিকারের নোয়াখালী অঞ্ছলের মানুষদের কাস্ট করেছেন ! যে কারনে পুরো মুভিটাই দারুণ বিশ্বাসযোগ্যভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। ব্যাপারটা ভাল লেগেছে আমার।

182111_296192047150756_134423446_n

টেলিভিশন মূলত একটা সামাজিক ড্রামা , যেটার ভেতর দিয়ে গল্পকার একটা কঠিন বক্তব্য তুলে ধরেছেন, যে ব্যাপারটা আসলেই ভাববার বিষয়। টেলিভিশন এর ব্যাপারে কোন একটা পক্ষ না নিয়ে দুই পক্ষেই চমৎকার এবং শক্তিশালী কিছু যুক্তি দেখানো হয়েছে। তবে শুধু টেলিভিশন নয়, সর্বোপরি আধুনিকতার সাথে ধর্মীয় গোঁড়ামির চিরন্তন দ্বন্দ্বই যেন ফুটে উঠেছে এখানে।

483467_10151339668435469_35235881_n

গ্রামের বয়স্ক চেয়ারম্যান একজন ধর্মপ্রাণ মুসল্লি, যার বিশ্বাসে টেলিভিশন থেকে শুরু করে মোবাইল ফোন, ক্যামেরা সবই হারাম। গ্রামে তার একার আইনে কেউ টিভি দেখতে পারবেনা। এমনকি এক হিন্দু গ্রামবাসী যখন তাদের ধর্মে টিভি এর মানা নেই বলে টিভি কিনে আনে, তখনও তার উপর আইন জারি হয়, কোন মুসলমান তার বাসায় গিয়ে টিভি দেখলে তার কঠিন শাস্তি হবে। কেউ তার কথার প্রতিবাদ করলেই তিনি তাদের জন্য যা যা করেছেন, সেসবের উসিলা দেখান। তাই কেউ তেমন কিছু করতে পারেনা। এই বিরোধই মুভি এর মূল বিষয়।

424427_326710107444746_1632753818_n

এর পাশাপাশি একটা ত্রিভুজ প্রেমের গল্প আছে, যেখানে চেয়ারম্যানের একমাত্র ছেলে চঞ্চল আরেক বাড়ির মেয়ে তিশার সাথে প্রেম করে। মোশারফ করিম চেয়ারম্যানের বাড়ীতেই কাজ করে। যে ছোটবেলা থেকে আবার তিশাকে ভালোবাসে। কিন্তু তিশা তাকে কখনওই গণায় ধরেনি। চঞ্চল প্রেমের সুবিধার্থে বিভিন্ন সময়ে মোশারফের সহায়তা নেয়। এই প্রেমের জটিলতায়ও ফারুকি বুদ্ধিমত্তার সাথে মুভি এর মূল বিষয়টা ব্যবহার করেন।

184432_10151368104310469_938468457_n

এটা একটা দক্ষ ফিল্ম মেকিং। দেখার পর বুঝলাম কেন ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে বাইরের নির্মাতা দের কাছেও বহুল প্রশংসা কুড়িয়েছেন ফারুকি।

দুর্দান্ত শিল্প নির্দেশনা এই মুভি এর সব চেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক। মনপুরার মত এখানেও অনেক দৃশ্য আছে, যেগুলা দেখে প্রশংসা না করে পারা যায়না। এছাড়া সিনেমাটোগ্রাফি ভাল। তবে Shaky Camera এর ব্যবহার প্রায়ই একটু মাত্রাতিরিক্ত মনে হয়েছে। তাছাড়া ভাষাগত জটিলতা তো ছিলই।734072_326996070749483_908694709_n1

এই প্রথম গানের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছি প্রকটভাবে কোন মুভি তে। চিরকুটের “কানামাছি” মুভি এর আবহ সঙ্গীতের মতই ছিল। মুভিটা দেখার পর গানটা আসলেই বেশ মনে ধরবে। কিন্তু এ ছাড়া আর কোন গানের কথা মনে করতে পারছিনা আমি হৃদয় খানের গানের ২টা লাইন বেজেছিল একটা সময়ে, তবে একেবারেই ভাল লাগেনাই। গ্রামের পটভূমিতে হৃদয় খানের মত শহুরে গায়কের অন্তর্ভুক্তি কোন যুক্তিতেই মেলাতে পারলাম না আমি। বাংলাদেশে কি সঙ্গীত শিল্পীর অভাব পড়েছে? আইয়ুব বাচ্চুর কোন গান কি ছিল মুভি তে? মনে করতে পারিনা। এখানেই মুভিটার একাধিকার বার হলে গিয়ে দেখার সম্ভাবনা কমে গেল বলে আমি মনে করি। যে কারনে মনপুরা আমি ৩ বার হলে দেখেছি, অসংখ্যবার বাসায়।

সম্পাদনা আরও ভাল হতে পারত। দৃশ্যগুলা বেশিরভাগ সময়ই সিঙ্ক্রনাইজড লাগেনাই, যে কারনে মুভিটা একনাগারে দেখার ফ্লোটা প্রায়ই নষ্ট হয়েছে।

এবার আসি অভিনয়ে।

428349_10151409855255469_1021185664_n

টেলিভিশনের পোস্টারে ৩ নায়ক নায়িকার প্রাধান্য থাকলেও বাস্তবে এর নায়ক আমার কাছে অন্তত কাজী শাহির হুদা রুমি, চেয়ারম্যানের চরিত্রে এই নেগেটিভ রোলটাই মুভি এর চালিকাশক্তি। এই লোককে ছোট পর্দায় বেশ অনেক দেখেছি, কিন্তু এই রোলটা তাকে জাতীয় পুরষ্কার এনে দিতে পারে। রেদওয়ান রনির চোরাবালিতে যেমন শহিদুজ্জামান সেলিম, এখানে তেমনি একটা শক্তিশালী রোল এই চেয়ারম্যানের। দ্বিতীয়ত আসবে মোশারফ করিম, যার কাজ এখানে তার আগের থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বার, প্রজাপতির চরিত্রগুলার চেয়েও তুলনামুলক ভাবে অনেক ভাল। আমার মতে তার এখন পর্যন্ত বেস্ট ওয়ার্ক। বাকি ২ মূল চরিত্রের চেয়ে তার সংলাপ বলাই সব চেয়ে সাবলীল লেগেছে। গলার টোন, অভিব্যাক্তি সব ১০ এ ১০. চঞ্চলের সাথে তার কেমিস্ট্রি আসলেই ভাল যায়।  চঞ্চলের কাজ পার্শ্ব অভিনেতা হিসেবে উৎরে গেলেও মনপুরার সোনাই চরিত্রের কাছে এটা কিছুই না।

282813_10151374130175469_439726223_n

এবার মুভিতে আমার মতে একমাত্র ও সবচেয়ে বিরক্তিকর দিক – তিশার অভিনয়। একি ধরনের অভিনয় দেখতে দেখতে এক কথায় আমি ত্যাক্ত হয়ে গেলাম। সংলাপ বলায় ন্যাকামি,মেকআপ,অভিব্যাক্তি কোন কিছুতেই ভাল হয়নি তার কাজ। অথচ অনেক গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্যে তার ভাল অভিনয় এর দরকার ছিল, যেখানে সে অতি অভিনয় করে গেছে। আমার মনে হয়, পরিচালক ফারুকির ব্যাপারটা একটু সিরিয়াসলি নেয়ার সময় এসেছে এখন। তার সব মুভিতে মূল নারী চরিত্রে তাঁর স্ত্রীকে নেয়ার অভ্যাসটা আশা করি তিনি শীঘ্রই কাটিয়ে উঠবেন। এই চরিত্রে জয়া আহসান থাকলে মুভিটার আবেদন আরও বেড়ে যেত।

398506_148525705259156_1207762155_n
সব মিলায় এটা একটা ভিন্নমাত্রার মুভি, যেটা আসলেই সব ধরনের দর্শকের জন্য নয়। ইস্পেশালি শেষের ১৫ ২০ মিনিট সম্পূর্ণ অন্যরকম। আছে দুর্দান্ত একটা সমাপ্তি, এতটা প্রত্যাশা করিনাই। কিন্তু একেবারে পারফেক্ট জায়গায় শেষ হয়েছে মুভিটা। পুরা মুভি এর কিছু মনে থাকুক আর না থাকুক, শেষটুকু মনে দাগ কাটবে এবং রেশ সহজে কাটবেনা।

শুধু বিনোদনের উদ্দেশ্যে যদি মুভি টা দেখতে যান, তাহলে সতর্ক করে দেই, টেলিভিশন আপনার প্রত্যাশা সম্পূর্ণ পুরন নাও করতে পারে। চোরাবালির মত কমারশিয়াল কোন ইলিমেনট নেই এখানে। আছে জীবনবোধ। তবে আপনার গ্রামের বাড়ি যদি নোয়াখালী হয়, আপনার উপভোগ করার সম্ভাবনা ৩০ পারসেনট বেড়ে গেল।

(Visited 67 time, 1 visit today)

মন্তব্য করুনঃ

You must be Logged in to post comment.

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন